শামীম আজাদের ভ্রমণগদ্য: ডার্লিং ধ্রুবাদি

শামীম আজাদ

চোখ বুঁজে ধ্রুবাদি’র ভয়েস রেকর্ড শুনে থ হয়ে যাই। কী করে সম্ভব! দিদি বয়স্ক অন্ধদের গার্ডেন নিয়ে গিয়ে স্পর্শের মাধ্যমে গাছ চেনান। বৃটিশ বোটানিক্যাল-সোসাইটি ওর যে ওডিও রেকর্ড চেয়ে নিয়েছে এটি সেই অডিও। এই নিদারুণ লকডাউনের সময় প্রতিবন্ধী মানুষকে অরণ্য ঘুরিয়ে আনলেন শুধু কথায় কথায়! কি অসাধারণ এই শ্রুতিভ্রমণ।

করোনাকালে কত কি বিকল্প হচ্ছে ঘরবন্দী মানুষের জন্য। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংবাদ কিছুই বাকি নেই। সবই চলে এসেছে অন লাইন। কিন্তু যারা প্রতিবন্ধী তাদের জন্য কি হচ্ছে? এরা যে ঘরে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আত্মহত্যার খবরও পেয়েছি।

আমাদের ধ্রুবা’দি, বাংলাদেশের বোটানিস্ট ফাল্গুনীএন্দ সরকার ইংল্যান্ডে এই কাজটি করেছেন। তিনি ইয়র্কের ডার্লিংটনে একটি বোটানিক্যাল সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবা দান করেন। ভ্রমণকারীদের প্রকৃতিতে নিয়ে গাছের সংগে পরিচয় করিয়ে দেন। এখন তারা প্রতিবন্ধীদের জন্য বের করেছেন এই শ্রুতিভ্রমণ। আমিও চোখ বন্ধ করে তাঁর কথায় কথায় ঘুরে এলাম আমার প্রিয় স্থান ইয়র্কের টীজডেল। ভাগ্যবান আমি, যা দেখেছি চর্মচক্ষু দিয়ে তা মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। সে ছিল বড় অদ্ভুত সময়। কিন্তু তারও আগে বলি আমি কীভাবে ইয়র্ক নিয়ে আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম।

তখন স্কুলের ছুটি ছাঁটা কিংবা উইকএ্যান্ড হলেই পড়ানোর চাকুরীতে ক্ষ্যান্ত দিয়ে ছুটতাম আমার লেখার চাকুরীস্থল সিটি লাইব্রেরী সান্ডারল্যান্ড আর্টস সেন্টারে। যেদিন যাবো সেদিন বেরুবার সময়ই সব নিতে হতো। কাপড় চোপড় টুথ ব্রাশ কম্পুটার। ক্লাশ শেষ করে ক্লাসরুম থেকে সর্বশেষ শিশুটিও মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে গেলে দ্রুত সব গুছাতাম যে দিন স্কুল খুলবে তার জন্য। আজ ভাবতে অবাক লাগছে টানা দু’বছর আমি কাজই করে গেছি। কোন অবসর যাপন করিনি। কিন্তু লেখার কাজের চাকুরী আর পড়ানোর কাজের মধ্যে ফারাক ছিলো। লেখার কাজ আমার কাছে ছুটির মত মজা লাগতো। মনে হতো যেন হলিডে।

কাজ থেকে হেঁটে হোয়াইট চ্যাপেল আন্ডারগ্রাউন্ড যেতাম। সেখান থেকে লন্ডন কিংস ক্রস ষ্টেশন। আর নেমেই স্নান সেরে নিতাম। পয়সা দিয়ে স্নানের জন্য ফক্‌ফকা তোয়ালে সাবানে নিয়ে বাথরুমে পাওয়ার শাওয়ারে স্নান করে ঘষে ঘষে দেহ থেকে বের করে নিতাম কাজ ও ক্লান্তির নিকোটিন। যখন বেরিয়ে আসতাম আমি অন্য মানুষ।রেডি ফর দা রাইটিং মিশন! নির্ধারিত সময়ে নিউ ক্যাসেলের ট্রেনে উঠেই টেবিলের উপর লেখার সরঞ্জাম সাজিয়ে জানালা দিয়ে চোখ মেলে দিতাম। পা গলে যেতো, চোখ ভরে যেতো সবুজ কাজলে।

