রিয়াদ চৌধুরীর গুচ্ছকবিতা

চিড়িয়াখানা

চিড়িয়াখানায় প্রায়ই যাই
বানরের খেলা দেখি, জিরাফের গলা দেখি
গন্ডারের নিস্পৃহ দাঁড়িয়ে থাকা দেখি
গাছ-গাছালির ভিড়ে সন্ধ্যাদেরও নামতে দেখি।

মাঝে মাঝে কিছুই দেখি না
কোন বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করি
যদি কোন বাঘ খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে পড়ে।

 

আমার ও আমাদের কবিতা

১.
ক্রিয়াপদে বাক্য শেষ হয়
এমন কবিতা খুঁজতে খুঁজতে দেখি সিঁড়িঘরে পৌঁছে গেছি

নামতে নামতে অনেককেই খুঁজে পাই-
বিনয়, সুনীল, শঙ্খ, উৎপল, আল মাহমুদ
যত রূপকথা তত মানুষ, ডাইনী, মোমবাতি প্রজ্বলন।

ক্রিয়াপদ উঠে পড়ে, দাঁড়ায়, আমার পাশে পাশে হাঁটে….
২.
ভোর– পৌঁছুলাম যশোর
দুপুর– পৌঁছুলাম কেশবপুর
বিকেল– পৌঁছুলাম সাগরদাঁড়ি, মধুসূদনের বাড়ি।
কপোতাক্ষের পাড়ে, কাঠবাদাম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সাথের বন্ধুটিকে বললাম, যখন তার পড়শীরা খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করায় তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয় নি, এখানেই তাঁবু গেঁড়ে মাইকেল কাটিয়েছিলেন চৌদ্দ দিন। বিদায় ঘাট দেখা হলো, যেখান থেকে মধু কবি বিদায় নিয়েছিলেন, দেখলাম তার পৈত্রিক বাড়ি, পারিবারিক পুকুর, কাছারি ঘর। কথা হলো তার দেশ ত্যাগ, অমিত্রাক্ষর, “আশার ছলনে ভুলি”, আরও অনেক কিছু নিয়েই, এক প্রবীণ বললেন, কুষ্টিয়ার রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সাগরদাঁড়ির মধুসূদনের মতন এত বড় কবি আর নেই বাংলা ভাষায়।
বাসায় ফেলে আসা মেঘনাদবধ কাব্যের কথা মনে পড়ে গেলো। বহু পুরোনো, মলাট খুলে গেছে, পাতা ছেঁড়া। কবি হতে চাওয়া কৈশোরে পড়তাম, পড়তাম না হয়তো, গুনে যেতাম আট ছয়, আট ছয়, আট ছয়- “এতক্ষণে- অরিন্দম কহিলা বিষাদে/জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল”- আর মাঝে মাঝে শাদা কাগজে ফুটে ওঠা রাবণ, চিত্রাঙ্গদা, সীতা হরণ, মেঘনাদের মৃত্যু, লক্ষণের শোকে রামের বিলাপ, বীরবাহুর শোকে রাবণের বিলাপ, ইন্দ্রের স্বর্গে গমন, নয় সর্গের মহাভারত।
এ সবই হয়তো ছিলো আমার না লেখা প্রথম কবিতার বই। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসতে যখন ফিরে আসছি, মৃদু বাতাসে বইটির পাতা উড়ছিলো- ধন্যবাদ, দত্ত কূলোদ্ভব কবি মাইকেল মধুসূদন।

 

সময়

স্নান হয়, গান হয় নদীর চাঞ্চল্যে
রাত্রির চূড়ার ধ্বস শরীরী মার্বেলে

যে স্রোত উঠল বয়ে চূড়ার মাথায়
তার খানিকটা দ্রাক্ষা বস্তু হয়ে যায়

আরো সন্তর্পণে ঢালো ওষ্ঠের গরল
হৃদপিণ্ড বস্তু হোক দেবতা তরল

যে স্নান,যে গান হয়, নদীতে সাগরে
যে শরীর পড়ে থাকে শ্মশানে কবরে-

পৌরাণিক ক্লান্তি ছুঁয়ে স্রেফ বাষ্প হয়
নিবিড় ধ্যানেই জানি বাষ্পই সময়।

 

সৌন্দর্য

কিছুই ঠিক হয়নি এটা জানি। এভাবে শিমুল গাছের ডালে পাতা হয়ে জন্মানোর কথা ছিল না আমার। তবু একদিন, রোদ ওঠার পর, জন্মে, ঝরে পড়েছি উঠোনে। ঝাডুওয়ালীর ঝাড়ুর টানে গতি পেয়েছি জংগলে যাওয়ার। একটা নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়-ই শুধু পেয়েছিলাম, সেই সময়ে একটা বিড়ালের শাদা গায়ে ঢেউহীন একটা পুকুরের ছবি দেখতে পেয়ে সেখানেই নেমে পড়লাম স্নান করতে, নিঃশ্বাস নেওয়া হয়নি। তারপর পুকুরে ভেসে থাকা সাতদিন-মাছের ঠোকর, সাপের পিঠের স্পর্শ, ব্যাঙের উত্ফুল্ল ডাকের মধ্যে মনে হচ্ছিল হয়তো ঠিক ই আছে জীবন, এইতো পুকুরের পানি, সূর্যের হলুদ ছটার মধ্যে ভেসে থাকা আদিম পৃথিবীর প্রথম কন্যাসন্তান, আমাকে ওম দিচ্ছে চমত্কার! তারপর, কৌতুহল। জমে থাকা কচুরিপানার মধ্যে, দুপুরের শেষ ভাগে শরীর এলিয়ে হালকা ঘুমুচ্ছিলাম। পানির আন্দোলনে ঘুম ভাঙল, পানির উল্লাসের কারন কি ভাবছি, দেখি, একটা শাদা পা, কচুরিপানা সরিয়ে আলতো ডুবেছে পানিতে। এরপর মনে হল,কিছুই ঠিক হয়নি-জন্ম, খসে পড়া, ভ্রমণ, দিনযাপন- কিছুই ঠিক হয়নি। আরেকটা ভুল করলাম, ইচ্ছে করেই, বয়স কম বলেই হয়তো, ওই পা বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম, অনেক উপরে। সৌন্দর্য বেয়ে, উঠতে লাগলাম, মেঘেরও উপরে।

 

মধ্যরাতে

মধ্যরাতে, যখন মা’র ঘুম ভেঙ্গে যায়, জেগে দেখেন বাবা পাশে নেই, একলা বিছানায় ভাবতে থাকেন তার বাবার কথা যিনি চাইতেন মা বড় হয়ে ডাক্তার হবেন, ভাবতে থাকেন তার কৈশোরের বন্ধুটির কথা যে এখন কোথায় আছে কেউ জানে না, ভাবেন আগামী দিনটির কথা, ভাবেন একটা খোলা মাঠ, ভাবতেই থাকেন যতক্ষন বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনে যাচ্ছেন আর ভাবছেন সব কিছু কীভাবে অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছেতাই লোকজন সব বাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর তিনি তাকিয়ে দেখছেনই শুধু, পারলেন না কিছুই, এমনকি ছেলেটাকে মানুষ করতেও, আর সেই মানুষ না হওয়া ছেলেটা, যে কিনা আমি, প্রচুর রাত পর্যন্ত গাজা টেনে ভাবছি আর কিছুক্ষনের মধ্যে ঘুম না এলে ছেলেবেলার মতন বাবা-মার মাঝখানে গিয়ে শুয়ে পড়বো।

 

রিয়াদ চৌধুরী

জন্ম: ১৯৮৮ সালে ,কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। পৈতৃক নিবাস হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কথায়, ছোটকাগজে কবিতা লেখা দিয়েই সাহিত্য জগতে প্রবেশ, এরপর শুদ্ধ কবিদের ছন্দময় কুহকী জীবন ছুঁয়ে দেখতে না পারার ব্যর্থতায় হোক কিংবা বাস্তবতার দাঁতে বিক্ষত জীবনটার স্বরূপ অনুসন্ধানের কৌতুহলে হোক, গদ্য জগতে আসা বিশ্বসাহিত্য অনুবাদের হাত ধরে। আর এই অনাড়ম্বর জীবনের ফাঁকে মনের ভিতরে বলার মত কিছু কথা জেগে উঠলে চেষ্টা করেন গল্প বলার মাধ্যমে মানুষকে শোনাতে।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।