নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার-পর্ব-৬

মিরপুর টেকনিক্যালের কাছাকাছি এসে খাদিজা খানমের গাড়ি যানজটে আটকে গেল। ছুটির দিনের এই সময় সচরাচর এত জট থাকার কথা নয়। হয়ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কিংবা সাধারণের রাস্তা আটকে কোনো মন্ত্রী বা ক্ষমতাধরের জন্য পথকে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঘড়িতে এখন সোয়া আটটা। রাত বেশি হলে আসমাটা ওদিকে আবার ছটফট শুরু করবে। বারান্দার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে তার ফেরার অপেক্ষায়। ওঁর অস্বস্তিটা যেন টের পায় ড্রাইভার ফারুক। তার কাছে জানতে চায় যানজটের কারণটা নেমে জেনে আসবে কিনা? খাদিজা প্রবল বেগে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানান। এই ছেলেটার সব কিছুতেই ভীষণ কৌতূহল। বেশি কৌতূহল দেখাতে গিয়ে মাঝে মধ্যে বিপদও ডেকে আনে। দরকার নেই গাড়ি ফেলে বাইরে যাওয়ার। অপেক্ষা করা যাক। সাপ্তাহিক ছুটির দ্বিতীয় দিন হওয়ায় সকালে স্কুলে যাওয়ার চাপ নেই তাই হয়ত এতটা নিরুদ্বেগ তিনি। অবশ্য জোনাকি থেকে ফেরার সময় অনেকটা শান্তিভাব নিজের ভেতর বয়ে আনেন প্রতিবার। আর আজতো উপচানো আনন্দে কেটেছে পুরোটা সময়। কেমন নির্ভার একটা অনুভূতি তাকে ঘিরে থাকে জোনাকিতে গেলে। এই সময় জাগতিক হুল্লোড় তাঁকে যেন খুব একটা স্পর্শ করে না। মাথাটা পেছনে সীটে হেলিয়ে চোখ বুজে বিকেলে বাচ্চাদের আনন্দে মেতে থাকার দৃশ্য ভাবতে থাকেন এক মনে।

গাড়ির বাতানুকূলের ভেতর বসে থাকায় বাইরের বিজবিজে গুমোট আবহাওয়া টের পাওয়া যাচ্ছে না। খানিক উসখুস করে হঠাৎই ফারুক তার ওদিককার জানালাটা খুলে মুখ বাড়িয়ে বাইরের অবস্হা পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সেই সুযোগে গুমোট একঝলক বাতাস গাড়ির জানালা গলে ভেতরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। সঙ্গে পথের নানা বিচিত্র শোরগোল। ছিটকে আসে খুচরো কথাবার্তা-

-গাড়ির সবডি গেছে নাকি কেউ বাঁইচ্যা আছে?

-রিশকাটারে দিছে মিসমার কইরা, সাথে রিশকাওয়ালারেও—

কী অবলীলায় বীভৎস ঘটনার বর্ণনায় মুখর হতে পারে কিছু মানুষ! যানজটের কারণ স্পষ্ট হয়। সামনে এক্সিডেন্ট ঘটেছে। আহা কার কোল খালি হলো! কার ঘর ভরে গেলে নিদারুণ শূন্যতায়! মাথা তুলে সোজা হয়ে বসেন খাদিজা। একটু আগে মন ছেয়ে থাকা শান্তি শান্তি ভাবটা উবে গেছে। তাকিয়ে দেখেন ফারুক বাইরে মুখ বের করে কারো সাথে চাপা স্বরে কথা বলছে। ছেলেটা অযথা কৌতূহলের রাশ ধরে রাখতে পারেনি। নিশ্চয়ই এক্সিডেন্ট কীভাবে হলো ইত্যাদি নিয়ে আলাপ চলছে। বলেও লাভ হয় না। অধীনস্তদের সঙ্গে বকাঝকার ধাত একদমই নেই খাদিজা খানমের স্বভাবে। অবশ্য ফারুককে তিনি কেবল মাত্র ড্রাইভার হিসেবে ভাবেন না। সে তার পরিবারেরই একজন।

