মঞ্জু সরকারের গল্প: প্রান্তিক গ্রাম-জীবনের চালচিত্র

মঞ্জু সরকারের সাম্প্রতিক গল্পগ্রন্থের নাম ‘অগস্ত্যযাত্রা ও অন্যান্য গল্প’। গত শতাব্দীর ৮০’র দশকে মঞ্জু সরকারের কথাসাহিত্য-অঙ্গনে পদার্পণ। প্রথম গল্পগ্রন্থের নাম ‘অবিনাশী আয়োজন’ সাহিত্যামোদীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। জিয়াউর রহমানের খাল-কাটা কর্মসূচিকে উপলক্ষ করে এই গল্পগ্রন্থে একটা গল্প ছিল। প্রথম গল্পগ্রন্থ থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল যে মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সমসাময়িকতা। সেই থেকে অদ্যাবধি মঞ্জু সরকার ক্রমাগত লিখছেন, মূলত ছোটগল্প আর উপন্যাসই তার মনোযোগের বিষয়। সময়ের সাথে সাথে তাঁর গল্প বা উপন্যাসের ফর্ম পাল্টেছে, এসেছে বিষয়বৈচিত্র্যও। আমাদের অস্থির সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির পরিচয় মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মে পাওয়া যায় আর পাওয়া যায় এক ধরনের সামাজিক দায়, যে কারণে কথাসাহিত্যিক হিসেবে জননন্দিত হওয়ার তাগিদ তাঁর লেখায় নেই বরং তিনি যেন সামাজিক গলিঘুঁজিতে সন্ধান করেন সেই আলোকবর্তিকা যার স্ফুরণে একদিন উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে এদেশের সামূহিক ভবিষ্যৎ।

‘অগস্ত্যযাত্রা ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে গল্প সংখ্যা ১২টি। বিষয়বৈচিত্র্য গল্পগুলোকে বিশিষ্ট করেছে। প্রায় বিগত ৩০/৪০ বছর আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব রাখছে বিদেশী টাকা। এই টাকা বিদেশে উপার্জন করে যারা দেশে পাঠাচ্ছে তারা যেমন এক বিশেষ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে তেমন দেশের ভেতর কোনোরকম উৎপাদন প্রক্রিয়া বহির্ভূত এই টাকা দেশীয় আর্থ-সাংস্কৃতিক-সামাজিক ক্ষেত্রেও এক ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যা প্রভাবিত করছে আমাদের ধারাবাহিক মূল্যবোধকে।

আমাদের অর্থনীতি বাজার ব্যবস্থায় এখন এই বিদেশী টাকার প্রভাব অনস্বীকার্য। বিদেশে যে অমানবিক পরিস্থিতিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে পরিবার-পরিজন বিবর্জিত একেবারে ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শুধুমাত্র টাকা অর্জনের জন্য এদেশের যে মানুষেরা মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করছে তাদের দিকে আমাদের কথাসাহিত্যিকরা কখনও দৃষ্টিপাত করেছেন এ রকম দৃষ্টান্ত বড় একটা নেই। মঞ্জু সরকার ব্যতিক্রম। নিজে সৌদি আরবে ছিলেন কিছুদিন আর সেই থাকার সুবাদেই তার দৃষ্টিসীমায় ঠাঁই নিয়েছে সেখানে শ্রমজীবী এদেশের মানুষেরা। তাদের কাজকর্ম সুখ-দুঃখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনার জগৎ হয়ে উঠেছে লেখকের কৌতূহলের বিষয়। বলাবাহুল্য, বিদেশে দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের উপর বিদেশী সংস্কৃতির অল্পবিস্তর প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়, যা দেশের মানুষ ও সংস্কৃতির সাথে কিঞ্চিৎ বেমানান, অসামঞ্জস্যপূর্ণও হয়ে উঠতে পারে। তারা পড়ে উভয়সংকটে, দেশ যেমন তাদের কাছে পূর্ববৎ আপন হয় না আবার বিদেশেও তারা হয় ব্রাত্য। যার ফলে এক ধরনের মানসিক নিরালম্ব পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তাদের। লেখকের ভাবনা-জগতের এইসব প্রাণবন্ত মানুষ পাঠকের মনে বিস্ময় আর কৌতূহলের জন্ম দেয় আর এ দেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রবহমান এই বিরাট ঘটনা সম্পর্কেও পাঠককে সচকিত করে।

