১
পথ ও পাথেয়
এদেশে কেউ একা হাঁটে না,
উন্নত দেশ বলে কথা!
যে একা, তারও হাতে থাকে পোষা কুকুরের লিস,
কারুর বা কোলে শাদা-কালো বন্যবেড়াল,
আমিই শুধু একা একা নিজেকে নিয়ে হাঁটি…
একলা মানুষ ছাড়া কি থাকে আর বাকী?
অতপর,কৈশোরে যে আমিকে ফেলে এসেছি হাঁটুবনে,
তাকে ডেকে তুলি, পা দোলাই কামরাঙা ফুলের ডালে—
বলি, একা হও, খুব একলা!
মনে পড়ে,দুরন্ত যৌবনের ডাকে
এক মেঘবালকের কাছে—
খুব করে চেয়েছিলাম,বলুক সে ”ভালোবাসি”।
সাহস পায়নি, অথবা চোখের
ক্ষণিক হাসিতে সেদিন
যা কিছু বলেছিলো,সংশয়ে
আমিই তা বুঝিনি কিছুই!
কখনো দেখা হয় যদি—চরম ও
পরম দুঃখের দিনশেষে
জলস্রোতে ঘূর্ণি তুলে আবারো
মিলিয়ে যাবে সে তরঙ্গ!
আজকাল হঠাৎ তবু সে আমার পথে ছায়াসঙ্গী হয়,
হাঁটি পাশাপাশি, বুকে-চেপে রাখা অনাথ কথাটি বলি:
যেভাবে বিকেলের রোদ গড়িয়ে পড়ে সন্ধ্যার কাঁধে…
ভাবি,পৃথিবীর দীর্ঘতম যে পথে
আজো আমি হেঁটে হেঁটে
ক্লান্ত, শ্রান্ত রোদ-বৃষ্টি নিয়ে পার
হই মারি ও মড়কে…
সেপথে আজ হোমলেস ভাবি নিজেকে—
নিদেন একটা কালো ব্যাগ নিই কাঁধে
জলের ছোট্ট ক্যান,এ্যাসমাসল,কিছু খাদ্যকণাও থাকে
ক্ষতি কি? এখন পথই যদি পরম বন্ধু,
বন্ধুর বাড়ি যাবো একা,শূন্য হাতে
এ কেমন কথা!
নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলি,জীবন সুন্দর!
তাকে চিনে নাও!
যে তোমাকে ছেড়ে গেছে সুদূরে পরাহত…
তাঁর জন্যে কেন একলা ফিলিঙে পোড়াবে নিজেকে!
জানো তো ঈশ্বর একা,একাই থাকেন সৌরভে-গৌরবে!
প্রকৃত মানুষ একা হতেই দ্রুত চলে যায়,ছায়ার ওপাশে!
১১/৬/২৬
রয়েল ইয়র্ক,টরন্টো
২
কথা সরে গেলে
কথারা সরে সরে যায়
ঠোঁট থেকে শব্দবীথি যেভাবে হারায়
একটুকু সরিনি আজো আমি নিজে
কথারাই সরে গেছে স্বেচ্ছায় ও অনিচ্ছায়
কথা শুনে যারা একদা কাছে এসেছিলো,খুব কাছে
তারাও নির্বাক চলে গেছে দূরে…
শব্দ শুনে শ্রমিক-মৌমাছি আজো ছুটে এসে চাক বাঁধে
তাদের কথায় কথায় ফুল থেকে মধু ঝরে…
গানেও থাকে শত কথা,সুরে থাকে সদা অনন্ত…
কথা সরে গেলে নিঃস্ব ও একা হয়ে পড়ে প্রেম!
৪/৫/২৬
৩
ভ্রমণ
যত জানি,তার চেয়ে বেশি
জানি না…
এলিভেটর থেকে বাইরে বেরুলেই ভ্রমণে পা রাখি আলতো…
ফেলে যাওয়া বসন্তের ফুলে ফুলে ভেজাগন্ধ এখনো
প্রকৃতির চোখে-মুখে সবুজ প্রেম,রোদ-চশমায় উৎফুল্ল!
এই তো লালচেরি,
টুনিবেরি,
ব্ল্যাকবেরি
গাছে গাছে জগতের রসনা ফুটে আছে উন্মুখ!
মনে হয় এই তো বাতাসেও সামারের টলটলে গন্ধ ভাসছে…
ওয়েলিংটন স্ট্রিট আর নায়াগ্রা ইন্টার সেকশনে এলে
এভাবেই অচেনা দেশের উত্তর-দক্ষিণ চিনে ফেলি—
ওল্ড ইয়র্কের পেছনে থেমে আছে লেকশোরের নীলজল
ওপর থেকে উজ্জ্বল আকাশ ভেঙে পড়েছে ব্ল্যাকবেরি পাতার ফাঁকে ফাঁকে, আমি দাঁড়িয়ে পড়েছি আচমকা!
ব্ল্যাকবেরি গাছের একটু উঁচু ডালে অভিসারে এসেছে ছোট্ট একপাখি
এডালে ওডালে নেচে গেয়ে খুঁজে ফিরছে তার বহুজনমের প্রেমিকা…
প্রিয় ডগের লিস হাতে ফিরোজা কালারের এক প্রৌঢ়া
আমাকে পাশ কেটে চলে যায় রহস্যময় দিনান্তের পথে
লাল দুচোখে তার উড়ছে ওল্ড ইয়র্ক বারের বুদবুদ…
এখানে স্পর্শহীন একাকীত্ব পাখা মেলে স্বপ্ন শিশিরে!
চোখ ধাঁধানো কুইন্স স্ট্রিটের উঁচু কোনো কন্ডো নয়,
হেঁটে হেঁটে আমি পথের দুপাশে পায়ের ধুলো দেখি!
স্ট্রিট ফেস্টিভেলে ঘুরে ফিরে বুঝে গেছি যেকোনো দেশে সঙ্গীত ও ভাষাশিল্পীরাই পৃথিবীর প্রকৃত সুন্দর মানুষ!
ভাঙাচোরা মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানুষটিকে
নাচে-গানে আজো তারা আনন্দে উদ্বেল করে তোলে
সুচতুর যুদ্ধবাজ ও ধর্মান্ধদের বিপক্ষে!
বহুবর্ণিল ধর্ম-বর্ণের অসাম্প্রদায়িক কানাডিয়ান প্রীতি
অলওয়েজ মনুষ্যত্বের বিভায় দীপ্ত,বন্ধুত্বেও অনাবিল!
সামান্য হলেও জীবন পরম্পরা পেয়ে যাই পরার্থের
হাসি-গান,শোষিত মানুষের চিরন্তন বেদনার আখ্যান…
২৬/৭/২৬
আইসবোট টেরেস,
টরন্টো
৪
কিছুই থাকে না অভ্যেসটুকু ছাড়া
কিছুই থাকে না
অভ্যেসটুকু/ ছাড়া
মন থেকে মনে কখনো ছিলাম /
একসাথে তুমি/ আর আমি এই /ভুবনে-ভবনে
স্পর্শে ফুটেছে/ নয়ন সে তারা—-
বিশ্বাসটুকু /হারালে,না থাকে
কোনোই শব্দ / কুহেলি—-
কাঁকনের মায়া/ চিত্তে দেয় না
ফিরিয়ে কখনো,/ ফেলে আসা সেই
শৈশবময় / সোহেলি…
কিছুই থাকে না/ মন থেকে মনে
অভ্যেসটুকু/ ছাড়া…
বিকেলের রোদে /নেই উত্তাপ
ছিলো না কখনো / ভুলে আর ভালে
শুধু প্রেমটুকু/ ছাড়া।
১৮/৭/২৬
আইসবোট টেরেস
টরন্টো
৫
ছোট ছোট শাখা নদী
চন্দনে যেদিন মেখে দিলে মুখ
সেদিন থেকে তুমি হলে আমার স্বদেশ…
বহুবাদী চোরা স্রোতে আজ
ভেসে যাচ্ছে দেশ…ও স্বদেশ
বঙ্গোপসাগরের তলদেশে?
না অন্য কোনো ঘূর্ণাবর্তে?
আপাতত কিছুই খুব বেশি স্পষ্ট নয় অবয়বে—
কখনো মনে হয় দেশপ্রেম বুঝি
কয়েক খণ্ডে ভেঙে পড়া—আতস কাঁচ
নাহ্,এভাবনা খুব সমূহ নয়—-
গাছ থেকে ফল পড়ে খুব বেশি দূর যায় না—একথা সবাই জানে!
কাজেই মৌলস্রোত বিনে বেশিদিন বাঁচে না
ছোট ছোট শাখা নদী!
একথা ইতিহাস জানে…
৩০/৭/২৬
রয়েল ইয়র্ক
টরন্টো
