জুনান নাশিতের গুচ্ছ কবিতা

সমগ্র

ভুলে যেতে চাইনি কিছুই
টুকটুকে রঙের ভেতর থেকে নীলাভ নিবিড়
ছিনিয়ে নিতে চাইনি কখনও
মধ্যরাতের বেহালা বাদন যেদিন গড়িয়ে পড়েছিল
ভোরের বাতাসে
সেদিনই তর্কাতীত এক অন্ধকার দিন
আমাদের নিয়ে গেল করুণ ক্লান্তির পথে
সেদিনই অশ্রুপাত
সেদিনই নিস্তব্ধতার খাপে হৈ হৈ জলন্ত কলরোল।

ভুল বুঝনা প্লিজ! আমিতো তোমার পায়েই পা রেখে
ভেঙেছি ছায়ার প্রপাত।

আমাদের সমগ্র আজ নিম্নগামী শোক
তাকে বয়ে যেতে দাও
মিশে যাক ব্যাকুল কুন্ঠিত সম্মোহনে।

 

বিরোধ

সপ্তসিন্ধু দশদিগন্তের মলাটটা ছিঁড়ে গেছে
লাগাতে পারোনি
আজ কাল না হয় পরশু….
চুপসানো সময়ের পিঠে চড়ে
ধারালো ছুরির গতিস্নিগ্ধতায় জীবনের বাঁকগুলো শুধু বদলালো
চোখের কোটরে স্থিত হলো মৌলিক বিরোধ
ভৌতিক প্রচ্ছদ জুড়ে পরষ্পরে সঙ্গচাতুর্যের যে খোলস
এতোদিন দিগন্তবিস্তারী ছিলো
তা-ই আজ গভীরতাকামী; ভূমির অতল খাঁজে অন্ধকারমুখী।

অশ্রুত কান্নার মেঘে কী ভীষণ ভারী আমাদের ইচ্ছেমায়া
ছেঁড়া মলাটের মতো নিবীর্য নিরন্ন
বুকশেলফের কোণে পড়ে থাকে স্পর্শহীন
জমে থাকা বেখেয়ালী ধুলোর মতন।

 

বর্ষাতি হারানো কোন এক ভোরে

কবিতার আনন্দিত গল্পে
নাক গলানোর স্বভাব গেলো না দোয়েল পাখির

বর্ষাতি হারানো কোন এক ভোরে ভেসে আসে
কত্থক নৃত্যের তাল
তখনই পাখিটি উড়াল খোঁজে
হাতের তালুতে নাচে শব্দহীন মুমূর্ষু পাথার

ঘন রাতে দূরের আকাশ আরো খইফোটা হলে
বর্ণগুলো ছইভাঙা প্রলাপের মতো
অযথাই চোখের দুপাশ ঘিরে থাকে
পাখিটাও শুন্যে কাঁদে
নি:স্ব দিন কেবলই নি:স্বতর

একদিন পাখিটি ফুড়ৎ !
কবিতার গল্পে তখন ক্রমেই রক্তনালা
ক্ষোভ আর জিঘাংসার হাড়-মজ্জা খুঁড়ে
কবিতাও ডুবতে থাকে…

পৃথিবীও প্রলাপে বিলীন হলে
পাখিটির গল্প চোখ সুরধ্বনি খোঁজে
বৃষ্টি নামে
বর্ষাতি হারানো ভোর পায়ে পায়ে কাছে আসে
রক্তাক্ত শিশিরে পোড়ে নিদ্রাহীন কঠিন সন্তাপ।

 

ভ্রমণ

(উৎসর্গ:অগ্রজ কবি ফেরদৌস নাহারকে
যিনি নিমগ্ন আজীবন কবিতার ঘরে)

দৃশ্যত ভ্রমণে থাকে না কোথাও কেউ!

স্বররিপিগুলো উড়ালের প্রস্তুতি নিতেই
কাঠঠোকরার দল নেমে এলো ঘাসের জমিনে
সেখানে প্রচুর লাল কাঁকড়ার সারি
মার্চপাস্ট করে চলে যাচ্ছে দূর সমুদ্রের দিকে..

অবতরণের হাওয়ায় ভেসে
নগরীর সব বাদামী উৎসব
থেমে গেছে
দূরন্ত পাখিরা তাই কথাহীন গল্পগুলো খুঁটে খুঁটে
তুলে আনে
অযাচিত অন্ধকার স্মৃতি!

ডাকপিয়নের কড়িগোনা দুপায়ে ইচ্ছের পাশে
একটিও সবুজ বাতাবী নেই
কেবলই সাদাফুল আর মার্চপাস্ট
কেবলই ঘাসের জমিন আর জেটলগ;

কাঠঠোকরা অথবা লাল কাঁকড়ার দল
নীলাভ ঘাসের ডগা পাড়ি দিতে দিতে ভাবে
হাতের তালুতে গ্যালাক্সিমন্ডল নিয়ে
তারাও হয়তো পৌঁছে যাবে কোন একদিন
বহুদূর শাশ্বতের যুগল কিনারে।

কথা

কথা জেগেছিল
কাল সারারাত
ঋতুর বাঁকানো স্বরে
অগভীর রাতের মতোন

যে কথারা ঘাইমারা বেদনার বোধে তীক্ষ্ণ করে
নিচু জলে নুয়ে আসা
জীবন জড়ানো মৃত্যুর দুকূল
সে কথার পিঠে নিশ্চুপ বিদ্রুপ
সময়ের কণা বেয়ে ধূ ধূ শূন্যতায় মিশে যায়
মিশে থাকে চলমান পায়ে
দিনানুদিনের অমার্জিত ব্যস্ততায়
সেসব ছাড়িয়ে জিজ্ঞাসার বিরতিতে
কেবল একটি কথা চাঁদ বেষ্টিত মেঘের মন্দিরায়
তির তির কাঁপে,

ঘৃণা কিংবা পাপ অথবা ধিক্কার যা কিছু থাকুক
কথার শরীরে কথারাই বেজে যাক।

 

জুনান নাশিত

জুনান নাশিত, কবি ও প্রাবন্ধিক
উত্থান: নব্বই দশকের শেষ দিকে
জন্ম: ১ অক্টোবর, ১৯৭৩, কুমিল্লায়
পেশা: সাংবাদিকতা, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত।
শিক্ষা: অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
প্রকাশিত গ্রন্থ: কাব্যগ্রন্থ: কুমারী পাথর, অন্য আলো অনেক দূরের, পলকাটা অন্ধকার, বাতাসে মৃত্যুর মায়া, কাঁটাঘন চাঁদ, জলন্ত ভ্রুণ।
প্রবন্ধ: রোগশয্যা ও রবীন্দ্রনাথ, দুই বাংলার কথা ও কাব্য
সম্পাদনা: আবুল হোসেন, কবির পোর্ট্রেট
ছড়াগ্রন্থ: ব্যাটে বলে ছক্কা, হরেকরকমবা।
কিশোর উপন্যাস: বেগুনি অ্যাম্বুলেন্স
কিশোর গল্প: ভূতের নাতি ওঁ চিঁ
গল্পগ্রন্থ: তিথি ও একটি আঙুল
পুরষ্কার: মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক ২০১৬জুনান 
নাশিত, কবি ও প্রাবন্ধিক

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।