ট্রেন এগুতে থাকলে, বসন্তে দেখতাম কিভাবে সবুজ থেকে সবুজান্তরের দরজা খুলে যাচ্ছে। সবুজের এতো বিভিন্ন শেড পাশাপাশি লন্ডনে দেখিনা। এ শুধু হাল্কা সবুজ আর গাঢ় সবুজ না। এরা সর্ষে সবুজ, ওয়াইন সবুজ, সূর্য সবুজ, বন্য সবুজ, হলুদ সবুজ, ব্যথার মত সবুজ, প্রেমের মত সবুজ, কলাপাতা সবুজ, চিতা পাখি সবুজ, ক্যামোমাইল সবুজ, কোরিয়েন্ডার সহজ সবুজ! আমি তাকিয়ে তাকিয়ে সব সবুজের নাম করণ করতাম অনেকটা সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে। রেটিনার রঙে দেখতাম পশুদের চারণ।

শীতের সময়ে মনে হতো কোট পরা ঘোড়ারা মাখনের থাবার মত মেষের সংগে দিব্বি হাই হ্যালো করে চলেছে।নির্বাচিত ঘাস খাচ্ছে ওদের বাচ্চারা। তীব্র ও গাঢ় সবুজ ঢালে উপুড় করা সোনার বাটির মত ফুটে থাকতো ড্যাফোডিল । ঢাল থেকে মেকাপ রিমুভার উলের গোলার মত গড়িয়ে যাচ্ছে মেষমন্ডল।
এই ছিল আমার মনের খেলা। সেও ছিল বড় কৌতুককর।

পথে পড়তো ইয়র্ক। তারপর ডার্লিং ডার্লিংটন। লেখা থামিয়ে কফি নিয়ে দেখতাম শ্যাওলা রঙা সুউচ্চ প্রাচীন লোহার ছাদ ও বিশাল বীম। ফুলের ঝাড়ে ঝুমুর কম্পন। থামলে এরই সেখান থেকে দামী লাগেজ ক্যারিয়ার সহ উঠে আসতেন ধবধবে সাদা চুলের রিটায়ার্ড সম্ভ্রান্ত দম্পতি। ষ্টেশন ছেড়ে যাবার সময় দেখতাম দূরে গাছে ও কনিফারে কোমর বাঁকিয়ে চলে যাচ্ছে টীজ নদী। এখানেই না লোকোমটিফ ট্রেন, স্টিম এঞ্জিন এর শুরু! কয়লা বহন করতে করতেই এর উন্নয়ন আর এক সময় বিস্ময়ের মত তাই হয়ে ওঠে সব কিছুরই ব্যাপক বাহক ।

আমার খুব সামারে কনিফার ও কুসুম দেখতে দেখতে, ইচ্ছে হত হঠাৎ করে নেমে যাই নর্থ ইয়র্কশায়ারের রূপবতী এই শহরে। কিন্তু কেউ যে আমার অপেক্ষায় নেই!

তো এতগুলো বছর পর ডার্লিংটনে ট্রেন থামতেই দেখি আমার জন্য অপেক্ষায় দিদি! কচি কলাপাতা শার্ট, গ্রে ট্রাউজার্স, কোট ছাড়া বুট পরা ধ্রুবা দিদি দু’হাত বাড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছেন। কার পার্কে অপেক্ষারত সৌম্যদর্শন অজিতদা। হ্যান্ড শেক করতেই তিনজন হৈ হৈ করে উঠলাম। মাঝে যে কতদিন তাদের যে দেখিনি মনেই হল না।

আমি লন্ডন থেকে পালিয়ে এসেছি। ওখানে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। বলছি ২০১৮ র কথা। মুসলিম নামধারী জানোয়ারদের হামলায় সেবার বিলেতের নিরীহ ফরাসী, ইংলিশ, স্প্যানিশ আরো কত জাতির মানুষ অকাল ও নৃশংস মৃত্যু হয়েছে। ম্যানচেস্টারের মারাত্মক জঙ্গি হামলার ব্যাপক ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এ কাণ্ড। এর জন্য থেমে গিয়েছিল আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণা পর্যন্ত। এদিকে বাংলাদেশ নিয়েও দিনকে দিন আরো বিচলিত হয়ে উঠছিলাম। সুন্দরবন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অনড় অবস্থান, তাদের নমনীয় মনোভাবের জন্য পাঠ্য পুস্তকের ক্যারিকুলামে সাম্প্রদায়িক থাবা এবং সবশেষে বাংলাদেশে হাইকোর্টের সামনের স্থাপত্যের স্থান পরিবর্তন – নতুন নতুন অশান্তি সৃষ্টি করেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে অশান্তি গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে? শুধু মনে হচ্ছিল, কোথায় শান্তি পাবো কোথায় গিয়ে!

তো ওদের গাড়িতে করে ডার্লিং শহর দেখে দেখে ওদের বাড়ির দিকে চলতেই আমি প্রশমিত হতে থাকলাম। এদের একজন অবসর জীবনে ফুল টাইম শিল্পচিন্তক আর আরেকজন প্রকৃতিপ্রেমিকা। শুরু হল আমার ইন্ডাকশন। হাউ গুড ইট ক্যান বি! বাড়িতে ঢোকার আগেই শুরু হয়ে গেল তিনজনের এ্যলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড নিয়ে লুই ক্যারল আলোচনা পর্ব। দেখলাম মঙ্ক টেরেসে গাছের আড়ালে তার জন্ম বাড়ি, তার পিতা ডডশন লতাগোলাপ ছাওয়া যে চার্চের দেখভাল করতেন সেটা ও সামনের ঊনবিংশ শতকের নাম না জানা মসে মাখামাখি কবরগুলোর এপিটাফ। গল্পের এ্যলিসের সুড়ঙ্গ থেকে শুরু করে আলোচনা জমে উঠলো ক্যারলের গোপন জীবন নিয়ে। সেই যে হঠাৎ করেই এ্যলিসের পরিবার তাকে আর কিশোরী এ্যলিসের সঙ্গে দেখাশোনা বন্ধ করে দিয়েছিলো। আর যে ক্যারল নিত্য ডায়েরী লিখতেন, এঁকে এঁকে সব বন্দী করতেন তা তার মৃত্যুর পর কিছু পাতা ছেঁড়া পাওয়া গেছিলো। কিছু ছবিও নাকি পাওয়া গেছিল যেখানে উদোম গায়ে ছোট ছেলেমেয়েরা দাঁড়ানো। তাঁরই নাকি তোলা! চার্চের ভেতরের অসাধারণ স্থাপত্য দেখতে দেখতে আমার একটা সন্দেহ হল, লুইস কি নিজেই শিশুকালে এই চার্চের কারো দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন? বলা যায় না। ধর্মের নামেই তো চলে ধর্মের ধর্ষণ।

চার্চ ও দিদির বাড়ির পাশেই সেই টীজ নদী। যেন এক টিন এজার। অনেক বড় না আবার ছোটও না। জলের রঙ মেটে সবুজ। পাড়ে পাড়ে মাথায় ছাতা ধরার সাইজের কচু পাতার মত বিশাল বিশাল বাটারবার পাতা। প্রাচীন কালে নাকি ঘরে মাখন তুলে নেবার পর কোন ঠান্ডা বা ভেজা জায়গায় সেই মাখনটুকু জমিয়ে বার বানিয়ে এই পাতা মুড়ে রাখা হত। তাই এর নাম বাটারবার। নদীর পাড়ে আরো আছে সুন্দর সুন্দর শ্যাওলা ও হ’থর্ণ, এল্ডার ফ্লাওয়ার ফুল। এখানে কনিফার দেখলাম না। নদীর একদিকে চুল এলিয়ে উইলো আর অন্যদিকে আমাদের পেছনে গহীন গহন প্রাচীন গন্ধ মাখা ঢাল। নাকে সে লাগলো তীব্র সে ঘ্রাণ। বোটানিস্ট দিদি একটানে একটি পাতা হাতে দিয়ে বললেন ডলে দেখো। ডলতেও হলোনা ছেঁড়া পাতা থেকে ভুর ভুর করে বেরুতে লাগলো এল্ডার ফ্লাওয়ার ড্রিংকের সুগন্ধ। আমি নাক চেপে ধরতেই দিদি কচি কলাপাতা হয়ে হাসতে থাকলো। আর সঙ্গে সঙ্গে আমার রোকেয়া হল জীবনের জিগরি দোস্ত শ্রাবণীর কথা মনে হল।দু’জনেরই হি হি করা হাসি। এত মিল! কি করে সম্ভব!

আজ দিদির কণ্ঠে মনে হল সত্যি সে সময়টাতে আবার ঘুরে এলাম। ইস্, একবার যদি শ্রাবণী সহ যেতে পারতাম !

জুলাই ২০২০
লন্ডন

শামীম আজাদ

বৃটেনে সর্বাধিক জনপ্রিয় বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত । তিনি বাংলা ও ইংরেজী – দু’ ভাষাতেই লেখেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক – এর সবই তাঁর লেখনীর ক্ষেত্র। প্রকাশিত গ্রন্হ সংখ্যা ৩৭। তিনিই প্রথম বাংলাদেশী কবি ১৯৯৭ এ ভারতের স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে আমেরিকার বিখ্যাত নিউইয়র্কার সাহিত্য সাময়িকীতে যাঁর কবিতার অনুবাদ ছাপা হয় এবং ২০১২ সালে বিশ্ব বিখ্যাত এডিনবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালে তিনি কবিতা ও গল্প পরিবেশন করেন। বিদেশে ও দেশে অন্যান্য নানাবিধ সম্মাননার সঙ্গে বাংলা একাডেমীর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পুরস্কারে ভূষিত।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।