শিবলি সাদিক-এর একগুচ্ছ কবিতা


স্মৃতি

জলাশয়ে মাছ হয়ে তোমার স্মৃতির মধ্যে ডুবে আছি। এইভাবে আজ আমি বেঁচে আছি। ইতিহাসের বাইরে। গাছ বা পাথর হয়ে। যখন প্রথম দেখা আমাদের, তখন মগজে ছিল মাছের কুসুম, শিখি নাই কোনো ভাষা, দেহ ছিল আমাদের সকল যোগাযোগের, বোঝাপড়ার মাধ্যম।

পাখিদের ডিমে জায়মান হয়ে, রংধনুর পালক পরে সবেমাত্র ভাসমান সর্বলোকে, আর তুমিও ঝর্নার পোশাকে বয়ে যেতে কোনোরূপ আড়াল ছাড়াই। সেই অবাক সকালবেলায় চেতনা ও বস্তু জড়াজড়ি করে ছিল পাখিতে-পালকে, আলোছায়ায়, দহনে-তরলে, আকাশে-বাতাসে।

তোমাকে তখন কোনো নামেই ডাকি নি আমি, কোনো নাম জানাই ছিল না, নামের বিভ্রম আমার ছিল না। সে-মুহূর্তটিতে শূন্য থেকে শুরু করে বিশ্বের ঘটনাসব, প্রত্যেক উত্তাপবিন্দু, বিকাশ-বিলাসের, নর্তন ও চিত্রণের, সুর ও ঝড়ের সকল উন্মাদবিন্দু জ্বলে উঠেছিল আচম্বিতে।

সেদিন আকাশ হতে ঝরে পড়েছিল ঋতুসব, আর থেমে-থাকা যত বায়ু সর্বভূত কাঁপিয়ে তীব্র বইছিল সব মন্ডলে ছড়াতে সুর-স্বরের সেই ঐকতান ।

আজ ইতিহাসপর্বে, নির্মাণ ও সভ্যতায় সব প্রেম— নিষিদ্ধ হয়েছে সব গান; স্মৃতি ছাড়া রইল না বাঁচার উপায়। ফলে সেই মিলনের লগ্নটুকু শিল্পে মাছে গাছের শরীরে শুধু উন্মাদের মত এঁকে যাই— গাছ পাথরের ভাষায় লিখে যাই সেই অসহ দাবানলের স্মৃতি।

শাপলা ও শালুক

আমাদের আত্মা গ্রীষ্মে লাল বেলুনের মত উড়ে যায়।
হয়তো সূর্যের আত্মা আমরা চোলাই করি রঙে, মদে।
খালে-বিলে শুয়ে থাকি, বুকে চেপে ধরি শাপলা-শালুক,
তাতে বের হয় মদ, আর সূর্যের লালচে আত্মা। গ্রীষ্মে
আমরা খাল-বিলের মেয়ে, সূর্য চেপে ধরে রঙিন চোলাই
করি মদে। আমরা শাপলা-শালুক, খাল-বিলে জল নেই,
জীবচক্র শেষ হয়ে বুঝি আসে, তাই চেপে চেপে ধরি
জীবন— লালচে আভা তার, সবটুকু মদ, রঙ শুষে নিয়ে
আমাদের আত্মা গ্রীষ্মে লাল বেলুনের মত উড়ে যায়।

বৃষ্টি ও বেহালা

বৃষ্টির দিনে কত কিছুই যে পুর্নজন্মের জন্য কাতর হয়ে পড়ে। একটি বেহালা কবে মরে গেছে, আজ রজঃস্বলা, তার সুরে গোলাপের রক্ত, আকাশ রক্তাক্ত। প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা নিয়ে তাই খুব কাড়াকাড়ি। কচু পাতা ও বাতাস বাদানুবাদ করছে। যেন বৃষ্টি নয়, কোনো প্রজাপতির আকাশে সহসাই ছিদ্র হয়ে আজ সব রং ও সৌন্দর্য জলের মাতমে নেমে আসে। রং আর রক্ত। গোলাপের রক্ত। তাই সব বেহালা জন্মের জন্য কাঁদে। মৃত নর্তকীরা কাঁদে পাতাবাহারের ঝোঁপে। তারা যদি এইবার বর্ষাকালে ফিরে পায় দেহ, তবে খুব রক্তারক্তি হবে। বেহুলা নাচের ছন্দে সব মেঘ নেমে এসে মর্ত্যে খুলে দেবে সব রূপ যা গোপন আছে পদ্ম ও পলাশে। তখন তো আর আমলকি হাতে তুমি কোথাও যাবে না, দেখবে বৃষ্টির সুরে সুরে সাতশো বেহালা জন্ম নিচ্ছে।