দীর্ঘদিনের পুরোনো ড্রাইভার ফারুক। বিশ্বস্ত। উনিশ কুড়ির যুবক ছিল যখন কাজে যোগ দেয়। এরই মধ্যে পনেরোটা বছর কেটে গেছে। দেখতে দেখতে এক ছেলের বাবাও হয়েছে। খাদিজা খানম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছেন ফারুকের। ওর বউটা খুব লক্ষী । ফারুকের মতো ছটফটে না। শান্ত স্বভাবের মিষ্টি একটা মেয়ে। স্বামী-স্ত্রী আর বাচ্চাটাকে নিয়ে ওরা নীচ তলার ডান দিকের দুটো ঘর নিয়ে সংসার পেতেছে। খাদিজা খানম বিয়ের উপহার হিসেবে একটা সংসারে যা যা লাগে সেসব দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। বলা যায় ওরাই এখন তার পরিবারের অংশ। বিপদ আপদে নিঃস্বার্থভাবে সবার আগে এগিয়ে আসে রক্তের সম্পর্কহীন এই ফারুক আর তার বউ জুলেখা। ওদের ছেলের নাম খাদিজাই রেখেছেন, অভ্র। জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখের ছটফটে দুষ্টু মিষ্টি একটা বাচ্চা। ছুটির দিনের আনন্দের উৎস সে খাদিজা খানমের। কাজের মানুষ, ড্রাইভার ওদের নিয়ে তার বাড়াবাড়ি বিষয়ে আত্মীয় স্বজনেরা স্বভাবতই বিরক্ত। তাদের বিরক্তরিতে তার যে কিছু যায় আসে না সেটা তাদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়ায় অনেক আত্মীয়ই এখন আর তাঁর বাড়িতে খুব একটা আসে টাসে না। আগ বাড়িয়ে আত্মীয়তা রক্ষার তাগিদ খাদিজাও আর এখন রক্ষার আগ্রহ পান না। আগে সবার খুব খোঁজ খবর করতেন। কিন্তু সবার সব বিষয়ে এত উগ্র কৌতূহল, অযাচিতভাবে উপদেশ দেবার অস্বস্তিকর অভ্যাস। খাদিজা খানমের পছন্দ না। তারচে দূরত্ব রেখে চলা ঢের ভালো।

-আম্মা এম্বুলেন্সে বডি তোলা হইছে, লাগে এট্টু পরই জট খুলবেনে। ফারুকের কথায় বর্তমানে ফেরেন খাদিজা। ‘বডি’ শব্দটা খট করে বুকে বাজে। প্রাণশূন্যতা মুহূর্তেই কেমন মানুষ থেকে একজন কে ‘বডি’ তে রূপান্তরিত করে। ওরকম রূঢ় শব্দ ব্যবহার করতে আগেও নিষেধ করেছিলেন, দিব্যি ভুলে বসে আছে। ফারুকের উপর রাগ করতে পারেন না। ওর কি দোষ, আশেপাশে যেমন চর্চা চলছে তারই অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ফারুক কিংবা অন্যরাও।

