দুই ভাষার মাঝখানে যে সেতুটি রয়ে গেল: কেতকী কুশারী ডাইসনকে স্মরণ

আবদুর রব

কেতকী কুশারী ডাইসন চলে গেলেন। ৮৬ বছরের একটি জীবন থেমে গেল, কিন্তু সেই জীবনের কাজকে একটি পরিচয়ে ধরা কঠিন। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক, সর্বপরী বাংলা ও ইংরেজি এই দুই ভাষা ও দুই সাংস্কৃতিক ভূগোলের মধ্যে নিরন্তর যাতায়াতকারী একজন লেখক। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একজন সাহিত্যিককে হারাল না বাংলা; হারাল এমন একজন সেতুনির্মাতাকে, যিনি দূরে থেকেও বাংলা ভাষাকে কখনো প্রবাসী হতে দেননি।

তাঁর নিজের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় তিনি ১৯৪০ সালের ২৬ জুন কলকাতার ল্যান্সডাউন রোডের রামকৃষ্ণ মিশনের একটি মাতৃসদনে তাঁর জন্ম। কিন্তু তাঁর একেবারে প্রথম শৈশবস্মৃতির ভূগোল আজকের বাংলাদেশের মেহেরপুর। বাবার চাকরিসূত্রে তাদের পরিবার তখন সেখানে থাকত। ফলে জন্ম কলকাতায় হলেও তাঁর স্মৃতির একেবারে গোড়ায় রয়ে গেছে মেহেরপুর, ভৈরব, নদিয়া, কুষ্টিয়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গার মতো নাম। দেশভাগের পর সেই ভূগোলই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া আদি ভূখণ্ডের অংশ।

আরও আশ্চর্যের বিষয়—তাঁর লেখকজীবনের সূচনাটিও যেন বাংলার মাটির সঙ্গে জড়িয়ে। ১৯৪২ সালের শেষ দিকে মেহেরপুরের সরকারি বাংলোর বারান্দায় একটি বড় কাঠের চৌকিতে বসে ছোট্ট কেতকীর সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’। তিনি পরে লিখেছেন, বাংলা পড়তে না-পারা কোনো সময়ের স্মৃতিই তাঁর নেই। চাঁদের আলোয় সেই বারান্দায় মায়ের কণ্ঠে শুনেছেন তাঁর প্রথম রবীন্দ্রসংগীত। তাঁর নিজেরই ভাষ্যমতে লেখক হিসেবে তাঁর জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ওই বারান্দাতেই।

এই তথ্যটি কেতকী কুশারী ডাইসনকে বুঝতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহু দশক পরে অক্সফোর্ডের কাছাকাছি বসবাসকারী যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে ইংরেজিভাষী পাঠকের কাছে তুলে ধরবেন, তাঁর রবীন্দ্রপাঠ শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের মেহেরপুরে একটি কাঠের চৌকিতে বসে।

কলকাতায় ফিরে তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশটিও ছিল সাহিত্যঘন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি কলেজ পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বাবা বুদ্ধদেব বসুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় থেকেই চিনতেন। কলকাতায় তাঁদের বাড়ি ছিল বুদ্ধদেব বসুর ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাড়ি এবং তাঁর সম্পাদিত কবিতা পত্রিকার কার্যালয়ের কাছেই। ফলে বুদ্ধদেব বসু তাঁর কাছে শুধু পাঠ্যবইয়ের কোনো সাহিত্যিক ছিলেন না; তাঁর পরিবারের সঙ্গে কেতকীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিল।

রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসু—এই দুই বিশাল মাপের সাহিত্যিক উপস্থিতি তাঁর সৃষ্টিশীল মানস তৈরিতে গভীর ভূমিকা রাখে। কিন্তু কেতকী তাঁদের অনুগামী হয়ে থেমে থাকেননি। বরং অনুবাদ, গবেষণা ও সমালোচনার মাধ্যমে তাঁদের নতুন পাঠকের সামনে নতুন প্রশ্নসহ হাজির করেছেন।

১৯৬০ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে যান। পরে সেখান থেকেই ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ১৭৬৫ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী ব্রিটিশ নারী-পুরুষদের জার্নাল ও স্মৃতিকথা—যা পরে A Various Universe নামে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থে রূপ নেয়। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক ভারতকে তিনি কেবল শাসিত মানুষের ইতিহাস দিয়ে নয়, শাসকের ব্যক্তিগত ডায়েরি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েও পড়েছিলেন।

বিয়ের পর ব্রিটেনে স্থায়ী হয়েছিলেন। এই জায়গাতেই কেতকীর সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইংরেজি তাঁর শিক্ষা ও গবেষণার প্রধান ভাষা হয়ে উঠলেও তিনি বাংলা ছেড়ে দেননি। বরং বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। তাঁর ব্রিটিশ প্রকাশক Bloodaxe Books তাঁকে সেই বিরল কবিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করে, যাঁরা দুটি ভাষাতেই কবিতা রচনা করেছেন। দুই ভাষায় মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ত্রিশেরও বেশি।

তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ ইংল্যান্ডে বাঙালি অভিবাসী জীবনের সম্পর্ক, একাকিত্ব, সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন ও নতুন পরিচয় নির্মাণকে সাহিত্যে নিয়ে আসে। আজ ‘ডায়াস্পোরা সাহিত্য’ একটি পরিচিত পরিভাষা। কেতকী যখন এই অভিজ্ঞতাগুলোকে বাংলায় কথাসাহিত্যের বিষয় করছেন, তখন সেই পথ এতটা প্রশস্ত ছিল না।

কেতকীর আরেক পরিচয় তিনি অনুবাদক। তাঁর রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ I Won’t Let You Go প্রকাশ করে Bloodaxe Books। বইটি ব্রিটেনের Poetry Book Society-এর Recommended Translation নির্বাচিত হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁর রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিতে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুধু বাঙালি পরিমণ্ডলেই প্রশংসিত হয়নি; ইংরেজি কবিতার পাঠকসমাজেও স্বীকৃতি পেয়েছিল।

তিনি বুদ্ধদেব বসুর কবিতাও ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ফিনিশ অনুবাদক হান্নেলে পোহিয়ানমিয়েস কেতকীর সেই ইংরেজি অনুবাদ পড়ে বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় এতটাই আলোড়িত হয়েছিলেন যে সেগুলো ফিনিশ ভাষায় অনুবাদ করেন। সেই বইটি হয়ে ওঠে ফিনল্যান্ডে বুদ্ধদেব বসুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ এবং আধুনিক ভারতীয় কবিতারও প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংকলনগুলোরও একটি। অর্থাৎ বাংলা থেকে কেতকীর ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছে যায় ফিনিশ ভাষায়।
রবীন্দ্রনাথের রং দেখার ক্ষমতা নিয়ে তাঁর গবেষণাটি ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ । তিনি, সুশোভন অধিকারী এবং অন্য গবেষকেরা মিলে রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির বিশেষত্ব—বিশেষত protanopic colour vision বা লাল রঙের নির্দিষ্ট শেড শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা—তাঁর চিত্রকলা ও লেখায় রঙের ব্যবহারে কী প্রভাব ফেলেছিল, তা অনুসন্ধান করেন। এর ফল ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। সাহিত্য, চিত্রকলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বর্ণদৃষ্টি চারটি ক্ষেত্রকে একই আলোচনায় এনে রবীন্দ্রনাথকে দেখার প্রয়াস পেয়েছিলেন যা বাংলা গবেষণায় একেবারেই স্বতন্ত্র। বইটির জন্য ১৯৯৭ সালে কেতকী ও সুশোভন অধিকারী আনন্দ পুরস্কার পান।

রবীন্দ্রনাথ ও আর্জেন্টিনার লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়েও তাঁর গবেষণা ছিল পথপ্রদর্শক। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি স্প্যানিশ পর্যন্ত শিখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একাধিক ভাষা জানলে শুধু যোগাযোগ নয়, চিন্তার পরিসরও বাড়ে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যত ভাষা জানা যাবে, সাহিত্য ও চিন্তার “খেলা” ততই সমৃদ্ধ হবে।

‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’-র জন্য ১৯৮৬ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার পান। একই বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ভুবনমোহিনী দাসী পদক দেয়। ১৯৯৭ সালে রঙের রবীন্দ্রনাথ-এর জন্য আসে দ্বিতীয় আনন্দ পুরস্কার। ২০০৯ সালে সাহিত্যে ‘Best Bengali of the Year’ সম্মান এবং ২০১৬ সালে তিনি হন প্রথম বুদ্ধদেব বসু স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপক; তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ। ২০২৩ সালেও তিনি ভাষানগরের আজীবন সম্মাননা ও বিদ্যাসাগর-দীনময়ী পুরস্কার পেয়েছেন।

কেতকীর সাহিত্যজীবনের দিকে তাকালে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে—তিনি সহজে কোনো খোপে ঢুকতে চাননি। কবিতা লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, নাটক লিখেছেন; নারীর জীবন, অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ, রাজনীতি, খাবার, ভাষা—সবই তাঁর লেখার বিষয় হয়েছে। গবেষণার পাশে সৃজনশীল লেখা, আর সৃজনশীলতার পাশে কঠোর তথ্যনির্ভর অনুসন্ধান—দুটিকে তিনি আলাদা পৃথিবী মনে করেননি। এ কারণেই তাঁর চলে যাওয়া শুধু একজন লেখকের মৃত্যু নয়।

একদিকে মেহেরপুরের বারান্দায় রবীন্দ্রনাথের শিশু হাতে একটি বালিকা; অন্যদিকে অক্সফোর্ডের গবেষক, যিনি ঔপনিবেশিক ইতিহাস খুঁজছেন পুরোনো ডায়েরিতে। একদিকে বাংলা কবি, অন্যদিকে ইংরেজি কবি। একদিকে প্রবাসী বাঙালির নিঃসঙ্গতার ঔপন্যাসিক, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের রঙের অনুভূতি অনুসন্ধান করছেন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। আবার তিনিই বাংলা কবিতাকে ইংরেজিতে নিয়ে গিয়ে এমন একটি পথ খুলছেন, যে পথ ধরে সেই কবিতা পৌঁছে যাচ্ছে আরও একটি ইউরোপীয় ভাষায়। এই বহুমুখিতাই কেতকী কুশারী ডাইসনের প্রকৃত পরিচয়।
তিনি প্রবাসে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাংলা প্রবাসে ছিল না। তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন, কিন্তু ইংরেজি তাঁকে বাংলা থেকে সরিয়ে দেয়নি। বরং দুটি ভাষার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি দেখিয়েছেন—একটি ভাষাকে ভালোবাসতে অন্য ভাষাকে অস্বীকার করতে হয় না; একাধিক সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করেও নিজের শিকড় অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।

আজ তাঁর শারীরিক যাত্রা শেষ হলো। কিন্তু মেহেরপুরের সেই কাঠের চৌকি থেকে অক্সফোর্ড পর্যন্ত যে দীর্ঘ বৌদ্ধিক পথ তিনি তৈরি করে গেলেন, সেখানে অসংখ্য চিন্তার দরজা এখনও খোলা।

কেতকী কুশারী ডাইসন চলে গেলেন। রয়ে গেল তাঁর কবিতা, তাঁর উপন্যাস, তাঁর অনুবাদ, তাঁর প্রশ্ন—এবং দুই ভাষার মধ্যে নির্মিত সেই দীর্ঘ সেতু।

 

আবদুর রব

কবি, অনুবাদক, অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদক ও অর্থনীতিবিদ। জন্ম ৩০ জুন ১৯৬১ সালে। পৈত্রিক নিবাস যশোর। বর্তমান বসবাস ঢাকায়। একটি আন্তর্জাতিক কন্সাল্ট্যান্সি ফার্মে কর্মরত। ৩৫টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

শৈশব থেকে লেখালেখির শুরু। এ পর্যন্ত দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্ণ প্রাণ যাবো’। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ: কে ঘুমায় কে জাগে (১৯৯৪); রূপান্তরের গান (২০০৩); আপেলসূত্র (২০১৪), বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় (২০২০), নুড়ি পাথরের ছায়া (২০২৩) ও নির্বাচিত কবিতা (২০২৪)। এছাড়া ছোটদের জন্য চীনা গল্পের তিনটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে। এগুলো প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অনুবাদ কবিতার বই ‘বৃষ্টির ভেতর এক গলিপথ’। বেশকিছু ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন তিনি। 

Facebook Comments

One comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top