গল্প: অচেনা শহর


দারা মাহমুদ

ব্যাপারটা কি? তোরা সব এমন করছিস যেন বাড়িতে কেউ মরে গেছে! একটু চড়া গলায় কথাগুলো বললো আরিফ।

খুকু কোনো কথা বললো না।

আরিফ একটা লুচি মুখের মদ্যে ঢুকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চিবুলো। একটু পানি খেলো। হঠাৎ করেই খুকুর চোখের দিকে সন্দেহের চোখ ছুঁড়ে দিয়ে বললো, তুই বিকেলে পড়তে যাসনি কেনো?

এবার খুকু কথা বললো। বেশ নিস্পৃহ গলায় বললো, কিছুদিন হলো পড়তে যাচ্ছি না।

কেনো?

ভাইয়া, শহরের অবস্থা খুব খারাপ।

শহরের আবার কি হলো?

খুকু কথা ঘুরানোর ভঙ্গিতে বললো, ভাইয়া তুমি কি এখন বাইরে যাবে?

হ্যাঁ

এখন না বেরুলে হয় না? তা ছাড়া সারাদিন জার্নি করেছ, রেস্ট নাও।

একটু বেরুতে হবে। কাজ আছে।

আরিফ বাসায় ঢোকার পর থেকে সবাই কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বাবা সেই দুপুর থেকে ঘুমুচ্ছে তো ঘুমুচ্ছেই। মা রান্না ঘরে রানছে তো রানছেই। আর খুকু দু’ঘন্টায় কথা বলেছে আট-দশটা। ব্যাপারটা কি? আরিফ তো গত মাসেও টাকা পাঠিয়েছে! অন্যান্যবার এলে সবাই হামলে পড়ে। খুকু তো কিছু একটা না পাওয়া পর্যন্ত ঘুরঘুর করতেই থাকে।

বাড়ি থেকে বেরুলো আরিফ। ইকবাল সাহেব দশ হাজার টাকা দিয়েছেন, আজই ওদের বারান্দিপাড়ার বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। ইকবাল সাহেব আরিফদের অফিসের অ্যাসিসটেন্ট মার্কেটিং ম্যানেজার। বলা যায়, ইকবাল সাহেবের জন্যই এতো বড় কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরিটা পেয়েছে আরিফ। খালাম্মার হাতে টাকাটা পৌঁছে দিতে হবে আগে। তারপর শর্মিদের বাসায় যেতে হবে। প্রায় পাঁচ মাস হলো শর্মির সাথে দেখা নেই। টেলিফোনে কথা হয় না দিন পনের হবে। শর্মির সাথে প্রেম-প্রীতির বিষয়টা নিয়ে এখন আর কোনো সংগ্রাম নেই। চাকরিটা পাওয়ার পর শর্মির বাবা মা তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছেন। বিয়েটা এখন সময়ের ব্যাপার। এনগেজমেন্টের জন্য এবার ঢাকা থেকে আংটি এনেছে আরিফ। বাড়িতে তো কেউ কথাই বললো না। ব্যাপারটা তোলাই হয়নি।

হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় উঠে এসেছে আরিফ। ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। বেশ শীত লাগছে, অথচ এখন ঢাকায় শীতের গন্ধমাত্র নেই। বিশুর দোকানের একটা শার্টার একটু উঁচু করা, ভেতরে আলো জ্বলছে। গলা বাড়িয়ে দখলো বিশু ক্যালকুলেটরে হিসাব করছে। আরিফকে দেখে বললো, আরিফ কখন এসেছিস?

ভেতরে আয়।

আরিফ বললো, এই সন্ধেয় শার্টার টেনেছিস কেনো?

তুই কিছুই জানিস না মনে হচ্ছে?

কি জানবো?

কিছুদিন হলো শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মাফিয়ারা।

কি বলছিস এসব!

