শহীদ মিনারের প্রথম শিল্পরূপ: বুদ্ধের নিরব বোধিতে সমর্পিত

আঞ্জুমান রোজী

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার যেটি পাকিস্তান পুলিশ ও আর্মি ভেঙে ফেলে।

ঐতিহাসিক বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রতীক ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রথম শিল্পরূপ এবং এর রূপকার নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক রয়েছে। আনা ইসলামের ‘নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ গ্রন্থটিতে অনেকক্ষেত্রে বিভ্রান্তিগুলো কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করা হয়েছে এবং নভেরা আহমেদের সাথে লেখকের এই ব্যাপারে কথোপকথন দলিল আকারে গ্রন্থিত হয়েছে। প্রবল কৌতূহলবশত প্রথমে হাসনাত আব্দুল হাই’য়ের “নভেরা” পড়ি; যা ছিল ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবনীমূলক উপন্যাস। এই উপন্যাসে নভেরার শিল্পসত্তা সম্পর্কে সেভাবে ফুটে উঠেনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে নভেরা আহমেদ সংক্রান্ত প্রবন্ধ এবং নভেরার ঘনিষ্ঠজনের সাক্ষাৎকারমূলক প্রতিবেদন পড়ি; তাতে শহীদ মিনার নিয়ে বিভ্রান্তিটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাখাওয়াত টিপুর ‘নভেরার রূপ’ গ্রন্থটিতে চিত্রকর সৈয়দ জাহাঙ্গীরের সাক্ষাৎকার থেকে ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে বাংলাদেশে যে বিভ্রান্তি রয়েছে এবং নভেরা আহমেদই যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রধান রূপকার তা প্রকাশ পায়। পরে গুগুল এবং উইকিপিডিয়া ঘেটে বিষয়টির সত্যমিথ্যা আবিস্কার করার জন্য তৎপর হই। তবে আনা ইসলামের ‘নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ গ্রন্থটি পড়ার পর ভাস্কর নভেরা আহমেদের শিল্পসত্তা আমার কাছে বিশেষভাবে ধরা দেয়। এই গ্রন্থটিতে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য জীবন ও শহীদ মিনারের ডিজাইন সংক্রান্ত চিত্রকর সৈয়দ জাহাঙ্গীর এবং চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলামের লিখিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রথম এবং প্রধান শিল্পরূপ ছিলো ভাস্কর নভেরা আহমেদের যা এই গ্রন্থে বিশেষভাবে বিধৃত হয়েছে; সেইসাথে বিধৃত হয়েছে শহীদ মিনার নিয়ে ভাস্কর নভেরার শিল্প ভাবনা । দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান শহীদ মিনারের শিল্প ভাবনা থেকে নভেরার শিল্প ভাবনার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

বুদ্ধের বোধিসত্ত্বে অনুপ্রাণিত ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।

‘গৌতমবুদ্ধের নিরীশ্বরবাদের অধীশ্বরে মুগ্ধ ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ। শান্তির দূত গৌতমবুদ্ধের ধরিত্রীর দিকে নতজানু ভাবমূর্তিটি ধারণ করেছিলেন নভেরা তার শিল্পচেতনায়।’ উদ্ধৃতটুকু লেখক আনা ইসলামের ‘নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ গ্রন্থ থেকে উল্লেখিত। এই অংশটুকুর মধ্য দিয়ে নভেরার শিল্পসৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশেই ফুটে উঠেছে এবং বৌদ্ধ ধর্মের বোধিসত্ত্বের প্রতি নভেরার দুর্বলতার কথাও আনা ইসলাম বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। যার প্রধান এবং অন্যতম প্রতিফলন দেখতে পাই ভাষা শহীদদের জন্য নির্মিত ‘শহীদ মিনার’এর অবয়বে, এর ব্যাখ্যা নভেরা আহমেদ নিজেই দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গটি আনা ইসলামের সঙ্গে নভেরার বেশ কয়েকবার সিটিং এর কথপোকথনে উঠে এসেছে। ‘নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ গ্রন্থটিতে নভেরা সংক্রান্ত আদ্যোপান্ত বিশেষ করে তাঁর শিল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও শহীদ মিনার প্রসঙ্গে আনা ইসলাম বিস্তারিত তুলে ধরেছেন, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। তাছাড়া লেখক ফ্রান্সে ছিলেন বিধায় নভেরা আহমেদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পাওয়াতে অনেক নতুন তথ্যও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে।

