কচি রেজার গল্প: আঙুলে হরিণের ঘ্রাণ

চারপাশে বেঁচে থাকার শব্দ। রাস্তায় মানুষের কোলাহল। ভিখিরির হাত। রিকশার জ্যাম। নিরন্তর জীবনসংগ্রাম। এইসব পেরিয়ে রোজ কলেজ যায় সে।

একটি কলেজের শিক্ষিকা হিমিকা।

মানুষের ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস।

সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী হিমিকা তা জানে।

মাঝে মাঝেই মনে পড়ে উন্মাতাল ভার্সিটি জীবন। মিছিলের দিন। মিছিল-মিটিংয়ে ভরপুর সময়গুলো আজ মনে হয় মৃত অতীত।

নিজেকেও মৃত মনে হয়। সেই টগবগে তরুণী, যার কণ্ঠের আগুনে জেগে উঠত অজস্র ছাত্রছাত্রী।

যেন সেই আগুনে চিরতরে উৎখাত হবে ধনিক। আসবে সমতার দিন। না, আসেনি। সমাজতন্ত্র দূরে থাক, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার, খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্রের নিশ্চয়তা নেই আজও।

নতুন করে বেঁচে ওঠবার রসদ বা জীবনীশক্তিটাই আজ হারিয়ে গেছে। এত নিঃসঙ্গ লাগে। এত একাকী।

হিমিকার বর হাসিনকে একটা ভূতের মতো মনে হয়। অফিস আর আড্ডা। না, সেদিনের মিছিলের সঙ্গী হাসিন লেনিন, মাও সে তুং হতে পারেনি। কিছুই পারেনি হতে।

জনতার সংগ্রামে সে আর নেই। ভাবেই না। একজন সাধারণ মানুষ। সাধারণের দিনানুপাত।

এত সাধারণ মানুষকে কী করে ভালোবেসেছিল!

দুটি সন্তানই দূরে। নিজেদের সংসার আর জীবন-জীবিকায় ব্যস্ত।

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবে হিমিকা। ছেড়ে দিলে তারপর আরও নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে তো।

চাকরি ছাড়া হয় না। একঘেয়েমি কাটে না। মৃত্যুচিন্তা আসে। এই কি মধ্যবয়স? যে বয়সে ফুরিয়ে যাওয়ার, সবশেষে বসে অঙ্ক কষতে হয় অতল ব্যর্থতার লাভ-ক্ষতির।

একেকদিন মনে হয়, হাসিন ওকে আজকাল ভালো করে দেখেই না। খাওয়া হয় হয়তো একই সঙ্গে, বাইরে যায়, শোয়—তারপরও মন ভরে না। কী যেন ফাঁকা, শূন্যতা, অসম্পূর্ণতা।

হিমিকা আসলে কি ফুরিয়েই গেল?

আয়না হিমিকাকে প্রতারিত করে না। সেই হরিণ-শরীর হয়তো আর নেই। এগিয়ে আসছে ভাঙন। জলের তুখোড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ভেঙেছে তো কিছুটাই। তবু কপালে টিপ পরলে তো ভালোই দেখায়।

হিমিকা সেদিন একটু সাজল। কপালে কালো টিপ। লক্ষ করে দেখতে চাইল হাসিনের চোখের ভাষা। ভালোবাসার।

গতানুগতিক দৃষ্টি হাসিনের। ভোঁতা গলায় আরও গতানুগতিকভাবে জিজ্ঞাসা করল, বাচ্চারা ফোন করেছে কিনা। অফিসে জরুরি মিটিং। দেরি হবে ফিরতে।

রাতে ভালো ঘুম হলো না। মনে হলো সংসার বড়ো ছোটো। সংসারের অসংখ্য জানালা চেপে ধরতে আসে হিমিকাকে। হাঁফিয়ে যায়।

কী নিঃসঙ্গ সে। হাসিন তাকে ভালোবাসে না। একটুও না।

হিমিকা ভাবে, উঠে দাঁড়াতে হবে। জীবন ছোটোও নয়, বড়োও নয়, দীর্ঘও নয়। জীবন এবং জীবনাবসানের এই মাঝের সময়টুকু ওকে নিজেরই গড়ে নিতে হবে। ইজেলের গায়ে নিজের জীবনকে রেখে আবার লাগাতে হবে নানান রং।

আগের দিন আসবে না। এলে কি আর মানিয়ে নিতে পারবে! কোথায় সেই পঁচিশ ইঞ্চি কোমর। দিঘল, গোড়ালি-ছোঁয়া চুল।

তবু তো সূর্য ওঠে। ভোরের আলো কতদিন দেখে না নিজের বিমর্ষ চিন্তার ভারে।

না, সে আর এই চাপ নেবে না।

আর ভাবে, মানুষ ব্যর্থ হয় না। মানুষের জয়-পরাজয় নেই।

এবার অভ্যর্থনা জানাবে সকাল, দুপুর, বিমূর্ত রাতকে।

এই জনস্রোত, এই কোলাহল, শিশুর চিৎকার—

সবার দিকে চোখ তুলে এত দিন তো সে দেখেনি।

অন্ধ অথর্ব এক প্রাণীর মতো কেবল ভালোবাসা ভিক্ষে করে বেড়িয়েছে। হাসিনকে সাপের ছোবলে জর্জরিত করেছে। ভিক্ষে চেয়েছে কেবল। ক্ষুদ্র করেছে জীবনের অগাধ সুন্দরকে। ঐশ্বর্যকে।

এবং নিজেকে।

কই, আজও তো ফুল ফোটে। পাখিরা ডাকে।

নত হয় হিমিকা। গাছের কাছে। গাছের ধ্যানের কাছে। শালীনতার কাছে। গাছের পায়ের কাছে।

আরও আলো… আরও আলো… আরও আলো।

 

কচি রেজা

জন্মশহর গোপালগঞ্জ, ডিসি রোড। মা- রাবেয়া রেজা, বাবা- কাশেম রেজা। প্রকাশিত বই এর কয়েকটি: অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর; ভুলের এমন দেবতা স্বভাব; মমি ও কাচের গুঞ্জন মনে করো ও নির্বাচিত কবিতা।

কবি কচি রেজার ভাষায়- খুব প্রস্তুতি নিয়ে লিখতে তো আসিনি। তবে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে অনেক। এখনও নিচ্ছি। তৈরি হচ্ছি এখনও। সমস্তকবিতাকালই প্রস্তুতিকাল, আমি মনে করি। জীবন ভালো কি মন্দ জানি না। আঘাতের অভিঘাতই আমি লিখতে চেয়েছি কেবল!

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top