১.
আষাঢ়ের প্রথম দিন থেকেই আকাশের মুখ ভার। সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে। থামাথামির নাম নেই। এমন বৃষ্টি মাথায় করে কে আসবে চা খেতে! মোড়ের চায়ের দোকানি কদম আলী শেষমেশ একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুলা নিভিয়ে কেতলিটা নামিয়ে রাখল। ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
আকাশ থেকে একটা কালো মেঘের টুকরো আচমকা কদম আলীর দোকানের টিনের চালের ওপর ধপাস করে আছাড় খেয়ে পড়ল। বৃষ্টির একটানা ঘ্যানঘ্যানে শব্দকে ভেঙেচূড়ে বিকট আওয়াজে মেঘের টুকরো এমনভাবে পড়ল যেন একটা ভিজে-ভারী তুলোর বস্তা! কদম আলী চোখ রগড়ে দেখল, মেঘখণ্ডটা রীতিমতো গোঙাচ্ছে। সে ভয়ে ভয়ে একটা হাতা দিয়ে মেঘের গায়ে খোঁচা দিতেই সে মানুষের গলায় বলে উঠল,
— আহ্ ভাই, একটু সাবধানে! পিঠে বেদম চোট পেয়েছি।
কদম আলী রীতিমতো বোকা বনে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, তু—তুমি কথা বলতে পারো?
মেঘখণ্ড মুখ বেঁকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল, তোমার কি ধারণা মানুষই কেবল কথা বলে? অবশ্য তোমাকেই বা দোষ দিই কীভাবে। মানুষের যতটুকু দেখা-বোঝার ক্ষমতা, ততটুকুই তো সে দেখবে-শিখবে। বলছি শোনো, ওপরের আকাশে আজ তিন দিন ধরে মেঘেদের ট্রাফিক জ্যাম। মাথা খারাপ হওয়ার মতো জট। তিন দিন ধরে নাওয়া-খাওয়া সব মাথায় উঠেছে। জ্যামে আটকা পড়ে একটা সময় সবাই এমন হুজ্জত আর ধাক্কাধাক্কি শুরু করল যে, তাল সামলাতে না পেরে আমি সোজা তোমার টিনের চাল বেয়ে চাটাইয়ে এসে পড়েছি। এখন আমায় ওপরে ওড়ার ব্যবস্থা করে দাও, নইলে কিন্তু পুরো এলাকা বন্যায় ভাসিয়ে দেব!
কদম আলী পড়ল মহাবিপদে। আষাঢ়ে বৃষ্টিতে এমনিতেই ব্যবসাপাতি লাটে ওঠার জোগাড়, তার ওপর বন্যা এলে দুর্গতির শেষ থাকবে না। তা ছাড়া মেঘ ওড়ানোর বিদ্যা তার জানা নেই। এমন কোনো কলকব্জার কথাও জানে না, যা দিয়ে মেঘকে সে আকাশে পাঠাতে পারে। মেঘটা বেশ ওজনদার। চায়ের কেতলিতে আটানো সম্ভব হলে বাষ্প করে উড়িয়ে দেওয়া যেত। হঠাৎ তার মনে পড়ল পাড়ার দরজি কালু মিয়ার কথা। কালু মিয়ার কাঁচির হাত জাদুকরি। কদম আলী মেঘটাকে কোনোমতে একটা চটের বস্তায় ভরে বৃষ্টির মধ্যেই ছুটল কালু মিয়ার দোকানে।
কর্মহীন কালু মিয়া তখন অলস বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিল। বস্তা খুলে যখন জ্যান্ত মেঘ বের করা হলো, কালু মিয়ার চোখ তো চড়কগাছ! মেঘটা গরগর করে ডেকে উঠল। তার ভাবখানা এমন যেন যেকোনো সময় বজ্রপাত ঘটিয়ে দেবে। কালু মিয়া তার প্যাঁকাটে গোঁফে মোচড় দিয়ে বলল,
— হুম, কেস তো গুরুতর। এমন ধুমসো মেঘ ওড়ানো চাট্টিখানি কথা নয়। একে ওড়াতে গেলে আগে এর ওজন কমাতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। কালু মিয়া তার মস্ত বড় কাঁচিটা বের করল। তারপর খচখচ করে মেঘের চারপাশ থেকে অতিরিক্ত অন্ধকার আর জলীয় বাষ্প কেটে বাদ দিতে লাগল। অবাক কাণ্ড! কাঁচি ছোঁ্যাতেই মেঘের শরীর থেকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সব রুপালি বোতাম হয়ে মেঝেতে ঝরে পড়তে লাগল। আর কালো অংশগুলো কেটে তৈরি হতে লাগল চমৎকার রেশমি সুতো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কালু মিয়া ওজনদার বিশাল কালো মেঘটাকে কেটেকুটে ফুরফুরে হালকা, ধবধবে সাদা একটা তুলোর পুতুলের মতো বানিয়ে ফেলল। ওজন কমতেই মেঘ আনন্দে ডানা মেলার মতো করে দোকানের ছাদ ছুঁয়ে ফেলল।
মেঘ খুশিভরা রিনরিনে গলায় বলল, বাহ্, শরীরটা এত হালকা লাগছে! ধন্যবাদ দরজি ভাই।
তারপর জানালার শিক গলে এক লাফে সে সোজা আকাশে উঠে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিলতে রোদের আলোয় পুরো আকাশ সোনা রঙে ভরে উঠল, বৃষ্টিও এক নিমেষে গা ঢাকা দিল! কালু মিয়া ও কদম আলী মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখে, সেখানে পড়ে আছে হাজার খানেক চকচকে রুপোর বোতাম আর গাছি-গাছি চকচকে রেশমি সুতো।
এমন ঘনঘোর বৃষ্টিমুখর দিনে ওদের ভাগ্যের দরজা এভাবে খুলে যাবে কে ভেবেছিল!
২.
বিকেলবেলা আকাশটা হঠাৎই ভোল পাল্টে স্লেট রঙের চেহারা নিল। আষাঢ় মাসের এই এক যন্ত্রণা, কখন যে তার মুখ ভার হয় বলা মুশকিল। দুম করে নেমে আসা অন্ধকার দিনদুপুরে চারপাশে কেমন একটা ছমছমে আবহাওয়া তৈরি করেছে। আনমনা-উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে, কখন গ্রামের পুরোনো হাটের ভাঙা চালার দিকটায় এসে পড়েছি খেয়াল ছিল না। আশপাশে কেউ তেমন নেই, রাস্তার ধারে একজনের দিকে চোখ পড়ল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির পরনের শার্টময় ছোট-বড় রিফুর কারণে বিচিত্র এক নকশা তৈরি হয়েছে। তার কাঁধের ঝোলাটা ক্যাটকেটে লাল, না চাইলেও ঝোলাতে চোখ আটকে যায়। দুই হাতের তালু চিতিয়ে সে একটা কিছু ধরে আছে। মনে হচ্ছে কিছু বিক্রির আশায় দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। এই হাটের বেচা-বিক্রি বহুদিন ধরেই বন্ধ। লোকজন একদিকে খুব বেশি আসেও না। লোকটি কি সেটা জানে না? এদিকে নতুন এসেছে নাকি! কৌতূহলী হয়ে কাছাকাছি গিয়ে দেখি, তার হাতে একটা অদ্ভুত পকেট ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা বাঁইবাঁই করে উল্টো দিকে ঘুরে চলেছে। তার প্রতিটা টিকটিক শব্দ বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি ছড়ায়।
আমাকে কাছে এসে দাঁড়াতে দেখে লোকটি চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল, “সময় কিনবেন?”
ওরকম আজব কথা শুনে যে কেউই হয়তো হেসে ফেলত। কিন্তু ওর গলার ঠান্ডা স্বরে এমন কিছু ছিল, যা আমার হাসি আটকে দিল। ভেতরের অস্বস্তি চেপে বেশ ভারিক্কি গলায় বললাম, “কী আজব কথা! সময় আবার বিক্রি হয় নাকি?” লোকটি এবার চোখ তুলল। মণিহীন ঘষা কাচের মতো দুটো চোখ। খসখসে গলায় বলে উঠল, “খুব হয়। তবে সবাই এই জিনিস কিনতে পারে না। যারা বিশেষ কিছু ভুলে যেতে চায়, তারাই এর খরিদ্দার।”
বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার! বিশেষ কিছু একটা ভুলে যাবার চেষ্টায় আমি যেন ঠিক এমন কিছুই খুঁজছিলাম। কিন্তু এই লোক জানল কীভাবে! ভেতরের বিস্ময় বাইরে প্রকাশ না করে জানতে চাইলাম,
“কত দাম?”