শহীদ মিনারের বর্তমান রূপ দেখে নভেরা আহমেদ বিস্ময়ে অবাক হয়েছিলেন, হয়েছিলেন চরম আহত । মিনারের মূল নকশা যেভাবে তিনি করেছিলেন তা বর্তমান নকশায় পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। মূল পরিকল্পনায় ছিল, “মিনারের মাঝের সর্বোচ্চ স্তম্ভে স্টেইন গ্লাসের কাজ থাকবে। সঙ্গে স্তম্ভের পাশের দেয়ালে থাকবে হামিদুর রহমানের ফ্রেসকো। দুপাশে ছোট স্তম্ভে থাকবে নভেরার করা ছোট ভার্স্কয। স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং চিত্রকর্মের সমন্বয়ে চেয়েছিলেন ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট বা নৈসর্গিক স্থাপত্যের ধারণা দিতে, আবেদন রাখতে” (নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে)। নভেরা আহমেদের জ্ঞান ও দক্ষতা ছিল বাইজেন্টাইন শিল্পকলা (গ্রিক ও রোমান স্থাপত্যকলার মেলবন্ধন) বিষয়ে, যে শিল্পকলায় মাতৃমূর্তিতে গড়া হয়েছিল মা-মেরিকে। এই শিল্পকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লম্বা হলঘর বা সামঞ্জস্যপূর্ণ উঠোনের ব্যবহার। তাছাড়া তিনি ছিলেন মানব ঐতিহ্যে অস্তিত্ববাদী। জ্যামিতিক ছকে ভাষা আন্দোলনের শিল্পরূপ নকশা আকারে আনতে গিয়ে প্রসস্ত পরিসরে মা-মেরির আনত মুখ নভেরার কল্পনায় ছায়াপাত ফেলে। তখন তিনি উপলব্ধি করেন, ‘আশ্রয় বুদ্ধের নিরব বোধিতে সমর্পিত। মিনারের পাঁচটি স্তম্ভের নমনীয় আনত ভাবের প্রেরণা বোধিতলে উপবিষ্ট বুদ্ধের অঙ্গুলিসংকেত৷ হাতের মুদ্রার আনত ভঙ্গিতে মূর্ত হয় একটি মাত্র মন্ত্র- শান্তি ৷ এমন দর্শনেই অনুপ্রাণিত হয়ে নভেরা শহীদ মিনারের নকশা করেন।’ একবার নভেরাকে শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলোর মানে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন,’বুদ্ধা ইন্টারেস্ট মি এ লট, আই নিড হিজ ব্লেসিং।’ বাস্তবে পাঁচটি স্তম্ভ ছাড়া আর কোনোকিছুই অবশিষ্ট থাকেনি।

তবে আমাদের কাছে বর্তমান শহীদ মিনারের শিল্পরূপের ভাবমূর্তিটি বেশি গ্রহণযোগ্যতা রেখেছে৷ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মোট পাঁচটি স্তম্ভ রয়েছে। মাঝখানের স্তম্ভটি সবচেয়ে উঁচু এবং উপরের অংশটি সামনের দিকে নোয়ানো। এই উঁচু স্তম্ভটির দুই পাশে সমান ছোটো-বড় আরও চারটি স্তম্ভ। মনে করা হয়, অতন্দ্র প্রহরী চার সন্তানকে নিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মা। পেছনে উদীয়মান লাল টকটকে সূর্য। অর্থাৎ, মাতৃভাষার অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেমন অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত। তেমনি মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় মায়ের পাশে এখনও অতন্দ্র প্রহরায় তার সন্তানেরা। আর পেছনের লাল সূর্যটা স্বাধীনতার, নতুন দিনের, অন্ধকার দূর করে আলোর উৎসারণ।