হ্যাঁ, ছিনতাই ডাকাতি হয় না, এমন কোনো রাতই নেই, আর খুন ধর্ষণ তো লেগেই আছে। মেয়েরা বাইরে বেরুনো প্রায় বাদ দিয়েছে।

খুকুর কথা মনে পড়লো আরিফের। খুকু স্যারের বাসায় পড়তে যাচ্ছে না। এই শহরেই আরিফের জন্ম, বেড়ে ওঠা। বরাবরই অপরাধ একটু বেশি হতো, কিন্তু এতোটা অবনতি, মেনে নিতে ইচ্ছে করছে না। কিছুটা অবিশ্বাসরে সুরে বিশুকে বললো, কিন্তু আমি তো প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ি!

বিশু কয়েকটা লোকাল কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো, তোদের ঢাকার কাগজে আমাদের ক’টা খবর ছাপা হয়? নে এগুলো পড়। এই তো, গত সপ্তায় এক মহিলাকে ধর্ষণ এবং খুন করে সার্কিট হাউসের সামনে ফেলে রেখেছিল মাফিয়ারা। এ সপ্তায় দু’মহিলাকে স্টেশন পাড়ার এক হোটেলে। আর খুন ছাড়া ধর্ষণ? সে নিউজ এখন লোকাল কাগজেও ছাপা হয় না।

বিশুর দোকান থেকে বেরিয়ে আসার সময় আরিফের শ্বাসক্রিয়া একটু জোরে জোরে হচ্ছিল। পকেটে অনেকগুলো টাকা। একবার ভাবলো ফিরে যায়, কিন্তু ফেরা হলো না। বিশু আরিফের সাথে পড়তো। ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু বাবা মারা যাওয়াতে এসএসসি পরীৰা না দিয়েই ব্যবসায় নেমে পড়ে। বিশু ব্যবসায় ভালো করেছে। স্কুল বন্ধুদের মধ্যে বেশ সাহসী ছিল বিশু। কিন্তু আজ বিশুকে বেশ প্যানিকগ্রস্থ মনে হলো।

ইকবাল সাহেবদের পাড়ায় ঢোকার গলির মুখে চারপাঁচজন কিশোর আরিফের রিকশা থামালো। দূরের ল্যাম্পপোস্ট থেকে ভেসে আসা হালকা আলোয় আরিফের মুখ হলুদ হয়ে গেল। গলা দিয়ে শব্দ বেরুতে চাইলো না। তবু জোর করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, কি চাই?

সরু জিন্সের প্যান্ট পরা সবচে’ লম্বা ছেলটা বললো, চাঁদা।

গলার স্বর শুনে মনে হলো ছেলেটার বয়ঃসন্ধি চলছে। চাঁদা কথাটা শুনে আরিফ ভেতরে ভেতরে একটু স্বম্বিৎ ফিরে পেল। কিন্তু স্বর স্বাভাবিক হলো না। আরিফ বললো, কিসের চাঁদা?

একুশে ফেব্রুয়ারির। সেই লম্বা ছেলেটাই বললো।

আরিফ মানিব্যাগ বার করে পাঁচটা টাকা এগিয়ে দিলো।

ছেলেটা খেঁকিয়ে উঠলো, ফকিরের ভিক্ষে দেন নাকি? একশ’ টাকা দেন।

আরিফ কথা না বাড়িয়ে এক শ টাকা দিয়ে দিল। রিকশা ছাড়লো। পাশ পকেটে রাখা দশ হাজার টাকার ওপর হাত রাখলো আরিফ। আরিফ সবে চাকরি পেয়েছে। টাকাগুলো খোয়া গেলে শোধ করতে বেশ সমস্যা হতো। ইকবাল সাহেবের মা-ই দরজা খুললেন। সালাম দিয়ে আরিফ টাকাটা বাড়িয়ে দিল। চা খাওয়ার জন্য ভেতরে ডাকলেন বৃদ্ধা। কিন্তু আরিফ ব্যস্ততার কথা বলে বেরিয়ে এল। অনেকটা নির্ভার মনে হচ্ছে নিজেকে। গলির মোড়ের কাছে আবার রিকশা আটকালো ছেলেগুলো। কিন্তু চিনতে পেরে ছেড়ে দিল।

একসময় একুশের চাঁদা আরিফরাও তুলেছে। অবশ্যই দিনের বেলায়। পথচারিদের বুকে ব্যাজ পরিয়ে দিলে চার আনা, আট আনা, সর্বোচ্চ এক টাকা পাওয়া যেত। সব টাকা জমা হতো পাড়ার নবারম্নণ ক্লাবে। একুশের দিন হাশেম মুক্তারের মাঠে জমজমাটি অনুষ্ঠান হতে। গান, আবৃত্তি, আলোচনা— এসব। হাশেম মুক্তারের মাঠে এখন অনেকগুলো ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে। আর নবারুণ ক্লাবে তাসের জুয়া চলে। খুব অল্প দিনেই সব কিছু কেমন নষ্ট হয়ে গেল।

শর্মিদের বাসাটা একতলা, কিন্তু বিশাল। সেকেলে। বিনিময় সূত্রে পাওয়া। কেমন অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। অথচ এদিকে লোডশেডিং চলছে না। দরজা খুললো নন্দর মা। এ বাড়ির পুরনো কর্মচারি। বসতে বলে ভেতরে চলে গেল। অনেকক্ষণ। আরিফ কি করবে। অস্বস্তি লাগছিল। একটা পুরনো খবরের কাগজে চোখ ডোবালো। হঠাৎ চোখ তুলে দেখলে শর্মির বাবা। ওর দিকে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুতভাবে হাসছে। পুরু লেন্সের চশমা, মোটা গোঁফ, থুতনির কাছে বয়সটা আরো একটু ঝুঁকে পড়েছে যেন। আরিফ উঠে দাঁড়িয়ে সালাম জানালো। কিন্তু ভদ্রলোক সালামের উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। হাসিটা থামলো। গমগমে গলায় বললেন, কি হে খোকা, আংটি এনেছো আংটি? আমার মেয়েকে বিয়ে করবে না? এমন মেয়ে আর কোথায় পাবে? আজই বিয়ে করে ফেলো, এক্ষুণি। শেয়াল কুকুরে খেয়ে ফেলার আগে ওকে নিয়ে যাও।

ভদ্রলোক থামলেন, কিছুক্ষণ, এবার হেসে উঠলেন স্বশব্দে। বিকটভাবে। খটখটে হাসির অভিঘাত পুরনো দালানের দেয়ালে লেগে আরিফের শরীরে এসে আছড়ে পড়েছে। হাসিটা আবার থামলো। ভদ্রলোক এবার শান্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, আমি ছেড়ে দেব ভেবেছো? না ছাড়বো না। আমার মতো উকিল বারে ক’টা আছে? আমি ছাড়বে না…।

ভদ্রলোক ‘আমি ছাড়বো না’ বলতে বলতে ভেতরে চলে গেলেন। আরিফ বসলো। ব্যাপারটা কি? শর্মির বাবা কি পাগল হয়ে গেলেন? উনি তো খুবই গম্ভীর চরিত্রের মানুষ। কি সব অদ্ভুত ধরনের কথা বললেন, যার কিছুই আরিফ বুঝতে পারলে না। কিছু একটা হয়েছে। খুকু, মা, বাবা যে অস্বাভাবিক আচরণ করেছে তার সাথে এ বাড়ির কোনো যোগসূত্র আছে। কিন্তু মিলাতে পারলো না ও। শর্মি আসছে না কেন? এ বাড়িতে ঘন্টাখানেক হলো। শর্মির ওপর একই সাথে রাগ এবং অভিমান হলো। আর নয়, এবার চলে যেতে হবে। শর্মির শিক্ষা হোক।

বেরিয়ে এল আরিফ। লম্বা লেন ধরে আস্তে আস্তে হাঁটছিল ও। গেটের কাছাকাছি এসে ডাকটা শুনতে পেল। হ্যাঁ, শর্মির সেই অ্যাপিল জড়ানো কণ্ঠ। বাড়ির উল্ট দিকে শর্মির ঘরসংলগ্ন একটা বারান্দা আছে। কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। ওদিক থেকেই ডাকটা ভেসে এলে। আরিফদের প্রেম যখন স্বীকৃতি পায়নি, তখন ওরা দু’এক সন্ধায় ঐ বারান্দাটা ব্যবহার করেছে। গেট দিয়ে টুক করে ঢুকে ঐ বারান্দার পিলারের আড়ালে সেঁধিয়ে যেত আরিফ। অন্ধকারে একদম কাছে শর্মি, শুধু মাঝে একটা গ্রিল। আরিফ ঐ বারান্দাটার দিকেই এগিয়ে গেল। হ্যাঁ, শর্মি দাঁড়িয়ে আছে। কিছুতেই অঙ্কটা মিলাতে পালো না ও। প্রেমের এই পর্যায়ে এসে এ লুকোচুরি খেলার মানে কি?

কেমন আছ আরিফ? এতো শুকিয়ে গেছ কেন? শর্মির কণ্ঠ আজ বেশ নোজাল এবং বেশি অ্যাপিল জড়ানো মনে হলো।

আরিফ বললো, ভালো, কিন্তু তোমরা সবাই এ রকম অদ্ভুত আচরণ করছো কেন আমার সাথে?

তুমি নিশ্চয়ই ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করছো না? এখনো হোটেলে খাচ্ছ? তোমাকে না বলেছি নিজে রান্না করে খেতে।

আরিফ ধাঁধাঁর মধ্যে পড়লো। এতক্ষণ বসিয়ে রেখে শর্মি শরৎ বাবুর নায়িকাদের মতো ডায়লগ দিচ্ছে। ঝাঁঝালো গলায় বললো, এতোক্ষণ তোমার জন্যে বসলাম, এলে না কেন? তোমার বাবা–

কথা শেষ করতে দিল না শর্মি, বললো, তোমার হাতটা দাও না, কতোদিন তোমার স্পর্শ পাইনি।

শর্মির উপর প্রচণ্ড রাগ হলো আরিফের। শর্মি কথা ঘুরাতে চাচ্ছে। কিন্তু শর্মির আহবান উপেক্ষা করতে পারলো না। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু স্পর্শ লাগতেই চমকে উঠলো ও। শর্মির শরীরে প্রচন্ড উত্তাপ। আরিফ বললো, তোমার গয়ে তো প্রচণ্ড জ্বর!

শর্মি এবারো আরিফের কথার দিকে গেল না। শর্মি বললো, রাত হয়ে যাচ্ছে, বাড়ি ফিরে যাও।

অন্ধকারে শর্মির অবয়ব দেখা যাচ্ছে না। কেমন দুর্বোধ্য এবং অচেনা লাগছে শর্মিকে। আরিফ এবার ভয়কাঁপা গলায় বললো, শর্মি তোমার কি হয়েছে?

কই, কিছু না তো। তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাও। শহরে কিছু নতুন জন্তু এসেছে। যাও বাড়ি ফিরে যাও।

জন্তু!

হ্যাঁ, মানুষের মতো, তবে শরীর রোমশ। ঠোঁট নেই, বড় বড় দাঁত দেখা যায়। আর হাতে নখগুলো খুবই ধারালো।

কি বলছো এসব?

ঠিকই বলছি। এই তো, পরশু, আমি ইউনিভার্সিটি থেকে মার্কশিট তুলে ফিরছিলাম। ট্রেন লেট ছিল, বেশ রাত হলো, পানির ট্যাঙ্কটার কাছে, চার-পাঁচটা জন্তু আমার রিকশা থামালো। ওখানে একটা পোড়ো কারখানা বাড়ি আছে না, ওর ভেতর ওরা আমাকে নিয়ে গেল।

শর্মি হঠাৎ করেই আরিফের হাত ছেড়ে দিল। হাত দু’টো ওর বুকের কাছে তুললো। খস করে একটা শব্দ হলো। কাপড় ছেঁড়ার শব্দ। শর্মি বললো, দ্যাখো, দ্যাখো, জানোয়ারগুলো আমার শরীরের কি অবস্থা করেছে।

আরিফ কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। ভয়ে ওর সমস্ত শরীরর কাঁপছে। কি করা উচিত, কি বলা উচিত কিছুই ঠিক করতে পারছে না আরিফ। শুধু মনে হলো আপাতত, এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। শর্মির অনাবৃত বুকের দিকে তাকালো আরিফ। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ করেই শর্মি গ্রিলের ভেতর থেকে দু’হাত বাড়িয়ে আরিফকে জড়িয়ে ধরলো। যেন মানুষ নয়, আগুনের দুটি হাত আরিফকে আঁকড়ে ধরেছে।

শর্মি বললো, আরিফ।

বলো।

কাল তোমার বাবা এসেছিলেন, বলে গেলেন, এ মেয়েকে শেয়াল কুকুরে চেটেছে, এ মেয়ে আমরা নেবো না, তুমি কি বলো?

দ্যাখো শর্মি, যে ঘটনায় তোমার কোনো হাত নেই, তার জন্য তোমাকে তো দায়ী করা ঠিক নয়।

আরিফ এ কথা বললো ঠিকই কিন্তু ও নিজেই অনুভব করলো ওর কণ্ঠস্বর স্বতঃস্ফূর্ত নয়। আপাতত এখান থেকে চলে যাওয়া দরকার। বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু যেতে চাইলেই তো আর যাওয়া যায় না। শক্ত করে ধরে রেখেছে শর্মি। একসময় এখানে একটু ছোঁয়াছুঁয়ি কতো আকাঙ্ৰার ছিল। কিন্তু এখন? এনে হচ্ছে এক কঠিন পরীক্ষা মুখোমুখি আরিফ। শর্মির জন্যে ভেতরে কষ্ট লাগা তৈরি হলো আরিফের। কলেজে দু’বছর নিচে পড়তো শর্মি। কলেজের অনেক ছেলের নজর ছিল ওর ওপর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় আরিফ। সে অনুভূতি ছিল বাবরের পানিপথ যুদ্ধ জয়ের মতো। সেই শর্মি আজ কেমন ভেঙেচুরে পড়েছে।

গির্জার ঘন্টায় রাত এগারটা বাজলো। আর্দ্র্র গলায় আরিফ বললো, শর্মি তুমি অসুস্থ, যাও রেস্ট নাও, আমি কাল আবার আসবো।

শর্মি বললো, হ্যাঁ, যাও– যাও, সাবধান, জানোয়ারগুলো ধরতে পারে।

শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। রাস্তায় লোকজন খুবই কম। আরিফ হাঁটছে, অনেকটা দৌড়ানের মতো। পানির ট্যাঙ্কটার কাছে চলে এসেছে আরিফ। ঐ তো সেই পোড়ো কারখানা বাড়ি। বৃটিশ আমলে এখানে চিরুনি তৈরি হতো। সেই চিরুনি ইওরোপে বিক্রি হতো চড়া দামে। এখন এই কারখানা, পুরনো লোহালক্কড় আর নোনাধরা ইট-পাথরের স্থান ছাড়া কিছু না। কবরের স্তব্ধতা আর চাপ চাপ অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে কারখানা বাড়িটায়। আরিফের মনে পড়লো, “মেয়েটার দেহ বিছিয়ে দিয়েছে ওরা, কবরের আঁধার কবরে। বাঁশ কোদালের ওঠা নামা, কবরের আঁধার কবরে” কবিতার ক’টা চরণ।

কারখানার ঠিক সমনে দু’পুলিশ দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। সম্ভবত শর্মির এই ঘটনার পর এ সেন্ট্রি বসেছে। আরিফ পুলিশ দু’টোকে পেরিয়ে গেল। এখন আর শীত লাগছে না। ঘাম ঝরছে। এতোদিন জীবন চলেছে এক সরলরৈখিক সড়কে। আজ থেকে জীবনের গতিপথ গেল বেঁকে।

আরিফ পেছন ফিরে দেখলো বেশ দূরে এখনো পুলিশ দু’জনকে দেখা যাচ্ছে। পূজা মন্ডপের সীমানাটা পেরুলেই বড় রাস্তায় উঠে পড়বে ও। কিন্তু তার আগেই চার-পাঁচ জন লোক ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। আরিফের মনে হলো ও এখন ঠিক বাংলাদেশে নেই। আফ্রিকার কোনো আধা বর্বর অরণ্যে। স্ট্রিট লাইটের সামান্য আলোয় ও দেখলো লোকগুলোর দেহ রোমশ, জঘন্যভাবে দাঁত বেরিয়ে আছে। হাতের নখ ধারালো। ঠিক শর্মি যেমনটা বলেছিল।

একজনের হাতে পিস্তল। আর সবার হাতে ক্ষুর। দু’জন এসে আরিফের দু’বাহু শক্ত করে ধরলো। অন্য আরেকজন পকেট থেকে নিপুণভাবে মানিব্যাগ, রুমাল, কয়েন এবং হাত থেকে ঘড়ি খুলে পশ্চাৎদেশে প্রচন্ড একটা লাথি মেরে বললো, যা, ভাগ, মুখ খুললে জানটা হারাবি।

আরিফের পকেটে সামান্য ক’টা টাকা ছিল। ক্ষতিটা খুব বড় নয়। দ্রুত এলাকা ত্যাগ করাটাই শ্রেয়। কিন্তু আরিফ তা না করে ঘুরে দাঁড়ালো। জন্তুগুলোর দিকে থুথু ছুঁড়লো।

পিস্তল-ওয়ালা বললো, মনা এ যে দেখছি থুথু দেয়, দে কুত্তার বাচ্চার ভুড়িটা হড়কে দে।

কথা শেষ হতেই দু’জন ঝাঁপিয়ে পড়লো আরিফের ওপর। অবিরাম ঘুষি এবং লাথির আঘাতে আরিফ যখন রাস্তায় পড়ে গেলো তখন দু’জন নিপুন হাতে ক্ষুর দিয়ে ওর শরীরে কয়েকটা জখম করলো। চলে গেলো জানোয়ারগুলো। আরিফ বেশ কষ্টে উঠে বসলো। দেখলো, দূরে, অন্ধকারে দুই পুলিশ নড়াচড়া করছে। কিন্তু ওখানে কি পৌঁছাতে পারবে ও? এখন আর রাস্তায় কোনো লোকজন নেই। ম্যাটিনি ভাঙলে হয়তো দু’এক জন আসতে পারে। কিন্তু তার জন্যেও তো কিছুটা সময়ের দরকার। রাস্তায় গড়িয়ে যাচ্ছে গরম রক্ত। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। আরিফ আবার আস্তে আস্তে শুয়ে পড়লো। একটা হাত পড়লো রাস্তার পাশের মাটির ওপর। আরিফের প্রিয় শহরের মাটি। এই শহরে আরিফের জন্ম, বেড়ে ওঠা, কলেজ পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া, প্রেম। বিশুর মতো কতো বন্ধু, কতো স্বজন এই শহরেই। কিন্তু এখন কেউ নেই। বন্ধু নেই, স্বজন নেই, বাংলাদেশ নেই, বিচার, চিকিৎসা কিছু নেই। শুধু নেই নেই নেই …।

আরিফ দেখতে পেল ওর স্বপ্নের টাইটানিক ডুবে যাচ্ছে। শর্মির কথা মনে হলো। এতোক্ষণে জানোয়ারতাড়িত শর্মির প্রকৃত অবস্থা অনুভব করলো ও। শর্মির কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করলো। ইচ্ছে করলো সেই অন্ধকার বারান্দায় ফিরে যেতে। ইচ্ছে করলো গ্রিল গলিয়ে শর্মিকে জড়িয়ে ধরে বলতে, শর্মি জানোয়ারগুলো যত ভয়ঙ্করই হোক, আমি ওদের মুখের ওপর থুথু দিয়েছি, এসব আসলে বড় এবং শেষ কথা নয়। ভালোবাসাটাই হলো বড়।

এরকম অসংখ্য শর্মিকেন্দ্রিক ইচ্ছে, রক্তের সাথে রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল নিচু মাটির দিকে। আরিফের প্রিয় শহরের মাটির দিকে। প্রিয়, কিন্তু অচেনা এক শহরের ইটের কুচিমিশ্রিত মাটির দিকে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *