পাভেল চৌধুরীর ছোটগল্প: বনের ডাক

(১)

বন ডাকে। কেমন সে ডাক, ভীতিকর নাকি প্রীতিকর, বিকট-বীভৎস নাকি শ্রুতিমধুর, উচ্চগ্রামের নাকি মৃদু লয়ের– এসব বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। এমনই অবর্ণনীয়, ব্যাখ্যাতীত, অব্যক্ত সে ডাক। সময়ও অনির্ধারিত। প্রত্যুষে কিংবা সাঁঝে, গভীর রাতে কিংবা ভরদুপুরে অথবা হঠাৎ কর্মব্যস্ততার সময়ও হয়, অকস্মাৎ, একেবারে বনের ভেতর থেকে সে ডাক উঠে আসে।

মাঠে বিচরণরত গবাদিপশু সেই ডাকে স্থির হয়ে যায়, উড়ন্ত পক্ষীকুল নিকটস্থ আশ্রয়ে থামে, কান্নারত শিশুরা নিশ্চুপ হয়, এমনকি বনজুড়ে যে কাকলির ঝংকার চলে প্রায় সর্বক্ষণই সেই ঝংকারও স্তব্ধ হয়ে যায়। শুনশান নীরবতা নামে এলাকাজুড়ে। কিছু সময়ের জন্য অবশ্য, তারপর আবার যা তাই, সব কিছু যেমন ছিলো তেমন, স্বাভাবিক।

ঐ ডাক শুনেছে কে? –সকলেই। এ অঞ্চলের সকল অধিবাসীই, তবে একেবারে নিজের কানেই যে শুনেছে এমন না–দাদা কিংবা নানা-দাদি-নানি-চাচা-ফুফু-মামা-মামি বা ঐরকম কেউ না কেউ নিজের কানে শুনেছে, স্বচক্ষে দেখেছে সেই আশ্চর্য কাণ্ড। ভয় পায়নি, ভয় পাওয়ারও না, বন তো– বনকে ভয় পায় কে? বন কি কারো পর? না শত্রু ? শুধু একটু সাবধান হতে হয়। সতর্ক হতে হয়– এই যা। কতো রকম বিষয় থাকে বনে, কতো রহস্য, কতো জারিজুরি, বনকে তাই মান্য করতে হয়। এ অঞ্চলের মানুষ বনকে মান্য করেও। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে বলে বনদেবতা, নিজস্ব উপায়ে বনকে পুজোও দেয়। মুসলমান হিন্দুতে এ ব্যাপারে প্রভেদ নেই, আবার জাহিরও নেই। বিষয়টা যেন একেবারেই যার যার নিজস্ব, নিজের বিশ্বাস, নিজের তৃপ্তি। কেউ হয়তো নিজের পোষা মুরগি বা হাঁস, বনের একটু গভীরে হেঁটে যেয়ে ছেড়ে দিয়ে আসে, বনের ভোগ। কেউ বনের মধ্যে বড়ো কোন গাছের গায়ে সিদুঁর লেপে দেয়, কেউ বা প্রদীপ জ্বালে। এ কর্মকাণ্ডে বন কতোটুকু খুশি হয় তা নিয়ে কেউ ভাবে না, তবে নিজেরা যে তৃপ্ত হয় তাতে সন্দেহ নেই।

জঙ্গলদিয়া গ্রামের গা ঘেঁষে এই বন। উত্তর বরাবর এই বনের বিস্তৃতি মানুষের দৃষ্টিকে আড়াল করে দিয়ে কোথায় কতোদুর– সে হিসেব বড়ো একটা কেউ রাখে না। দক্ষিণ দিক একেবারে ফাঁকা। পূবে বিশাল দিকভোলা বিল। বর্ষায় সে বিলের সীমানা হারিয়ে যায়, সেই বিলই যেন কিছুটা ঘুরে দক্ষিণে বাঁক নেয়। এই বিলের পশ্চিমে জঙ্গলদিয়া গ্রামটা পুরোনো, মাত্র ৩০/৪০ ঘর লোকের বাস। মুসলমান বেশি, হিন্দুও কিছু আছে। হিন্দুদের মধ্যে আবার দু’ঘর কায়স্থ। তাদের জন্য একটা মন্দির আছে। ইটের তৈরি, পলেস্তারা-খসা। এটা দেখেই গ্রামের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা করা যায়। হিন্দুদের মধ্যে ছোটজাতের সংখ্যা বেশী। তারা যে যার মতো পুজো-অর্চনা করে, একটা বরোয়ারি পুজোমণ্ডপও আছে। মুসলমানদের জন্য একটা মসজিদ আছে। চাটাইয়ের বেড়া, খড়ের ছাউনি। খুবই পরিচ্ছন্ন। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত আযান হয় সেখান থেকে। মুসল্লিরা মসজিদে নামাজ পড়ে, সংখ্যায় তাঁরা কম। শান্তিপূর্ণ গ্রাম। বাইরের সাথে যোগাযোগ তেমন নেই। খুব প্রয়োজন না হলে বাইরের সাথে যোগাযোগের তেমন আগ্রহ কেউ দেখায় না। একটা পাঠশালা আছে গ্রামে। কার্ত্তিকবাবু সেই পাঠশালায় সকাল-বিকেল উচ্চস্বরে ছাত্রছাত্রী পড়ায়। অংক আর বাংলাটা একটু শিখলেই পড়ার পাঠ চুকে যায়। গ্রামের সবাই কৃষিজীবী। জমির আকাল নেই। বিলের সব বিস্তীর্ণ জমিই প্রায় খাস খতিয়ানে, তবে অনিশ্চয়তা আছে। বর্ষায় পানি একটু বেশি হলে বিল এমনই ফুলে-ফেঁপে ওঠে যে, একেবারে ঘরের দোরগোড়ায় পানি এসে ঠেঁকে। তখন নিজেদের রক্ষা করতে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। মাচা বাঁধা হয়, গবাদিপশুদের উঁচু জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়, আর হাতের কাছে এমন একটা বন থাকা সত্ত্বেও সে বন তেমন কাজে আসে না। বনের মধ্যেও তখন পানি ঢোকে। নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ, জন্তু-জানোয়ার অল্প জায়গায় জড়ো হয় নিরাপত্তার খোঁজে। শত্রু আর শত্রু থাকে না। সাপে-নেউলে একসাথে থাকতেও নাকি দেখা যায়। বনের দিকে তখন আর অন্য সময়ের মতো কাঠ কুড়ানো কিংবা শাক পাতা জোগাড় করতে যাওয়া যায় না। অবশ্য ঐ রকম দুর্যোগ যে ফি বছরই হয় এমন না, দু পাঁচ বছর পরপর হয়। গ্রামের লোকদের সেটা সয়ে গেছে, কিছু প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকে।

কাসেম, বিশে আর শিবু এই তিনজন মূলত বিলে মাছ ধরে তাদের জীবিকা চালায়। বিলের ধারে তাদের কুঁড়ে। পানি কমে গেলে সে কুঁড়ে পানির কান্দা অনুযায়ী দূরে সরে যায়; পানি বাড়লে গ্রামের নিকটে সরে আসে। কুঁড়ের নিচে পানিতে তাদের ডুঙ্গা ভাসে। মাছ ধরার জাল দড়াদড়ি ইত্যাদি কুঁড়ের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে। মাছ মোটামুটি গ্রামের সকলেই সময়বিশেষে কম-বেশি ধরে কিন্তু সম্বৎসর মাছ ধরে এই তিনজনই। গ্রামের লোকে তাদের মালো বলে। কাসেম মালো, শিবু মালো, বিষে মালো–এই রকম।

আর গ্রামের একপাশে বিশাল অশ্বত্থ গাছের নিচে গ্রামের একমাত্র মুদির দোকান। মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। তেল নুন প্রয়োজনীয় আনাজপাতি সরবরাহ হয় সেখান থেকে। সন্ধ্যে একটু গাঢ় হলেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়, খোলে বেলা করে। অবশ্য খুব দরকার পড়লে বাড়ি থেকে দোকানদারকে ডেকে আনা যায়। কোনো কারণে দোকানদার বাড়ি না থাকলে চাবি নিয়ে তার বৌ আসে অথবা তার বড়ো মেয়ে। এই দোকানের পাশে খুব নড়বড়ে অবস্থায় গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকান। চাটাইয়ের বেড়া, জরাজীর্ণ খড়ের চাল। চাটাইয়ের বেড়া ঘেঁষে খান দুই বেঞ্চ। তারপাশে উঁচু মাটির চুলোয় চায়ের পানি ফোটে। ঠিক মাঝখানে বেড়া ঘেঁষে একটা চৌকি। অবসর মতো দোকানদার সেখানে বসে। দু-এক রকমের বিস্কুট, লজেন্সের বয়াম সেখানে সাজানো থাকে। আর থাকে একটা এক ব্যান্ডের মারফি রেডিও। আকাশবাণীর বিবিধ ভারতী সেন্টার থেকে লতা-রফি-আশার হিন্দি গান নানা ধরনের শাব্দিক উপদ্রবের মধ্যেও কখনও জোরে কখনও আস্তে ভেসে আসে। কেরোসিনের কুপির আলো অনেক রাত পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে জ্বলে। গ্রামের যুবক আর পড়তি বয়সি মানুষদের আড্ডা প্রতিদিনই বসে, নানা প্রসঙ্গে কথা হয়। কোনো কোনোদিন রাত একটু বেশি হলে বাতাস ওঠে। বন থেকে তখন মর্মর ধ্বনি ভেসে আসে। বনের ডাক না; সবাই জানে। কাজেই কেউ উদ্বিগ্ন হয় না।