জ্যোৎস্না, নৌকা, ভাষা

প্রতিটি জ্যোৎস্না রাত নৌকাদের ভাষা নিয়ে আসে। কেননা সেসব রাত জলমগ্ন, মাছ আর জল কথা বলে। রোরুদ্যমান গাছের কাছে যেও না এই রাতে, রোদনের স্রোতে ভেসে যেতে পারো। আমি এই রোদন ও ভাষা নিয়ে বস্তুত ভেবেছি। সব কথা বোঝা কার সাধ্য! তবু টের পাই বহু কথা চাপা থাকে বাস্তবতার গদ্যপ্রবাহে। যেমন ধরুন, কারুবাসনা নামের এক নৌকা করে রূপ থেকে রূপান্তরে ঘুরে বেড়াতে সকলে চায়। অথচ তেমন নৌকা কোথা আছে! শুধু জ্যোৎস্না রাতেই এই সব নৌকা দেখা যায় যখন জগৎ ডুবে যায় অলৌকিক মদে, জাগে মাছেদের ভাষা। সব রূপ থেকে রূপান্তরে চাঁদের রূপালি পাল নিয়ে এইসব নৌকা ঘোরে।

শহরের কবিতা ১

সন্ধ্যার বাতাসে শুধু তোমার নগ্নতা, চুল খুলে যায়—
জড়ায় ট্রাফিক, ট্রাক, পণ্যের প্যাকেট, ধাতুর নগরী,
আর ওঠে বুদ্বুদ মদের গ্লাস থেকে, আঁধার বাণিজ্য থেকে,
এসিডে-তরলে গলে যায় উঁচু টাওয়ার, নগরের বাড়িঘর,
যুবতীর হাঁটার মুদ্রায় অনেক সারস দেখা যায় আর
নগরপিতার পাতলুন বেয়ে উঠে আসে ঘন সাপ,
অনেক মানুষ ঘরে ফিরবে না বলে ঝড়ে ঘোরে,
তাদের পিছনে লেগে থাকে গুপ্তপুলিশ, শূন্যতা,
স্তব্ধ-সাইরেন, ফুটপাত-যিশু, বিষণ্ন-শতাব্দী, বেশ্যাদের ঠোঁট।

একটি মদের গ্লাসে বিজ্ঞাপনের এই ছবি বারবার ভেসে ওঠে।

শহরের কবিতা ২

আত্মার আগুন দিয়ে পোড়াব শহর একদিন,
সেই দিন দূরে নয়, বৃষ্টির জ্বলন্ত ফোঁটা
থেকে মোম নিচ্ছি তুলে— বুর্জোয়া ফ্যাক্টরি,
তার যত বালবাচ্চা, পণ্যের প্যাকেটে গুপ্তধন—
কন্ডম যৌনতা হাঁস— এদেরকে চিনে নিচ্ছি,
আমি মধ্যরাতে ঘুরি, সংগ্রহ করছি মৌমাছি—
তারকাদের আক্রোশ— আকাশ-ভেঙে নেমে-আসা
আত্মার আগুনে আমি দাঁড়িয়ে বলছি কথা
যাযাবর পাখি আর নক্ষত্রের আবর্তনের সহিত।

বাঘের অহম নিয়ে একদিন দেখা দেব,
দাউদাউ ঘোর-লাগা প্রণয়-মুহূর্তে, নিসর্গের সাথে
দগ্ধ মিলন-মুহূর্তে, তৃতীয় নয়ন থেকে
সব তাপ তুলে এনে মন্ত্রহীন নিরক্ষর হয়ে
পুড়িয়ে ফেলব সব— সভ্যতা ও বলাৎকারের যত যন্ত্র—
শহর মার্কেট স্টক নিউইয়র্ক লন্ডন বেইজিং… সব।

শহরের কবিতা ৩

চিলেকোঠা সর্বদাই আশ্চর্য শৈশবে ডুবে থাকে।
আলো-ছায়া-মেঘ-রৌদ্র বাতাসের হাত থেকে
উড়ে-আসা ঘুড়ি নিয়ে রঙের খেলায় থাকে মেতে।
বাড়ির বয়স্ক চোখ এড়িয়ে পালিয়ে যেতে চায়
রোদ্দুরের পিঠে চড়ে রঙিন চিলের সাথে দূরে।

উপনিবেশের ছাতে পাখিরাজ্যে চিলেকোঠা
সামান্য আলগা হয়ে দালানের কাঠামোর ‘পরে
হারানো গ্রহের দ্বিধা আর কূটাভাষ নিয়ে ভাসে।

চিলেকোঠা কথা বলে ঘুড়ি ও তারার সাথে,
গ্রীষ্মের বাতাসে সব দমকল তার ভাষা জানে,
গোপনে নয়নতারা শহরময় বাতাসে ওড়ে;
মৌমাছির আক্রমণে সহসাই শহর ধ্বংস হবে ।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *