নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার-পর্ব-৮ (শেষ)

সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে যাবার মুখে একটা সম্মিলিত খিলখিল হাসির শব্দে থমকে যেতে হয় খাদিজা খানমকে। শব্দটা নীচতলার ফারুকের ঘর থেকে আসছে। অভ্রের কঁচি কণ্ঠের সাথে পাল্লা দিয়ে আসমা- জুলেখার সাথে অপরিচিত আরো একটা গলা কি এক অপার্থিব আনন্দে খিল খিল হাসিতে ভেঙে পড়ছে। স্বভাবতই কৌতূহলী হয়ে উপরে না গিয়ে ফারুকের ঘরের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে যান খাদিজা। ফারুকও গুটি গুটি পায়ে পেছন পেছন আসে। নীচতলার বসবার ঘরের মেঝেতে ফুটফুটে এক তরুণী চিৎ হয়ে শুয়ে অভ্র কে উপরে ছুঁড়ে দিচ্ছে আবার খপ্ করে লুফে নিচ্ছে। সেই সাথে ছড়া কাটছে তালে তালে – ছিপখান তিন দাঁড় তিনজন মোল্লা..’ ছোট্ট অভ্র একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বরং মজা পেয়ে খলবল করে হাসছে। সেইহাসির সাথে পাল্লা দিয়ে পাশে বসা জুলেখা, আসমাও হাসছে। ওদের চোখে মুখে অপার মুগ্ধতা। যেন জাদুকর মনোমুগ্ধকার কোনো জাদু দেখাচ্ছে আর দুজন উপস্হিত দর্শক অবাক বিস্ময়ে তাই দেখছে। এই দেখায় তারা এতটাই মগ্ন যে খাদিজা খানম বা ফারুকের উপস্হিতি ঠিক খেয়াল করেনি কেউ। ফারুক যথার্থই সারপ্রাইজড! ওর ঘরের উদোম মেঝেতে শুয়ে পরীর মতো এই মেয়েটা কে! অবশ্য তার ঘরের প্রতিটি কোণার মতো মেঝেও ঝকঝকে তকতকে রাখে জুলেখা। নিজেদের উপস্হিতি জাহিরের উদ্দেশ্যে সে গলা খাকারি দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় – হু ইউ?

ওর ভুল ইংরেজির কারণে নাকি অনিন্দ্য সুন্দর একটা দৃশ্যের মাঝে হঠাৎ ছন্দপতন ঘটানোর অপরাধে খাদিজা খানম বিরক্ত হয়ে ফারুকের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকান। ঘরের ভেতর তখন বাস্তবিকই ছন্দপতন ঘটে গেছে। শোয়া থেকে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়। বুকের কাছে আঁকড়ে থাকা অভ্র তখনও হেসে যাচ্ছে। আসমা, জুলেখার সামনে থেকে হুট করে মুগ্ধতার পর্দা সরে যাওয়ায় তারাও দাঁড়িয়ে গেছে। পরিস্হিতি স্বাভাবিক করতেই বুঝি জবাবদিহির স্বরে আসমা হড়বড় করে বলে ওঠে,

-এই আপা আসছেন আপনার সাথে দেখা করতে। তারে আগে দেখিনাই, চিনিও না। তাই উপরে না নিয়া এই ঘরে বসাইছি।

-আম্মা তিন-চাইরবার ফোনও দিছিলাম। সেই কত্তক্ষণ গেছেন। আপ্নের কিচ্ছু খাওয়াও তো হয়নাই; চোখমুখ কেমন শুকনা লাগে। আপায় অনেকক্ষণ বসা। বলতে বলতে পুষ্পিতাকে দেখায়।

– আপনার কলিগের দুঃখজনক খবরটা শুনেছি ওদের মুখে, টেক মাই ডিপেস্ট কন্ডোলেন্স..বলতে বলতে এগিয়ে এসে তাকে অবাক করে দিয়ে খাদিজা খানমের সারাদিনের ক্লান্ত-শ্রান্ত, ঘামে ভেজা শরীরটা জড়িয়ে ধরে।
মিষ্টি একটা গন্ধে ম ম করছে মেয়েটার শরীর। খাদিজা খানমের বুকের ভেতরটা এই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির ভালোলাগায় কেমন উথাল-পাথাল করে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ কথাহীন ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর কোমল স্বরে জানতে চান কে তুমি মা?