উপরোক্ত পটভূমিতে লেখা গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো হল; শিকড়ের রস, সৌদি পার্কে একদিন, ক্লিনার, কালো গোলাপের ঘ্রাণ, মরু-পাহাড়ের এক বিমূর্ত চাষী, ভালবাসার হালখাতা।
মঞ্জু সরকারের সাহিত্যচর্চার ভিত্তিভূমি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমজীবী, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ। দেশের এই বিপুল বিরাট অংশ মানুষের মধ্যেই তিনি সন্ধান করেন সম্ভাবনার বীজ। মানুষ অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম করে কিন্তু শুধু সংগ্রামই যে তারা করে এমন নয়; এই সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত থাকে জীবনের রস, আনন্দ। বলা যায়, সেটাই হচ্ছে সংস্কৃতি। শ্রেণি-বর্ণ-নির্বিশেষে এই সংস্কৃতির রূপ ভিন্ন কিন্তু এই বিভাজন উল্লম্ব নয়, আনুভূমিক। মঞ্জু সরকারের লেখায় বিষয়টি স্পষ্ট বলেই তার লেখা যান্ত্রিক নয়, রসোতীর্ণ। মানুষ কিংবা প্রকৃতি সেখানে সক্রিয়, পরিবর্তনশীলও।

গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত দেশের পটভূমিতে লেখা গল্পগুলো হল: অগস্ত্যযাত্রা, বেকার দিনের দায়, তুমি মরো আমি বাঁচি, সন্দেহ জাগানো সহবাস, ক্ষমতার সঙ্গে থাকা, বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আত্মীয়-স্বজন। প্রায় সব গল্পগুলোরই শ্রেণিভিত্তি হল নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ আর ক্ষুদ্র কৃষক।

শিকড়ের রস অসাধারণ গল্প। অসাধারণ এই অর্থে যে এই গল্পের উপজীব্য বা বিষয় বাংলা কথাসাহিত্যে একটা নতুন প্রসঙ্গের সূচনা করেছে। বিদেশে অধ্যায়নরতা পিয়া ছুটিতে দেশে ফিরে গ্রামের বাড়িতে অশীতিপর বৃদ্ধা দাদিকে জড়িয়ে ধরলে ‘মন অনাবিল সুখে ভরে ওঠে’। কেন? এ প্রশ্ন পিয়ার। রক্তের টান? নাকি শেকড়ের টান? শিক্ষা আর কাজের সূত্রে মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। এক সময় যে মানুষের সীমানা ছিল গ্রামের গণ্ডিটুকু; সেই মানুষ আজ ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বময় কিন্তু তাতে করে যে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে নিজের দেশের সাথে, দেশের মানুষের সাথে, এই গল্পে তার পরিচয় আছে আর আছে এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার আভাস। যে নিঃসঙ্গতা পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় মানুষকে করে তোলে একক, আত্মকুণ্ডায়ন যার অনিবার্য পরিণতি। পিয়ার দাদির ছেলেরা থাকে শহরে, সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু দাদি নিজে থাকেন গ্রামে, নিজের মত করে। আসলে মানুষ তো চায় স্বকীয়তা, যেখানে সেই স্বকীয়তা নিশ্চিত হয় সেখানেই তার টান আর এই টান জোরালো হয়ে ওঠে যদি তার সাথে যুক্ত হয় শেকড়ের রস। জার্মান প্রবাসী পিয়া দেশে এসে দাদির সাথে দেখা করতে ছুটে আসে গ্রামে। দাদি শুধু সম্পর্কসূত্রের বিষয় নয়, দাদি অতীত আর বর্তমানের সেতুবন্ধ, যে সেতুবন্ধ উপেক্ষা করা যায় কিন্তু লঙ্ঘন করা যায় না। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতা জার্মান প্রবাসী পিয়া পিতৃপুরুষের ভিটেয় এসে গ্রামীণ প্রকৃতি আর মানুষের সাথে যেন অদৃশ্য আত্মিক সংযোগের সন্ধান পায়। ভালো লাগে গ্রামের সম্ভাবনাময় শিক্ষিত যুবক আজাদ মাস্টারের ছেলে বক্করকে। পিয়ার নিঃসঙ্গ স্থবির জীবনে এসব ক্ষীণ তরঙ্গ তুললেও অকস্মাৎ সে আবিষ্কার করে এক দুর্লঙ্ঘ সাংস্কৃতিক বাঁধা, যে বাঁধা তার নিঃসঙ্গতায় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করে। ‘মাটি হইতে রস না পাইলে গাছ বাঁচে না। মানুষও তেমনি রে পিয়া, সংসারে আপনজনের মায়া মমতার মধ্যে না থাকলে একলা যতই লেখা পড়া কর, যত টাকা কামাও, সুখ শান্তি পাবি না।’ –নাতির মাথায় হাত রেখে দাদি সান্ত্বনা দেয় কিন্তু একি সান্ত্বনা শুধু? না, এ সেই চিরন্তন বাণী, মানুষের জীবনে যা অপরিহার্য দিকদর্শন হয়ে আছে। তারপরও জাগতিক উৎকেন্দ্রিকতা মানুষকে ভোগ-বিলাস-আধিপত্যের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে চলেছে আবার তাকে করে তুলছে একক, অসহায়ও। যে উপলব্ধি পিয়ার মধ্যেও আছে। কান্না-গলায় দাদিকে জড়িয়ে সে তাই বলে, ‘আমি আসলে তোমার চাইতেও একা। তোমার তবু জায়নামাজের আশ্রয় আছে, আমার যে তাও নাই। রস পাওয়ার মত তোমার এই ভিটা আছে, আমার যে তাও নাই দাদি। কতদিন একলা উড়ে বেড়াতে হবে জানি না।’ গল্পের শেষে পিয়ার এই দীর্ঘশ্বাস শুধুমাত্র গল্পের চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বর্তমানের আন্তঃবিশ্ব উন্নয়ন আর ব্যক্তি-সাফল্যের উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষাকে যেন প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশ্ন তোলে, গন্তব্য কোথায়? এই মনুষ্যপ্রজাতির গতিমুখ কোনদিকে?

‘সৌদি শহরের পথে পথে বাংলাদেশি সোলায়মান সোনা খুঁজে ফেরে’ –এই বাক্য দিয়ে ক্লিনার গল্পের শুরু। সৌদি আরবে বিদেশ থেকে আসা কর্মসন্ধানী মানুষদের নিয়ে গল্প আছে ৫টা। তার মধ্যে ১টা গল্প ভিন্ন মাত্রার, ‘সৌদি পার্কে একদিন’। উত্তম পুরুষের বয়ানে লেখক এখানে বহিরাগত একজন। তার শিশু নাতি পার্কে খেলতে গিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় এক সৌদি শিশুকে সামান্য আহত করলে লেখক বিপদগ্রস্ত হন আবার বিপদ থেকে তিনি উদ্ধারও হন জনৈকা সৌদি বৃদ্ধার বদান্যতায়। এই সংক্ষিপ্ত কাহিনীর মধ্যে দিয়ে লেখক মানুষের চরিত্রের এমন এক মানবিক দিকের সন্ধান দিয়েছেন, দেশ-কাল ভেদে যার রূপ এক। স্থান-কাল-পাত্র-ভাষা-সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছু ছাড়িয়ে যা জায়মান এবং মানবিক। বাকি চারটে গল্পই এদেশ থেকে যাওয়া শ্রমজীবীদের দিনযাপনকে কেন্দ্র করে লেখা। ক্লিনার গল্পে সোলায়মান যে সোনা খুঁজে ফেরে সেই সোনা তাদের সমৃদ্ধির প্রতীক, আকাঙ্ক্ষা। যে আকাঙ্ক্ষার তাড়নায় দেশের পরিবার-পরিজন স্মৃতি-সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করে নিতান্ত অজ্ঞাত অচেনা অজানা সৌদি আরবে তারা ঠাঁই নিয়েছে। নানা দেশের নানা জাতের মানুষ সেখানে। সোলায়মানের কাজ রাস্তায় কিংবা বাড়ির সামনে ফেলে রাখা আবর্জনা নির্দিষ্ট গাড়িতে তুলে দেওয়া। সৌদি ভাষায় এই কাজের শ্রমিকদের বলা হয় ‘বলদিয়া’। সোলায়মানের সাথে কাজ করে অন্ধ্রপ্রদেশের অমুসলমান সমবয়সের সমসামাজিক অবস্থানের ‘আঁধরু’। প্রকৃত নাম তার এটা না হোলেও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে এসেছে বলে সোলায়মান তাকে এই নামে ডাকে। রেগে গেলে বলে ‘আঁধরু হালা’। দু’জনের দেশ আলাদা শুধু নয়, ভাষা আলাদা, সংস্কৃতিও আলাদা কিন্তু তারপরও ‘পারস্পরিক রাগ-বিরাগ-সহমর্মিতা কিংবা তার অভাব এমনকি গোপন চালাকি পর্যন্ত বুঝতে অসুবিধা হয় না তাদের। সোলায়মান আর আঁধরুর চোখ দিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন সৌদি সমাজকে, যদিও তাতে সমাজের কতটুকু অংশই বা দেখা যায় ? তারপরও এই সব বিদেশী শ্রমিকদের প্রতি সৌদিদের মনোভাব অমানবিক বলে মনে হয় না। কারণটা এরকম হতে পারে যে প্রান্তিক কাজে নিয়োজিত এই সব বিদেশী শ্রমিকরা যে তাদের বিলাসী জীবনযাত্রার ভগীরথ সে ব্যাপারটা হয়তো তাদের উপলব্ধিতে থাকে। বলার কথা এইটাই, সৌদি মানুষরা লেখকের গল্পে যথাযথ স্থান পেলেও জুগুপ্সার প্রকাশ কোথাও তেমন দেখা যায় না। সমপেশায় একধরনের পেশাগত দ্বন্দ্ব থাকেই। সোলায়মান আর আঁধরুর মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে সেটা ছিল কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় সমশ্রেণির মানুষের মানসিক ঐক্য। যে কারণে আঁধরুর স্ত্রীর মায়ের মৃত্যু সংবাদে প্রগাঢ় শোকগ্রস্ত আঁধরুর পাশে