মধ্য নভেম্বরের শীত শীত আমেজ চারদিকে, মূলত চলছে হেমন্তের সোনালি দিন। অবশ্য সেই আগুনরঙা প্রকৃতি প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে, ঝরতে শুরু করেছে গাছের পাতা। তারই মাঝে রবীন্দ্রনাথ, মানে টরন্টোর বুকে রবীন্দ্র উৎসব। সেই উৎসবে যোগ দিতে এসেছেন এমন একজন যার সৃষ্টি আমার চিরকালের প্রিয় বিষয়গুলোর অন্যতম। সেই তাঁর দেখা পেলাম কিনা হঠাৎ করে পরবাসে! জীবনের চোরাবালির ফোঁকর খুঁজে বেরিয়ে আসা একটি না-ভুলে যাওয়া দিন। যে দিনের নাম রেখেছি, কেতকীর সঙ্গে একদিন।
ছেলেবেলায় এক একজনের বেড়ে ওঠার এক একটি নিজস্ব কায়দা-কানুন রয়েছে। আমি বেড়ে উঠেছিলাম প্রচুর বই ও ভাবনার মাঝে। তাই হয়তো সমবয়েসীদের চাইতে কিছুটা আগেই জেনে যাই এমন অনেকের নাম, যাদের লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ-বিস্ময়ে ভালো লাগার স্তরগুলো পার হয়েছি স্বাধীনভাবে। আমি তাদের লেখা পাঠ করে ঋদ্ধ হয়েছি এবং সমান্য হলেও বুঝেছি কী করে ভাষাকে আয়ত্তে আনতে হয় নিজের মতো করে। তাদেরই একজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব কেতকী কুশারী ডাইসন। অসংখ্য পরিচয় তাঁর। একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, অনুবাদক, গবেষক, সমালোচক, একজন প্রতিবাদী নারী লেখক এবং রবীন্দ্র গবেষক। বাংলা ও ইংরেজি দু ভাষাতেই সমান দক্ষতায় কলম চালান তিনি। একসঙ্গে এতগুলো পরিচয় যাঁর, তাঁকে কাছে পাবার আগ্রহ আমার আকাঙ্ক্ষার পর্যায়েই রয়ে যেত, যদি না ২০০৫-এর নভেম্বরে টরন্টো ইউনিভার্সিটির নিউ কলেজের উদ্যোগে আয়োজিত রবীন্দ্র উৎসব সেই বিরল সুযোগ করে না দিত।
আমার প্রথম যৌবনের আকণ্ঠ ডুবিয়ে রাখা বেশ কিছু গ্রন্থের জননী তিনি। আমি তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত বহুকাল ধরেই। ১৯৮১- ৮২ সন ধরে তাঁর প্রথম উপন্যাস নোটন নোটন পায়রাগুলি যখন পশ্চিমবঙ্গের দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, তখন আমাদের বাড়িতে নিয়মিত দেশ রাখা হতো। অনেক লেখক ও সাহিত্যিককে চিনিয়ে দেওয়ার ও প্রিয় লেখক বানানোর কাজটি এই পত্রিকা করে গেছে। আমরা যারা নিয়মিত দেশ পড়তাম তারাই জানতাম কী দুর্বার ছিল সেই আকর্ষণ। সেখানেই আমি কেতকী কুশারী ডাইসনকে প্রথম চিনি। যদিও এর বেশ কিছু আগেই বাংলা ও ইংরেজিতে কবিতা, জার্নাল, আত্মজীবনী মিলিয়ে প্রায় গোটা সাতেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে তাঁর । তবুও এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি যখন প্রকাশিত হতে শুরু করল, আমি যেন নতুন করে জানলাম একজন আধুনিক নারী লেখকের ঔজসিক কলমের শক্তি। সেই তখন থেকে তিনি আমার আগ্রহ অধিকার নিলেন পাকাপাকিভাবে। আমি কেতকী কুশারী ডাইসনের ক্ষুরধার লেখনীর ভক্ত হয়ে গেলাম। পরবতীর্তে নোটন নোটন পায়রাগুলি বই আকারে বাজারে এলে কিনেছিলাম, সেই বইয়ের প্রচ্ছদ ফ্ল্যাপে পেয়েছিলাম একজন মেধাবী লেখকের মুখচ্ছবি।
