হেমন্ত


মীজান রহমান

আকাশভরা এত নীল অনেকদিন দেখিনি। ইচ্ছে হচ্ছিল আকাশকে বলি, একমুঠো নীল ধার দেবে তুমি? মন চাইছে গায়ে মাখি। গাড়ি চালাচ্ছিলাম, নইলে হয়তো সত্যি সত্যি সব কাজ ফেলে বসে বসে দু’ছত্র পদ্য লিখে ছেড়ে দিতাম ডাকে, ঠিকানা ছাড়াই। এমন পাগলামিতেও আমাকে ধরে বটে মাঝে মাঝে।

অক্টোবর আমার প্রিয় মাস ক্যানাডাতে। সেই প্রথম থেকেই। পাকা আটচল্লিশ বছর আগে, ফ্রেডারিকটন নামক পাখির শাবকের মতো এক ছোট্ট ঘুমঘুম শহরে, যখন অক্টোবরের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার। তখন আমার গাড়ি ছিল না। একদিন সকালবেলা বইপত্র হাতে ক্লাসে যাব বলে রাস্তায় বেরুচ্ছি এমন সময় একঝাঁক ঝরা পাতা আমার পিছু নিল। কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়বে না। তাদের সঙ্গে একপ্রকার হিমহিম মিষ্টি বাতাস ঘুরে ঘুরে, উড়ে উড়ে, ছুটল আমার সাথে। ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস আমার বাসা থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথ। হাঁটছি বলে মনে হয়নি, মনে হচ্ছিল ভাসছি। বিপুল এক বায়ুতাড়িত তরঙ্গ আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। তখন থেকেই অক্টোবরের প্রেমে পড়া আমার।

কে জানে কি আছে ক্যানাডার হেমন্তে, কি সেই মায়ার ছোঁয়া, যা প্রাণমন একেবারে অবশ করে দেয়। সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গতেই শিশিরের শব্দ শুনতে পাই জানালায়। ঊষার আকাশে অন্তহীন রহস্য। দু’চারটে উড়ো মেঘ তাকে যেন আরো গাঢ় করে তোলে। ছায়াছবিতে দেখা সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যার নির্জনতায় ‘লেফটেনান্টের স্ত্রী’র ঘোমটাপরা মুখটির মতো। অক্টোবরকে ঠিক তাই মনে হয় আমার—যেন কোনো পরকীয়া প্রেমের দুঃসাহসী অভিসার।

ছোটবেলায় দেখতাম অঘ্রানের মাঝামাঝিতে ফসলতোলার আনন্দমদিরাতে ভুরভুর করছে গ্রামবাংলার হৈমন্তী বাতাস। গোলাভরা ধান, উঠোনভরা সোনালি পাট স্তূপ স্তূপ করে সাজানো, কৃষকের ঘরে আনন্দের জোয়ার। মেয়েরা লজ্জার বাঁধ ভেঙ্গে খল খল করে হাসত, গাইত, সাজত। হিন্দুপাড়ায় ছেলেরা যাত্রা করত, গানের আসর বসাত। সেখানে মেয়েরা আলতাপরা পায়ে ঘুঙ্ঘুর বেঁধে নাচত, গা দুলিয়ে, গ্রীবা বাঁকিয়ে, চোখ নাচিয়ে, আনন্দে আনন্দে উত্তাল হয়ে। ক্যানাডায় তা হয়না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। এরা থ্যাঙ্কসগিভিং করে, জানি। টার্কি খায়, আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে হৈহুল্লোড় করে, কৃতজ্ঞতাভরে প্রণতি জ্ঞাপন করে তাদের শস্যদায়ী মহাপ্রভুর কাছে। কিন্তু তারা বাংলাদেশের গরিব কৃষকদের মতো নাচের ছন্দে আর গানের মাতনে মেতে ওঠে না, আনন্দবারিধারাতে করে না অবগাহন।