-আমি পুষ্পিতা, একজন মা কে দেখতে এসেছি।

খাদিজার প্রশ্নের চটপট উত্তর দেয় পুষ্পিতা। অভ্রকে ওর মায়ের কোলে চালান করে দিয়ে পাশের সোফায় রাখা বেলুনটা তুলে দেখায়।

-এই যে দেখুন! ওর মুখে এখন ঝলমলে হাসি।

গোটা ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেণ্ড লাগে খাদিজা খানমের। বিস্ময়ে তিনি কথা খুঁজে পাননা। বাড়ির ঠিকানাসহ বেলুন ওড়ানোর খেলাটা তো তিনি অনেকবারই খেলেছেন। আজ পর্যন্ত কেউ ঠিকানা ধরে এসে উপস্হিত হয়নি। এও কি সম্ভব! গতকালই তিনি কী এক আবেগে পড়ে বেলুনটায় বাড়ির ঠিকানা আর ‘তোমার মা’ লিখে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই বেলুনটা গিয়ে পড়েছে এই মেয়ের হাতে! আর পেয়েই ছুটে এসেছে তাকে দেখতে! ওর ফুটফুটে চেহারা, কথাবার্তা- বেশবাস দেখে তো মনে হচ্ছে না কোনো বদ মতলবে এসেছে। কিছু মানুষ থাকে যাকে দেখেই আপন মনে হয়। বিশ্বাস ভালোবাসা কেড়ে নেয় মুহূর্তে। মেয়েটা সেই গোত্রের। কতক্ষণ আর এসেছে এ বাড়িতে? অথচ কী সাবলীল আন্তরিক ব্যবহার।

হাসপাতালের শোকগ্রস্ত পরিবেশ উজিয়ে এসে এই বিস্ময়কর যোগাযোগে খাদিজা খানম কেমন খেই হারিয়ে ফেলেন। এতক্ষণের ক্লান্তি-ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব কেমন নিমিষেই উবে যায়। আসমার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উঁচু গলায় বলেন,
-ওকে উপরেই বসানো উচিত ছিল। এসো তো তুমি আমার সঙ্গে।
মেয়েটাও কেমন দিব্যি বিনা বাক্যব্যয়ে সযত্নে ওঁর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। বাকিরাও পেছনে পেছনে এসে উপস্হিত হয়। উপরে এসে চারদিকে চোখ বুলিয়ে পুষ্পিতা বুক সেলফের সামনে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কি দারুণ কালেকশন আপনার! আলগোছে কিছু বইয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। খাদিজা খানমের দিকে ঘুরে বলে চমৎকার বাড়ি আপনার। কিন্তু আপনার এখন রেস্ট দরকার। আপনি রেস্ট করুন, আমি বরং এবার আসি। এই না… মুখের কথাটা কেমন জড়িয়ে যায়, খাদিজা খানম টলে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে চোখের পলকে পুষ্পিতা দুহাতে তাঁকে আঁকড়ে ধরে। আসমা হা হা করে ওঠে, সারাদিন না খাওয়া, আম্মার সুগার নামছে…। মানুষটা ডায়াবেটিক সুগার ফল করেছে বুঝতে সমস্যা হয়না পুষ্পিতার। দৌড়ে চিনি গোলা পানি নিয়ে আসে আসমা। যত্ন করে সেটা খাইয়ে দেয় সোফায় এলিয়ে থাকা খাদিজাকে। তারপর ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়।

মিনিট দশেক হলো নিজের বিছানায় এনে তাকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে। চুপচাপ শুয়ে আছেন তিনি। চোখ খুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না একদম। তাতে যদি এতক্ষণ চলতে থাকা পুরো ঘটনাটা স্বপ্নদৃশ্যের মতো হওয়া হয়ে যায়! অনবরত একটা কোমল হাত তার চুলে বিলি কেটে যাচ্ছে। আরামে শান্তিতে ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এই মেয়েটি কে! শরীরভরা মায়া। যেন খাজিদা খানম তার নিজের মা। এই অপার্থিব পাওয়ার সময়টিকে এতদ্রুত সমাপ্তিতে টেনে নিতে মন চাইছে না খাজিদা খানমের। তিনি চোখ খুললেই মেয়েটি হয়ত আবার বলবে, এবার তবে আসি। থাকুক না আরেকটু। পরের অচেনা অজানা মায়াবতী মেয়েটা আরো কয়েকমুহূর্ত ওর মেয়ে হয়ে। থাকুক না আরো কিছুক্ষণ সন্তানহীন এই মায়ের পাশে। এরই ভেতর প্রেশার মাপার যন্ত্র আছে কিনা খোঁজ নিয়ে সেটা আনিয়ে প্রেশার মেপেছে। লো প্রেশার। দুধের গ্লাস ধরে আসমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, দাঁড়ান আমি ওঁকে তোলার চেষ্টা করছি। গরম দুধটুকু খেলে ভালো লাগবে— আলগোছে তাকে তোলার চেষ্টা করছে দেখে খাদিজা খানম এবার নড়েচড়ে ওঠেন। মেয়েটাকে কষ্ট দেয়া হয়ে যাচ্ছে অযথা। সযত্নে দুধের গ্লাসটা মুখের কাছে ধরে। যেন ছোট্ট কোনো শিশুকে বলা হচ্ছে এমন ভঙ্গিতে বলে চোঁ চোঁ করে সবটুকু শেষ করে ফেলুন দেখি! বলেই হেসে ফেলে। ছোটোবেলায় মা ওরকম বলে আমাকে দুধ খাওয়াতো। ওর নির্মল হাসি ঘরময় থিতু হওয়া দমচাপা ভাবটা উড়িয়ে নিয়ে যায়। এতক্ষণ কথা ভুলে চুপচাপ সব দেখে যাওয়া ফারুকের মুখে এবার বোল ফুটে,
– ম্যাডাম কি ডাক্তার নাকি?
মুখের হাসি ধরে রেখেই উত্তর দেয়।
-না ভাই, আমি ডাক্তার নই। মা অসুস্হ ছিলেন যখন, তখন দেখাশোনা করতে গিয়ে টুকটাক শেখা।
-আপ্নের মা এখন কেমন আছেন ম্যাডাম?
-ভালোই আছেন সম্ভবত।
-কেন ম্যাডাম, আপ্নের সাথে মায়ের বনিবনা নাই?
-‘বনিবনা’? মানে?
-মানে মিলমিশ, যোগাযোগ আপা। পাশ থেকে জুলেখা শব্দের অর্থটা ধরিয়ে দেয়।
-নাহ্ যোগাযোগ নেই। মৃতদের সাথে জীবিত মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এখনও।
ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে হুট করে। উপস্হিত মুখগুলো একধরনের অপরাধবোধে ঝুলে পড়ে।
-আরে আরে.. শোনেন, পৃথিবীতে আমরা যে যার মতো নিদির্ষ্ট সময় নিয়ে আসি। এতে আমাদের কারো হাত নেই। যে বিষয় আমাদের হাতেই নেই সে বিষয়ে দুঃখ পাওয়াটা ঠিক না। মৃত্যু তো শুধু মানুষের শরীরটা নিয়ে যায়। তার সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো নিতে পারে না। আমার মায়ের সাথে আমি খুব আনন্দের সময় কাটিয়েছি। মা আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড। এখনও। এই যে এই দেশে আসা সেটাও মায়ের জন্য। মা আমার সাথেই আছেন। গলার লকেটে আলতো করে হাতটা রাখে।

পুষ্পিতা হাতঘড়িতে সময় দেখে নেয় চট করে। এই দেশে তার থাকার মেয়াদ আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তার যাওয়া দরকার। ভদ্রমহিলাকে এভাবে ফেলে যেতেও মন সায় দেন না যেন। অভ্রটাকে চট করে কোলে তুলে নিয়ে ওর পেটে কাতুকুতু দিতেই খলবল হাসিতে পরিবেশটা পালটে যায়।
পুষ্পিতা হাসতে হাসতে বলে,
– এটাকে আমায় দিয়ে দেন। আমি নিয়ে যাই সাথে করে।
এতক্ষণ কেন এই প্রশ্নটা করা হয়নি সেটা ভেবেই বুঝি ফারুক দারুণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
-আরে আপ্নি কই থাকেন সেইটা তো জানা হয় নাই। কই থাকেন ম্যাডাম?
ওর হয়ে জুলেখা আর আসমা কে কার আগে উত্তরটা জানাবে তার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। হড়বড় করে দুজনই একসাথে বলে ওঠে
– আমরিকা।
-কসকি মামুন! আপ্নি আমরিকা থেইকা এই বেলুন পায়া আসছেন?
ফারুকের তাজ্জব মুখটা দেখে পুষ্পিতা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ছলকে ওঠা ঝরনার মতো হাসতে থাকে সে… ওর হাসির তোড়ে আস্তে আস্তে উঠে বসেন খাদিজা খানম।

-আহহা শুয়ে থাকুন, আরেকটু শুয়ে থাকুন।
খাদিজা খানমের বলতে ইচ্ছে করে শুয়ে শুয়ে এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না। কেমন আনন্দ বিলাচ্ছে এই মেয়ে! আস্তে করে জিজ্ঞেস করেন,
– তুমি কোথায় উঠেছো মা? কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে?
আসলে খাদিজা খানমের এই প্রশ্ন করার পেছনে কারণ আছে। তার চিন্তা হচ্ছিল অচেনা শহরে মেয়েটা ফিরবে কীভাবে? তার স্বজনেরা হয়ত চিন্তা করবেন অযথা।
-হোটেল আম্বালা ইনে উঠেছি আমি। আমার সাথে গাড়ি আছে। অবশ্য ড্রাইভার ভাইকে একটু ঘুরে আসতে বলেছি আশেপাশে। উনি এসে ফোন দেবেন। এখন একটু ভালো লাগছে আপনার? এবার কিছু খেতে হয় তো।
-কী কাণ্ড হোটেলে উঠেছো তুমি! তোমার আত্মীয় স্বজনেরা ঢাকার বাইরে থাকেন বুঝি?
-জি।
ক্লান্ত মানুষটাকে নিজের সত্যিটা বলে এখন আর ভারাক্রান্ত করতে মন চাইলো না পুষ্পিতার।
-কতদিন আছো ঢাকায়?
-আগামিকাল রাত একটায় আমার ফ্লাইট।
-বেশি সময় তো নেই।
কেমন হাহাকার করে উঠলেন খাদিজা খানম। এই অল্প সময়ে মেয়েটা তাকে কেমন একটা মায়ায় বেঁধে ফেলেছে। পুষ্পিতার হাত ধরে নিজের পাশে বসান।
-তোমার জন্ম এখানে বুঝি?
কলকল করে হেসে ওঠে পুষ্পিতা।
-আমার বাংলাটা চমৎকার ঠিক না? আমার মায়ের জন্য সম্ভব হয়েছে জানেন! আমার জন্ম ম্যাসাচুসেটসে। পরে মা আর আমি নিউইর্য়কে চলে যাই। ওখানে মা পিএইচডি করে। আমার পড়াশোনা চাকরি সব নিউইর্য়কেই।
-তোমার বাংলা শুনে বোঝার উপায় নেই তুমি এদেশে বড় হওনি। এখানে জন্ম নেওয়া অনেক ছেলেমেয়েও তোমার মতো এত ভালো বাংলা বলে না। কী সুন্দর ছড়াও কাটছিলে তখন…। একটা শব্দে গড়বড় ছিল একটু এইযা, বাকিটা কিন্তু নিখুঁত! আমার স্কুলের অনেক বাচ্চাদেরই দেখি ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলে।
অশুদ্ধ শব্দ উচ্চারণের জন্য জিভ কামড়ে নেয় পুষ্পিতা। তারপর উচ্ছ্বসিত হয়ে জানতে চায়,
-বাহ্ আপনি স্কুলে পড়ান? আমার মা ও স্কুলে মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতো। আমার নানাভাইও শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।
খাদিজা খানমের জানতে ইচ্ছে করে,
-আচ্ছা বেলুনের লেখাটা তো কারো নিছক দুষ্টুমিও হতে পারতো। সেরকম হলে?
খাদিজা খানমের হাতদুটো টেনে নিয়ে বুকের কাছে ধরে পুষ্পিতা বলে,
– হুম, পারতো বৈকি। জানেন, বেলুনের এই খেলাটা আমিও খেলি। মায়ের সাথে। যদিও জানি ওপাশ থেকে মায়ের উত্তর পাবো না। তাই একটা সুযোগ নিলাম। ভাবলাম, মেয়ে হয়ে এক মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে দেখাই যাক না!
বুকের উপর চেপে রাখা হাতদুটো পুষ্পিতার হৃৎপিণ্ডের বেড়ে যাওয়া ধুকপুক টের পায় স্পষ্ট। চোখের কোণ কটকট করে ওঠে খাদিজা খানমের।

