কবি আজীজুল হক আমাদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না, সার্বিকভাবে তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকার মতো পথপ্রদর্শক— কখনওবা কঠোর শিক্ষক, কখনওবা আত্যন্তিক বন্ধু। এ শুধু গর্বের না, সৌভাগ্যেরও ব্যাপার। আমাদের কৈশোর কেটেছিল নিরতিশয় নির্মোহ সাধক কবি আজীজুল হকের সান্নিধ্যে, একথা ভাবলে রোমাঞ্চিত না হয়ে উপায় থাকে না।
প্রায় ৪০ বছর তিনি যশোরের সাংস্কৃতিক জগৎকে শাসন করেছিলেন, পথনির্দেশ করেছিলেন এবং নিজের নব নব সৃষ্টিকর্মে বিমোহিত করেছিলেন সংস্কৃতিমনস্কদের। ছায়ানাটক ছিল তাঁর এক অনবদ্য সৃষ্টি। সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ চত্বরে বিপুল সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে তাঁর রচিত ও নির্দেশিত ছায়ানাটক ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ দেখে সেই ছাত্রাবস্থায় অভিভূত হয়েছিলাম। মঞ্চে কোনো শিল্পী ছিল না, ছিল তাদের ছায়া; আর সেই ছায়ার সঞ্চালন এমন এক বাকরুদ্ধ নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যে পিনপতন নীরবতায় অভিভূত ছিল প্রায় হাজার খানেক দর্শক। শুধু এইটুকু না, সেই ছায়ানাটকের ছিল সোচ্চার সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী বক্তব্য। ছায়ানাটকের এই ধারা অব্যাহত থাকেনি। আজীজুল হক স্যার নিজেও সেই চেষ্টা কখনও করেছেন বলে মনে পড়ে না। হয়ত ছায়ানাটকের জন্য প্রয়োজনীয় জোগাড়যন্ত্র তাঁর পক্ষে আর করে ওঠা সম্ভব হয়নি। কবিতার বাইরে এছাড়া কিছু গীতিআলেখ্য ও প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছিলেন।
মজলিশি মানুষ ছিলেন তিনি। যে কোনো আড্ডা দেড়-দু’ঘণ্টা এককভাবে জমিয়ে রাখতেন অনায়াসে। পোড়াবাড়ির চমচম থেকে কান্তাজীর মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী— কোনো কিছুই তাঁর আয়ত্তের বাইরে ছিল না। আবার ব্যাডমিন্টন খেলাতেও তাঁর আগ্রহ বা দক্ষতা ছিল। বাগ্মী ছিলেন অসাধারণ। এত আকর্ষণ ছিল তাঁর বক্তব্যের যে শ্রোতাদের অভিভূত না হয়ে উপায় ছিল না। সময় পার হত অজান্তেই। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বড় মাপের মানুষ। মানুষের সৌন্দর্যের যা কিছু মৌলিক উপাদান— মানবিকতা, নৈতিকতা, দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদাবোধ, জ্ঞানগরিমা, অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদি; সবকিছুকেই তিনি ধারণ করেছিলেন উচ্চমাত্রায়, দক্ষতার সাথে। প্রচারবিমুখ ছিলেন। স্বীকৃতি বা শ্রদ্ধা প্রাপ্তি তাঁর লক্ষ্য ছিল না, কিন্তু যারা তাঁকে বুঝতেন তারা তাঁকে শ্রদ্ধা করতে পেরে ধন্য হতেন। একবার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক সঙ্গীত সন্ধ্যায় বিপুল মানুষের ভিড়ে ভক্তপরিবৃত কণ্ঠশিল্পী প্রয়াত নিলুফার ইয়াসমিনকে দেখেছিলাম, স্যারকে দেখামাত্র ছুটে এসে অবনত শ্রদ্ধায় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে। সেদিন এই ঘটনায় উপস্থিত শ্রোতৃবর্গ দারুণ বিস্মিত হয়েছিল।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে চারটি বই লিখেছিলেন তিনি— তিনটি কবিতার, একটি প্রবন্ধের। বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর ছাত্ররা সাহিত্য-সংস্কৃতি-চাকরি-রাজনীতিতে স্বনামধন্য হয়েছেন, কিন্তু আজীজুল হক কখনও কোনো রকম উচ্চতর সুযোগ-সুবিধা অর্জনে প্রলুদ্ধ হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত নেই। মাগুরার শ্রীপুরে ১৯৩০ সালে তাঁর জন্ম হলেও প্রায় পুরো কর্মজীবন তিনি যশোরে থেকে গেলেন। শেষ জীবনে অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। বেজপাড়ার পিয়ারীমোহন রোডের এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। রোগশয্যায় ছিলেন বেশ কিছুদিন। দারিদ্র্য ছিল, পারিবারিক অনিশ্চয়তাও। অবশেষে ২৭ আগস্ট, ২০০১ সালে তাঁর জীবনাবসান হলো।
আজীজুল হক স্যারের নামের সাথে পরিচিত ছিলাম অনেক আগে থেকে, কিন্তু তাঁকে প্রত্যক্ষ জানলাম ১৯৭৪ সালের দিকে। তখন আমরা সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তখন বিশৃঙ্খল পরিবেশ, উচ্ছৃঙ্খলদের দাপট। স্যার বাংলা পড়াতেন, ক্লাসে আসতেন যথাসময়ে। ছাত্রদের চরম গোলযোগের মধ্যেও সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ না করে বলতেন, “যত যাই কর, ঠিক সময়মত আসবো, রোল কল করবো আবার ঘণ্টা বাজলে চলে যাব। আমাকে উত্যক্ত করে লাভ হবে না।” কাজেই যারা চাইত ক্লাসে থাকতো, যারা চাইত না নির্বিবাদে বের হয়ে যেত ক্লাস থেকে। অসাধারণ আকর্ষণ বোধ করতাম স্যারের ক্লাসের প্রতি। বিশুদ্ধ স্পষ্ট উচ্চারণ, সাবলীল বাক্য গঠন আর নিখুঁত শব্দক্ষেপণ— সামগ্রিকভাবে তাঁর কথার ছিল বিশেষ স্টাইল। কথ্য ভাষারও যে একটা নান্দনিক দিক থাকে আর সেটা যে আয়াসসাধ্য বিষয়, স্যারের কাছ থেকে সেই প্রথম ধারণা পেয়েছিলাম।
ছোটোখাটো খুবই হালকা গড়নের মানুষ ছিলেন তিনি। ঘাড় অবধি ছিল বাঁকানো চুল, চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। কণ্ঠ ছিল তেজস্বী কিন্তু প্রীতিপ্রদ। একবার টাউন হলের মাঠে, রাতে, বিপুল শ্রোতার উপস্থিতিতে তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি শুনেছিলাম— ‘বাংলাকে ভালবাসা বড় বেশি কঠিন ব্যাপার’। এখনও যেন সময়-বিশেষে তাঁর সেই কণ্ঠ আর আবেগ নিজের মনে অবিকল অনুভব করতে পারি।
আর একদিনের ঘটনা। আমাদের এক সহপাঠী মজা করার জন্য কলেজে আসার সময় প্যাকেটে করে কিছু মানুষের মাথার খুলি আর হাড়গোড় নিয়ে এল। তখন এসব যত্রতত্র পাওয়া যেত। সকলে তো মহাখুশি। আমাদের একজন অপছন্দের স্যার ছিলেন। তাঁর ক্লাসে সেগুলো সাজিয়ে রাখা হলো টেবিলের উপর আর ব্ল্যাকবোর্ডের কোণায়। যথাসময়ে স্যার এলেন। স্যারের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য সমস্ত ক্লাস নীরব, যা আগে কখনও থাকতো না। প্রথমত স্যার বিষয়টা না দেখার ভান করলেন, কিন্তু সামান্য সময়, তারপরই বিকট চিৎকার করে লাফ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ক্লাস থেকে। এরপর সমস্ত কলেজ জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। এত ভয়ঙ্কর কাজ! বিশেষ করে ধর্মভীরু শিক্ষকরা তো রীতিমত আহাজারি শুরু করে দিলেন। আমরাও ঘাবড়ালাম না এমন না; ঘটনার প্রতিক্রিয়া যে এতটা হবে কেউ ধারণা করেনি। অধ্যক্ষের নেতৃত্বে শিক্ষকদের জরুরি মিটিং বসলো। তদন্ত কমিটি করে দোষীদের কলেজ থেকে চিরতরে বহিষ্কারের প্রস্তাব উঠল। আমরা সহপাঠীদের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে উদ্বেগের সাথে শিক্ষকদের আলোচনা শোনার চেষ্টা করলাম। এমন সময় শোনা গেল আজীজুল হক স্যারের কথা— “আপনারা এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? এরা সব তরুণ যুবক, এদের কত সাহস, কত প্রাণশক্তি, এরা কিই না পারে? ক’দিন পরে দেখবেন মানুষের খুলিতে করে এরা চা খাবে, ফ্রেঞ্চ রেভোলিউশনের কথা ভাবুন, এরা কি কিছুকে ভয় পায়?” আশ্বস্ত হলাম আমরা। অন্তত একজনকে পাওয়া গেল যিনি আমাদের হয়ে বললেন। সে যাত্রা আমাদের রক্ষা হয়েছিল, যে কারণেই হোক।
স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা হলো ১৯৮৯ সালের পর। তিনি তখন সরকারি এমএম কলেজ থেকে অবসর নিয়েছেন। ততদিনে আমি একটা বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনায় কয়েক বছর পার করেছি। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “অবসর জীবনে কী করছেন?” বললেন, “পড়ছি, দৈনিক অন্তত ১০-১২ ঘণ্টা। দর্শন পড়ছি।” আধুনিক কবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন— সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের অগ্রগতি ধারণ করে যিনি কবিতা লেখেন তিনিই আধুনিক কবি। সব বিষয়েই তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ। পরিযায়ী পাখি সম্পর্কে একদিন এত বিস্তারিত বললেন যাতে অবাক না হয়ে উপায় ছিল না। মেলামেশার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদার। আমাদের থেকে তিনি অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও কিংবা আমাদের থেকেও যারা অনেক ছোটো, তাদের সাথেও তিনি মিশতেন বন্ধুর মতো। আসলে আজীজুল হক নিজেকে যে একজন বড় মানুষে উন্নীত করতে পেরেছিলেন তাঁর পেছনে কারণ ছিল এটাই যে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি কখনও অস্বীকার করেননি। তিনি যে বড় কবি হয়েছিলেন তার মূল প্রেরণাই ছিল এখানে। প্রগতির পক্ষে ছিলেন তিনি। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক আন্দোলনে কখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল প্রথম ভঙ্গ হয়েছিল যশোরে। সেদিন ছাত্র-জনতা মিছিল করে মার্শাল ল-এর প্রতিবাদ করেছিল। মার্শাল ল ভাঙ্গার সেই মিছিলে প্রথম সারিতে ছিলেন তরুণ অধ্যাপক আজীজুল হক। ’৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলনে তাঁর বাড়ি ছিল আন্দোলনরত ছাত্রদের গোপন আশ্রয়স্থল। বড় ধরনের বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হলেও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের তিনি নৈতিক সাহস আর উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।
তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন বলা যায় পরিণত বয়সের আগেই। যশোরের সুধীজনরা তাঁর চিকিৎসার জন্য চাঁদা তুলেছিলেন। বিদেশেও গিয়েছিলেন তিনি চিকিৎসার জন্য, কিন্তু সেসব চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসেনি। রোগশয্যায় যাওয়ার আগে প্রায়ই দেখতাম উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় আমাদের রেল রোডস্থ বাড়ির সামনে দিয়ে তিনি হেঁটে কিংবা রিকশায় বাড়ি ফিরছেন। কোনো কোনোদিন আমাদের বাড়ির সামনে আমরা বসতাম। নানা প্রসঙ্গে আলাপ হতো। অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকতেন বিষণ্ণ। কায়দাকৌশল না জানায় চাকরিতে তাঁর কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না, তার ওপর ছিল অসুখের হুমকি। একদিন এরকম এক উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় তিনি এসে বসলেন। খুবই বিষণ্ণ দেখলাম তাঁকে। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থেকে বললেন— “দেখ, এখন আমার তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সবই অতীত। চোখ বুজলে সিনেমার স্লাইডের মতো অতীতের সেই সব দিনগুলোর ছবি আমি একটার পর একটা দেখতে পাই। সেই সব উত্তাল দিনগুলো দেখি, নিজেকে দেখি, ছাত্রনেতাদের দেখি, তারা এখন সব কত ভাবে প্রতিষ্ঠিত। আজকে তার (নাম উল্লেখ করলাম না) সাথে দেখা করতে যেয়ে আমাকে বাইরে দেড় ঘণ্টা বসে থাকতে হলো।” তাঁর গলা ধরে এসেছে টের পেলাম, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য মাত্র। তিনি উঠে হাঁটা শুরু করলেন। অন্যদিন হলে হয়ত ডাকতাম কিংবা উঠে হাত ধরে বসাতাম, কিন্তু সেদিন আর সে সাহস বা শক্তি পেলাম না।
কবি আজীজুল হক লিখেছিলেন: “অবিকল মানুষেরা চিরকাল আসেনি কি দেখে
যন্ত্রণার অর্থ নেই জীবনের সত্য আর স্বপ্ন ব্যতিরেখে।”
সেই স্বপ্ন আর সত্যের সন্ধানে আমৃত্যু নিরন্তর সংগ্রাম করে গেলেন আমাদের প্রণম্য শিক্ষক, ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, কবি আজীজুল হক।
পাভেল চৌধুরী

যশোর শহরে জন্ম ১৯৫৭ সালে, বেড়ে ওঠাও যশোরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন। অতঃপর শহীদ মশিয়ূর রহমান কলেজ, ঝিকরগাছা, যশোর-এর অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০১৮ সালে। ১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চলে যাচ্ছি’ প্রকাশিত হয়। ছোট গল্প ছাড়াও প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখায় আগ্রহী।