ধানমণ্ডি পৌঁছাতে পৌঁছাতে কত সময় গড়াবে এখনও নিশ্চিত না। খাদিজা খানম ব্যাগ খুলে মোবাইলটা বের করে আসমা কে জানিয়ে দেন পথে আটকে পড়েছেন, ফিরতে কিছু দেরি হবে। খবরটা নিচে গিয়ে যেন জুলেখাকেও জানিয়ে আসে, সেটি বলতেও ভোলেন না। ড্রাইভারের সীটে বসা ফারুক তার ঝকঝকে দাঁতে ঝিলিক তুলে বলে ওঠে,, -আপ্নের সবদিকে খেয়াল আম্মা। পূর্ণ চোখে তাকান তিনি ফারুকের দিকে। পথ থেকে আসা হলুদ রঙের মরা আলোর ভেতরও ওর চেহারার সজীবতা ফুটে আছে কেমন। পাশের কোনো গাড়িতে উৎকট হিন্দি গান বাজাচ্ছে কেউ। এরকম একটা পরিবেশে যেটা বড়োই বেমানান মনে হয় খাদিজা খানমের।
-এ জন্নই বলে কারো সব্বোনাশ, কারো পোউশ মাস। কেম্নে গান বাজায় দেখছেন আম্মা! ছেলেটার ভেতর জেগে ওঠা মানবিকতাবোধের স্পর্শে কিছুক্ষণ আগের বিষাদ মুছে যায় মন থেকে।

পরিস্হিতি বিবেচনায় সবার আচরণ একরকম আশা করাটা বোকামিই— বলতে গিয়েও চুপ করে থাকেন। সব কথার উত্তর হয় না। সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস চাপেন তিনি। আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে তার। কাচের বাইরে স্হবির হয়ে পড়া জটপাকানো যানবাহন ডিঙিয়ে আকাশ খোঁজেন মরিয়া হয়ে। দুপাশের সারি সারি ইটকাঠের জঙ্গলের ফোকর গলে পুরোটা আকাশ ধরা দেয় না কিছুতেই। সেই ব্যর্থতায় কিনা কে জানে, বাতানুকূল গাড়ির আরামদায়ক পরিবেশও তাকে স্বস্তি দিতে ব্যর্থ হয়। তার কেমন ফাপড় লাগে।

তাদের ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটার মতো বেজে যায়। আসমার অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও রাতে কিছুই মুখে দিতে উৎসাহ পান না খাদেজা খানম। দু’ গ্লাস বরফ শীতল পানি খেয়ে শুয়ে পড়েন। মুঠোভর্তি হুল্লোড়-আনন্দময় দিনটা বিমর্ষ রাতটার সামনে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দিনের সব সূর্যই গোটা দিনটাকে আলোতে ভারিয়ে দিতে পারে না। ভুল কথা ওটা – মর্নিং শোজ দ্য ডে– এক্সিডেন্টে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যাদের চলে যেতে হলো, তারাও চনমনে আলোকময় একটা দিন দেখেই দিবসের যাত্রা শুরু করেছিল হয়ত! অথচ কেমন অন্ধকারে ডুবে গেল সবটা। …কার সংসার উজার হলো ওই দুর্ঘটনায়? ভাবতে ভাবতে এক সময় ক্লান্তির কাছে নতজানু হন খাদিজা খানম। চাপা একটা অস্বস্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন এক সময়।

ফারুকের হইচই শুনে ঘুম ভাঙে খাদিজা খানমের। উঠে বসে কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করেন কি নিয়ে এতটা উত্তেজিত সে। বয়স হয়েছে তার, এভাবে ঘুম ভাঙায় বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে। নাইটস্ট্যান্ডের উপর ঢাকা দেওয়া পানির গ্লাসটা খালি করেন প্রায় এক নিঃশ্বাসে। খোঁপা খুলে এলিয়ে পড়া চুলগুলো আবার খোঁপায় বেঁধে নেন দ্রুত। এখনও মাথা ভরা চুল খাদিজা খানমের। চুলে পাক ধরেছে বহুদিন। সেটাও যেন ওর চেহারায় অন্যরকম একটা লালিত্য যোগ করেছে। স্কুলে তার ভক্ত অনেকেই প্রায় বলে, আপা চুলটা ছেঁটে ফেলুন, একদম প্রিয়দর্শনী লুক এসে যাবে। আপনার সঙ্গে ইন্দিরার চেহারায় সত্যিই ভীষণ মিল। নাকটাও সেরকম খাড়া… ওসব কথায় তিনি কেবল মুচকি হাসেন। এই নাক নিয়ে তার স্বামীর কত খোঁটাই না সহ্য করতে হয়েছে এক সময়…

-তুমি এত্ত শিউর কেম্নে হও সেইটা আগে বলো ফারুক মিয়া। এইজন তো অন্য কেউ হইতে পারেন। একই নামের কত্ত মানুষ থাকে না?’ আসমার ধীরস্হির গলা শোনা যায়।
ফারুক তড়বড়িয়ে উত্তর করে…
– আপা আপ্নে তো রোজ ইশকুলে যান না, যাই আমি। তারে রোজই দেখি। এই চেহারা, এইনাম। আহা রে আম্মা জানতেও পারেননাই গেল রাইতে তাঁর কলিগের এক্সিডেন্টেই আটকাইছিলাম আমরা…..

বুকটা ধড়াস করে ওঠে খাদিজা খানমের। কোনোরকমে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে ডায়নিং স্পেসের যেখানে ফারুক-আসমার কথা হচ্ছিলো সেখানে এসে দাঁড়ান। দাঁতব্রাশের কথাটাও বেমালুম ভুলে যান।
-কাকে নিয়ে কথা বলছো তোমরা? কী হয়েছে?
আসমা দ্রুত ওঁর কাছে এগিয়ে আসে।
-আম্মা রাতে আপ্নে কিচ্ছু খান নাই। আগে কিছু মুখে দেন। তারপর ফারুকের বেহুদা প্যাচাল শুইনেন। ফারুক তুই এইবার যা তো।
বিরক্তি নিয়ে চোখে চোখে ফারুককে আরো কিছু যেন বলার চেষ্টা করে আসমা। খাদিজার বুঝতে দেরি হয় না, রাতে কিছু খাননি বলেই আসমা কায়দা করে তাঁকে আগে কিছু খাইয়ে নেবার জন্য ফারুককে তাড়াতে চাচ্ছে। কি বুঝে ফারুক কে জানে, হাতে ধরে থাকা কাগজটা চট করে পেছনে লুকিয়ে ফেলে। দৃষ্টি এড়ায় না সেটা খাদিজা খানমের। হাতটা মেলে ধরেন ফারুকের সামনে।
-কাগজটা দাও।
যন্ত্রের মতো কাগজটা খাদিজা খানমের সামনে তুলে ধরে। ওর চোখ-মুখে অপরাধী ভাব স্পষ্ট। বেচারার জানা ছিল না রাতে খাদিজা কিছুই খাননি। চোখের দৃষ্টি দিয়ে যদি পুড়িয়ে দেবার ক্ষমতা মানুষের থাকতো, ফারুক এতক্ষণে আসমার দৃষ্টির আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যেত বোধকরি।

অজানা এক আশঙ্কায় দুরু দুরু বুকে কাগজটা হাতে নিয়ে ডায়নিং টেবিলে চেয়ার টেনে বসে পড়েন খাদিজা। কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেন ঠিকই, কিন্তু সবই কেমন ঝাপসা ঝাপসা। তাড়াহুড়োতে চশমাটা ভুলে গেছেন। আসমাকে এগিয়ে আসতে দেখে বুঝে যান সে কী বলতে চায়। ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে ওঠেন,
-চশমাটা এনে দে জলদি….

কতক্ষণ বসে আছেন এই চেয়ারে? সামনে খোলা খবরের কাগজ। প্রতিদিনের মতো হাজারে বিজারে খবরের ভাঁজে নতুন একটা শিরোনাম হয়ে ফুটে আছে কোথাও কারো ঘর উজার হওয়ার ভয়াবহ বার্তা । ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ড্রাইভারসহ একই পরিবারের তিনজন সদস্য এবং এক অজ্ঞাত পরিচয়ের রিকশাচালক নিহত। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকচালক নিখোঁজ।’ বার কয়েক খবরের পুরো বর্ণনাটা পড়েছেন খাদিজা খানম। ফারুক যেমন নিশ্চিত তিনিও তাই। তবুও মন আসমার মতো ভেবে স্বস্তি খুঁজতে চায় যেন। একই নাম অন্য অনেকেরই হতে পারে। চেহারার মিলটাও অসম্ভব কিছু না। কিন্তু স্কুলের নামটা! ওটা যে তারই স্কুলের নাম! স্বামী সন্তানসহ হাসিমুখের নার্গিস মাহজাবীনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খাদিজা খানম স্হান কাল ভুলে স্বজন হারানোর শোকে হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন…

দীর্ঘদিন সহকর্মী হিসেবে একসঙ্গে তারা কাজ করেছেন। তাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা একটা সময় আর তেমন স্বাস্হ্যকর হয়ত ছিল না। কিন্তু শত অপমানেও খাদিজা কখনও মেয়েটার অনিষ্ট কামনা করেছেন বলে মনে পড়ে না। কিছু মানুষ নিজের ইগোর বৃত্তে আটকে থেকে অন্যকে টেক্কা দিয়ে কেবল জিতে যেতে চায়। অন্যের আগে নিজেকে দেখতে ভালোবাসে। অস্বীকারের উপায় নেই স্বভাবে-আচরণে নার্গিস মাহজাবীন ছিল সেরকম একজন। ব্যক্তিগতভাবে খাদিজার কোনো সমস্যা ছিল না তাকে নিয়ে। মাহজাবীনসহ আরো কয়েক জনই বরং খামোখাই রেষারেষির একটা অস্বাস্হ্যকর পরিবেশ তৈরি করেছে স্কুলে। কী লাভ এসব করে আসলে! সব কিছু পেছনে ফেলে শূন্যহাতে মৃত্যু নামের অমোঘ পরিণতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। পরিণত একটা জীবন কাটিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মৃত্যুও মৃতের স্বজনদের জন্য শোকের। আর মাহজাবীনের তো সেখানে জীবনের কাছে আরও কত পাওনা বাকি ছিল। কতই বা বয়স মেয়েটার। মাত্র উনচল্লিশ! দেখতে আরো কম মনে হতো।

আরো কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে কত কি ই ভাবছিলেন খাদিজা। উপস্হিত সবার চোখে মুখে স্বজন হারানোর চিহ্ন। সহকর্মীদের অনেকেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সদ্য নিহত পরিবারের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় আলোচনায় মগ্ন। সদ্য বিদায় নেওয়া মেয়েটির সাংসারিক জীবনের অজানা তথ্য অন্যদের মধ্যে পরিবেশন করে একে অন্যকে টেক্কা দেবার একটা সূক্ষ্ণ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন যেন মৃতার ঘনিষ্ট সহকর্মী-বন্ধুদের কেউ কেউ। মাহজাবীনের ননদের কান্নাকাটিতে বিরক্ত সহকর্মী পাপিয়া কেটে কেটে বলে,
– এহ্ কান্নার মচ্ছব বসানো হচ্ছে এখন। বেঁচে থাকতে তো কম প্যারা দাওনি মাহজাবীনকে। পাপিয়ার চেয়ে নুশাবাও যে কম কিছু জানেনা সেটা জানান দিতে বলে ওঠে,
-বড় ভাবী ঘষেটি বেগমের ন্যাকামিটা দেখতে আরো অসহ্য লাগছে। মহিলা, মাহজাবীন প্রেগন্যান্ট হলে কম তুকতাক করেনি বাচ্চাটা নষ্ট করতে—–
কেউ আরেকজন সামান্য গলা তুলে ফস্ করে বলে বসে,
-এক অর্থে ভালোই হয়েছে মাহজাবীন সপরিবারে মারা গেছে। ওদের মধ্যে একজন কেউ বেঁচে থাকলে সে বেঁচে থাকাটা দারুণ যন্ত্রণাময় হতো–
কথটা হয়ত সত্যিই। কিন্ত সর্বসাধ্য মনে হলেও সব জায়গাতে কী সব কথা বলার প্রয়োজন আছে! মৃতদের পরিবারের কারো কানে এই রূঢ় বাক্যটুকু পৌঁছালে সেটা কতটা যন্ত্রণা হয়ে বাজতে পারে সে জ্ঞানটুকুও তো থাকা চাই। কথার জন্য কথা বলাটাও কারো কারো স্বভাব। অন্যের ক্ষত ঢেকে রাখার চেয়ে সেটা প্রকাশ্যে আনার নিষ্ঠুরতায় মানুষ বড়ই সুখ পায়। খাদিজা খানম চুপচাপ নির্লিপ্তভাবে এক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন।

এরই ভেতর একজন বয়স্ক মতো মহিলার আহাজারি করিডোরে আছড়ে পড়ে গোটা পরিবেশটাকেই কেমন বিষন্ন করে তুলেছে। মাহজাবীনের মা কিংবা শাশুড়ি হবেন। কান্নারত মানুষটার অবস্হান জটলার ভেতরে হওয়ায় এখন থেকে বোঝার উপায় নেই কে কাঁদছেন। এমন শোক সহ্য করা কোন মায়ের পক্ষে সম্ভব! শোকের পরিবেশে খাদিজার দম কেমন বন্ধ হয়ে আসতে চায়। শোকগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেবার ব্যাপারে খাদিজা খানম বরাবরই দুর্বল। কষ্টে বুক ফেটে গেলেও দুটো সান্ত্বনার বাক্য মুখে সময় মতো জোগায় না তার। হয়ত বলতে পারেন না বলেই এরকম পরিস্হিতির ধকলে তিনি কেমন অসুস্হ হয়ে পড়েন। আসমা বিষয়টা জানে বলেই তাকে বাধা দিতে চেয়েছিল। তার নিষেধ সত্ত্বেও তিনি না এসে পারেননি। ওর পরিবারের সদস্যদের নাইবা মুখ ফুটে সমবেদনা জানাতে পারলেন। তাঁর নীরব উপস্হিতির মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর বহুদিনের সহকর্মীর প্রতি মনে মনে শেষ ভালোবাসাটুকু জানানোর ইচ্ছায় ছুটে এসেছেন।

একটা প্রাণবন্ত পরিবারের সবার এভাবে একসঙ্গে চলে যাওয়ার শোক যারা বেঁচে থাকলেন তারা কীভাবে সামলাবেন! বিষয়টা ভেবেই বাতাসে অক্সিজেনের অভাববোধ করেন খাদিজা খানম। হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নেন তিনি। ইতিমধ্যে ফারুক বার দুয়েক এসে জানতে চেয়েছে কখন বাড়ি ফিরবেন। আসমা হয়ত তাগাদা দিয়েছে। হুট করে চলে আসতেও তার কোথায় জানি বাধছে। পোস্টমোর্টমের অনুষ্ঠানিকতা সেরে লাশ পেতে ঢের সময়ের ব্যাপার। যদিও মাহজাবীনের বড়ো দুলাভাই আর্মির পদস্হ কর্মকর্তা এবং স্বামীর বাবা খোদ হাসপাতালের ডাক্তার হবার সুবাদে হয়ত সাধারণ সময়ের চেয়ে খুব একটা দীর্ঘসূত্রতায় গড়াবে না। তাও কখন সম্ভব হবে সেটাও অনিশ্চিত। পাপিয়ার মাধ্যমে তথ্যটা জানতে পেরে উপস্হিত সহকর্মীরা বিদায় নেবেন সিদ্ধান্ত হয়। পাপিয়া লাশ না পাওয়া পর্যন্ত থাকবে। পাপিয়ার সঙ্গে মাহজাবীনের সবচে’ বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। আহা বেচারীর জোড় ভেঙে গেল! মাহজাবীনের শেষ বিদায়ে পাপিয়াকে প্রতিনিধি হিসেবে হাসপাতালে রেখে বাকিরা একে একে যে যার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হাসপাতাল ছাড়ে।

পড়ন্ত বিকেলের গায়ে সন্ধ্যার আলতো ছায়া পড়ে যখন চারদিকে মায়াবী মসৃণ একটা পর্দা নেমে আসতে শুরু করে, হাসপাতাল থেকে তখন খাদিজা খানম বাড়ি ফিরেন। বাড়ির সদর দরজা খোলার অপেক্ষায় গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকার মুর্হূতে চোখ পড়ে তার বাড়ির ঠিক লাগোয়া বাড়ি শবনমের দিকে। বদিউর রহমান চাচা মালীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে কিছু বোঝাচ্ছেন। হাত তুলে বোঝানোর ভঙ্গির কারণে ওঁর হাতের লাঠিটাও বার কয়েক শূন্যে লাফিয়ে ওঠে। যতবার লাঠিটা শূন্যে লাফায় মালী তালিব আলী ভয়ে ঝট্ করে মাথাটা নীচু করে নিচ্ছে। চমৎকার বোঝাপড়া। দৃশ্যটা খাদিজার মনে কিছুটা হলেও ভালোলাগার আবহ তৈরি করে দেয়। তার ঠোঁটের কোণে পাতলা একটু হাসি ভেসে ওঠে। কথা শেষ করে ওদের দিকে হাসিমুখে বদিউর রহমানকে এগিয়ে আসতে দেখে ফারুক গাড়িতে গতি না দিয়ে থামিয়ে রাখে।

-কেমন আছো গো মা? ক’দিন দেখিনি তোমাকে। ব্যস্ততা যাচ্ছে খুব?’ আরো কিছু বলতে গিয়ে থমকে যান খাদিজার শুকনো চোখমুখ দেখে।

-শরীর ঠিক আছে তো মা? বেশি খাটাখাটুনি যাচ্ছে মনে হচ্ছে….

তারপর কিছুটা একটা মনে পড়তেই বলে ওঠেন

– যাও যাও, ভেতরে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। মেয়েটা অনেকক্ষণ অপেক্ষায় আছে তোমার। আমার সাথেও খানিক কথা হয়েছে ওর, বুঝলে! ভারী মায়াভরা মুখ মেয়েটার। ওকে দেখে কী মনে হয়েছে জানো? যেন আমার মেয়েটাই সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে……’

কে মেয়ে? কার কথা বলছেন বদি চাচা? খাদিজার মাথায় কিছুই ঢোকে না। তবে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না চাচা আজ কোনো কারণে খুব খোশ মেজাজে আছেন। নিজ থেকে এক নাগারে এত কথা আজকাল তিনি আর তেমন বলেন কই! সারাদিন নাওয়া-খাওয়াহীন শরীরটা কেমন ঝিমঝিম করে খাদিজার। মাহজাবীনের আকস্মিক মৃত্যুটা তার ভেতরে বেশ নাড়া দিয়েছে। মাথা যেন ঠিক মতো কাজ করছে না। বদি চাচাকে দেখা মাত্র তিনি নিজেই সচরাচর তাঁর খোঁজ-খবর নেন, এগিয়ে গিয়ে কথা বলেন। অথচ আজ তিনি সৌজন্যবশত গাড়ি থেকে নামতেও ভুলে যান। ভুলটা বুঝতে পেরে শোধরানোর সদিচ্ছায় তড়িঘড়ি গাড়ির দরজা খুলে নামতে যাবেন, বদিউর রহমান নিজেই বাধা দেন।

– ঘরে যাও মা। কেউ তোমার অপেক্ষায় আছে।

 

নাহার তৃণা

জন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।