দাঁড়ায় সোলায়মান। পরিচ্ছন্নকরণ কাজের মধ্যে কুড়িয়ে পাওয়া একটা ব্যাগ, যার মধ্যে আছে মূল্যবান মেয়েলি সামগ্রী, সে সান্ত্বনা হিসেবে আঁধরুর স্ত্রীর জন্য দিয়ে দেয়। সোলায়মানের উপহার পেয়ে খুশি হয় সে। এক সৌদি সেদিন তাকে পেপসির বোতল দিয়েছিল একটা। পরে খাবে বলে বোতলটা পকেটে রেখেছিল। সেই বোতল সোলায়মানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে– লে ভাইয়া তোম পিও। উভয়ের পেপসি পানের মধ্যে দিয়ে এই গল্পের সৌহার্দ্যমূলক সমাপ্তি হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে দেশের নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীদের নিয়ে গল্প আছে ৬টা। প্রায় সব গল্পের পটভূমি গ্রাম। গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের চারিত্রিক বৈচিত্র্য শহরে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের থেকে বেশি। তার একটা কারণ হয়তো গ্রামীণ শ্রমিকদের বৈচিত্র্যময় জীবন সংগ্রাম। ‘অগস্ত্যযাত্রা’ গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা। ‘যার যে স্থানে জন্ম, সেই জন্মস্থানের মাটিতে মিশে যাওয়ার অন্তিম বাসনা অনেকেরই হয়’–এই বাসনা নিয়েই গল্পের মূল চরিত্র লেখক অবসর জীবনে নিজের পিতৃপুরুষের ভিটেয় ফিরে আসে বাকি জীবনটুকু শান্তিতে কাটাবার আশায়। ‘ঢাকায় রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ ফিরেও তাকায় না, কিন্তু গায়ের পথে হাঁটতে বেরুলেই চেনা-অচেনা বহু লোকের সালাম পাই’। এই সালাম পাওয়ার অর্থ নিজের গুরুত্ব-উপলব্ধি, যে উপলব্ধি লেখককে গ্রাম জীবনের প্রতি শুধু যে আকৃষ্ট করে এমন না, সেখানে বসবাসের একটা স্বাপ্নিক ঘোরও নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। গ্রামীণ সমাজজীবনের জাব্দা ভিতে শুধুমাত্র উত্তরাধিকার আইনের জোরে ভিন্ন কেউ তার কল্পবিলাসের শেকড় চারাবে; বিষয়টা এত সহজ না। সে কারণে দেখা গেল পুকুর পাড়ে বসে মাছ ধরার কল্পনা, সব্জি ক্ষেত, বিশ বছর মেয়াদি মেহগনি চারার সাজানো বাগান, রাতারাতি তছনছ হতে সময় লাগল না। ‘শেষ বয়সে আমার এত বৃক্ষপ্রেম আর মৎস্যপ্রেম ব্যর্থ হওয়ায় বাঁচার আনন্দ আর কোথায় খুঁজব আমি? মনে হয় আমার ইহকাল নেই, পরকালও নেই, জীবিত থাকতেই অসীম এক কালো গহ্বরে বিলীন হয়ে যাচ্ছি।’ কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাকে বিলীন হতে হয় না। গল্পের শেষে যখন তার কাজের সাহায্যকারী দিনমজুর উবেদ আলীর ছেলে ছক্কা মহা আনন্দে এসে খবর দেয় যে পুকুরে শত্রুতা করে বিষ দেওয়া সত্ত্বেও সব মাছ মারা যায়নি, তখন শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে হলেও ছক্কার আনন্দে ভাগ নিতে সে উঠে দাঁড়ায়। এই দাঁড়ানোর মাধ্যমেই যেন লেখক বলতে চান শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। শেষের মধ্যেই শুরু থাকে।