এই লেখকের সাহিত্য জীবন যেমন বহুল বর্ণময়, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। ভারতবর্ষের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মাপকাঠিতে কেতকী কুশারী ডাইসন এক জ্বলজ্যান্ত বিপ্লব। বিশেষ করে ষাট দশকের প্রারম্ভে কলকাতা থেকে বৃত্তিলাভ করে বিলেতের অক্সফোর্ডে পড়তে যাওয়া একজন প্রচন্ড মেধাবী নারী। আবার সেখানেই বিবাহসূত্রে একজন সাহেবের গলায় বরমাল্য পরিয়ে দেওয়া, একে সেসময়ের প্রেক্ষাপটে বিপ্লব ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। বাংলাদেশে বসে যতটা জানা সম্ভব ততটাই জানার চেষ্টা করেছি তাঁর সম্পর্কে। সেই থেকে ভেতরে ভেতরে একটি স্পষ্ট ভালোলাগা তৈরি হতে থাকে তাঁকে ঘিরে। আর সে-ভালোলাগা কালক্রমে প্রবল ও দৃঢ় হতে হতে কখন যে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, তা টের পেলাম টরন্টোতে তাঁকে প্রথম দেখার পর।
টরন্টো ইউনিভার্সিটির নিউ কলেজ আয়োজন করেছিল তিন দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব, শিরোনাম, ক্লেইমিং অ্যা কালচারাল আইকন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । অনুষ্ঠানটির সার্বিক দায়িত্বে ও আহ্বায়কের ভূমিকায় ছিলেন প্রফেসর জোসেফ ও’কনেল এবং ক্যাথলিন ও’কনেল দম্পতি। ক্যানেডিয়ান এই দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে বাঙালিদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিজেদের নিরলসভাবে একাত্ম করে রেখেছেন। তাদেরই আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বিশাল অনুষ্ঠান। আমন্ত্রণ পেলাম।
১১ নভেম্বও ২০০৫ বিকেল তিনটে নাগাদ পৌঁছে গেলাম ইউনিভার্সিটি প্রঙ্গণের উইলিয়াম ডু অডিটোরিয়ামে। বসে আছি দর্শকের সারিতে। অনেক রথী-মহারথী এসেছেন বিশ্বের নানান জায়গা থেকে, রবীন্দ্রনাথের ওপর কিছু বলতে, জানাতে ও দেখাতে। অতিথিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ আনিসুজ্জামান, কণ্ঠশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, নৃত্যশিল্পী লুবনা মারিয়ামসহ আরো অনেকে। সিঙ্গাপুর থেকে এসেছেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুস্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র সারিন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিলেত থেকে আগত বিশিষ্ট বাংলা গবেষক ডঃ উইলিয়াম র্যাদিচি, প্রফেসর তপন রায়চৌধুরী এবং ডঃ কেতকী কুশারী ডাইসনসহ আরো কয়েকজন। প্রথম যখন জানতে পেলাম কেতকী কুশারী ডাইসন এসেছেন তখন মনটা আপনাতেই চঞ্চল হয়ে উঠল। আগে থেকে কিছুই জানতাম না, কে বা কারা আসছেন এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কারণ অনুষ্ঠান উদ্যোক্তারা এবিষয়ে তেমন কোনো প্রচার করেননি। তাই কেতকী কুশারী ডাইসনের নাম শুনে নড়েচড়ে বসলাম। দেখতে চেষ্টা করলাম কোথায় তিনি!
