রিয়াদ চৌধুরীর গল্প: নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান

তারা– হীরের মত জ্বলজ্বল করছে পুরোটা আকাশ জুড়ে। চাঁদও আছে, আকাশের এক কোণে, অর্ধেকটর মতন। সেই অর্ধেক চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘুম-ঘুম শহরটার বাতি নেভানো ঘর-বাড়িগুলোর উপর। চারপাশে বাতাসের বয়ে চলার শব্দ ছাড়া আর কোন সাড়া-শব্দ নেই। চাঁদের আবছা আলোয় ভুতুড়ে ছবির মতন লাগছে শহরটাকে।

হঠাৎ-ই নীরবতা ভেঙ্গে খসখস শব্দ। মানুষের হাঁটার শব্দ।কেউ একজন সরু রাস্তাটা দিয়ে এগিয়ে আসছে।চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। পা চালিয়ে বেশ দ্রুত হেঁটে আসছে মানুষটা।আরও কাছে আসবার পর ঠিকভাবে দেখা গেল। আগাগোড়া কালো পোশাক পরা একটা লোক।কালো প্যান্ট, কালো শার্ট, তার উপর কালো সোয়েটার। জুতোও কালো বোধহয়।অন্ধকারে মানুষ না,বরং একটা ছায়ার মতন মনে হচ্ছে লোকটাকে।

চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায় সে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে। হাত মুঠো করে মুখের সামনে এনে, ফুঁ দিয়ে হাতটা গরম করে নিল। প্রচন্ড শীত পড়েছে আজ।বাতাসে হালকা কুয়াশা।

আবার পা চালায় ছেলেটা।কত বয়স হতে পারে তার? চব্বিশ, পঁচিশ? একদম ছিপছিপে শরীর।আর বেশ লম্বা। পা ফেলছে জোরে জোরে।কাছেই হয়তো বাসা।শীতের রাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায়।

সোজা আরও কিছুদূর গিয়ে হাতের ডানপাশের ছোট্ট গলিটাতে ঢুকে পড়লো।এত ছোট গলি, চাঁদের আলোও গলির দু’পাশের একতলা, দোতালা বাড়িগুলোকে এড়িয়ে ভিতরে ঢুকতে পারে না।ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারের ভিতরেই ছেলেটা হাঁটতে থাকে।খুব ভালো চিনে বোধহয় সে এলাকাটা। অন্ধকারের কারণে হাঁটাতে এতটুকু জড়তা নেই।গলির একেবারে শেষ মাথায় একতলা একটা বাড়ির বারান্দায় ক্ষীন আলো জ্বলছে।এতক্ষনে আলোর দেখা!ছেলেটা সেই বাড়ির সামনে গিয়েই দাঁড়ায়।

তালা লাগানো নেই গেটে। নব ঘোরাতেই খুলে গেল। গেট দিয়ে ঢুকে বাড়ির সামনের ছোট্ট জায়গাটা পেরিয়ে কাঠের দরজার সামনে দাঁড়ালো ছেলেটা। আবার ফুঁ দিয়ে হাত গরম করলো।সত্যিই খুব শীত। হাত পা জমে যায় একেবারে।

কী মনে করে ছেলেটা কলিং বেলে হাত দিয়েও চাপ না দিয়ে হাত নামিয়ে আনে। নেমে এসে বাড়ির সামনের খালি জায়গাটায় এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে না, তবু কোথা থেকে যেন চাঁদের হালকা আলো উঠোনে, দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গাছগুলোর গায়ে এসে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠান্ডায় গাছগুলোও জমে গেছে বোধহয়। একটা পাতারও নাড়া-চড়া নেই কোন।

হুট করে বাসার দরজাটা খুলে গেল। বুড়ো মত একজন মানুষ দাঁডিয়ে আছে দরজায়। ছেলেটার বাবা বোধহয়।উনিও লম্বা, ছেলেটার মতই। দরজা খোলার শব্দে ছেলেটা ফিরে তাকালো। কেউ কিছু বললো না। বুড়ো মানুষটা দরজা খোলা রেখেই ভিতরে ঢুকে পড়লো।কিছুক্ষন পর ছেলেটাও ঢুকলো বাসায়।