সেই অভাবটি যেন পূরণ করে দেয় প্রকৃতি। ক্যানাডার হেমন্তে প্রকৃতি নিজেই সাজগোজ করে, রূপের বাহার তুলে পাগল করে দেয় মানুষকে, বিগত প্রেমের বেদনাতে আকুল করে তোলে মানুষের দেহমন। মেঘমুক্ত দিন পেলে আমি একাই বেরিয়ে যাই গাড়ি নয়। কোথায় যাব জানিনা। গাড়ি নিজেই আমাকে নিয়ে যায় ঠিক জায়গাটিতে। পুরনো গাড়ি আমার মনের খবর জানে। কখনো ডাউ লেকের ধারে। যেখানে হ্রদের জলে পাতারা ভেসে ভেসে কোথায় যায় জানিনা। যেখানে কাঠবেড়ালিরা আসর জমায় গাছে ছায়ায়, কীটপতঙ্গেরা ছুটোছুটি করে কিসের আনন্দে কে বলবে। সেখানে গাছে গাছে রঙের আগুন জ্বলে অক্টোবরের রোদেলা দিনে। সেখানে ছেলেদের নিয়ে মাছ ধরতে যেতাম একসময়, আর তাদের মা পাশের বেঞ্চিতে বসে টমাস হার্ডির বই পড়ত—কেন যে সে এত পছন্দ করত এই লেখকটিকে।

কখনো যাই বড়লোকের পাড়া রক্লিফে। প্রকাণ্ড সব প্রাচীন বাড়ি গাছে গাছে ঢাকা। হঠাৎ হঠাৎ সাঁকোর মতো কি যেন কি চমকে দেয় পথচারীকে। একটা মাঝারি আকারের খাল আছে সেখানে, যাতে বাংলাদেশের শাপলার মতো ফুল ফোটে মরশুম এলে। খালের ধারে কাঁচা রাস্তা, কিম্বা একবারেই রাস্তা নেই—লতায় পাতায় ছেয়ে গেছে সব। সেখানে পাখিরা অনর্গল কিচির মিচির করে যাচ্ছে, খরগোশেরা ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে তাদের প্রেমিকাদের, ঘুঘুরা ডালে বসে কাঁদছে গুমরে গুমরে। তারপর বিকেল হলে লম্বা ছায়া পড়ে সেই খালের ওপর। গাছের ছায়া, আকাশের ছায়া, প্রাচীন প্রেমের ছায়া, সব ছায়াতে মিলে একাকার হয়ে যায়। সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। গাছ তখন ঝুঁকে পড়ে জলের ওপর নিজের ছায়া দেখার জন্যে। নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়। সেখানে আমিও আমার মুখ দেখি, ছায়া দেখি। দেখি আমার স্মৃতিকে, আমার সমস্ত হৃদয় অর্পিত হয় তার পাদমূলে। তার অশেষ কাজলতা বর্ষিত হয় আমার কল্পনাতে, আমার আত্মায়।