তিনি বসেছেন প্রায় সামনের সারিতে, ভেবে রাখলাম, সেমিনারের প্রথমপর্ব শেষ হলে দেখা করব তাঁর সঙ্গে। যাই হোক, উদ্বোধনী দিনের বক্তাদের মূল্যবান সব বক্তব্যের পর অনুষ্ঠান আপাতত শেষ হলো। ভিড় ঠেলে কেতকী কুশারী ডাইসনের কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করলাম। শাড়ি পরা মিষ্টি মুখের এই নারীর মাঝে আমি কি তখন খুঁজছিলাম বহুকাল আগে দেখা তাঁর উপন্যাসের কভারে ছাপানো কেতকীর সেই মুখ! আদৌ কি তিনি বদলেছেন? কী করে জানবো, এই তো জীবনে প্রথম মুখোমুখি দেখলাম তাঁকে। বহুগুণে গুণান্বিতা তিনি, বহুবিধ বিদগ্ধতায় উজ্জ্বল একজন নারী। এই পরিচয়ের অহং তাঁকে কতটা অহংকারী করেছে জানি না। তবু সাহসের রেলগাড়িতে চড়ে বসলাম, দাঁড়ালাম গিয়ে তাঁর কাছাকাছি।
অনেকেই তখন গুণীজনের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যে অধীর। আর আমি খানিকটা দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়েই আছি, ভাবছি- কী বলবো তাঁকে? সামান্য সৌজন্য বিনিময়ের সুযোগ এলে বললাম, আমি আপনার বই পড়েছি, ভীষণ পছন্দ করি আপনার লেখা। হেসে বললেন– তাই, কী কী পড়েছ? একটু যেন ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেন আমার দিকে। কিন্তু কে একজন হাত ধরে টেনে পরিবর্তন করে দিলো কেতকী কুশারী ডাইসনের আগ্রহকে, দিদি দিদি, এদিকে তাকান! এখানে আসুন! আপনার, সঙ্গে ছবি তুলব… ইত্যাদি বলতে বলতে দখল নিল তাঁর চারপাশ। দেখলাম ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠলো বারবার। ব্যক্তিত্বের ঋজুতায় উজ্জ্বল তিনি অনেকের ভিড়ে মিশে গিয়েও হারিয়ে যান না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমি ফিরে যাই অন্যপথে। কারণ মাথার ভেতর তখন হাজারো আগ্রহ ভর করেছে। হাজারটা না-হোক অন্তত একটি ইচ্ছার তীব্রতা মনের মাঝে ক্রমশ সঘন হচ্ছে, কিছুটা সময় যদি কথা বলতে পেতাম…। সেই কবে থেকে জানি, তারপরও কত অজানা। যদি এই জানা-অজানা দূর হয়ে কিছু কথা বিনিময় করতে পেতাম তাঁর সঙ্গে!
দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে কেতকী কুশারী ডাইসন পাঠ করলেন তাঁর অন্যরকমের একটি রবীন্দ্র-গবেষণামূলক পেপার। যাতে কিনা তিনি জানালেন, ব্যক্তিগত জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চোখের দৃষ্টিতে কিছুটা বর্ণান্ধ অর্থাৎ কিনা কালার-ব্লাইন্ড ছিলেন। আর তারই প্রভাব কী করে তাঁর সাহিত্য ও আঁকা ছবিতে পড়েছে, তার উপর বিশ্লেষণ ও আলোচনা। এ বিষয়ে তাঁর একটি আটশো পৃষ্ঠার বিশাল গবেষণা বই রয়েছে রঙের রবীন্দ্রনাথ নামে। এই বইটি গড়তে কেতকী কুশারীকে সহযোগিতা করেছেন সুশোভন অধিকারী, অড্রিয়েন হিল ও রবার্ট ডাইসন। ১৯৯৭ সনে রঙের রবীন্দ্রনাথ বইটির জন্য তিনি দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। আর তাই ক্লেইমিং অ্যা কালচারাল আইকন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্বে তাঁর আলোচ্য প্রবন্ধের বিষয় ছিল এই বিষয়ের ওপর।
আমার বিবেচনায় শেষদিন অর্থাৎ কিনা ১৩ নভেম্বরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠের আসর। আটটি ভাষায় মোট কুড়িজন কবি ও আবৃত্তিকার এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার ডালি সাজিয়ে। উপস্থাপনায় ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার পন্ডিত টরন্টোর বিশিষ্ট বাঙালি ব্যক্তিত্ব কান্তি হোর। আবৃত্তি করা হলো স্প্যানিশ, ফরাসি, জার্মান, স্লোভানিয়ান, ইটালিয়ান, হিন্দী, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায়। আমরা