বর্তমান শহীদ মিনারের প্রথম দিকের পরিকল্পনায় ছিল স্নেহময়ী আনত মস্তক মাতার প্রতীক হিসেবে মধ্যস্থলে সুউচ্চ কাঠামো, এবং দুই পাশে সন্তানের প্রতীক স্বরূপ হ্রস্বতর দুটি করে কাঠামো। সামনে বাঁধানো চত্বর। পেছনে দেয়ালচিত্র। সম্মুখ চত্বরে শিল্পী হামিদুর রহমানের দুটি ম্যুরাল স্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল। এছাড়া ছিল বেদনাঘন শহীদ দিবসের প্রতীক হিসেবে একটি ফোয়ারা স্থাপনের পরিকল্পনা। এ নকশায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের সম্মুখভাগের বিস্তৃত এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে দ্রুত কাজ সমাপ্তির উদ্দেশ্যে মূল নকশা অর্থাৎ নভেরা আহমেদের নকশার সরলীকরণ করা হয়।

শহীদ মিনারের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা গোক- “প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়াসহ আরও কিছু সাইটে প্রথম শহীদ মিনারের সেই ছবিটি থাকলেও তা অস্পষ্ট। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক আশফাক স্বপনের ‘দ্য ফার্স্ট শহীদ মিনার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ও ঝকঝকে ছবি পাওয়া গেল। আশফাক স্বপনের বাবা সেই সময়ের ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বদরুল আলমই প্রথম শহীদ মিনারের নকশাটি করেছিলেন। আর ছবি তুলেছিলেন আরেক চিকিৎসক আবদুল হাফিজ। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, মেডিকেল ছাত্রদের উদ্যোগে বর্তমান মিনারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শহীদদের রক্তভেজা স্থানে সাড়ে ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া ভিত্তির ওপর ছোট স্থাপত্যটির নির্মাণকাজ শেষ হলে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ লেখা একটি ফলক লাগানো হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু বিকেলে পুলিশ সেটি ভেঙে ফেলে। তবে সারা দেশে ছোট ছোট অসংখ্য মিনার গড়ে ওঠে। ১৯৫৩ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হতে থাকে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও ছুটি ঘোষণা করে। এরপর নতুন শহীদ মিনার তৈরির ঘোষণা আসে। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মাওলানা ভাসানী এবং শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম। শিল্পী হামিদুর রহমানের তত্তাবধানে এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী ১৯৫৭ সালের নভেম্বর থেকে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক আইন জারি হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত লোকজন অসম্পূর্ণ এই মিনারেই ফুল দিয়েছে। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী মূল নকশা পরিবর্তন করে আরেকটি নকশা করা হয়। এরপর দ্রুত মিনারের কাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করেন বরকতের মা। এই মিনারই পরে একুশের চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী মিনারটি ভেঙে সেখানে ‘মসজিদ’ লিখে দেয়। তবে দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে নতুন করে মিনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও মূল নকশা এড়িয়ে ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতেই কাজ শেষ করা হয়। ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা হলেও বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ১৯৮৩ সালে মিনার চত্বর কিছুটা বিস্তার করে শহীদ মিনারটিকে বর্তমান অবস্থায় আনা হয়। সেই থেকে জাতি এখানেই শ্রদ্ধা জানায় (সূত্র প্রথম আলো)।’

১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রধান স্থপতি ছিলেন একজন ইংরেজ। নাম তার লেকলেন। তিনি বলেছিলেন, ভাষা আন্দোলনের সিম্বল; বাঙালি স্থপতির করা উচিত। স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে শহীদ মিনারের নকশার জন্য প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি নকশা করতে রাজি হননি। এ সময় শিল্পী হামিদুর রহমানের তৎপরতায় তিনি ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ মিলে একটা নকশা করেছিলেন। অবশ্য শহীদ মিনারের মূল নকশাটি নভেরা আহমেদের করা।

লেখক আনা ইসলামের সঙ্গে ভাস্কর নভেরা আহমেদ এবং তাঁর স্বামী গ্রেগোয়ার (১৯৮৬)

