শ্যারন ওল্ডসের কবিতা পরিচিতি ও ভাষান্তর: সাবেরা তাবাসসুম

“প্রতিটি সঙ্গম একটা আত্মা— লাজুক, আরক্ত এবং প্রার্থনারত”

[অ্যামেরিকান কবি শ্যারন ওল্ডসের কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয় কবি শামস আল মমীন অনূদিত সাম্প্রতিক অ্যামেরিকান কবিতার বইয়ের পাতায়। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর কবিতার বই Blood, Tin, Straw হাতে এলে আরেকটু পাকাপোক্ত রকমের চেনা-জানা হতে থাকে ২০১৮ থেকে। প্রথম কবিতা পাঠের আবহ আমাকে চাবকে নিয়ে বেরিয়েছিল, মনে আছে। ভাবছিলাম, কী অকপট, কী সাংঘাতিক শক্তিশালী কবি! তাঁর ভাবনায় এবং কর্মে শরীর বিশেষত নারী-শরীর এবং নারীর যৌন অভিজ্ঞতার ট্যাবুকে আঘাত করেছেন, ভেঙেছেন দুর্দান্ত দক্ষতায়। অত্যন্ত শক্তিশালী ইরোটিক চিত্রকল্প ও বাক্যালঙ্কার ব্যবহারের জন্য তাঁকে পরিচিত করা হলে সেটা হবে তার খণ্ডিত পরিচয়। কোনো বিষয়কে তাঁর দেখার দৃষ্টিভঙ্গী এবং কবিতায় তার উন্মুক্ত উপস্থাপন কবি হিসেবে তাঁকে অনন্য করেছে। আর আমাকে আকৃষ্ট করেছে সেই দিকটাই। আমার স্বল্প পাঠের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে খুব সহজবোধ্য নয় তাঁর কবিতা। এবং সকল পাঠক প্রস্তুতও নন তাঁর কবিতার রস আস্বাদনের জন্যে। সে কারণে সতর্ক পাঠক হয়ে উঠতে হয় আমাদের। শৈশবের বেড়ে ওঠায় নির্যাতনকারী মদ্যপ পিতা ও দুর্বল ব্যক্তিত্বের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অমধুর স্মৃতি তাঁকে তাড়িত করেছে বার বার। কবিতায় সেই ক্ষোভকে উগরে দিয়েছেন তিনি। লিখছেন ষাটের দশক থেকে । তবে প্রথম বই `Satan says’ প্রকাশিত হয় ১৯৮০তে। বলা হয় ওতে তাঁর যৌবনের শুরুর দিককার যৌন-অভিজ্ঞতা মুদ্রিত হয়েছে খোলামেলা ভাষায়। পুরস্কৃত হয়েছেন নানান পুরস্কারে। ২০১৩-এ পুলিৎজার পেয়েছেন তাঁর ‘Stag’s Leap’ বইয়ের জন্যে। ২০০৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ‘একাডেমি অফ এ্যামেরিকান পোয়েটস’-এর চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ করেছেন। সম্প্রতি পড়াচ্ছেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রোগ্রামে। কবিতায় তিনি এখনও সচল। পাঠকের আমন্ত্রণ রইল শ্যারন ওল্ডসের কবিতা-জগতে।]

 

আমাদের ভবনে ধর্ষণ ঘটে যাওয়ার পর

ঘটনার পরের দিন আমরা শুনতে পেলাম ব্যাপারটা
আমরা মিলিত হয়েছিলাম, সকালে, সে ঢুকে গেল আমার ভেতরে
এবং আমি ভাবলাম, এটা এমন খারাপ কিছু নয়,
আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না অনুভব করা,
কেবল শক্ত একটা কিছু আমার ভেতর ঢুকছিল বেরুচ্ছিল
আমার শরীর থেকে বহুদূরে কোথাও
বহুদূর হতে কিছু নজরে আসার মত
একটা সমুদ্রের কিনার কুড়ি মাইল দূরে নেমে যাচ্ছে
আজব মনে হতে পারে এটা, যে মানুষটা আমার ওপর শুয়ে
কাজটা করছে, তার প্রতি আমার মায়া জন্মাচ্ছিল
এমন কি এখনও তার শক্ত বুক আমার প্রিয়
যেন সে আমার কাছে নিরাপদ,
তার সমস্ত মিষ্টি ত্বক, হরষে দাঁড়িয়ে যাওয়া লোম
যদিও আমি কিছুই অনুভব করছিলাম না
পরে সে যখন আমার নাভির বিপরীতে কান পাতলো
তার লম্বা, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সমেত থুতনি
আমার তলপেটে ঘষছিল, আমার সমস্ত অস্তিত্ব
একটা নতুন গ্রহের মত ভাঙছিল-গড়ছিল
এবং পরে যে যখন কনডম খুলে ফেলছিল,
আমি তার দিকে ফিরেও তাকাই নি
কনডমটাকে একটা খামে ভরল যেন শিশুরা দেখে না বোঝে
তারপর ময়লার ঝুড়িতে ফেলল সে খামটাকে
এবং প্রথম বারের মত আমি বুঝতে পারলাম
ঐ সমস্ত স্পার্ম তখনও জীবন্ত, ছুটছে,
দক্ষতার সাথে পাল্লা দিচ্ছে একটা অন্ধকার
গোলকের ভেতর, সাদা ক্বাথ
আর আমি ওদের সাহায্য করতে পারছিলাম না,
আমি ধর্ষকটার কথা ভাবছিলাম
তার আত্মার কথা
সেই সংকুচিত গোলক
অবরুদ্ধ, নিষ্ফল।

 

দ্য বেবি সিটার

প্রায় ছয় মাস বয়সী শিশু,
একটি মেয়ে। এইটুকু বয়সের কাউকে, আমি
কখনো ছুঁয়েও দেখি নি। সেই রাতে, যখন তারা বাইরে গেল
আমি তাকে বাহুতে নিলাম এবং
তার মুখটা আমার সুতি শার্টের দিকে ঘুরিয়ে দিলাম
আমি সত্যিই সেভাবে কাউকে জানি নি, আমি
চাইছিলাম কেউ আমার স্তন চুষুক।
ব্যাপারটা ঘটানোর জন্যে বদ্ধ বাথরুমটায় গেলাম
আমি কোমর পর্যন্ত ন্যাংটো, শিশুটিকে ধরে আছি
আর সে যা চাইছিল সেটা হল আমার চশমা
আমি তাকে আলতো করে ধরে ছিলাম
অপেক্ষা করছিলাম তার মুখ ঘোরানোর
যেন এক দেবদূতের অপেক্ষায় তার সেবিকা
এবং সে কিছুতেই সেটা করছিল না
সে চাইছিল আমার চশমা,
চোষো, ধ্যাত্তেরিকি, আমি ভাবছিলাম,
আমি চাইছিলাম অন্য একটা জীবনের প্রবল টান,
খুব প্রয়োজনীয় কেউ হতে চাইছিলাম আমি
সে আমার চশমা আঁকড়ে ধরতে চাইলো আর হাসলো
আমি আমার ব্রা আর শার্ট পরে নিলাম
এবং তাকে প্রাণ ভরে খাওয়ালাম
এবং শেষবারের মত গান শোনালাম ওকে
সত্যি বলতে কি এটা অন্য রকম একটা
কাজের সপ্তাহ ছিল— বাতি নিভিয়ে দিলাম
আর বাথরুমে ফিরলাম, কোনো বাতি নেই,
আমি মেঝেতে শুলাম,
আমার উদোম বুক চেপে ধরলাম
বরফ শীতল মেঝের বিপরীতে; আমার দুই ঊরুর
মাঝে হাত গুঁজে দিলাম, কঠিন গনগনে
চুল্লির বিপরীতে আমার বুকের বোঁটাগুলো
নীলাভ-সবুজ পান্না, যেন আমি উড়ছি,
নিজেকে উলটে দিয়ে, এই পৃথিবীর ছাদের তলায়।