অনেকেই অংশগ্রহণ করলাম এই কবিতা পাঠানুষ্ঠানে। ভীষণ ভালো লাগলো যখন দেখলাম এই আবৃত্তিপর্বে আমাদের সবার সঙ্গে রয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। এতক্ষণ তিনি একমনে শুনছিলেন সবার আবৃত্তি ও পাঠ, এবারে তাঁর পালা, সবশেষ পারফরমার তিনি। কেতকী কুশারী ডাইসন প্রাঞ্জল ভাষায় প্রথমে বাংলায় ও পরে ইংরেজিতে পাঠ করলেন কবিগুরুর অমর সেই কবিতা ১৪০০ সাল । উপস্থিত সকলে মুগ্ধ-বিস্ময়ে ঘোরলাগা আবেগে শুনলেন তাঁর আবৃত্তি। কবিতাটি আবারো নতুন করে সকলের মন ছুঁয়ে গেল। আবৃত্তির শুরুতে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে বর্তমানে প্রচলিত ইংরেজিতে অনুবাদ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, দেড়শ বছরের পুরনো রবীন্দ্রনাথকে আজকের প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর এটাই একমাত্র পথ, সমসাময়িক ধারার ইংরেজিতে অনুবাদ করা। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এবং কথায়।
অনুষ্ঠান শেষে কেতকী কুশারী ডাইসনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হলো। আজ তেমন ভিড়ভাট্টা নেই, নেই কোনো অযথা টানাটানি। কথা বলতে গিয়ে কোনকিছু না ভেবে তাঁর কাছে কিছুটা সময় দাবি করে বসলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে জানালেন, আর মাত্র দুদিন আছেন টরন্টোতে, তা থেকে একদিন দিতে পারেন। পুরো একদিন! প্রত্যাশার একটা পরিমাপ আছে, তা বলে এতটা! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আর কিছু নয়, তাঁকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ব এটাই স্থির করলাম মনে মনে। আমার ফোন নম্বর নিলেন, বললেন, রাতে ফোন করে জানাবেন আগামীকাল কোথা থেকে তাঁকে তুলতে হবে। ভাবছিলাম আদৌ কি তাঁর মনে থাকবে ফোন করে সময় ও ঠিকানা জানাতে? কিন্তু না, ঠিকই রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ফোন করে সবকিছু জানিয়ে দিলেন, নির্ধারণ করলেন সময়। বললাম, আপনাকে সময়মতো তুলে নেব, কোনো চিন্তা করবেন না। কেতকীদি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে তুলে নিয়ে কী করবে? বললাম, সে যখন তুলে নেব তখনই দেখবেন। টরন্টোতে আগে কখনো এসেছেন দিদি? –হ্যাঁ বেশ ক’বছর আগে, তখনও দেখা হয়নি তেমন কিছু, এবারও না। –বেশ তাহলে সারাদিন আপনার সঙ্গে থাকব, আপনার কথা শুনব, আপনার সঙ্গে ঘুরব, কথা বলব। উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াব যেদিক সেদিক, চলবে না? হেসে বললে্ খুব চলবে…। তিনি এই অজানা শহরে ততধিক অচেনা কারো আগ্রহকে নিভিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা বরং কিছুটা প্রশ্রয়েই দিলেন যেন। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হলো না। কখন না জানি সকাল বয়ে যায়! আবার নাকি দেরি করে ফেলি!
পরদিন ১৪ নভেম্বর চমৎকার দিন। উজ্জ্বল ঝকঝকে। রোদের মদিরা আর হেমন্তের সোনালি প্রকৃতির বোঝাপড়ায় আমাদের পথচলা হয়ে উঠল অনন্য অপূর্ব। আমার সঙ্গে আরো আছেন রোকসানা লেইস, নাসরীন খান রুমা। সকাল এগারোটায় হাইওয়ে ফোর-ও-ওয়ান ধরে ছুটলাম টরন্টোর ডাউন টাউনে, কেতকী কুশারী ডাইসনের টরন্টোর হোস্ট সাউথ ইন্ডিয়ান মিসেস বাসান্তার বাড়ির দিকে। সময় ও ট্রাফিক বাঁচাতে আমরা যখন হাইওয়ে ধরে ছুটছি তখন একবার কেতকীদির ফোন এলো, তাঁকে আশ্বস্ত করলাম, পথেই আছি, অল্প সময়ের মাঝেই পৌঁছে যাব বলে। মূলত এখান থেকেই শুরু হলো আমার কেতকীর সঙ্গে একদিন । আগের যা কিছু সবই উপক্রমণিকা বা ভূমিকা পর্ব।
মিসেস বাসান্তার বাড়ি থেকে কেতকী কুশারী ডাইসনকে তুলে নিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটল হারবারফ্রন্টের পাশ দিয়ে। হারবারফ্রন্ট এলাকাটি কানাডার বিখ্যাত লেক অন্টারিও-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এখানে এসে সময় কাটানো বা উপভোগ করার নানান ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া প্রায় সারা বছরই এখানে কোনো না কোনো উৎসব লেগেই আছে। তারই পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাদের অতিথি আনন্দিত মনে নানান প্রসঙ্গে কথা বলে চলছেন। কথায় কথায় জানালেন, মিসেস বাসান্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আইরেসে। ১৯৮৫-তে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে বইটির জন্যে মাল-মশলা রসদ জোগাড় করতে আর্জেন্টিনায় যান, মিসেস বাসান্তার প্রয়াত স্বামী মিঃ জগন্নাথন তখন আর্জেন্টিনার ভারতীয় দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা। সেসময় ওই ভিনদেশে বসে ভদ্রলোক কেতকী কুশারী ডাইসনকে অনেক সাহায্য সহযোগীতা করেছেন। সেকথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে বইটি যেমন বাংলা সাহিত্যে গবেষণা ও নভেলের সংমিশ্রণে রচিত একটি নতুন মাত্রার সৃষ্টি হিসাবে গণ্য, তেমনি এই বইটি রচনার প্রাক-কাহিনীও কম রোমাঞ্চকর নয়। সবকিছু নিয়ে এমন বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন যে, মনে হলো আজই প্রথম নয়, আমরা যেন তাঁর অনেককালের চেনা। বাংলাদেশের কয়েকজনকে কাছে পেয়ে ফিরে গেলেন স্মৃতির সুদূর পাড়ে। আমি তাঁর কথার মাঝে গুঁজে দিচ্ছিলাম ছোট ছোট প্রশ্ন। আর মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছিল উত্তরগুলো।
জন্মেছেন অবিভক্ত ভারতের কলকাতায়, যদিও আসল বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। কেতকী কুশারীর বাবার জন্ম ওখানেই। নিজেকে বাংলাদেশের মেয়ে বলে পরিচয় দিতে ও ভাবতে ভীষণ আনন্দবোধ করেন। কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান যখন ভাবতে হয় বাংলাদেশ আজ আর তাঁর দেশ নয়। আকুল হয়ে বলে ওঠেন- কেন এমন হবে বলতে পারো, রাজনীতির কুৎসিত খেলায় কেন আমরা টুকরো পরিচয় বহন করব, আমরা কি অখণ্ড বাংলাদেশের কেউ নই? আমরা এক ভাষা, এক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক অথচ দুই ভূখন্ডের… এ কেমন কথা বলো তো! কেতকীদির কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া কষ্টের অভিঘাত মনকে ছুঁয়ে যায়। আমরা তখন উডবাইন বিচের কাছাকাছি। টরন্টোর সম্পূর্ণ দক্ষিণদিক জুড়ে অন্টারিও লেকের জল টলমল করছে। দেখে সমুদ্রের চেয়ে কোনো অংশে কম বলে মনে হয় না। তারই উপকূলে গাড়ি রেখে জলের ধার ঘেষে হেঁটে হেঁটে কথা বলতে থাকি। কেতকীদিকে ভীষণ মুডে পেলাম। কথা যেন তাঁকে পেয়ে বসেছে। বলছিলেন জীবনের নানা কথা–পার্টিশনের বেদনা, অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি, অক্সফোর্ডে অভিজ্ঞতা, অনেক সুধীজনের ভালোবাসা অথবা বৈরীতার কথা, অনেক সংগ্রাম, অনেক যুদ্ধ ও অনেক জয়ের কথা। কণ্ঠের ওঠা-নামার সাথে আবেগের মিশ্র ঐকতান শ্রবণ ও মনকে আচ্ছন্ন করছিল বারবার। তাঁর নিজের কথা নিজের মুখে শোনার এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার প্রতিটি মুহূর্ত পরম আগ্রহে উপলব্ধি করতে চেয়েছি।
জন্ম ১৯৪০-এ, তাই সাত বছর বয়স অবধি অর্থাৎ কিনা পার্টিশনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে ঘুরেছেন বাবা-মার সঙ্গে। এখনো মনে করেন মেহেরপুর, নীলফামারী, কক্সবাজার কিংবা ফরিদপুরের স্মৃতি। বাবা অবনীমোহন কুশারী, মা অমিতা কুশারী। একভাই ও তিনবোনের সবচেয়ে বড় তিনি। ঢাকার নাম করা শিক্ষিত পরিবার ছিলেন কুশারীরা। কুশারী পদবীটি তিনশ বছরের পুরনো। কেতকী কুশারী ডাইসনের ঠাকুরদা একজন শিক্ষক ছিলেন, তাঁর পান্ডিত্যের জন্যে সকলে তাঁকে সেক্সপিয়ার কুশারী বলে ডাকতো।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৫৮-তে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়ে কেতকী কুশারী ওয়েস্ট বেঙ্গল স্কলারশিপ নিয়ে সেবছর বিলেত যান। ১৯৬৩-তে অক্সফোর্ড থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী ও প্রথম বাঙালি যিনি ১৯৭৫-এ অক্সফোর্ড থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানেই বিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম এবং পরিণয়; কলকাতায় এসে বিয়ে করলেন তারা। তারপর বিলেতে ফিরে গেলেন সংসার করতে, সেটা ১৯৬৪ সালের কথা। বাস্তবিক অর্থে সেখান থেকেই শুরু হলো তাঁর প্রকৃত প্রবাস জীবন। দুইপুত্র সন্তান, ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগর নীলাদ্রি ডাইসন। থাকেন লন্ডন থেকে দূরে অক্সফোর্ডের কিড্লিংটন শহরে। ভীষণ ব্যস্ত জীবনযাপন করেন শুধুমাত্র লেখালেখির কারণে। তারই মাঝে সময় দেন হাজারো রকমের মানুষজনকে। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতে লেখেন বলে দায়িত্বটা তাঁকে একটু বেশিই নিতে হয় বৈকি। তাছাড়া যে কোনো কাজ তিনি ডিটেইলে করতে পছন্দ করেন। তাই তাঁর কৌতুহলী মন ও কলম দু-ই সমান পরিশ্রমী। এ পর্যন্ত কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটক ও গবেষণা-আলোচনা মিলিয়ে অসংখ্য গ্রন্থের জন্ম দিয়েছেন। বিলেত ও পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, দুবার ল্লাভ করেছেন আনন্দ পুরস্কার।
পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করার পরও কেন তিনি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলেন না, সেপ্রসঙ্গ উঠতে জানালেন, অধ্যাপনার পেশায় তিনি অনিয়মের শিকার হয়েছেন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন দ্বারা। খোদ বিলেতের মতো জায়গাতেও একজন ভিন্নবর্ণ ও নারী হবার কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন দুঃখজনকভাবে। অথচ তিনি মেধা ও যোগ্যতায় অনেকের চাইতেই অগ্রণী ছিলেন। তাই এই পেশা থেকে দূরে সরে লেখালেখিকে আরাধ্য বিষয় হিসাবে বেছে নেন। হাসতে হাসতে বললেন, হয়তো অধ্যাপক হলে ভালো লেখক নাও হতে পারতাম। একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি তখন হয়তো গ্রাস করে নিতো শৈল্পিক আবেগকে।
দুপুর গড়িয়ে গেছে। উডবাইন বিচ থেকে সোজা চলে গেলাম একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। চীনা খাবার কেতকীদির ভীষণ পছন্দের। সেখানে বসে গল্প হলো হাজারো রকমের। বারবার প্রশংসা করছিলেন খাবারের স্বাদের ও আজকের এই অপ্রত্যাশিত দিনটির। খুব ভালো লাগছিল তাঁর অনুপম সান্নিধ্য। এত ঘরোয়া আর আপন লাগছিল যে, ভুলে গেছি ব্যবধান। সেখানে বসেও কথা হলো বিস্তর- পশ্চিম ও পুবের সাহিত্য, ছবি, মানুষ ও জীবন নিয়ে। এত বড় সাহিত্যক, কিন্তু এতটুকু দ্বিধা লাগছে না কোনো কথা জানতে বা জানাতে। নানা প্রসঙ্গ ঘুরে সালমান রুশদির দ্য স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে কথা উঠলে জানালেন– তিনি তাঁর মুক্তমন ও বুদ্ধিবৃত্তিক শোভনতা দিয়েও বইটিকে সমর্থন করতে পারেননি। তিনি তো এবিষয়ে সরাসরি তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেনও, সামগ্রিক বিচারে বইটিকে তাঁর মহৎ সাহিত্যকীর্তি বলে মনে হয়নি। কারো ধর্মবিশ্বাসকে নগ্নভাবে আঘাত করে মুম্বাইয়ের ব্লকবাস্টার সিনেমার মতো তাৎক্ষণিক চটক ও পয়সা কামানো যায় হয়তো, কিন্তু লেখার স্বাধীনতা দাবি করার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও নিতে হয়। কেতকী কুশারী ডাইসন মনে করেন সালমান রুশদির ত্রুটি সেখানেই। কী ভীষণ সত্য ও দৃঢ় মন্তব্য। নারীদের বিষয়ে তাঁর যেসব লেখা আছে, তা নিয়ে আলোচনা হলো বেশ কিছুক্ষণ। নারীদের অধিকার ও জীবন নিয়ে লেখা তাঁর সহসী প্রবন্ধগুলো কীভাবে বাঙালি ভদ্রলোকেরা নিয়েছেন তার নানা গল্প শোনালেন। খুব মজার একটি ছড়া বললেন যা কিনা কেতকী কুশারী ডাইসনকে নিয়ে সেসময় কলকাতায় চালু ছিল-
গদ্যে পদ্যে ধোপদুরস্ত
কেতকী কুশারী ডাইসন
ফেমিনিস্ট তিনি জবরদস্ত
ত্রস্ত পুরুষ বাইসন..
এ ধরণের পদ্য-পরিহাস তাঁকে এতটুকু টলাতে পারেনি, সেদিনও না আজো না। তাঁর কাছে লেখক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো সোসাল রিয়েলিটি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা। জীবনের পদে পদে তিনি সম্মুখীন হয়েছেন নানান সূক্ষ্ম অথবা মুর্খ সমালোচনার। একজন প্রগতিশীল নারী লেখককে তাঁর আধুনিকা ও বৈদগ্ধতার জন্যে যতটা যুদ্ধ করতে হয়, তাঁকেও তা পুরোপুরি করতে হয়েছে। এমনকী এখন পর্যন্ত তা-ই করে চলছেন। এসব গায়ে-পড়া তর্কের উত্তর দিতেই তো অনর্থক খরচ হলো কত মূল্যবান সময়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এসব তর্ক-বিতর্কের উত্তর না দিলেও নয়। অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়তার সাথে বললেন– কর্মে, কৌতুহলে, জ্ঞান অন্বেষণের আগ্রহে নারীর মধ্যেও যে বৈচিত্র্য ও বিশিষ্টতা থাকতে পারে তা যেন অনেকেই স্বীকার করতে চান না। তাই মেয়েদের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের তুলনায় এই যুদ্ধটা অনেক বেশিই করতে হয়।
জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এতগুলো পরিচয়ের মাঝে কোন পরিচয়টি আপনার নিজের কাছে প্রিয়? কোনোরকম চিন্তা-ভাবনার সময় না নিয়ে বলেলেন– আমার কবি পরিচয়। আবারো কবিতা প্রসঙ্গ এলে, এতবড় সাহিত্যিকের মুখেও শুনলাম কবিতার বই প্রকাশ করার প্রতি প্রকাশকদের অনীহার কথা। সকলে তাঁর কাছে গদ্যের পান্ডুলিপি চান। তাহলে কি কবিতার পাঠক ক্রমশ কমে যাচ্ছে? কবিতাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে প্রকাশনা শিল্পের যে একটি বিশাল ও মুখ্য ভূমিকা রয়েছে, তা কি এখন বিলুপ্তির পথে? একঝাঁক প্রশ্ন ও চাপা কষ্টের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম তাঁর কণ্ঠে। তিনি স্পষ্টতই মনে করেন, কবিতাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা প্রকাশকই রাখতে পারেন। কিন্তু আজকে সে দায়িত্বেও বিশাল উদাসীনতা।
আবারো প্রশ্নন: এখানে এসে কেমন লাগছে? খুব আন্তরিক কণ্ঠে জানালেন- এমনিতে তো ভীষণ ভালো লাগছে, বিশেষ করে আজকের এই ঘুরে বেড়ানো খুব ভালো লাগছে, কিন্তু জানো তো দুবার কানাডায় এলাম, একবারও আমার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা হলো না। তাই একটু আফসোস রয়েই যাচ্ছে। আবারো এলে এই আফসোস আর থাকবে না বলেই আশ্বাস দিলাম। অনুরোধ করলাম বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য কিছু বলতে। কেতকী কুশারী ডাইসন বাংলাদেশের পাঠকদের প্রশংসা করে বললেন- তাঁরা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুজায়গার লেখকদের লেখাই পাঠ করে থাকেন। তাই তাঁদের কাছে সমগ্র বাঙলা সাহিত্য সম্পর্কে একটি সার্বিক ধারণা রয়েছে। এক্ষেত্রে পশ্চিম বঙ্গের পাঠকদের একধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওরা অনেকেই বর্তমান বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো লেখক কবিদের নামও জানে না, সেখানে তোমরা দুবাংলার প্রায় সবাইকে চেনো জানো এবং তা বেশ ভালোভাবেই। তিনি অনুরোধ করলেন- আমি তো নানা রকমের কাজ করি, সে সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষকে জানাতে চাই, তাঁরা যেন আমার লেখা পড়েন।
কথা তো ফুরাতে চায় না, তবে সময় ফুরিয়ে যায়। এবার তাঁর ফেরার পালা। আগামীকালই ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। সন্ধ্যা হতে আর বাকি নেই, একটি দুটি করে আলো জ্বলতে শুরু করেছে এই বিশাল নগরীতে। আমরা ফিরে যাচ্ছি তাঁকে পৌঁছে দিতে। বারবার তিনি তাঁর প্রাণ থেকে কিছু উপদেশ ও পরামর্শ দিলেন। বললেন, লিখে যাও, যতটা পারো নিজের কাজ করে যাও। আমাদের কাজ শুধু সৃষ্টি করে যাওয়া। স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে কাজ করে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ আমার জানা নেই। তোমাদেরকেও তা-ই বলছি।
গন্তব্যে নেমে যাবার সময় জড়িয়ে ধরলেন বুকে। সেই কবে তাঁর লেখা পড়ে তাঁকে ভালোবেসেছি, শ্রদ্ধা করেছি। আজ তাঁর অন্তরঙ্গ উষ্ণতাকে খানিকটা স্বপ্নের মতো মনে হলো। মনে হলো অলীক কোনো অনুভব। এত বিশাল মাপের ব্যক্তিত্বের আলিঙ্গনে নিজেকে আর খুঁজে পাই না যেন।
কেতকী কুশারী ডাইসনকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতে আসতে কারো মুখে কোনো কথা নেই–শুধু কেতকী ছাড়া। কিছুক্ষণ বসে রইলাম হারবারফ্রন্টের জলের ধারে, উদার আকাশের নিচে। হয়তো সারাদিন একধরনের বিশালতার মাঝে কাটিয়ে সহসাই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না গৃহের সীমাবদ্ধতায়। দেখছিলাম টলমল জলের বুকে কী করে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যার আলো-ছবি। আর এই মুহূর্তের মৃদু গুঞ্জরণে যা কিছু কথা তার পুরোটাই জুড়ে একজন সৃষ্টিশীল সফল নারীর উপস্থিতি। রাত্রির নীরবতা ভেঙে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সেইসব কথকতার দ্যোতনা জলে স্থলে নভোতলে বনে উপবনে…।
ফেরদৌস নাহার

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগীত রচয়িতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং কানাডা থেকে কম্পিউটার ট্রেনিংপ্রাপ্ত এই বোহেমিয়ান ও চিরতরুণ কবি বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাস করছেন। বইপড়া, ভ্রমণ (যাকে তিনি ‘ঘুরণ’ বলেন) এবং কফিশপে ধোঁয়া ও ঘ্রাণে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ১৭টি কাব্যগ্রন্থ, ৩টি প্রবন্ধের বই এবং বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত ৪০টিরও বেশি যৌথ সংকলন, যার বেশ কিছু কাজ ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি প্রখ্যাত ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর বহু জনপ্রিয় গানের রচয়িতা হিসেবে তিনি বিশেষভাবে খ্যাত এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছবি আঁকা ও ব্লগিংয়ের কাজও করে থাকেন। শিল্প ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার ২০২২’ এবং ‘অনুপ্রাণন সম্মাননা ২০২২’-এ ভূষিত হন।