নিজের দুর্বলতা ঢাকতে প্রসঙ্গ পালটে জানতে চান মেয়েটাকে কিছু খেতেটেতে দিয়েছে ওরা, নাকি খালি মুখেই বসিয়ে রেখেছে। আসমা কে জিজ্ঞেস করেন,
-ওকে চা নাস্তা কিছু দেয়া হয়েছিল তো?
-জি, ওসবের পাট বহুক্ষণ মিটে গেছে। ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।
তারপর কি মনে হতে আসমার দিকে তাকিয়ে বলে
-এক কাজ করেন, আপনি বরং রাতের খাবারটা টেবিলে দিয়ে দিন। ওঁর খাওয়া দরকার। আমিও না হয় বসবো। হোটেলে গিয়ে আর একা একা খেতে হবে না। মা মেয়ে একসঙ্গে খাবো চলুন…।

একটু আগে বুকের খাঁজে নামিয়ে দেয়া কান্নাটা দলা পাকিয়ে উঠে আসতে চায়। মেয়েটা তার কে হয়! আর মাত্র কয়েক ঘন্টা আছে সে এই দেশে। তারপর সাত সমুদ্র পেরিয়ে চলে যাবে। তাহলে এত মায়া বাড়াচ্ছে কেন!

-আম্মা কি তাজ্জব ব্যাপার বলেন, আপ্নিও বেলুনে ঠিকানা দিয়া উড়াইলেন সেইটা পায়া এই ম্যাডামও আসলেন। আমরিকার ম্যাডামের সাথে না হইলে তো চিনপরিচয় হইতো না আমাদের, ঠিক না আম্মা?
ফারুক তার স্বরূপে ফিরে এসেছে। খাদিজা খানম প্রমাদ গোনেন।
-হ্যাঁ, খুব ঠিক বলেছেন। আমি ধানমণ্ডি একুশ নম্বরটা চক্কর দিয়ে ঘুরেটুরে হোটেলেই ফিরে যেতাম। দিনটা কাটিয়ে রাতের ফ্লাইটে নিজের দেশে ফিরতাম। আমার মায়ের দেশ, জন্মদাতার দেশ দেখতে এসেছিলাম। মাঝখানে একটা বেলুনের কারণে আপনাদের সাথে দেখা হলো। বিকেলে এক নানাভাইয়ের সাথে দেখা হলো। চিটাগং-কক্সবাজার দেখা হলো। ওখানকার চমৎকার কিছু মানুষের সাথেও পরিচয় হলো। সাথে করে এই সুন্দর স্মৃতিগুলো নিয়ে যাবো।
-আবার কবে আসবেন ম্যাডাম?
খাদিজা খানম ফারুকের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে ওঠেন,
-হ্যাঁ আবার কবে আসবে তুমি? তখন কিন্তু হোটেলে ওঠা চলবে না। এই মায়ের বাড়িতে উঠতে হবে। আমার এত বড় বাড়ি থাকতে তুমি হোটেলে উঠেছো শুনে খুব খারাপ লাগছে।
পুষ্পিতার বুকের ভেতর কেমন একটা করে। কে বলে এই দেশে এই শহরে, সে অনাত্মীয়, স্বজনহীন! এই তো একজন মা তার জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