সপ্তায় দুদিন এই অশ্বত্থ তলায় হাট বসে। ঘোড়ায় চেপে দূর থেকে এক কাপড় ব্যবসায়ী লুঙ্গি, শাড়ি এইসব নিয়ে এসে হাটের এক পাশে পসরা সাজায়। তাতেই গ্রামের মানুষের কাপড়ের চাহিদা মিটে যায়। সুবিধে এই, বিপদে-আপদে সে আবার কাপড় বাকিতেও দেয়। মরসুমে ফসল উঠলে দাম শোধ করা হয়। ভালো কথা, মুদির দোকানে দু-একপ্রস্ত কাফনের কাপড়ও থাকে, কখন কার দরকার হয়!

কেনায়েত ওরফে কানু মণ্ডল এই গ্রামের বংশানুক্রমিক মাতব্বর। তাঁর আব্বা ছিলেন ঝড়ু মণ্ডল, বেশিদিন বাঁচেননি কিন্তু তস্য পিতা জাঁহাবাজ মণ্ডল ছিলেন বংশের আসল পুরুষ। যেমন পরিশ্রমী, তেমন তেজী। অসংখ্য গরু ছাগল ভেড়া ছিলো তাঁর। এই বিলের খাস খতিয়ানের জমি ইচ্ছেমতো সে শুধু দখলই করেনি সেসব জমিতে পরিকল্পিত আবাদও করেছে। তাঁর মাতব্বরী ছিলো একচ্ছত্র। নিজের ঘোড়া ছিলো কয়েকটা। সকাল-বিকেল ঘোড়ায় চড়ে আবাদ-ঘাট তদারক করে বেড়াতেন। বিশালদেহী, মুখভর্তি সাদা দাড়ি আর বড়ো বড়ো দুটো চোখ, মাথায় টুপি। নিড়ানি-কাচি নিয়ে সময়বিশেষ নিজে মাঠে যেতেন কাজ করতে। তেজ ছিলো খুব, বন্ধুর মতো মিশতেন সবার সাথে কিন্তু কোনো কারণে রেগে গেলে তাঁর ত্রিসীমানায় যাওয়ার সাহস ছিলো না কারো। তিনি বনের ডাক শুনেছিলেন, নিজের কানে। যদিও এই কথার সত্যাসত্য যাচাইয়ের সুযোগ এখন নেই। তিনি বেঁচে ছিলেন অনেকদিন, এমনকি ছেলে ঝড়ু মণ্ডল মারা যাওয়ার পরও অনেক বছর। ততোদিনে পৌত্র কেনায়েত মণ্ডল যুবক হয়ে উঠেছে। শেষের দিকে জাঁহাবাজ মণ্ডল অনেকটা নিভৃতচারী হয়ে গিয়েছিলেন, নিষ্ক্রিয়ও, যদিও মারা যাওয়ার আগের দিনও তাঁকে ঘোড়ার পিঠে দেখা গেছে। প্রথম দিকে কেনায়েত মণ্ডলের মধ্যে দাদা জাঁহাবাজ মণ্ডলের ছায়া দেখা যেতো। ঘোড়ায় চড়ে দাপিয়ে বেড়াতেন কিন্তু মাঝবয়স পেরোবার আগে থেকেই তিনি যেন কেমন পাল্টিয়ে যেতে লাগলেন। পার্থিব প্রতিপত্তির প্রতি তেমন আগ্রহ দেখা যেতো না। দাদার মতো মাথায় টুপি বিশাল দাড়ি তাঁরও আছে, মাঝে মধ্যে ঘোড়ায়ও যে চড়েন না এমন না কিন্তু তিনি কেমন ভাবুক ধরনের হয়ে উঠলেন। সৃষ্টির রহস্য তাঁকে বিশেষভাবে ভাবায়। সুযোগ মতো এই নিয়ে আলোচনা করতেও আগ্রহ বোধ করেন। বনের ডাক তিনি নিজের কানে শোনেননি কিন্তু শতবর্ষী দাদা জাঁহাবাজ মণ্ডল যে শুনেছিল এ ব্যাপারে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই।

কেনায়েত মণ্ডলের প্রায় সার্বক্ষণিক সাথী, প্রায় সমবয়সী, সনাতন বাছাড়। অবস্থাপন্ন। জাতে নিচু হলেও হিন্দু সমাজে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আছে। ছোটোখাটো মানুষ, হাঁটুর উপরে ধুতি পরেন আর খালি গা আর খালি পায়ে থাকেন সারাক্ষণ। খুব দরকার হলে গায়ে একটা সাদা চাদর জড়িয়ে নেন, চাদরটা ঘাড়ে ভাজ করাই থাকে। কখনও কখনও তাঁর কপালে তিলক দেখা যায়।