কথাসাহিত্যিক আনা ইসলামের সদ্য প্রকাশিত ‘নভেরা : বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ বইতে লেখককে শিল্পী আমিনুল ইসলামের দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের গোড়ার কথা এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে। একই বইয়ে শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর লিখিতভাবে বলেছেন, ‘আমার মনে আছে ওই সময় আমি এবং আমার বন্ধু (আমার থেকে দুই বছরের সিনিয়র শিল্পী) আমিনুল ইসলাম প্রায়ই বিকেলে আমরা যেতাম হামিদ আর নভেরার সঙ্গে আড্ডা দিতে। একদিন দেখলাম, নভেরা কাদা-মাটি দিয়ে শহীদ মিনারের একটি মডেল তৈরি করছে। মাটির প্রশস্ত চত্বর আর বেশ কিছু লম্বা সিঁড়ি সামনে। পেছনের দিকে গাছের ছোট ছোট ডাল দিয়ে, যা বর্তমানে সিমেন্টের খুঁটি আর লোহার রড দিয়ে তৈরি হয়েছে।’

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা ১৯৫৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে পাস করা হয়। সেই সময় শহীদ মিনারের মূল নকশায় একটি অংশে লেখা ছিল ‘শহীদ মেমোরিয়াল : কম্পোজার হামিদুর রহমান মুর্যালিস্ট ইন কোলাবরেশন উইথ নভেরা আহমেদ স্কাল্পটর। ’ এখানে নভেরাকে সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, নকশা পাসের বিভিন্ন কাগজপত্রের বিষয় শিল্পী হামিদুর রহমানে হাতেই ছিলো। নভেরা আহমেদ নকশা পাসের জন্য অফিসিয়াল কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে নভেরা আহমেদ বলেছিলেন, “হামিদ তো ফ্রেসকো পেইন্টিং শিখেছে! কোনোদিন স্থাপত্য বা ভাস্কর্য করেনি। সে কী করে শহীদ মিনারের নকশা করে! শ্রমিকরা জানতো না কী করে এ ধরণের কাজ করতে হয়। হামিদ ছিল সাহায্যের জন্য। কিছু আগাম অর্থ দিয়েছিল কাজের জন্য। আমি চলে আসার পর কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না।’ নভেরা আহমেদের এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাই মূলত শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে অনেক বিভ্রম সৃষ্টি করে। আনা ইসলামের বইটিতে ২০১৪ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাস্কর নভেরা আহমেদ শহীদ মিনার প্রসঙ্গে আরো বলেন,, ‘আমি আমার আইডিয়ার কথা বলেছি। কী করতে হবে বলেছি। অনেক কাজ একা করতে হবে বলে হামিদকে বলি সাহায্যের জন্য। সে আমার কথা অনুসরণ করত। কারণ, আইডিয়া আমার। সে বুঝত না আমি কী চাচ্ছি, সম্পূর্ণভাবে কী চাচ্ছি। তাই আমি যখন যা করতে বলতাম, তখন তাই করত।’ ‘নভেরা : বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ গ্রন্থটিতে শহীদ মিনারের প্রধান নকশাবিদ যে নভেরা আহমেদ তা আরো প্রকট হয়ে দেখা দিল।

সাতান্ন সালের নভেম্বরে শিল্পী হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমদের সহযোগিতায় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। একটানা কাজের মধ্য দিয়ে আটান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে শহীদ মিনারের ভিত, মঞ্চ ও তিনটি স্তম্ভ নির্মিত হয়। এর মধ্যে ভাষা আন্দোলনের উপর হাজার বর্গফুটের একটি ম্যুরাল চিত্রের দুই স্তরের কাজ হামিদুর রহমান শহীদ মিনারের বেদির নিচের ঘরে সমাপ্ত করেন। একাত্তরের মার্চ মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার ধ্বংস করার সময় ওই মূল্যবান ম্যুরালটি ধ্বংস করে দেয়। এছাড়া পরিকল্পিত শহীদ মিনারের জন্যে শিল্পী নভেরা আহমেদ তিনটি ভাস্কর্যের কাজও এই সময়ে শেষ করেন। একাত্তরের ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই অবিস্মরণীয় ম্যুরালের কিছু অংশ অবশিষ্ট ছিল যা বাহাত্তরের মিনার পুননির্মাণের সময় কে বা কারা সম্পূর্ণ মুছে ফেলে।

হামিদুর রহমান মূলত চিত্রকর এবং ম্যুরাল শিল্পী ছিলেন৷ লন্ডনে ফ্রেসকো পেইন্টিং অধ্যায়ন করেছেন। তাঁর চর্চা ছিল চিত্রকর হিসেবে। ভাস্কর্য গড়ার ন্যুনতম অধ্যায়ন ও অনুশীলন অভিজ্ঞতা হামিদূর রহমানের ছিল না। মৃৎশিল্প, ভাস্কর্য কোনো ত্রিমাত্রিক মাধ্যমে তিনি কখনো কাজ করেননি। তাঁর পক্ষে জ্যামিতি, ব্যাকরণ মেনে ত্রিমাত্রিক নকশা রূপায়ন সম্ভব নয়। তিনি করেছিলেন পাশের দেয়ালের ম্যুরাল। নভেরা লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটসে ভাস্কর্য বিষয়ে চারবছর অধ্যায়ন শেষে ডিপ্লোমা পেয়েছিলেন। ত্রিমাত্রিক শিল্পের ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। তাঁর পক্ষেই শহীদ মিনারের নকশা করা সম্ভব। এই প্রসঙ্গে নভেরা আহমেদকে প্রশ্ন করা হলে বেশ অনেকক্ষণ নিরব ছিলেন। মৃদুভাষী, সংযত এবং আত্মপ্রত্যয়ী নভেরা আহমেদ বহুবার সহজ স্বাভাবিক স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন,’ হামিদ ভালো বন্ধু ছিল।’ কিন্তু বারংবার প্রশ্নের একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,’হামিদ তো ভাস্কর নয়। সে কী করে ডিজাইন করে! আমি মিনারের একটি মডেল করে দিয়েছিলাম। হামিদের কাছেই আমার করা ড্রয়িংসহ সব কাগজপত্র ছিল।’ ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক আইন জারি হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সেই কাগজপত্র ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়ে অন্য ইতিহাসের রূপ নেয়। যার কালক্রমে মূল নকশার রূপও বদলে যায়, বদলে যায় শহীদ মিনার নিয়ে নভেরা আহমেদের শিল্প ভাবনা।

শহীদ মিনার শুধু বাংলা ভাষা আন্দোলনেরই প্রতীক নয়; শহীদ মিনার বাংলাদেশের বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক। সেইসাথে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একুশের চেতনায় দণ্ডায়মান এই প্রতীক বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে চলার শক্তি যোগায়। তাই বলছি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা এবং প্রধান নকশাকার হিসেবে ভাস্কর নভেরা আহমেদের নাম স্বীকৃতি দেয়া, আজ দেশের মানুষের গুরু দায়িত্ব হয়ে পড়েছে।

 

আঞ্জুমান রোজী

আঞ্জুমান রোজী: ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কানাডা প্রবাসী। কবিতার প্রতি প্রেম বেশি হলেও গদ্য এবং গল্প লেখায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।এ পর্যন্ত তার তিনটি কবিতাগ্রন্থ, দুটি গল্পের বই এবং একটি গদ্যের বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কবিতার বই, ‘এক হাজার এক রাত’ (২০১০) , এবং গল্পের বই ‘ মূর্ত মরণ মায়া'(২০১২) সাকী পাবলিশিং ক্লাব থেকে প্রকাশিত হয় । ২০১৩ ও ২০১৫ তে নন্দিতা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কবিতার বই ‘বৃষ্টির অন্ধকার’ এবং তৃতীয় কবিতার বই ‘নৈঃশব্দ্যের দুয়ারে দাঁড়িয়ে’।২০১৭তে গদ্যের বই অনুপ্রাণন প্রকাশনা থেকে ‘মুখর জীবনগদ্য’ এবং চৈতন্য প্রকাশনা থেকে ২০১৯এ গল্পগ্রন্থ ‘সবুজ পাসপোর্ট ও অন্যান্য নিঃসঙ্গ গল্প’ প্রকাশিত হয়।ভ্রমণবিলাসী আঞ্জুমান রোজী লেখালেখির পাশাপাশি আবৃত্তি শিল্পের সঙ্গেও জড়িত আছেন । বাংলাদেশের অন্যতম সেরা আবৃত্তি সংগঠন- ‘কন্ঠশীলন’ এবং বাংলাদেশ গ্রুপথিয়েটারভুক্ত নাঠ্যসংগঠন- ‘নাট্যচক্র’র তিনি সদস্য ছিলেন।বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ করে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নিয়ে গঠিত গবেষণামূলক আর্কাইভ 1971GenocideArchive এর সঙ্গে জড়িত আছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।