বাইরে থেকে বাসাটাকে বেশী বড় মনে হয়নি। ভিতরে ঢুকে মনে হচ্ছে একেবারে ছোটও না। মেইন দরজা দিয়ে ঢুকতেই বেশ খোলামেলা একটা ড্রয়িংরুম, সাথে লাগানো ডাইনিংরুম। একটা বেডরুমের দরজা ড্রয়িংরুম থেকে দেখা যাচ্ছে। অন্যপাশেও একটা রুম আছে মনে হচ্ছে।ছেলেটা বাসায় ঢুকে ড্রয়িংরুমে রাখা সোফায় এসে বসে, ধীর হাতে পা থেকে জুতো খুলে নেয়। জুতোজোড়া কালোই,যা ভেবেছিলাম। জুতো খোলার পরও সোফাতেই বসে থাকে সে কিছুক্ষন। বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে ছেলেটাকে।

ড্রয়িংরুমটা বেশ পরিপাটী করে গোছানো। তেমন বেশী কিছু নেই যদিও। সোফা সেট, বইয়ের শেলফ, টিভি,একটা শোকেসের ভিতর ছোট বাচ্চাদের কতগুলো খেলনা, শোকেসের উপরও কিছু বই, আর একটা অ্যাকুরিয়াম। পানির ভিতরে একটা গোল্ডফিশ এপাশ ওপাশ ঘুরছে। প্রত্যেকটা জিনিস যেন একেবারে ঠিক ঠিক জায়গায় রাখা, কোন কিছু একটু এদিক ওদিক হলেই বাসাটাকে এমন পরিপাটী মনে হবে না আর। দেয়ালটাও নতুন রঙ করা হয়েছে বোধহয়।শাদা টিউবলাইটের আলোয় ঝকমক করছে ঘরটা।

সোফা ছেড়ে ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়। জুতোজোড়া হাতে করে নিয়ে রুমের কোণায় রাখা ছোট্ট কাঠের বাক্সটায় রাখে। তারপর খালি পায়ে হেঁটে যে রুমটার দরজা ড্রয়িংরুম থেকে দেখা যাচ্ছে সে রুমটায় ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।

ছেলেটা দরজা লাগাতেই সোফার নিচ থেকে একটা বিড়াল বেরিয়ে এলো। ধবধবে শাদা আর নাদুস নুদুস শরীরের একটা বিড়াল। সোফার নিচ থেকে বের হয়ে লাফ দিয়ে সোফার উপরে বসে। বড়সড় একটা হাই তোলে। তারপর দুই থাবার উপর মাথা রেখে আরামে চোখ বন্ধ করে ফেললো।

বাইরের থেকে বাসার ভিতরে ঠান্ডাটা অনেক কম। শাদা আলো আর হালকা ঠান্ডায় সবকিছু কেমন কোমল আর আদুরে লাগছে। এমন ঘরে ঢুকলেই মনে হয়, রাতের বেলা খুব ভালো ঘুম হবে এখানে।

পায়ের শব্দ পেয়ে বিড়ালটা চোখ খুললো। বুড়ো লোকটা বের হয়ে এসেছে। বিড়ালটা মাথা ঘুরিয়ে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুড়ো ছেলেটার রুমের দিকে এগিয়ে যায়। আস্তে কড়া নাড়ে।ছেলেটা দরজা খুলতেই বুড়ো কী যেন জিজ্ঞেস করে। ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছে না, সে কী বললো সেটাও শোনা গেল না।দরজা লাগিয়ে দেয় ছেলেটা আবার।

বুড়ো আবার উল্টো দিকে চলে গেল। হুমম, আরেকটা রুম ওদিকে।বুড়োর শোবার ঘর। এই ঘরটাও পরিপাটী। জাহাজের কেবিনের মত অনেকটা। বিছানার চাদর,পর্দা সব শাদা রঙের। রুমের ওপাশেও একটা দরজা মনে হচ্ছে। বুড়ো গিয়ে দরজাটা খোলে। বারান্দারই দরজা। দরজা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়লো ঘরে। বুড়ো বারান্দায় দাঁড়াতে চেয়েছিলো হয়তো, বাতাস গায়ে লাগতেই দরজা লাগিয়ে দিলো।