আসমা আর জুলেখা রাতের খাবার জোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত রান্না ঘরে। অভ্রটা ঘুমিয়ে পড়ায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফারুক ওকে নিয়ে নীচে গেছে। ঘরে এখন ওরা দুজন। একথা সেকথার পর, খাদিজা খানমের কী একটা মনে হতে জিজ্ঞেস করেন,
-আচ্ছা বদিউর রহমান চাচার সাথে তোমার পরিচয় হলো কীভাবে? ওরকম রাশভারী মানুষটাকে আজ অনেকদিন পর বেশ খোশ মেজাজে দেখলাম। কী কথা বললে তোমরা? আগে কিন্তু অতটা গম্ভীর ছিলেন না বদি চাচা, শবনম চলে যাওয়ার পর থেকে কথা বলা বেশ কমিয়ে দিয়েছেন। মেয়েটার স্মৃতি ভুলতে একুশ নম্বরের বাড়িটা বিক্রি করে আমার এদিকটায় চলে এলেন। এদিকটায় আসার বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা জানি না। হয়ত ওঁর প্রিয় মেয়ের প্রিয় বান্ধবী ছিলাম বলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো কিছু থাকতে পারে ওঁর ভাবনায়- জানি না সঠিক। অথচ কী কাণ্ড দেখো, যাকে ভুলবেন বলে নতুন বাড়িতে এলেন, সে বাড়ির নাম রাখলেন ওই মেয়েরই নামে! শবনম আর আমি স্কুল থেকে- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। ওর ইচ্ছে ছিল বদি চাচার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করবে। আমি বরাবরই শিশুদের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছি। তাই স্কুলের শিক্ষকতা বেছে নিয়েছি। শবনমের পরিবারের সাথে পরিচয় আজকের তো নয়, বহুদিনের। বদি চাচাও বরাবর আমাকে খুব স্নেহ করে এসেছেন। শবনমটা চলে যাওয়ার পর মাত্রাটা বেড়েছে বৈ কমেনি। সেটা এখন সরব না হলেও বুঝতে সমস্যা হয় না।

পুষ্পিতা চট্ করে ঠাহর করে উঠতে পারেনা খাদিজা খানম কার কথা জানতে চাইছেন, এত কথা বলছেনই বা কার সম্পর্কে। তবে ওঁর বলা কিছু কথা পুষ্পিতার বুকের ভেতর কেমন কাঁপন ধরিয়ে দেয়। একুশ নম্বর, শবনম… প্রশ্নভরা চোখে সে তাকায় খাদিজার দিকে। খাদিজা খানম নিজের ভুলটা বুঝতে পারেন। হেসে বলেন,
-ওহ্ আমি কী বলো দেখি! বিকেলে আমার পাশের বাড়ির বয়স্ক যে ভদ্রলোকের সাথে কথা বলেছো, তাঁর কথা বলছি। ওনার নাম বদিউর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব নামকরা শিক্ষক ছিলেন এক সময়। ওঁর মেয়ে শবনম তাবাসসুম, পিএইচডি করতে আমেরিকা গিয়ে এক হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করে বসে। বদি চাচা সেটা মেনে নিতে পারেননি। পরিণতিতে বাবা মেয়ের সম্পর্কটা ছিঁড়ে যায়। শবনমটা চিরকালের জেদি। আমি বদি চাচার হয়ে দু’চার কথা বলায় ভুল বুঝে আমার সাথেও যোগাযোগ রাখেনি আর। যে নিজে থেকে হারিয়ে যেতে চায় তাকে খুঁজে পাওয়া…

খাদিজা খানমের মুখের কথা শেষ হয় না। সামনে বসে থাকা পুষ্পিতা কেমন পাগলের মতো দুহাতে তাকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ঘটনাচক্রে এক পরম প্রাপ্তিযোগের উত্তজনা ওর শান্ত স্বভাবকে এলোমেলে করে কেমন অস্হির করে তোলে। পুষ্পিতার মনে হতে থাকে সিনেমায় কিংবা জাদুর কারসাজিতে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাওয়ার কাণ্ড কারখানা হয়ত ঘটতে দেখা যায়। এমনটা বাস্তবেও ঘটে! তারপর সে খাদিজা খানমকে অবাক করে দিয়ে ছুটে নামতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। যেতে যেতে শুধু বলে যায়
– শবনমে যাচ্ছি, নানাজান…
খাদিজা খানম বুঝে নেন সব। অজান্তে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বুক থেকে বেরিয়ে আসে। দোতালার বারান্দা থেকে তিনি দেখতে পান, দুচোখের আনন্দ-বিষাদে মাখামাখি জলের ধারা মুছতে মুছতে পরীর মতো মেয়েটা সদর দরজা খুলে প্রায় দৌড়াচ্ছে । ওর গন্তব্য এখন বিকেলের সেই বাড়িটা, যেটাকে তার নানার বাড়ি ভাবতে ইচ্ছে করেছিল, যে বাড়িটা ওর মায়ের নামে নাম সেই বাড়িটার দিকে।

 

নাহার তৃণা

জন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।