জুনান নাশিত: করোনা কালের পাঁচটি কবিতা

জুনান নাশিত

১.
অশ্বখুর

সবুজ রূপান্তরের রূপকথার গল্পে নেই কোন অশ্বখুরের ডাক!

মেহগণি সভ্যতার দিনে আবলুসী ভাবনাগুলো রেললাইনের কিনার ধরে
গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেছে ওই দূর তেপান্তর ছাড়িয়ে
অথচ কোন একদিন ছাপাখানার মোড়ে
ঈশপের চোখের জল আর ইছামতী নদীর ভেঙে পড়ার কাহিনীগুলো ভীষণ জ্বলজ্বলে ছিল
ঠিক আজকের মতো, শারিরীক দূরত্বের এই দিনে
ইমোজির শেষ চিহ্নে যখন দীর্ঘশ্বাসের কলোরল
ইচ্ছেঘুড়ির সুতোর ডাকে ছিন্নভিন্ন দৃষ্টিসীমার বৈভব
তখন বিছানায় লেপ্টে থাকা কোন এক বুকের ঘুঙুর দশদিগন্ত মাড়িয়ে
ঠাঁই নিল ব্যালকনির ছায়াভেজা নিরেট রোদ্দুরে।

একদিন রোদ্দুরের ওড়াউড়ি দেখে
পাখিরাও হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলো সূর্যের ঠিকানায়
ঠিক যেমন কোয়ারেন্টিন ভাঙা অশ্বখুরের ডাকে লাভার উদগীরণও
থেকে থেকে দিক বদলায়!

সবুজ রূপান্তরের রূপকথার গল্পে
তাই নিঃশব্দ নদীও তার জানালা খুলে দেয়
কান পাতে, ভাবে, এইবুঝি ভেসে এল অশ্বখুরের ডাক
সমুদ্র মোহনায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে সেও
শারিরীক দূরত্বের সীমা ভেঙে
ভেসে যাবে উজানি ভাটির খরতর দাঙ্গায়।

২.
কোভিড ১৯

ক.

কোভিড ১৯
খুনি তুমি
গিলে খাও ফুসফুস!

পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের উস্কে ওঠা বিরোধের রাস্তা ধরে
সভ্যতার শ্বাসনালী বেয়ে খামচে ধরো নিঃশ্বাসের অগণিত চৌকাঠ।

কোভিড ১৯
নিথর দেহের পাশে তোমার নীলাভ হিংস্রতা
যেন লকলকে এক অগ্ন্যুৎপাতের কাল
লটকে আছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সূঁচালো ব্যগ্রতায়
ঘোরতর দু:সময়ের উত্তপ্ততায় দ্রুতগামী তুমি
কেড়ে নাও জলতরঙ্গে নেচে চলা ফড়িঙ বাতাস।

তুমি হাত থেকে সরিয়ে দিয়েছো হাত
চোখ থেকে চোখ
সান্নিধ্যের উষ্ণতায় বাজিয়েছো জিঘাংসার বীণ
টইটই করে ছুটে চলা মানুষের অন্তহীন পথে
ছুঁড়ে দিয়েছো বিষবাষ্পের তীর;
দুলে ওঠা সুতোর শরীরেও ছড়িয়ে দিয়েছো ড্রোন হামলার ত্রাস

খ.

উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম
বৈশাখি ঝড়ের তান্ডবে কান্নাকাতর হায় অবরুদ্ধ প্রতিটি দিন!
কোভিড ১৯
শোন তবে
আজ যে শিশু কেঁপে কেঁপে ওঠে
ভূমিষ্ঠ হবে সেও একদিন ভিন্নতর এক জীবনের ঘোরে
সবুজ পাতার ফাঁকে নরম আলোর রেখা ধরে
যে ধুলিকণাগুলো উড়ে উড়ে গান গায়
নিঃশব্দ নিবিড়ে
তার শব্দের স্রোতে ভেসে ভেসে
সেই শিশু জুড়াবে ক্ষতমুখ
কুড়াবে শরৎ আয়ুর পাশে পড়ে থাকা
গীতবিতানের নন্দিত উৎসসুখ।

 

৩.

অচেনা অসুখ

আঙুলে রক্তের দাগ শুকিয়ে কাঠ
হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ঘষি সারাদিন
ওঠে না-

এতোদিন ভুলেছিলাম পাখির ডাক
ঝকঝকে রোদ, ছায়ার গুঞ্জন
এখন বারান্দার দোলনায় খেলা করে তারা
জানালা গলিয়ে ঢলে পড়ে নরম বিছানায়

তবু আলো নেই ঘরে, চোখে নেই কোমল বিদ্যুৎ
মায়াবী মুখোশগুলো ভরে গেছে বিষের উত্তাপে
বিষ ধুতে কিনে আনি স্যানিটাইজার, ব্লিচ
ঝকঝকে রোদ আমাকে শাসায়, এভাবে নয় ওভাবে!

ঘুরে ঘুরে পাখির পালক খুঁড়ে জলছায়া দেখি
নীরব কম্পন দেখি সবুজ পাতার ফাঁকে
আয়নার নির্জনতায় মিশে থাকা শোক
রক্তাক্ত আঙুল বেয়ে গড়াতে থাকে
যেন তারা পরজীবী শ্লোক –

ডুবে আছে গুরুতর এক অচেনা অসুখে।

৪.
করোনাকালের মা

ফাটলগুলো চিহ্নিত ছিল!

কাঠঠোকরার চোখের মনিতে আঁকা ছিল রমনার সবুজ;
এমনকি ভার্চুয়াল মিটিংয়ের আগে তড়িঘড়ি প্রস্তুতি বৈঠকেও
বুলবুল পাখির রটনার বিরুদ্ধে আইনের খসড়া তৈরি করাই ছিল
তবু করোনা রোগী পুড়ে মারা গেলে
তদন্ত বিভাগের কাছে দেয়া সাক্ষ্যে
উল্টো কথাই শুনিয়েছিল
যমুনার পাড় ধরে ছুটে চলা একটুকরো দমকা বাতাস।

তাই দোয়েল আর ময়নার বিবৃতিতে উঠে এলো
কোয়ারেন্টিন ভাঙা লাল পিঁপড়ে দলের ভেসে যাওয়ার গল্প
আর ঘরবন্দী মানুষগুলোর করুণ করোনাগাঁথা
এক অন্ত:সত্ত্বা নারীর পৃথিবী কাঁপানো বিপন্নতাবোধ
তুলতুলে ছোট্ট রিমকির বারান্দায় দাঁড়িয়ে
পাখিদের সাথে সখ্য রচনার দূরাভাসগুলো
অনলাইন সংস্করণে ইশতেহারের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে গেলে
চাঁদের পালকি চড়ে অসংখ্য করোনাঢেউ
ফাটল গলিয়ে ছড়িয়ে পড়ল শহরজুড়ে
এমনকি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরেও।

তারপর চল্লিশ বছরের সাদাকালো এক বক্ররেখা!

তার ওপর দাঁড়িয়ে মায়ের ছবি হাতে রিমকি ভাবে
আইসোলেশানে পুড়ে যেতে যেতে মায়ের মুখ
বেঁকে গিয়েছিল ঠিক কতোদূর?
যতোটা তার হাঁটুর ভাঁজে ‘দ’ চিহ্ন ফুটে ওঠে,
ততোদূর?

ফাটলগুলো আজ বহুদূরের… অচিহ্নিত..

নির্জন গৃহকোণে উপচে ওঠা দীর্ঘশ্বাসে দাঁড়িয়ে
রিমকি আবারো ভাবে,
যাপিত জীবনের স্বেদবিন্দুতে
যদি ছিঁটেফোঁটাও জোছনার কণা থাকে
তারার গাম্ভীর্যে সে ফিরে পাবেই
তার করোনাকালের মাকে।

 

৫.
জন্মদিনের ভার্চুয়াল গল্প

নীল ফড়িঙের জন্মদিন আজ
মানকচু গাছের নিচে তেপায়া টেবিলে রাখা আছে ফ্রোজেন কেক
নীল ফড়িঙের গায়ে ডোরাকাটা বাঘের ছাল
কোয়ারেন্টিন ভেঙে জন্মদিনের উৎসবে যোগ দিল
লাল পিঁপড়ের দল, খয়েরি পতঙ্গ, কেঁচোখেকো কয়েকটি মোরগ
লাইভ সম্প্রচারে দূর থেকে যোগ দিল
রঙিন দুটি প্রজাপতি আর ঈশপের গল্পের সেই কুকুর ও কাক।

নীল ফড়িঙের পায়ে অজানা ঘোর
অনুভূতি জানাচ্ছে সে তামাশার খরধ্বনিতে
এমন সময় আম্পান গতিতে ছুটে এলো এক দূরন্ত কিশোর
হাতে তার পাটখড়ি
খড়ির আগায় জঙ্গল হাতড়ে আনা একবিন্দু গোলাকার তপ্তরোদ
মুহূর্তে আটকে গেল নীল ফড়িঙের পা
লাইভ সম্প্রচার যারা দেখছিলেন তাদের হা হা ধ্বনি আর নীল ফড়িঙের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল
দুপুর আড়াইটার নিয়মিত করোনা ব্রিফিংয়ের শোকার্ত কান্নায়।

নীল ফড়িঙের জন্মদিন ছিল আজ
কীঅ্যাক্টাবস্থা হলো
ভেবে দেখুন তো, হায়!

 

জুনান নাশিত

 

জুনান নাশিত, কবি ও প্রাবন্ধিক
উত্থান: নব্বই দশকের শেষ দিকে
জন্ম: ১ অক্টোবর, ১৯৭৩, কুমিল্লায়
পেশা: সাংবাদিকতা, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত।
শিক্ষা: অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
প্রকাশিত গ্রন্থ: কাব্যগ্রন্থ: কুমারী পাথর, অন্য আলো অনেক দূরের, পলকাটা অন্ধকার, বাতাসে মৃত্যুর মায়া, কাঁটাঘন চাঁদ, জলন্ত ভ্রুণ।
প্রবন্ধ: রোগশয্যা ও রবীন্দ্রনাথ, দুই বাংলার কথা ও কাব্য
সম্পাদনা: আবুল হোসেন, কবির পোর্ট্রেট
ছড়াগ্রন্থ: ব্যাটে বলে ছক্কা, হরেকরকমবা।
কিশোর উপন্যাস: বেগুনি অ্যাম্বুলেন্স
কিশোর গল্প: ভূতের নাতি ওঁ চিঁ
গল্পগ্রন্থ: তিথি ও একটি আঙুল
পুরষ্কার: মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক ২০১৬জুনান
নাশিত, কবি ও প্রাবন্ধিক

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।