সনাতন– একটু সুর চড়িয়ে ডাকেন কেনায়েত মণ্ডল।

মণ্ডল– সনাতন বাছাড়ও প্রায় একই সুরে ডাকেন।

দু’জনে হরিহর আত্মা। দু’জনেরই বয়স এখন সত্তরের কোঠায়।

কেনায়েত মণ্ডলের একটা দোনালা বন্দুক আছে। এই গ্রামের একমাত্র বন্দুক। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। অনেকদিন আগে কিছু ইংরেজ এই বিলের ধারে কোনো কারণে ক্যাম্প করেছিলো। ছিলো কিছুদিন। তারা নিয়মিত পাখি মারত। জাঁহাবাজ মণ্ডলের তখন যৌবনকাল। তিনি মনমতো সঙ্গ দিয়েছিলেন ইংরেজদের; তারই পুরস্কার এই বন্দুক। জাঁহাবাজের শিকারের নেশা ছিলো কিন্তু তাঁর পৌত্র কেনায়েতের সে নেশা নেই। যৌবনে কিছুদিন তিনি বন্দুক নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছেন, পাখ-পাখালিও মেরেছেন কিন্তু সেটা বেশিদিনের জন্য না। তারপর থেকে বন্দুকটা ঘরের কোণায় ঠায় দাঁড়িয়ে, কালেভদ্রে ঝাড়পোচ করা হয় কিন্তু ব্যবহার নেই। কারো নজরও সেদিকে তেমন যায় না। কেনায়েত মণ্ডলের বাড়ির আঙিনায় হরিতকি গাছের নিচে একটা বুড়ো ঘোড়া বাঁধা-অবস্থায় সকাল-সন্ধ্যে মাথা নিচু করে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকে। থেকে থেকে কান লেজ নাড়িয়ে সে মাছি তাড়ায়। যত্ন নেই, খাদ্য বলতে কিছু খড়, কিছু ঘাস, সামনে পড়ে থাকে। কোনো কোনো দিন দেখা যায় কেনায়েত মণ্ডল ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে পরম মমতায় হাত বুলায় তার গায়। আর একেবারে মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে ঘোড়াটা যেন পরিপূর্ণ স্বাদ নেয় মনিবের সেই আদরের। বার্ধক্য কি উভয়ের মনে সহমর্মিতার সৃষ্টি করে? মনে হয়।

একেবারে বিলের মাঝখান থেকে উঠে এসে বিশাল এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি ঠিক যেন মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। বাতাসে ভাসে বিচিত্র কলগুঞ্জন। তাদের ছায়া গড়িয়ে যায় মাটির উপর দিয়ে। চোখ ঘুরিয়ে ভালো করে দেখার আগেই অদৃশ্য হয় তারা।

শীত চলে এল। সকাল-বিকেল শরীরে শীতের হালকা ছোঁয়া বেশ টের পাওয়া যায়।

–আচ্ছা শুনিছি বনের ডাকে নাকি ধরিত্রিও কম্পিত হয়?

সন্ধ্যা কিংবা সকালের কোনো আড্ডায় কেনায়েত মণ্ডলের এই প্রশ্ন সনাতন বাছাড়ের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না।

–তাই হয়! ধরিত্রি কম্পিত হলে বন থাকে ? কাঁপে দিগন্ত, মনে হয় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। –সনাতন বাছাড়ের উত্তর কেনায়েত মণ্ডলের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যই মনে হয়।

এ গ্রামে অনেকের মধ্যে আর একজনও আছে। যাকে সবার সাথে মেলানো যায় না, অন্যরকম। চেরাগালি। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। ঢ্যাঙা, লম্বা ধরনের, ভাঙা চোয়াল আর কোটরের ভেতরে ধারালো গোল ক্ষুদে দু’টো চোখ। মাথায় এলোমেলো লম্বা চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ, কখনও সে আবার চুলগুলো পেছনে ঝুটি বেঁধে রাখে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ গ্রামের একমাত্র ওই কিছুদিন নিরুদ্দেশ ছিলো। ও বলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কোনো কাহিনী ওর মুখ দিয়ে সচরাচর শোনা যায় না, মুক্তিযুদ্ধের কোন সনদও ওর কাছে নেই, কাজেই ওর এই দাবী সম্পর্কে সংশয় থেকেই যায়। আবার কখনও মুক্তিযুদ্ধের এমন দু-একটা কাহিনীও বলে ফেলে তাতে বিষয়টা একেবারে অবিশ্বাসও করা যায় না। কিন্তু এসব নিয়ে ওর কোন মাথাব্যথা নেই। বিশ্বাস করলে করো, না করলে না করো, ওর কিছু এসে যায় না।

চেরাগালি সারাদিনই ঘুমায়। ওর কাজ কারবার রাতে। নিশাচর যাকে বলে। বিড়ালের মতো একেবারে নিঃশব্দ ওর হাঁটাচলা। কোনো কোনোদিন গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকানের কোনায় হঠাৎ নিঃশব্দেও এসে বসে। ঘুমজড়ানো শরীরে চুপচাপ চা খায় আর গভীর মনোযোগে কিছু ভাবে। ওর চোখ দুটো তখন জ্বলে, দোকানের বাইরে দৃষ্টি চালিয়ে অন্ধকারে আঁতিপাঁতি করে কিছু খোঁজে।

চেরাগালি কথা তেমন বলে না, ওর সাথে তেমন কেউ কথা বলতেও চায় না।

গ্রামে ওর সম্মান নেই, আবার গ্রামের মানুষের ও যে কোনো ক্ষতি করেছে এমনও না। আসলে ওর পেশাকে গ্রামের মানুষ মেনে নিতে পারে না। রাতে ঘুরে ঘুরে নানা পদ্ধতিতে ও তক্ষক ধরে, গুঁইসাপ ধরে, তারপর চালান করে দেয় কোথাও। কেন বাবা গায়ে খাটো, খেটে দু’টো পয়সা আয় করো। –গ্রামের মানুষ ওকে বুঝিয়েছে অনেক; এই সব বন্যপ্রাণী এদের একটা অভিশাপ আছে না! ও বোঝেনি। –ধুত্তোর অভিশাপ, আমি কারো ক্ষতি করতিছি, বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছি কারো? আর বনের অভিশাপ? এই যে সব তিন-চারশো বছরের পুরোনো গাছ রাতারাতি কেটে উজাড় করে দেচ্ছে, বন কি করতিছে? কি হচ্ছে তাদের?

আসলেই, এখান থেকে অন্তত মাইল দুই দূরে; বন যেখানে আরো গভীর, দুর্ভেদ্য; কি এক কারখানা বসবে বলে বিরাট এলাকা একবারে সুনসান ফাঁকা করা হচ্ছে। বিশাল বিশাল সব যন্ত্র এসেছে, তিন-চারশো বছরের পুরোনো গাছ ঘণ্টা  দু’য়ের মধ্যে উপড়ে ফেলা হচ্ছে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এ গ্রামের অনেকেই যেয়ে দেখে এসেছে সেই অবিশ্বাস্য ধুন্দুমার কাণ্ড। ওরে বাপ্, ওরকম একটা গাছ; পেড়ে ফেলা মানে কি! –কতো রকমের পাখি, সরীসৃপের অনাদি আশ্রয়, মাটিতে কোন আমলের পুরোনো ছায়া, ফল-ফুল, এসব ঘণ্টা দু’য়ের মধ্যে উজাড় হয়ে যাওয়া! –ভাবা যায়? গ্রামের অনেকে আবার ইচ্ছে করেই দেখতে যায়নি এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ। দেখার উৎসাহ পায়নি।

চেরাগালির ভয় নেই। সারারাত সে বন আঁতিপাঁতি করে খোঁজে গুঁইসাপ তক্ষক। সাপ সে ধরে না, ও বিদ্যে তার জানা নেই, তবে সাপের ভয়ও পায় না। –আমি কি বনের কিছু ক্ষতি করতিছি তাই? যারা শ শ বছরের পুরোন গাছ সাবাড় করতিছে তাদের কিছু করতিছো না ক্যান, উগের দেখলি যে হুজুর হুজুর করতিছো?

অকাট্য যুক্তি, তর্ক করার কিছু নেই। তারপরও চেরাগালির পেশাটা গ্রামের কেউই প্রায় মানতে পারে না।

গভীর ভারি স্তব্ধ কোনো রাতে বনের কোথাও ‘তক্কাস’ ‘তক্কাস’ শব্দে কোন তক্ষক ডেকে উঠলে গ্রামের মানুষের অস্বস্তি বাড়ে। তারা নিশ্চিত জানে এ ডাক প্রকৃত তক্ষকের না। চেরাগালি অবিকল তক্ষকের ডাক নকল করে তক্ষক ধরার ফন্দি করছে। গ্রামবাসীর অনাদিকালের অক্ষতিকর ভীতিপ্রদ সহচারী তক্ষক; দেখতে টিকটিকির মতো, তবে আকারে বেশ বড়ো, গায়ের রঙ কদাকার, –এখন চেরাগালির কারণে নির্বংশ হতে চলেছে। আগে ঘরের চালে, বাড়ির পাশে পুরোনো গাছে এদের সচরাচর দেখা মিলত, যেন মানুষের কাছে থাকতেই এরা পছন্দ করত, হঠাৎ হঠাৎ শোনা যেত রাত-কাঁপানো-ডাক, –তক্কাস। এখন আর দেখা যায় না। বনের গভীরে কিছু থাকলেও থাকতে পারে। সেগুলো করায়ত্ব করার জন্যেই রাতের পর রাত চলে চেরাগালির অভিযান। গভীর রাতে কাছে দূরে তক্ষকের ডাকে তাই গ্রামের মানুষ শঙ্কিত হয়। তক্ষকের সর্বনাশে সমব্যথী হয়ে ওঠে। গুঁইসাপের কোন শব্দ নেই। দেখতে তক্ষকের মতো তবে আকারে বড়ো। এরা মাটিতে থাকতে পছন্দ করে। বনের ভেতর ঝোপঝাড়ের মধ্যে এদের উপস্থিতি আতঙ্কের চমক লাগায়। এরাও অক্ষতিকর, পোষা হাঁস-মুরগির বাচ্চা লোপাট করে সুযোগ পেলে, বিলের মাছ খায়। ছোটোখাটো সাপও খায়। চেরাগালির হাত থেকে এদেরও রক্ষা নেই। কতো রকমের ফাঁদ পাতে এদের ধরতে।

–শুনিছি যেবার বন ডাকে সেবার নাকি ফসল ভালো হয়। বৃষ্টি-বাদল হয় দরকার মতো, বাঁজা বৌদের পেটে বাচ্চা আসে, মেলাদিনের পুরোন রোগ আরোগ্য হয়। সুখির নহর বয় গ্রামে। এবার কি যে হয়–!

ভোরবেলা বিলের আদিগন্ত ফাঁকা মাঠের ভেতর প্রাচীন বিশাল নিমগাছের নিচে কেনায়েত মণ্ডল আর সনাতন বাছাড়ের নিয়মিত গল্প জমে। গাছ থেকে পাকা হলুদ নিমফল ঝরে, আর গাছের প্রাচীন মোটা কালো ডালগুলো বেয়ে চলে হরেক রকম পাখির বিচিত্র কোলাহল।

সনাতন বাছাড়ের মনের আশঙ্কায় কেনায়েত মণ্ডল সহমত হয়, –আমিও গো তাই ভাবি। ভোরবেলা, তখন অল্প সলক হয়েছে, দেখি চেরাগালি ঘাড়ে বস্তা ঝুলিয়ে লম্বা পা ফেলে যাচ্ছে। ডাকলাম– চেরাগালি চেরাগালি, শোনলে না।

তাই শোনে? –সনাতন বাছাড় বললো, –ওর ঘাড়ের বস্তায় কি থাকে আমি জানি, তক্ষক, গুঁইসাপ, চালান দেয়। চামড়ার নাকি অনেক দাম। যেভাবে ও প্রাণীদের মাথাটা থেতলে দেয় মুগুর দিয়ে, আমি দেখিছি, আমারে একদিন সেধে কলে, –দাদা দেখপা? দেখা যায় না, কি যে কষ্ট, ভয়ডর নেই ওর; তাই দেখে আমি কদিন ভাত খাতি পারিনি। সনাতন বাছাড়ের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে, মুখটা শীর্ণ হয়ে যায় বেদনায়।

–তাই ভাবতিছি, বনের মান্যি নেই, প্রাণীগুলোনরে ধরে মুগুর দিয়ে মাথা থেতলে দুবা, গাছগুলোনরে কেটে লোপাট করবা, বন ছেড়ে দেবে? এবার বন ডাকলি কি যে হবেনে–! বন ডাকার পরিণতির কথা ভেবে কেনায়েত মণ্ডলের চোখদুটো ভারি হয়ে আসে। আর সেই ভারি চোখে মুখ তুলে সে তাকায় বিলের দিকে।

বিল থেকে তখন সারারাত মাছ ধরে কাসেম, শিবু, বিষে গ্রামের পথে ফেরে। তাদের শরীর ভেজা, মাথায় ঝুড়িতে মাছ। মাছের দরকার হলে সনাতন বাছাড় বা কেনায়েত মণ্ডল এখান থেকেই কেনে। না দরকার হলেও ডেকে ঝুড়ির মাছ পরখ করে। ওরা খুশি হয়।

–এ বছর তো চিতল দেখলাম না একটাও?

–না ধরতি পারলি দেকপা কনতে? জল একটু নামুক, কনে যাবে? ধরা তো পড়তিই হবে।

এরকম কথাবার্তা হয়। সূর্যের তাপ বাড়ে। মাঠের আবাদ দেখা শেষ করে কেনায়েত মণ্ডল আর সনাতন বাছাড় গ্রামের দিকে ফেরে।

 

(২)

জঙ্গলদিয়া গ্রামবাসীদের জন্য এদিনের ভোরটা ছিলো একেবারে অন্যরকম। তখনও অন্ধকার প্রায়, পুব আকাশের গোঁড়ায় একটু আলো এসেছে। বিলের ভেতরে জায়গায় জায়গায় নলখাগড়া, পাতিবনে জমাট অন্ধকার। এমন সময়ই জেগে উঠেছে সমস্ত গ্রামের মানুষ, এমনকি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত। তারা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিলের দিকে কিছুদূর যেয়ে দল বেঁধে দাঁড়িয়েছে। মনে উত্তেজনা। হৃদপিণ্ড চলছে দ্রুত। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের গতিও বেড়ে গেছে সবার। অজানা আশঙ্কায় যেন হতভম্ব সকলে।

ফাঁকা মাঠের ভেতর বিশাল এক সাপ। এতো বড়ো সাপ দেখা তো দূরের কথা, কল্পনাও করেনি কেউ কোনোদিন। কুচকুচে কালো। মোটা বাঁশের মতো শরীর। ২/৩ হাত খাড়া দাঁড়িয়ে কুলোর মতো মস্ত ফণা তুলেছে। ফণাটা আবার টকটকে লাল। রাগে ফুঁসছে সাপটা। শরীরের বাকি অংশ মাটিতে কুণ্ডলী পাকানো। আর সেই কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে এসেছে চিকন লেজ। থেকে থেকে লেজটা মাটি স্পর্শ করছে। সেই স্পর্শে রাগ নেই অবশ্য, যতোটা আছে মমতা। যেন মাটিতেই তার শেষ আশ্রয়। পুবে সবে একটু লাল হয়ে ওঠা আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড শব্দে গজরাচ্ছে সে। বলা যায় এই ভয়ংকর গজরানোর শব্দেই ঘুম ভেঙে গেছে গ্রামের মানুষের।

কি সাপ এটা কারো জানা নেই। জঙ্গলের মধ্যেই ছিল নিশ্চয়ই। সাপটা থেকে বেশ কিছু দূরে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষেরা; যুবক-বৃদ্ধ-মেয়ে-পুরুষ এমনকি শিশুরাও। কারো হাতে লাঠি, কোঁচের বাঁশ কিন্তু এসব সরঞ্জাম সাপটা শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ঠ কিনা এ ব্যাপারে সবার মনেই সংশয়। তাছাড়া সাপটা মারার চেষ্টা করাটা ঠিক হবে কিনা সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। কে দেবে সেই সিদ্ধান্ত, গ্রামের জন্য যদি অমঙ্গল হয়! যদি না মারা যায় সাপটা!  তখন?

বরং কেউ কেউ দুই হাত জড়ো করে  প্রণাম করলো সাপটাকে, এই তো সেই মনসা দেবী–। সর্পরাজ।

সাপটার কিন্তু কোন দিকেই খেয়াল নেই। একভাবে সে ফণা তুলে আছে পুব দিকে চেয়ে। আর গজরাচ্ছে। বিলের বিস্তীর্ণ পানির কিছুটা অংশে তখন লাল রঙ ছড়িয়ে পড়েছে; তার ভেতর থেকে উঠে আসছে থালার মতো রক্তিম সূর্য। যতো বেলা বাড়ছে আর সূর্য উঠে আসছে উপরে, ততোই যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে সাপটা, গজরানোর শব্দ বাড়ছে, দুলে দুলে উঠছে ফণা। রাগ কি তবে সূর্যকেই? দিনের আলোকে?

বেলা বাড়ার সাথে সাথে সাপটার মিশকালো শরীর, মোরগের ঝুঁটির মতো টকটকে লাল ফণা ঝিলিক দিতে শুরু করল। ক্রমান্বয়ে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠছে সে–। পেছনে দূরে জড়ো হওয়া গ্রামের মানুষদের মনে অসহায়ত্ব বাড়ছে, কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না তারা আবার এলাকা ছেড়েও চলে যেতে পারছে না। এমন সময় দেখা গেলো কেনায়েত মণ্ডলকে, পাশে সনাতন বাছাড়। কেনায়েত মণ্ডলের হাতে বন্দুক। বন্দুকটা হাতে নেওয়ায় তার বয়স কি অনেকটা কমে গেলো? দৃঢ় পায়ে সে এগিয়ে আসছে আর গ্রামের লোকদের পেরিয়ে সাপটার বেশ কাছে যেয়ে মাটিতে বসলো, সনাতন বাছাড় বসলো তাঁর পাশে।

সূর্য অনেকটা উঠেছে। আলোও ছড়িয়েছে বেশ। রাতের আঁধার সরতে সরতে বনের ভেতর গিয়ে ঢুকেছে। কিন্তু সাপটার এখন রূদ্রমূর্তি। আরও হাত খানেক উঁচুতে উঠেছে তার ফণা আর গজরানোর শব্দে মনে হচ্ছে মাটি যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। আসলে লাল সূর্য আর দিনের আলোকেই যেন মানতে পারছে না সাপটা। তার চাই গহীন অন্ধকার, বড়ো জোর চাঁদ-গলা একটু আধটু জ্যোৎস্না।

বন্দুক নিয়ে কেনায়েত মণ্ডল এসে পড়ায় গ্রামের মানুষ ভরসা পায়। সাপ যতোই ভয়ংকর হোক, বন্দুকও তো কম কথা না।

কেনায়েত মণ্ডল কাঁধে বন্দুক ঠেকিয়ে বার দুই তাক করলো তারপর আবার নামিয়ে ফেলল বন্দুকটা। তিনিও কি দ্বিধায় পড়লেন!

উত্তেজনায় গ্রামের মানুষদের চোখের পলক পড়ে না। কখন যে কি হয়; বন্দুকটা গর্জে ওঠে নাকি উল্টো সাপটাই তাড়া করে ওদের ইত্যাদি নানা ধরনের আশঙ্কায় ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে যায় সবার।

এমন সময় চেরাগালিকে দেখা গেলো। হন্তদন্ত হয়ে ঘুমজড়ানো শরীরে  ছুটে আসছে। কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা গিয়ে সে বসলো কেনায়েত মণ্ডলের পাশে। কানে কানে কিছু বলল। ব্যস্ত হয়ে কেনায়েত মণ্ডল বন্দুক তুলল তারপর নিশ্চিত নিশানা নির্ণয়ে তৎপর হলো।

নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে উপস্থিত গ্রামের লোকদের।

ঠিক তখনই দিগন্ত বিদীর্ণ করে বিকট শব্দ ভেসে আসে।

বনের ডাক!

হতভম্ব মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও অপার শূন্যতার ভেতর চলে যায়। তারা  আকাশের দিকে তাকায়, এবং অবাক হয়ে দেখে, –তেমন কিছু না। একটা কাঠঠোকরা পাখি ডাকতে ডাকতে আকাশের মাঝ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এই পাখিদের ডাক খুব কর্কশ হয়, স্বভাব এমনই, উড়তে উড়তে ডাকা। কিন্তু তাতেই এই বিভ্রম? –উপস্থিত মানুষদের এ-ওর মুখের দিকে নির্বোধের মতো তাকানো ছাড়া কিছু করার থাকে না।

আর কেউ দেখেছে কিনা না জানলেও কেনায়েত মণ্ডল জানে যে তাঁর হাত থেকে বন্দুকটা পড়ে গিয়েছিল, সেটাকে আবার তুলে নেবে কি না এই ভাবনা তাঁকে বিব্রত করে ফেলে।

যদিও গ্রামবাসীর সামনে আশ্চর্যজনকভাবে তখন সেই ভয়ালসদৃশ সরীসৃপ যা সকলের কাছে সাপ বলে সাব্যস্ত হয়েছিল, সেটা আর নেই। বিল-পারের বিরান প্রান্তর একেবারে ফাঁকা। নানাভাবে অনুসন্ধান করেও সাপটার কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না।

বেলা বাড়ল। সকালের নবীন রোদে ঝলমল করে উঠল চারিদিক। আর সেই ভয়ংকর সাপ, নগণ্য সেই কাঠঠোকরা পাখির ডাক, মুহূর্তের মধ্যে অলৌকিকভাবে সাপটার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সব ঘটনায় হতবিহ্বল গ্রামের মানুষ নিজেদের অসহায়ত্বই নতুনভাবে উপলব্ধি করল।

একে একে গ্রামে ফিরতে লাগল তারা। বনের ডাক চিরন্তন রহস্য হয়েই থেকে গেলো।

 

পাভেল চৌধুরী

যশোর শহরে জন্ম ১৯৫৭ সালে, বেড়ে ওঠাও যশোরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন। অতঃপর শহীদ মশিয়ূর রহমান কলেজ, ঝিকরগাছা, যশোর-এর অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০১৮ সালে। ১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। লেখালিখির সংখ্যা খুবই কম, প্রকাশনার সংখ্যা আরও কম। ২০১৭ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চলে যাচ্ছি’ প্রকাশিত হয়। ছোট গল্প ছাড়াও প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখায় আগ্রহী।

ঠিকানাঃ রেল রোড, (চার খাম্বার মোড়), যশোর। মোবাঃ ০১৭১১৩৮৫২৩৪।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।