ড্রয়িংরুমে ফিরে আসে বুড়ো। বিড়ালটা এবার আর চোখ খোলে না।বুড়ো এসে বিড়ালটাকে হাতে তুলে নিয়ে সোফায় বসে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে। বিড়ালটার সাথে কথা বলছে নাকি? হুমম,তাই। আবার বিড়বিড় করে ওঠে বুড়ো। “সারাক্ষন শুধু ঘুমোস! কার্টুন দেখবি নাকি একটু আমার সাথে!” বিড়ালটা চোখ বন্ধই করে রাখে। বুড়ো উঠে টিভিটা ছেড়ে দেয়। কার্টুন চ্যানেল এনে দিয়ে আবার সোফায় এসে বসে। বিড়ালটা বুড়োর কোলে উঠে এসে গুটিসুটি মেরে শুয়ে হালকা চোখ খুলে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে।

অ্যাকুরিয়ামের ভিতর মাছটা টিভির শব্দ শুনে নড়ে ওঠে। কাঁচের ভিতর দিয়ে টিভির দিকে তাকায়। কিছুক্ষন পর পাখার মতন লেজটায় ঝাপটা দিয়ে পানির উপর ভেসে উঠে একবার। কয়েকটা বুদবুদ ছেড়ে আবার পানি গভীরে চলে যায়। বুড়ো আর বিড়ালটা নিঃশব্দ।নীরবে টিভি দেখে।

একটু পর বুড়ো হেসে ওঠে।“কী চমৎকার কার্টুন,তাই না, হুলো?” বিড়ালটা বোধহয় মাথা নাড়ায় একটু। টিভি থেকে চোখ সরাতে রাজী নয় সে। বাচ্চা একটা ছেলে জাদুর দেশে বেড়াতে এসে বিপদে পড়েছে। ছেলেটার কুকুরটাকে ধরে নিয়ে গেছে জাদুর দেশের জাদুকর। কুকুরটাকে উদ্ধার করতে হলে জাদুকরকে মারতে হবে। কিন্তু জাদুকরকে মারা অত সহজ না। জাদুকরের তিনটা প্রান, তাকে মারতে হবে তিনবার, একবার ম্যাজিক স্টিক, একবার ম্যাজিক সোর্ড, আরেকবার ম্যাজিক গান দিয়ে। ম্যাজিক স্টিক দিয়ে এরমধ্যেই জাদুকরকে একবার মেরে ফেলেছে ছেলেটা, কিন্তু এখনো জাদুকরের আরও দু’টো প্রাণ বাকী। ম্যাজিক সোর্ড হাতে নিয়ে ছেলেটা জাদুকরকে খুঁজছে এখন।
দরজা খোলার শব্দ। ওপাশের রুম থেকে বুড়োর ছেলে বের হয়ে আসে। কাপড় বদলে ফেলেছে সে। গোসলও করেছে বোধহয়। মুখের ক্লান্ত ভাবটা আর নেই। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে বোতলে মুখ লাগিয়ে খায় সে। বিড়ালটামাথা ঘুরিয়ে দেখে। বুড়ো তাকায় না। ছেলেটা বুড়োর দিকে একবার, টিভির দিকে একবার তাকিয়ে একটা চেয়ারে এসে বসে।

জাদুকর এখন তলোয়ারের রূপ নিয়ে আছে তলোয়ার প্রাসাদে। সত্যিই তলোয়ারের তৈরি প্রাসাদ, লক্ষ লক্ষ তলোয়ার দিয়ে বানানো। তলোয়ারের খোঁচা এড়িয়ে প্রাসাদের ভিতর ঢোকা কঠিন। বাচ্চা ছেলেটা একটা মন্ত্র পড়লো বিড়বিড় করে। এক ডাইনী শিখিয়ে দিয়েছে তাকে মন্ত্রটা, তলোয়ারের খোঁচা থেকে বাঁচার জন্য। খুব সাবধানে প্রাসাদে ঢুকলো সে, উপরের দিকে নজর।সিলিং থেকে হঠাৎ হঠাৎ নেমে আসছে তলোয়ার। একটা তলোয়ার তো প্রায় পিঠ ঘেঁষে পড়লো।

হঠাৎ-ই দেয়াল থেকে দু’টো তলোয়ার ছিটকে বেরিয়ে ছেলেটার সামনে এসে ভাসতে লাগলো। ছেলেটাও সাথে সাথে তার ম্যাজিক সোর্ড তুলে ধরলো। সাঁই করে দু’টো তলোয়ারই একসাথে আঘাত করলো ছেলেটাকে। ছেলেটা কোন রকমে বসে পড়ে ম্যাজিক সোর্ড দিয়ে ঠেকালো তলোয়ার দু’টোকে। তলোয়ার দু’টো পিছে সরে গেল কতকটা। এর মাঝেই ছেলেটা আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপর এগিয়ে গিয়ে ডানদিকের তলোয়ারটার বাট বরাবর চালালো তার ম্যাজিক সোর্ড। ফ্লাইং সোর্ডকে বশ করার এটাই নিয়ম। ডানদিকের তলোয়ার মাটিতে পড়ে গেল ম্যাজিক সোর্ডের আঘাতে।

অন্য তলোয়ারটা বেশী চালাক। ছেলেটা কিছুতেই বাটটাকে বাগে আনতে পারছে না। লাফ দিয়ে দিয়ে সরে যাচ্ছে কেবলই। ছেলেটা হঠাৎ তার ম্যাজিক সোর্ডটাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ফ্লাইং সোর্ড এটা আশা করে নি। কেমন হতবুদ্ধি হয়ে গেল। একটু পর বুদ্ধি ফিরে পেয়ে লাফ দিয়ে এগিয়ে এলো ছেলেটার দিকে। ছেলেটাও রেডি ছিল, টুপ করে বসে পড়েই ফ্লাইং সোর্ডের বাটটা ধরে ফেললো। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা তার ম্যাজিক সোর্ডটা তুলে নিয়েই ঘ্যাচাং করে কেটে দিল ফ্লাইং সোর্ডের বাট।সাথে সাথে তীব্র আর্তনাদ। জাদুকরের দ্বিতীয় প্রাণ ছিল এই দুই তলোয়ারের ভিতরেই। তলোয়ারটার বাট কেটে নিতেই তলোয়ার প্রাসাদও উধাও হয়ে গেল। ছেলেটা দেখলো চারপাশে কিছু নেই আর, খোলা একটা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে সে। কেবল দূরে দেখা যাচ্ছে আগুন প্রাসাদ। সেখান থেকে ভেসে আসছে জাদুকরের হুঙ্কার। ছেলেটা পকেট থেকে ম্যাজিক গান বের করে আগুন প্রাসাদের দিকে রওনা হলো।
অ্যাড চলে এলো এরপর।

বুড়োর মুখ হাসি হাসি। কার্টুন দেখে খুব মজা পাচ্ছে যেন। বুড়োর ছেলে অ্যাকুরিয়ামটার দিকে তাকিয়ে আছে। মাছটা বিরামহীন ভাবে বুদবুদ তুলে যাচ্ছে পানিতে।
বুড়ো হঠাত করে বলে উঠে,“হিন্দুদের পূনর্জন্ম ব্যাপারটা ভালো, তাই না? মরার পরও বারবার এই পৃথিবীতেই জন্ম নেওয়া।”

ছেলেটা বুড়োর দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলে না। বুড়ো আরও কিছু বলবে কিনা তার অপেক্ষা করে হয়তো। কিন্তু বুড়ো কিছু বলে না, বিড়ালটার গায়ে হাত বুলাতে থাকে কেবল।
অ্যাড শেষ হলো।

বিশাল আগুন প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়ালো ছেলেটা। সোনালি রঙের একটা প্রাসাদ দাউদাউ করে জ্বলছে যেন। পুরোটা প্রাসাদ আগুনের তৈরি। দরজা, জানালা কিছু নেই। ভিতর থেকে জাদুকরে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ঘেউ ঘেউ শব্দও ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। ছেলেটার কুকুরটাকে এখানেই রেখেছে জাদুকর।

ম্যাজিক গানটা হাতে নিয়ে প্রাসাদের একদম সামনে চলে এলো ছেলেটা। এই গানটা থেকে গুলি বের হয় না, ট্রিগার চাপলে বেরিয়ে আসে ম্যাজিক ওয়াটার। এটাও তাকে ওই ডাইনীই দিয়েছিল। ছেলেটার প্রাসাদের আগুন বরাবর গুলি চালালো, সাথে সাথে একটা পানির ফোয়ারা বের হয়ে এলো। আগুনের ভিতর একটা চৌকোনা দরজা তৈরি হয়ে গেল ম্যাজিক ওয়াটার দিয়ে দাগ তেনে দিতেই। সেই দরজা দিয়ে প্রাসাদের ভিতর ঢুকে পড়লো ছেলেটা।

প্রচণ্ড গরম প্রাসাদের ভিতর। দরদর করে ঘামছে ছেলেটা। তবু হাঁটা থামায় না। আগুনের দেয়ালে একটার পর একটা দরজা তৈরি করে এগোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত একটা দরজা দিয়ে ঢুকতেই জাদুকরের দেখা মিললো। ভয়ংকর দেখতে জাদুকর। আগুনের শরীর। গলার উপর জ্বলন্ত উনুন যেন একটা। গোঁ গোঁ করে শব্দ বের হচ্ছে সেখান থেকে। জাদুকরের পাশের একটা কুকুর বেঁধে রাখা, শুয়ে ছিল কুকুরটা। ছেলেটাকে দেখতেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

জাদুকরের দিকে ম্যাজিক গান তুলে গুলি চালালো ছেলেটা। জাদুকরের বাম পায়ে গিয়ে পড়লো পানির ফোয়ারা। জাদুকরের পায়ে একটা ফুটো হয়ে গেল।জাদুকরে রেগে গিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে ফুটোটাতে হাত বুলাতেই ঠিক হয়ে গেল ফুটোটা। এবার হা করে মুখ দিয়ে ছেলেটার দিকে আগুন ছুঁড়ে দিলো জাদুকর। ছেলেটা লাফ দিয়ে সরে গেল। লাগলে পুরো শরীরটাই ঝলসে যেতো।জাদুকর আবার আগুন ছুঁড়লো। অল্পের জন্য আবার বাঁচলো ছেলেটা। কী করবে বুঝতে পারছে না। জাদুকরকে মারতে হলে মাথায় ঢালতে হবে ম্যাজিক ওয়াটার। কিন্তু জাদুকরের মাথা অনেক উঁচুতে। অতদূরে পানি যাচ্ছে না।

জাদুকরের গায়ে পানি মারতে মারতে ছেলেটা ধীরে ধীরে কুকুরটার দিকে সরে যেতে লাগলো। গায়ে পানি লাগলো জাদুকর কিছুক্ষনের জন্য আগুন ছোঁড়া বন্ধ করে, সে সুযোগটাই নিচ্ছে সে। কোন রকমে জাদুকরকে এড়িয়ে কুকুরটার কাছে পৌঁছে গেল। দ্রুত হাতে কুকুরটার বাঁধন খুলে দিল সে। তারপর কুকুরটার পিঠে চড়ে বসলো।

জাদুকরকে জ্বালিয়ে মারছে কুকুরটা। জাদুকরের পাশ দিয়ে,পায়ের ফাঁক দিয়ে, একবার সামনে, একবার পিছনে, ডানে বামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাদুকর আগুন ছুঁড়ে মারছে কিন্তু একটাও তাদের গায়ে লাগছে না। ছেলেটা এর মাঝে ম্যাজিক গান চালিয়ে দেয়ালের গায়ে একটা জানালার মতো তৈরি করল। কুকুরটা ছেলেটাকে পিঠে নিয়েই লাফ দিয়ে সেই জানালায় উঠে পড়লো। এখান থেকে জাদুকরের মাথার নাগাল পাওয়া যাবে। জাদুকর গোঁ গোঁ শব্দ করে পিছন ফিরতেই ম্যাজিক গান চালালো ছেলেটা। এবারে সোজা মাথা বরাবর। পানির ফোয়ার মাথায় পড়তেই চিৎকার করে উঠলো জাদুকর। থরথর করে কাঁপছে। ছেলেটা পানি ছোঁড়া বন্ধ করলো না। জাদুকরের বিশাল শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে বাঁকা হয়ে পড়ে যেতে শুরু করল। সেই সাথে ধ্বসে পড়ে যেতে লাগলো আগুন প্রাসাদটাও। যেন একটা ধোঁয়ার প্রাসাদ সেটা এখন। ধোঁয়ার মাঝেই দেখা গেল জাদুকর মাটিতে উলটে পড়েছে। তার বিশাল আগুনের শরীর ধীরে ধীরে কাদায় মিশে যাচ্ছে।

লাফ দিয়ে মাটিতে নেমে এলো কুকুরটা। ছেলেটা তার পিঠ থেকে নেমে পড়লো। কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরে খোলা মাঠে নাচা শুরু করে দিয়েছে সে। চুমু খেলো কুকুরটার পুরো মুখে, এরপর ক্যামেরার দিকে ফিরে দু’জনে হাসতেই “দা এন্ড” লেখা উঠলো টিভি পর্দায়।

“অনেক রাত হয়ে গেছে।”বুড়ো মানুষটা দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে।
ছেলেটা কিছু বলে না। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় একটু পর। উঠে অ্যাকুরিয়ামটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“বাবা,একটা গোল্ডফিশ মারা গেছে, দেখেছো?”
“হুমম,দেখেছি।”
ছেলেটা ঘুরে বুড়োর দিকে তাকালো। “ফেলে দিতে হবে মাছটাকে।”
“সকালে ফেলে দিব আমি।”

ছেলেটা আবার অ্যাকুরিয়ামটার দিকে ফিরে। মরা মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। একসময় নিজের ঘরে ফিরে যায়। একটু পর বুড়ো উঠে। টিভিটা বন্ধ করে দেয়। বিড়ালটাকে কোল থেকে নামিয়ে আস্তে করে সোফায় শুইয়ে রাখে। ঘুমিয়ে পড়েছে বিড়ালটা।রুমের লাইটটা নিভাতে গিয়ে বুড়ো কিছুক্ষন সুইচ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে বুড়োকে। লাইট নিভায় না বৃদ্ধ মানুষটা, বরং দরজা খুলে উঠোনে এসে দাঁড়ায়।

ঝিঁঝি পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছ। কী যেন একটা ফুলের গন্ধে উঠোনটা ভরে আছে। ছেলেটা যখন ফিরেছিল এই গন্ধটা ছিলো না। একটানা ঠান্ডা বাতাস বইছে। বুড়ো একটু পরপর কেঁপে উঠছে। একসময় ঘরে ফিরে এসে ড্রয়িংরুমের লাইট নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

ধীরে ধীরে বুড়োর চোখে গাঢ় ঘুম নেমে আসে। এমন চমৎকার একটা রাতে, চমৎকার একটা স্বপ্ন হয়তো দেখবে সে, দেখাই উচিৎ। অন্য ঘরে ছেলেটাও এতক্ষনে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিড়ালটাও ঘুম। অ্যাকুরিয়ামের ভিতর বেঁচে থাকা গোল্ডফিশটাই কেবল ঘুমোয়নি এখনো। বুদবুদ তুলতে তুলতে অ্যাকুরিয়ামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে ছুটে এসে মরা মাছটার গায়ে খোঁচা দিচ্ছে। মাছটা এখনো হয়তো জানে না, তার সঙ্গী মরে গেছে। কিংবা হয়তো জানে, ভালোবাসা দিয়ে এই চমৎকার শীতের রাতটায় মরা মাছটাকে বাঁচিয়ে তোলা যায় কিনা সেই চেষ্টাই করে দেখছে।

 

রিয়াদ চৌধুরী

জন্ম- ১৯৮৮ সালে ,কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। পৈতৃক নিবাস হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কথায়, ছোটকাগজে কবিতা লেখা দিয়েই সাহিত্য জগতে প্রবেশ, এরপর শুদ্ধ কবিদের ছন্দময় কুহকী জীবন ছুঁয়ে দেখতে না পারার ব্যর্থতায় হোক কিংবা বাস্তবতার দাঁতে বিক্ষত জীবনটার স্বরূপ অনুসন্ধানের কৌতুহলে হোক, গদ্য জগতে আসা বিশ্বসাহিত্য অনুবাদের হাত ধরে। আর এই অনাড়ম্বর জীবনের ফাঁকে মনের ভিতরে বলার মত কিছু কথা জেগে উঠলে চেষ্টা করেন গল্প বলার মাধ্যমে মানুষকে শোনাতে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।