গ্রামীণ সমাজের জটিল-কুটিল অষ্টাবক্রের ছবি আমরা এই গল্পের মধ্যে পাই। এই গ্রাম প্রথাগত চিরকালীন গ্রাম নয়, হাল আমলের। যখন গ্রামীণ সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে রেমিটেন্সের টাকা। এতদিনের সরল স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবনে ভোগবিলাসের টোপ সাজিয়েছে বাজার অর্থনীতির বেপরোয়া কারিগররা আর গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় শেকড় চারিয়েছে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির দুর্বিনীত আয়ুধ।

গ্রামীণ সমাজের উপর ভিত্তি করে লেখা এই গল্পগ্রন্থের ৫টা গল্পের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ‘বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আত্মীয়-স্বজন’ গল্পটি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখার ঝুঁকি অনেক কিন্তু লেখকের সততা আর নির্মোহ নিরীক্ষা তাকে সাহস জুগিয়েছে।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এদেশের নিম্নবিত্ত দরিদ্র বিপুল পরিমাণ কৃষকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ছিল অপ্রতিহত। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনার সুপ্ত বীজ তিনি রোপন করেছিলেন তাদের মধ্যে। ভক্তের অভাব ছিল না, এমনকি তাঁর ডাকে জাগতিক সবকিছু উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিল এদেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র কৃষক। চেংটু সাবেদ ছিল তার এমনই এক ভক্ত। হতদরিদ্র কৃষক কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বপ্নে সে ছিল বিভোর। ‘বাঙালির এত বড় বন্ধু এ দুনিয়ায় আর কাঁয়ও নাই বাহে’–শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে এই ছিল তার সরল কিন্তু নিষ্ঠ সিদ্ধান্ত। একবার চেংটু পগার থেকে ধরা বিপুল পরিমান জিয়ল-মাগুর-কৈ মাছ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিজে গ্রাম থেকে কোনোদিন বের হয়নি বলে সে চেষ্টা সফল হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে চেংটু নিজে অংশগ্রহণ করেনি সত্যি কিন্তু নিজের পোষ্য দশ বছরের আপন ভাগ্নে মজিবরকে পাঠিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে, ‘নেতা কয় নাই যার যা আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। মজিবরই আমার বড় অস্ত্র বাবা।’ এই গল্পে মুক্তিযুদ্ধ আছে, আছে সেই যুদ্ধের গ্রামীণ অবয়ব। শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিহত প্রভাবের পরিচয় এই গল্পে পাওয়া যায়। গ্রামীণ সমাজবিন্যাস অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের গাম্ভীর্য ধরা পড়ে নানা মাত্রায়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিও খুব উজ্জ্বল এই গল্পে। ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন, ‘৭৪ এর মহামঙ্গা, ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনা, এসবই গল্পের উপজীব্য। আকারে ছোট হলেও বাংলাদেশের একটা ছোট গ্রামের নানা শ্রেণীর কিছু মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে একেবারে জিয়াউর রহমানের খাল-কাটা বিপ্লব পর্যন্ত ঘটনাবহুল বিস্তৃত সময়ের যে সংক্ষিপ্ত অথচ সূক্ষ্ম রেখাচিত্র অঙ্কন করা হয়েছে তার ঔজ্জ্বল্যে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। বঙ্গবন্ধুর প্রাণান্ত ভক্ত চেংটু সাবেদের জীবনে দু‘টো প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে গেল। তার একটা, স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে; ২৫মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু ধরা পড়াকে কেন্দ্র করে। বিষয়টা ছিল তার কাছে ভীষণ রকম অবিশ্বাস্য। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতারে নেতার বজ্রকণ্ঠ শুনে লেখককে সে উপহাস করে বলেছিল; ‘ঢাকায় থাকিয়া কি বালের পলিটিক্স করেন বাহে। আমি কই নাই মুজিবকে বন্দি করা এত সোজা না। মুজিব আছে কি নাই, নিজের কানে শোনো সবাই।’ বাস্তবতা যাই হোক, শুরুতে শেখ মুজিবের বন্দি হওয়ার খবরটা সে কোনোভাবে মানতে পারেনি । তার স্বাভাবিক বুদ্ধিতে মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ‘সবাইকে যুদ্ধ করার হুকুম দিয়ে পাকবাহিনীর হাতে ধরা দিয়ে আবার জেলে যাবে, নেতা এমন বোকা হয়’? স্বপ্নের স্বাধীন দেশে জিয়াউর রহমানের উৎপাদন বৃদ্ধি আর খাল-কাটা বিপ্লবের সময় ‘অভাব-অনটনে অসুখ-বিসুখে’ ভুগে একরাশ হতাশায় জর্জরিত চেংটু সাবেদের জীবনাবসান হয়। তখন তার মনে প্রশ্ন আরও একটা ছিল। বলা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা জটিল-কুটিল-তত্ত্ব-তথ্যের ঘূর্ণি চেংটুর মত হতদরিদ্র এক কৃষকের উত্থাপিত এই দু‘টো প্রশ্নকে ঘিরে আজও সক্রিয়। দ্বিতীয় প্রশ্নটা সে করেছিল তার মৃত্যুশয্যায় আর এই প্রশ্নের মধ্যে দিয়েই সমাপ্তি ঘটে গল্পের। দীর্ঘদিন পর গ্রামে লেখকের সাথে দেখা হলে মৃত্যুপথযাত্রী চেংটু সাবেত জানতে চেয়েছিল, ‘যার কণ্ঠ শুনিয়া পাকিস্তানি দুশমনরা বাঙলার মাটি থাকি পালায় গেল, সেই দয়ার সাগর, রক্ষিবাহিনী আর লাল ঘোড়া দাবড়ায় ঘরের শত্রু দমন করতে পারে নাই কেন বাহে?’