 

কথা বলিয়েরা

পুরো সপ্তাহ, আমরা কথা বলেছিলাম
আমরা কথা বলেছিলাম সকালে বারান্দায়,
যখন আমি চুল আঁচড়ে নিচ্ছিলাম আর চিরুনিতে
উঠে আসা চুল দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম,
ওটা ভাসতে ভাসতে নেমে আসছিল উপত্যকার দিকে
আমরা কথা বলছিলাম গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে
কথা বলছিলাম ওটার মসৃণ গোলাকার ছাদ নিয়ে,
যখন গাড়ির দরোজা খুলছিলাম, মাথা নিচু করছিলাম,
বাঁকা হয়ে ঢুকছিলাম আর কথা বলছিলাম
দেখা হল, দিনের মধ্যভাগে, প্রথম যে জিনিসটি
আমরা করেছিলাম তা হল দুজনেই মুখ খুলেছিলাম
সারাদিন, আমরা একে অপরকে সেই গান শোনাচ্ছিলাম
কথার ভাষায়। এমন কি যখন আমরা খাবার খাচ্ছিলাম,
আমরা থামি নি, একটা বাটার কুকির শরীর ভাঙতে ভাঙতে
আমি কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, আলতো করে গুঁড়োগুলো তার দিকে
ছড়াতে ছড়াতে। আমরা কথা বলছিলাম আর হাঁটছিলাম। আমরা
গাড়ির বিপরীতে হেলে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম পার্কিং লট-এ
এবং যতক্ষণ না পার্কিং-এ থাকা সকল গাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল
আমরা এঁটেছিলাম এর গভীর অন্ধকারে শীতলতায়
এবং নতুন আরেকটা বিষয়ে আলাপ শুরু করেছিলাম
আমরা তার স্ত্রীর বিষয়ে কথা বলি নি, বেশি নয়
অথবা আমার স্বামী সম্পর্কে, কিন্তু এছাড়া
সমস্ত বিষয়ে আমাদের ঠোঁট ও জিভকে ব্যস্ত রাখছিলাম
উষ্ণ চৌবাচ্চায় আমাদের ঘাড় পর্যন্ত ডোবানো অথবা
খাড়া হয়ে উঠে যাওয়া পথে হাঁটা
গরম ধূলায় পা রাখা যেন আয়ন মণ্ডলে পাখা মেলা,
এবং বালুর ওপর, দুজনে পাশাপাশি, যখন
ঘুরে দাঁড়ালাম, এই ঘুরে দাঁড়ানোটাও
পরস্পরের জন্যে আনন্দের— এমন কি জলের তলায়
চিহ্ন রেখে যাচ্ছিল আমাদের মুখের পেলব পংক্তিমালা।
কিন্তু বেশির ভাগ সময় রাতে, এবং দূরবর্তী রাতে, আমরা কথা
বলেছি যতক্ষণ না আমরা শেষপ্রান্তে পৌঁছেছি
যেন, থেমে যাওয়াটা ক্ষণিকের, আমরা আবার এগোতে থাকি
একে অপরের দিকে। আজ, সে বলল, সে অনুভব করছে যেন
চিরকাল আমার সাথে কথা বলে যেতে পারবে, এটা এমন
পবিত্র আত্মারা যেভাবে বেঁচে থাকে
একে অপরের থেকে দূরে বসে, বিভোর
তাদের এক হতে থাকা আত্মার স্বর্গ-সুখে। ওহ ঈশ্বর,
তারা পরস্পরকে ছোঁয় না কখনো।

 

সাবেরা তাবাসসুমের পরিচিতি


সাবেরা তাবাসসুম। কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।