ফেরদৌস নাহারের কবিতা: নদী, অখণ্ড রক্ত-স্রোতধারা

নদীবন্দনা
আমি পুবদেশের, দুহাতে বাজাই নদীদের করতালি
যেতে যেতে চিরদিন গড়িয়ে পড়ি তাহাদের বুকে

পদ্মা

একটা তল্লাট উড়ানো ঝড়, প্রকৃতির নামে
ভাড়াটে কেউ এখানেই লুকিয়েছে, তার গন্ধ এখন
পদ্মার জোয়ার ভাটায় ভেসে যাচ্ছে মরণ মরণ চিৎকারে
উড়ছে চৌচির বিশুষ্ক বালুচর, সবকিছু কাঁপিয়ে ধেয়ে আসছে
জল কই! পড়ে আছে রাশি রাশি বালু নয় বিষের তোড়া
ইলিশেরা ফিরে গেছে অন্য নদীর জলে, অন্যকোনো দেশে

 

মেঘনা

মুঠো খুলে রাখো। অচেনা সব অন্ধকার একত্রে ভেসে আসে
সবকিছু অজানা প্রবাদে হাসাহাসি, অজানা জীবন খেলা
মেঘনার মেঘদল বাজাচ্ছে সাইরেন, বুক ভরা বৃষ্টিগুচ্ছ
প্রাচীন সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠা বাতিঘর, বিজন রোদের তাপে
গলে যাওয়া প্রশান্ত প্রহর। একটানা এঁকে দেয় দীর্ঘ ছাপ
তারও চেয়ে আরও ঘোর ঢেউয়ের স্বভাব

 

কীর্তনখোলা

একদিন ছিলাম খুব কীর্তনখোলার দেশে, এলেবেলে জীবন্ত
পঞ্চরং সন্ধ্যার অতৃপ্ত ব্যঞ্জন মেখে মুখে তুলে দিয়েছিলে
বলেছিলে, খাও, খেয়ে নাও খুব স্বাদ, ভুলবে না কখনও!
সমুদ্র সঙ্গমে ধায় আত্মার ঝুটি ধরে নেমে আসে খুনেরা প্রবাদ
তামাম আয়ুর শেষে ধানসিঁড়ি ভেসে যায় জীবনবাবুর টানে
দেখো, প্রথম যৌবনের রূপকথা জাহাজের হুইসিল বাজায়

 

গড়াই

কত রাত তোমাকে স্বপ্ন দেখেছে কোনো এক অন্ধ বালক
পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি লোকালয় থেকে একা হেঁটে হেঁটে
তোমারই কাছে যায়। নুয়ে আসে খুব কাছে, চুপিচুপি বলে—
জানো তো গড়াই-কালে নদী-ভাঙে নদী-গড়ে, তবু
চর জেগে জানিয়ে যায়, আবারো কাঁপছে সে ভালোবাসায়!
অন্ধ ছেলেটার দুহাত ধরে সে এখন তোমাকেই চায়

 

সুরমা

সুরমার কালি দিয়ে অমৃত পদাবলী লিখা হলো
যাবতীয় আয়োজন মর্মরে লিখে রাখে ইবনে বতুতার রেহলা
দুচোখ জুড়ে সমবেত শামা নাচ, জালালি কবুতর ওড়াউড়ি
বিপুল মুগ্ধতা হানা দেয় চোখে, যারা আসে সমবেত সঙ্গীত গেয়ে
তারাও চড়ে বসে ভাসানো জায়নামাজের মখমল জমিনে
নদীর ঢেউগুলো ম্যাজিক-ঘোরে আকাশের তারা হয়ে যায়

 

ফেরদৌস নাহার

ফেরদৌস নাহারের জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে। নেশা, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো ও বইপড়া।

ফেরদৌস নাহার বাংলা ভাষার একজন শক্তিমান কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগীত রচয়িতা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা: ১৫টি কবিতা ও ৩টি প্রবন্ধের বই। তাঁর কবিতার  ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে একটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে অসংখ্য যৌথ কবিতা সংকলন। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের দল ‘মাইলস’-এর অনেকগুলো জনপ্রিয় গানের রচয়িতা তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও কানাডা থেকে কম্পিউটার ট্রেনিং প্রোগ্রাম কোর্স করেছেন তিনি। কবিতার পাশাপাশি ছবি আঁকেন, গান লেখেন, ব্লগিং করেন, কফিশপে ধোঁয়া আর ঘ্রাণে আড্ডার ঝড় তোলেন। কিন্তু সবকিছুর উপরে এক বিশ্ব বোহেময়ান কবি আর চির তারুণ্যের নাম ফেরদৌস নাহার। মন চাইলে বেরিয়ে যান। ঘুরে বেড়ান খেয়াল-খুশি মতো, যাকে তিনি ‘ঘুরণ’ বলেন। ভালোবাসেন প্রকৃতি ও মানুষ। পথের নেশা তাকে করেছে ঘরছাড়া, ঘুরতে ঘুরতে এখন আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে, কানাডায়। সেখানে জীবন যাপনের পাশাপাশি জীবন উৎযাপন করেন কবিতা এবং লেখালিখির খরস্রোতা নদীতে বৈঠা বেয়ে। ইমেইল : [email protected]

Facebook Comments

2 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।