“উঁহু! দাম নয়, বিনিময়।”
লোকটি আমার দিকে ঘড়িটা বাড়িয়ে দিল, “এর বিনিময়ে আপনার একটা স্মৃতি দিতে হবে। সেই স্মৃতি, যা আপনি সবচেয়ে বেশি আঁকড়ে আছেন।”
কৌতূহল সামলাতে না পেরে ঘড়িটা নেড়েচেড়ে দেখলাম। ঘড়িটা স্পর্শ করতেই মনে হলো, কপালের রগ চিরে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস ঢুকে গেল মাথার ভেতর। আর আমার শরীর থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা বেরিয়ে ঘড়ির কাঁটায় জড়িয়ে গেল। আমি ছিটকে পিছিয়ে এলাম, “কী নেওয়া হলো আমার কাছ থেকে?”
লোকটি হাসল, শব্দহীন নীরব হাসি। ঠোঁটের কোণে কেমন এক নিষ্ঠুরতা ফুটিয়ে সে উত্তর দিল,
“যেটা ছাড়া আপনি বেঁচে থাকবেন, কিন্তু কেন বেঁচে আছেন সেটা আর বুঝবেন না।”
অজানা আতঙ্কের সঙ্গে রাগ মিশে আমার পিত্তিটা বুঝি জ্বালিয়ে দিল। বিদঘুটে কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলাম, “এ তো রীতিমতো প্রতারণা!”
লোকটি শান্ত গলায় বলল, “মোটেও না। আষাঢ়ের বৃষ্টি যেমন মেঘের ঘড়িঘণ্টা জানান না দিয়ে আচমকা আসে, মানুষের কিছু স্মৃতিও তেমন হঠাৎই খসে পড়ে। সবাই এটা টের পায় না। আপনি পেয়েছেন, স্মৃতি খসে পড়ার মুহূর্তটা আপনি স্বচক্ষে দেখলেন। ঘড়িটা ছুঁয়ে আপনি নিজেই তাকে কাছে ডেকেছেন। তার দায় আপনারই।”
হুড়মুড় করে আকাশের বুক ফেটে বৃষ্টি নামল। যেনবা আমার স্মৃতি হারানোর দুঃখে সেও কাতর! সঙ্গে ছাতা ছিল না, বৃষ্টির ছাঁটে চোখ-মুখ বুজে আসছিল। শার্টের হাতায় চোখ মুছে তাকাতেই দেখি, রাস্তা ফাঁকা! লোকটি নেই কোথাও। তার উৎকট লাল রঙের ঝোলাটা পথে পড়ে কাদা-জল মেখে একা একা ভিজছে।
কোন স্মৃতির বিনিময়ে এই অদ্ভুতুড়ে ঘড়ির মালিক হতে হলো আমাকে? উত্তর খোঁজার ব্যাকুলতা কিংবা অজানা আতঙ্ক, আমাকে প্রায় ছুটিয়ে বাড়িতে নিয়ে এল। ভিজে একসা হয়ে বসবার ঘরে ঢুকতেই প্রথম নজর গেল দেয়ালে টাঙানো পারিবারিক ছবিটার দিকে। সেখানে বাবা, মা, ভাইবোন সবাই হাসিমুখে আদর্শ পরিবারের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মাঝখানের একটা জায়গা একদম সাদা, শূন্য! কেউ যেন ব্লেড দিয়ে নিখুঁতভাবে সবার মাঝখান থেকে একজনের অবয়ব কেটে বাদ দিয়েছে। মুখে কোনো শব্দ জোগাল না। ভেতরের ঝড় সামলে ভাবতে চেষ্টা করলাম, তার মানে অহেতুক কোনো স্মৃতি বিনিময় ঘটেনি, অজান্তে বিনিময় হয়ে গেছে নিজের অস্তিত্বের অধিকার!
হতাশায় মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে আমার। টের পেলাম বুকের ভেতর চেপে বসা শূন্যতা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। আমাকে চমকে দিয়ে হঠাৎই পকেটের ঘড়িটা টিকটিক শব্দে বেজে উঠল। কাঁপা হাতে ঘড়িটা বের করলাম। ঘড়ির কাঁটা এখন সোজা দিকে ঘুরছে। সময় সঠিক জায়গায় ফিরে এসেছে, কিন্তু আমি আর আমার জায়গায় নেই।
বাইরের বৃষ্টি ধরে এসেছে। জানালার ওপার থেকে ভেসে আসা ভেজা বাতাসের সঙ্গে কারো একটা ফিসফিসানি কানে এসে ঝাপটা দিল,
“যে সময় কেনে, সময়ের ভেতর থাকার অধিকার সে হারিয়ে ফেলে।”