কোনও স্বচ্ছ জলাশয়ে নিজের প্রতিকৃতি দেখামাত্র আমার মনে পড়ে যায় বহুদিন আগে পড়া এক অসাধারণ ছোটগল্পের কথা। দুঃখের বিষয় গল্পটির নাম, এমনকি লেখকের নামটিও এখন আর মনে করতে পারছিনা। ওতে এক মাতাল চরিত্রের অদ্ভূত কাণ্ডের কথা লেখা ছিল। মাতালটি তার এক বন্ধুর সাথে জোছনারাতে নৌকাবিহারে বেরিয়েছিল এক হ্রদের ওপর। সেখানে সে দেখতে পেল পূর্ণিমার চাঁদ থৈ থৈ জলে থরথর করে কাঁপছে। আহা, এবার পেয়েছি তোমাকে হাতের কাছে। এই বলে সে হাত বাড়িয়ে চাঁদটাকে নৌকাতে তুলে নিতে চাইল। পারল না বলে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ল পানিতে। সাঁতার জানত না বলে সে আর উঠতে পারেনি গভীর পানি থেকে। চাঁদ কিন্তু রয়ে গেল সেই একই জায়গায়। কি অসাধারণ আইডিয়া, তাই না? কোনটা সত্য, আকাশের চাঁদ, না, তার পানিতে ভেসেবেড়ানো ছবিটা? জ্ঞান আর ইন্দ্রিয়ের পর্দাটি যখন থাকে না তখন বিষয় আর প্রতিবিম্বের তফাতটাই বা বুঝবার উপায় কি? তাই প্রশ্ন জাগে, এই যে দীঘির জলে আমার মুখটি শিল্পীর আঁকা ছবির মতো ভগ্নরেখার রূপ নিয়ে প্রতিভাত হয়েছে সে কি আমার চেয়ে বড় সত্য? বা দীঘিপারের প্রকাণ্ড মেপল গাছটি তার বিপুল ছায়া ফেলে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে সে কি তার নিজের রূপেতেই মুগ্ধ, না আমারই মতো বাস্তব আর পরাবাস্তবের মিহিন আবরণ নিয়ে বিভ্রান্ত?

*         *         *          *          *

এই যে বাস্তবের মাঝে পরাবাস্তবের প্রকাশ, অথবা অবাস্তবের তুরীয় শরীরে স্থূল বাস্তবের প্রতিভাস, এই দ্বন্দ্বটি সবচেয়ে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে হয়তো আধুনিক শিল্পকলার জগতে। মজার ব্যাপার হল যে শিল্পের এই আধুনিকায়নের পেছনে যে মৌল আইডিয়া সেটি কিন্তু এসেছে এক ক্ষণজন্মা পদার্থবিজ্ঞানীর কাছ থেকে—স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর প্রস্তাবিত চতুর্থ মাত্রা, যাকে তিনি প্রকৃতির এক অদৃশ্য এবং দুর্জ্ঞেয় বাস্তবতা বলেই দাবি করে বসলেন ১৯০৫ সালের এক কালজয়ী গবেষণাতে, সেই চতুর্থ মাত্রাই দু’তিন বছরের মধ্যে শিল্পীদের পটে আঁকা ছবিকে বস্তুর স্থূলত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নৈর্বস্তুকতার এক সূক্ষ্ণ মাত্রাতে পরিণত করবার প্রেরণা দিয়েছিল, এবং তার প্রধান উদ্দীপনা যুগিয়েছিলেন সে যুগের দুই উদীয়মান তারকা—পাব্লো পিকাসো আর জর্জি ব্রাক। তাঁদের হাত দিয়েই জন্ম নেয় পরবর্তীকালের বিমূর্ত শিল্পধারা—কিউবিজম, যেখানে মূর্তিমান প্রতিকৃতি পরিণত হয় ঘনজ্যামিতির রেখাবিচিত্রায়। অর্থাৎ গণিতের সাথে, বিজ্ঞানের সাথে, সখ্যবন্ধন সৃষ্টি হয় শিল্পকলার। বস্তু লাভ করে এক নৈর্বস্তুক মাত্রা—বিজ্ঞানের সেই রহস্যময় চতুর্থ মাত্রা। অবিশ্বাস্য মনে হবে শুনতে যে সেসময়কার এক বিশিষ্ট শিল্পী, মার্সেল ডুশাম্প, তাঁর অন্যতম বিখ্যাত ছবিতে আইনস্টাইনের ভাবানুসারে ‘সময়’ নামক চতুর্থ মাত্রাটিকে দৃশ্যমান স্থিরচিত্রের ক্যানভাসে ধরে রাখবার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯১১ সালে আঁকা তাঁর এই ছবিটির ফরাসী নাম: Portrait de joueurs d’echeecs.

জ্যামিতিক বা গাণিতিক মাত্রা জিনিসটা আসলে কি? সাধারণ ভাষায়, একপ্রকার স্বাধীনতা। নড়াচড়ার স্বাধীনতা। একমাত্রা মানে ডানবাম ছাড়া অন্যদিকে নড়বার উপায় নেই—একটি সরলরেখা যেমন। আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক চলাফেরা তিনমাত্রিক—উত্তরদক্ষিণ, পূর্বপশ্চিম, উপরনিচ, এই তিনদিকেই আমাদের নড়াচড়া করবার স্বাধীনতা আছে। চতুর্থ মাত্রাটির ধারণা আইনস্টাইনের আগে কারো মাথায় ঢোকেনি, কারণ বিজ্ঞান তখনও অতটা অগ্রসর হয়নি। তবে গাণিতিকদের জগৎ আলাদা। তাঁরা হরহামেশাই নতুন নতুন মাত্রা তৈরি করে যাচ্ছেন তাঁদের অঙ্কের গবেষণাতে। সেই মাত্রার সাহায্যে তাঁরা অনেক দুরূহ সমস্যা সমাধান করছেন। এগুলো বাস্তবে কাজে লাগবে কি লাগবে না সে নিয়ে তাঁদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। তাঁদের কাজ কল্পনার সৌধ রচনা করা—বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের সৌধ। অনেকটা আধুনিক বিমূর্ত আর্টেরই মতো। আধুনিক শিল্প আর আধুনিক গাণিতিকের চারণক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের লক্ষ্য মূর্তি বানানো, ভাবের মূর্তি, আইনস্টাইনের সেই অতীন্দ্রিয় মাত্রাসম্বলিত মূর্তি, যার প্রধান উদ্দেশ্য অপার্থিব রূপের প্রতীক সৃষ্টি করা। হ্যাঁ, গণিতেরও একটা অপার্থিব রূপ আছে বৈকি। এবং সেটা যতই এ্যাবস্ট্রাক্ট হোক আপাতদৃষ্টিতে এবং আবিষ্কারকালে যতই সুদূরপরাহত মনে হোক তার প্রয়োগশীলতা, দেখা গেছে যে তার ভেতরে যদি সেই দুর্লভ বস্তুটি থাকে যার স্পর্শে সবকিছুই এক স্বর্গীয় আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তাহলে প্রকৃতিদেবী নিজেই সেই এ্যাবস্ট্রাক্ট আবরণ ভেদ করে পরম বাস্তবের রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। এ্যাবস্ট্রাক্টের যে সৌন্দর্য তা প্রকৃতিরই এক বিকল্প রূপ।

আমি অত্যন্ত স্থূলভাবে, রক্লিফের হেমন্তবেলায়, দীঘির জলে গাছের ছবি দেখে দেখে সেই অতীন্দ্রিয় বাস্তবতাকে খুঁজি। খুঁজি সুন্দরের পরমসত্তাকে। মানুষের অনন্ত তৃষ্ণাই তো তাই। যা স্নায়ুতে ধরা দেয়, যা ইন্দ্রিয়ের পরিধিতে বন্দী তার বাইরে, অনেক অনেক বাইরে আরো একটা মাত্রা আছে, আরো অনেক মাত্রা আছে, যাকে কেউ জেনেশুনেই স্পর্শ করতে চায়, কেউবা করে অজান্তে। এখানেই আমাদের অন্তহীন অতৃপ্তির উৎস—সকল সৃষ্টির উৎস।

অটোয়া, ৯ই অক্টোবর,’১০
মুক্তসন ৩৯

Facebook Comments

One Comment:

  1. hey all http://www.sahityacafe.com admin discovered your blog via yahoo but it was hard to find and I see you could have more visitors because there are not so many comments yet. I have discovered website which offer to dramatically increase traffic to your blog http://xrumerservice.org they claim they managed to get close to 1000 visitors/day using their services you could also get lot more targeted traffic from search engines as you have now. I used their services and got significantly more visitors to my site. Hope this helps 🙂 They offer backlinks seo usa backlink service backlinks Take care. steve

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *