আঞ্জুমান রোজী: টরন্টোর মেঘ বৃষ্টি এবং নস্টালজিয়া

 

 

আঞ্জুমান রোজী

টরন্টোর বৃষ্টি নিয়ে লিখতে বসে হারিয়ে যাচ্ছি বাংলাদেশের বৃষ্টি রাজ্যে। নস্টালজিয়ায় ভর করেছে বাংলার বর্ষা। টরন্টোতেও বৃষ্টি আসে।মেঘ গুড়গুড় করে। বিজলীর ঝলকে চমকে উঠে প্রকৃতি। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি ঝরে। ভিজিয়ে দেয় শহরতলী। চারদিকের পত্রপল্লব স্নান করে ওঠে; সজীব হয়ে বাতাসের দোলে নৃত্য করে। কখনো কখনো অঝোর ধারায় ভাসিয়ে দেয় কত কত লোকালয়! থৈ থৈ করা বৃষ্টিজলে ডুবে যায় পথঘাট। আবার চোখের নিমিষে সেই জল কোথায় যে চলে যায়! দূরে… কোথাও…

টরন্টোতে মূলত বৃষ্টি আসে গ্রীষ্মকালে। শীত বসন্তেও বৃষ্টি আসে। তবে সেই বৃষ্টি শীতের বরফে জমে হয়ে যায় বরফবৃষ্টি। আর বসন্তে হয় বৃষ্টির আয়োজন। কখনো ঝরবে তো ঝরবে না। এমন করেই গ্রীষ্ম চলে আসে। গ্রীষ্ম মানেই হলো কানাডাবাসীদের উৎসব। প্রতিদিন, প্রতিরাত উদযাপনের প্রতিটিক্ষণ হয়ে উঠে আনন্দ উৎসবে মূর্ত। বৃষ্টি সেখানে অন্য দ্যোতনা নিয়ে আসে। প্রকৃতির আলাপনে বৃষ্টি এসে কতকথা বলে যায়! বৃষ্টিজলে টইটুম্বুর হয়ে ফুলে উঠে সব লেকের বুক। বাড়ন্ত যৌবনের মতো হয় উচ্ছ্বল চঞ্চল। কখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কখনো বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি ভিজিয়ে রাখে প্রকৃতির শরীর।

তারপরও বাংলার বৃষ্টির মতো হৃদয়কে কাঁপায় না। সেইভাবে আবেদনও তৈরি হয় না। বৃষ্টিজলের আবেগেও ডুবে যাইনা। যেখানে রবীবাবুর ভাষায় যদি হারাই, তাহলে বলতে হয়,

“রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের ‘পরে
নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে।
এসেছে এসেছে এই কথা বলে প্রাণ,
এসেছে এসেছে উঠিতেছে এই গান,
নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।
আবার আষাঢ় এসেছে আকাশ ছেয়ে।”

ঠিক সেরকম বৃষ্টি প্রস্তুতি আর নেয়া হয় না। বাংলার মানুষ যেভাবে ভাবে। যেমন মহাদেব সাহা বলেন, “কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে। সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি, এই ভরা বর্ষা।” টরন্টোর মেঘ বৃষ্টি সেই অর্থে অনুভব করতে পারি না। কর্পোরেট জীবনযাপন এখানে। ব্যস্তসমস্ত জীবন আমাদের। বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ ব্যস্ততার মাঝে হারিয়ে যায়।

কানাডায় চারটি ঋতু। গ্রীষ্ম,শরত,শীত, বসন্ত; এই চারটি ঋতু বৈচিত্র্যে প্রতিটি প্রভিন্স প্রকৃতির রঙয়ে সাজে। গ্রীষ্ম এলে পুরো প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। গরম পড়ার সাথে সাথে মেঘ বৃষ্টির সাজ-সাজ রব শুরু হয়ে যায়। মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়; এসবের তাণ্ডবলীলা ঘটে। হঠাৎ করে আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। শুরু হয় মেঘ গর্জন। তখন এলোপাথাড়ি ঝড়ের নৃত্য দেখি। বাংলাদেশে যেমন বর্ষা ঋতু আছে, একটানা দুমাস বৃষ্টি হয়। টরন্টোতে তা নয়। এখানে থেকে থেকে বৃষ্টি হয়। জুলাই আগস্টে অতিরিক্ত গরমে অতিষ্ঠ হয়ে মনে মনে বৃষ্টি প্রার্থনা চলে।

বাঙালি মনের ভাবনাটা যেমন, আকাশ মানে বৃষ্টি, বৃষ্টি মানে কবিতা। আর কবিতা, সেতো বৃষ্টিস্নাত শুভ্র অবগাহন। ধুয়ে মুছে যায় যত গ্লানি, জরা-যন্ত্রণা। বৃষ্টি মানেই নতুন করে নিজেকে ফিরে পাওয়া। তাই বৃষ্টি-আকুতি মন, যেন বৃষ্টি-ভালোবাসার মন। বৃষ্টির মাদকতা নিয়ে বাঙালি কবির নান্দনিক আবেগ উদ্বেলিত হয়। বৃষ্টির গুণে অকবিও কবি; লেখার সাধ্য না থাকলেও মনের ভুবনটা তখন পাল্টে যায়। মেঘ-মাখা বৃষ্টি ঝরানো আকাশের দিকে তাকাতে হয়, তেমনি নজর ফেরাতে হয় ‘বর্ষার অজস্র জলধারে’। ফাগুন বিকেলেও তাই বৃষ্টি নামে। জড়বাদী কবির ‘অন্তরে থামে না বৃষ্টিধারা। বৃষ্টি ঝরার মুগ্ধতা মনে রেখে লিখতে হয় ‘এখনও বৃষ্টির দিনে মনে পড়ে তাকে। ‘বিচ্ছেদ-বাদল-রাত’ প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হয়ে ওঠে।

বৃষ্টির আবেদন মন হারাবার আবেদন। মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলির কথা। রিমঝিম বৃষ্টি বেলায় শৈশবে বৃষ্টি নিয়ে খেলার কথা। বৃষ্টি নিয়ে বিলাস করা বাঙালির একটি “আজন্ম বিলাস”। বৃষ্টি দেখলেই মনের মধ্যে কুহু কুহু করে কবি কবিতা লিখতে শুরু করে। তখন তৃষ্ণার্ত প্রকৃতিকে অমৃতসুধায় ভরিয়ে দিতে রিমঝিম বৃষ্টি একরাশ সজীবতা আর কদমফুলের সুভাষ নিয়ে আসে বাঙালির দ্বারপ্রান্তে। এমন মন-মানসিকতা নিয়ে আমি টরন্টোর বৃষ্টি দেখার সুযোগ খুঁজি। মনে মনে তা উদযাপন করি। কিন্তু আবহমান বাংলার বৃষ্টির সুর এখানে কানে এসে বাজে না, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার টাপুরটুপুর শব্দের মতো শব্দ তোলে হৃদয়কে কাঁপায় না। টরন্টোর বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি মনকে উদাসীনও করেনা। এখানেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা ঘটে। ভর দুপুরে অন্ধকার হয়ে আসে। সূর্যদেবতা হয়তো মেঘের আড়ালে বসে হাসে। সেই সময় কবিগুরুর কথা মনে পড়ে,

“নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে॥
বাদলের ধারা ঝরে ঝরো-ঝরো, আউষের ক্ষেত জলে ভরো-ভরো,
কালিমাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্ চাহি রে॥”

টরন্টোতে নস্টালজিয়ার স্রোতে বৃষ্টি উদযাপন করি। কখনো কখনো ঝড়ের বিকট তাণ্ডব দেখি। সাইক্লোনের মতো ধেয়ে আসে ঝড়। তখন আকাশ ছোঁয়া গাছগুলো যারা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে তারাও ঝড়ের প্রাবল্যে নুয়ে পড়ে পথমাঝে। মনে হয় ক্লান্তিতে গা এলিয়ে দিয়েছে। তখন সিটি কর্পোরেশনের কাজ হয়ে যায় সেসব গাছগুলো কেটেছেটে চলাচলের পথ পরিষ্কার করে দেয়া।

বৃষ্টি বাহুল্যে গ্রীষ্মের পুরো সময়টা একাকার হয়ে যায়। টরন্টোতে গ্রীষ্ম আসে প্রকৃতির উন্মত্ততা নিয়ে। সেইসাথে থাকে বৃষ্টির আদিখ্যেতা। কানাডার সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটে ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার উপকূল বরাবর। যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫০০ মি.মি. পর্যন্ত। ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার ওশান জলপ্রপাতের সর্বাধিক বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৪১৪৫.১ মি.মি.। কানাডার একদিনের বৃষ্টির রেকর্ড ৪৮৯মি.মি. যা ভ্যানকুভার দ্বীপে ইউক্লিলেট (৬ই অক্টোবর ১৯৬৭) এর কাছে ঝরেছিল। উচ্চ বৃষ্টিপাতের দ্বিতীয় অঞ্চলটি আটলান্টিক প্রদেশগুলি নিয়ে গঠিত। নোভাস্কোশিয়া এবং নিউফাউন্ডল্যান্ডের অংশগুলিতে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৫০০মি.মি.ছাড়িয়ে যায়। কানাডার অন্যান্য অংশে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা এবং ঘনঘন হারিকেনের বহির্মুখী পর্যায়ের সাথে সম্পর্কিত। হারিকেন হ্যাজেলের কারণে দক্ষিণ অন্টারিওর (১৫-১৬ অক্টোবর ১৯৫৪) অংশে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে ১৮ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত ঝরেছিল। আর্কটিক অঞ্চলগুলিতে সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত হয়। দক্ষিণ প্রেইরি অঞ্চল এবং ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার অভ্যন্তরে গভীর উপত্যকাতেও বৃষ্টি ঝরে। তবে এই অঞ্চলগুলিতেও বিচ্ছিন্ন এবং অতি ভারী বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৪ই জুলাই ১৯৬৮তে উইনিপেগে ৫ মিনিটের মধ্যে ১৭.৮মিমি বৃষ্টি ঝরেছিল। বৃষ্টিপাত একটি প্রধান বাহন যার মাধ্যমে কানাডার মিঠা পানির সংস্থানগুলি পুনর্নবীকরণ হয়। দেশের বেশিরভাগ জায়গায়, বিশেষত প্রেইরিগুলিতে, ফসলের ফলন বর্ধমান মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সময়গুলির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তবে খুব ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যা এবং ওয়াশআউট হতে পারে।

টরন্টোর মেঘ বৃষ্টি নিয়ে লিখতে বসে নস্টালজিয়ায় হারালাম। বৃষ্টি তো বৃষ্টি, তারপরও ভৌগলিক সীমারেখা আর আবহাওয়াগত কারণে বৃষ্টি অনুভবে ভিন্নতা রাখে। সময় এবং পরিবেশ বৃষ্টির আবেদন অন্যরকম হয়ে ধরা দেয়। ঋতু-বৈচিত্র্যে প্রকৃতির এই আনন্দলোকে টরন্টোর বৃষ্টিও বহুমাত্রিক প্রণোদনায় ঝরে। তাই এখানের বৃষ্টি আমেজে নিজেকেও আজকাল মানিয়ে চলি। জীবন যেখানে যেমন ঠিক সেভাবে। বৃষ্টিভেজা মন নিয়ে, বৃষ্টির অবগাহনে গ্রীষ্মটাকে উদযাপন করি।

 

আঞ্জুমান রোজী

আঞ্জুমান রোজী- ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কানাডা প্রবাসী। কবিতার প্রতি প্রেম বেশি হলেও গদ্য এবং গল্প লেখায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।এ পর্যন্ত তার তিনটি কবিতাগ্রন্থ, দুটি গল্পের বই এবং একটি গদ্যের বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বই, ‘এক হাজার এক রাত’ (২০১০) , এবং গল্পের বই ‘ মূর্ত মরণ মায়া'(২০১২) সাকী পাবলিশিং ক্লাব থেকে প্রকাশিত হয় । ২০১৩ ও ২০১৫ তে নন্দিতা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কবিতার বই ‘বৃষ্টির অন্ধকার’ এবং তৃতীয় কবিতার বই ‘নৈঃশব্দ্যের দুয়ারে দাঁড়িয়ে’।২০১৭তে গদ্যের বই অনুপ্রাণন প্রকাশনা থেকে ‘মুখর জীবনগদ্য’ এবং চৈতন্য প্রকাশনা থেকে ২০১৯এ গল্পগ্রন্থ ‘সবুজ পাসপোর্ট ও অন্যান্য নিঃসঙ্গ গল্প’ প্রকাশিত হয়।ভ্রমণবিলাসী আঞ্জুমান রোজী লেখালেখির পাশাপাশি আবৃত্তি শিল্পের সঙ্গেও জড়িত আছেন । বাংলাদেশের অন্যতম সেরা আবৃত্তি সংগঠন- ‘কন্ঠশীলন’ এবং বাংলাদেশ গ্রুপথিয়েটারভুক্ত নাঠ্যসংগঠন- ‘নাট্যচক্র’র তিনি সদস্য ছিলেন।বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ করে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নিয়ে গঠিত গবেষণামূলক আর্কাইভ 1971GenocideArchive এর সঙ্গে জড়িত আছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।