আগেই উল্লিখিত হয়েছে যে কথাসাহিত্যিক হিসেবে মঞ্জু সরকারের মূল আগ্রহের বিষয় এদেশের ক্রমপরিবর্তনশীল গ্রামীণ জনপদ এবং সেই জনপদের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র কৃষক মজুর; এখনও পর্যন্ত যারা আমাদের গ্রামীণ জীবনের স্বকীয়তা ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করছে তাদের প্রতি। তার গদ্য গতিশীল। মেদহীন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কালোয়াতি সেখানে নেই। প্রকৃতির বর্ণনার ক্ষেত্রেও তিনি উচ্ছ্বাসহীন, সংযত। ব্যক্তি সেখানে নিছক সামাজিক উপাদান; সমাজবিচ্ছিন্ন সক্রিয় কোনো উপকরণ নয়। যে কারণে ব্যক্তির একক বিচ্ছিন্ন সংকটের প্রতি লেখকের আগ্রহ কম। সমাজ সংগঠনের নিয়ত পরিবর্তনশীলতায় যেটুকু যেরকম সাড়া ব্যক্তির আচরণে পড়ে সেখানেই লেখকের আগ্রহ। সেই আচরণটুকু তিনি মেলে ধরতে চান সমাজের গতিমুখের নিদর্শন হিসেবে। সম্ভাবনার খোঁজ করেনও সেখানে।

আমাদের দেশে কথাসাহিত্যের ভোক্তা এখনও পর্যন্ত শহুরে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সাহিত্য তাদের কাছে বিনোদন উপকরণ, স্বপ্ন-সহচর। জীবনজিজ্ঞাসার বহুমুখী সামাজিক দর্পণ নয়। যে কারণে মঞ্জু সরকারের সাহিত্য-মনোভঙ্গি বোধ বা রুচির সাথে পাঠকের মানসিক সাযুজ্য বিঘ্নিত হয়। এই বিঘ্নতা সাহিত্যবিচারের মানদণ্ড নয় সত্যি কিন্তু পাঠকপ্রিয়তার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে। পাঠকের কাছে কথাসাহিত্যের বিস্তীর্ণ চারণভূমি বিনোদনসামগ্রীর অধিক জীবনজিজ্ঞাসার আকর উপাদান হয়ে না উঠলে কথাসাহিত্যের মর্যাদা বা গুরুত্ব প্রয়োজনের আবশ্যিক তালিকায় অনিবার্য হয়ে ওঠে না। একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

আশা করা যায় সমাজ নিরীক্ষায় মঞ্জু সরকারের সাহিত্য প্রয়াস তাতে নিরস্ত হবে না।

 

পাভেল চৌধুরী

যশোর শহরে জন্ম ১৯৫৭ সালে, বেড়ে ওঠাও যশোরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন। অতঃপর শহীদ মশিয়ূর রহমান কলেজ, ঝিকরগাছা, যশোর-এর অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০১৮ সালে। ১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। লেখালিখির সংখ্যা খুবই কম, প্রকাশনার সংখ্যা আরও কম। ২০১৭ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চলে যাচ্ছি’ প্রকাশিত হয়। ছোট গল্প ছাড়াও প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখায় আগ্রহী।

ঠিকানাঃ রেল রোড, (চার খাম্বার মোড়), যশোর। মোবাঃ ০১৭১১৩৮৫২৩৪।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।