লুবনা ইয়াসমিন: কবিতার পেছনের গল্পযাত্রা

নর্দার্ন লাইটস

চলো একবার যাই, ঘুরে আসি উত্তরে
সম্ভোগ, অনুরাগ, বিরাগ, কিচ্ছু নয়…
আকাশ-চেরা রোশনাই খুঁজে রাত্রির পথে
কেবল চেয়ে থাকবো দ্যুতি জ্বেলে চোখে
রাতের নির্মল আকাশে, অন্ধকার নিবিড় হলে!
পরস্পরকে দেখবার দরকার নেই, পাশাপাশি
আছি, বুঝে নিলেই হবে নিঃশ্বাসের ওঠা নামায়
নর্দার্ন লাইটস জ্বেলে আকাশ যদি হয় অর্চিষ্মান
সেই ম্যাজিক মুহূর্ত মেখে নিয়ে দু’চোখে, ফিরবো!
শুনেছি রূপান্তর তাতেই, প্রেমে, প্রজ্ঞায়, স্থিরতায়।

 

কবিতার পেছনের গল্প:

অনেক আগে একটা টি ভি সিরিজ এর আমি খুব ভক্ত ছিলাম, ‘নর্দার্ন এক্সপোজার’। আলাস্কাতে সিসিলি নামে একটা কাল্পনিক শহরের কিছু মজার আর খানিকটা পাগলাটে চরিত্রদের নিয়ে কাহিনী। মনে আছে আমি একটা পুরো সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকতাম, যখন মানুষ ড্যালাস, ডাইন্যাস্টি বা এই ঘরানার সোপ অপেরার জন্যে অস্থির ছিলো, সেই সময়ে আমি এ রকম লেইড ব্যাক একটা শহরের চরিত্রগুলোর জীবনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করতাম। সেই সিসিলিতে একটা ক্যারাভানে ক্রিস বলে এক ছেলে থাকতো। এই ক্যারাভানটাই ছিলো তার হোম কাম শহরের একমাত্র রেডিও স্টেশন। সে গুড মর্নিং সিসিলি বলে তার এফ এম রেডিও স্টাইলের রেডিও থেকে সকালের অনুষ্ঠান শুরু করতো। আমার তাকে ভালো লাগতো, কারণ সে মাঝে মাঝেই টি এস এলিয়ট, বা হেমিংওয়ে বা আরো আরো আমার ভালোবাসার কবি, সাহিত্যিকদের উদ্ধৃত করতো চমৎকার ভাবে, পুরো অনুষ্ঠানের সাথে একটা মিষ্টি ঐকতানে। সেই সিসিলিতে আরো আরো চরিত্র ছিলো, ম্যাগি নামের কেন্দ্রীয় চরিত্রটা ছিলো আশ্চর্য এক নারীর, সে ডেয়ার ডেভিল টাইপ, একা একা জঙ্গলে চলে যায়, তাদের জীবন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সিসিলির রাস্তায় মুস হরিণ হেঁটে বেড়ায়, ভালুক লোকালয়ে চলে আসে। আমার আগ্রহ বাড়ে আর্কটিকের জীবন, লোকালয় সম্পর্কে।

আরো পরে আমি জানতে পারি এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক বিস্ময়, নর্দার্ন লাইটস বিষয়ে যা আর্কটিক প্রকৃতির এক অনুষঙ্গ। অরোরা, যা নর্দার্ন লাইটস বা পোলার লাইটস বা সাদার্ন লাইটস নামে পরিচিত, উচ্চ অক্ষাংশের আকাশে এক ধরনের আলোর খেলা। নর্দার্ন লাইটস (Aurora Borealis), আমার এক জীবনের স্বপ্ন হয়ে যায়! দেখতে যেতে হবে এই ম্যাজিক, দিন, ক্ষণ, ঋতু, সম্ভাবনা সব হিসেব করে দূরের উত্তুরে যাত্রায় শামিল হয়ে।

এই ইচ্ছে আরো প্রগাঢ় হলো আমার ফিজিও থেরাপিস্ট ডোনার মাধ্যমে। এই মেয়েটি তার নিখুঁত কাজ এবং মিষ্টি হাসি দিয়ে আমার মত সবার মন জয় করেছিলো। তার ফিয়ান্সে কাজের সুবাদে ক্যানাডার সুদূর উত্তরে নর্থ ওয়েস্ট টেরিটরিতে অবস্থিত ইয়েলো নাইফ শহরে চলে যায়, ডোনাও সিদ্ধান্ত নেয় চলে যাবার এবং সেখানে গিয়ে তাদের বিয়ে হবার কথা। ডোনা বিয়ে পরবর্তী চিঠিতে তাদের বিয়ের খুব সুন্দর একটি ছবি সহ আমাকে লেখে, দিন-ক্ষণ দেখে তারা ঠিক করে, যখন আকাশ তার মোহন দরোজা খুলে নর্দার্ন লাইটসের আলোয় আলোকিত করবে চরাচর, সেই ম্যাজিক মুহূর্তে তারা বেঁধে নেবে একসাথে চলার পথ, আর ঘটেও ঠিক এমনটাই। আমি চমৎকৃত হয়ে যাই। আহা কী অপরূপ যাদুই কান্ড! ক্যানাডার সুদূর উত্তরে ইউকুনে কঠিন শীতের ভেতরেও জাপানী পর্যটকদের (বিশেষত কাপলদের) ভীড় দেখা যায়। তারা বিশ্বাস করে যে নর্দার্ন লাইটস এর নীচে গর্ভধারণ করলে সন্তান হবে বিশেষ জ্ঞানী। আরেকটা বিশ্বাস আছে তাদের মাঝে যে, নিঃসন্তান দম্পতিরা নর্দার্ন লাইটস এর নীচে মিলিত হলে গর্ভধারণ করতে পারবে।

এরপরে কত কত টাইম ল্যাপ্স ভিডিও যে আমি মুগ্ধ চোখে দেখেছি, অরোরা বোরিয়ালিস বা নর্দার্ন লাইটস এর! একবার তো বন্ধুরা মিলে চলে গেলাম আমার প্রভিন্স অন্টারিওর উত্তরে সাডবুরি তে, কটেজে ক’ দিন থাকবো, নিরিবিলি প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার সাথে যদি নর্দার্ন লাইটস দেখার সৌভাগ্য হয়! বলা বাহুল্য হয়নি, তবে একদিন আরো উত্তরে, আরো আরো উত্তরে চলে যাবো অরোরার খোঁজে! নর্দার্ন এক্সপোজার এর সিসিলির মত কোন এক শান্ত লোকালয়ে, যখন আকাশ খুলবে তার মোহন দরোজা আর আলোকিত করবে চরাচর!

‘নর্দার্ন লাইটস’ কবিতা আমার এই স্বপ্নযাত্রার অভিলাষ এর উৎসার থেকে লেখা!

 

জোন অফ আর্কের শিরস্ত্রাণ

সাবেকী পালঙ্কের বাজুতে ঠেস দিয়ে
এখনো দাঁড়িয়ে তুমি পিতামহী?
জরি পাড় শাড়ি, আঁচলে চাবির ঝনাৎকার!
চোখের ফসফরাসে জ্বলে রাত্রি তমস্বিনী!
কালো পর্দায় ঠেকাই জ্যোৎস্নার নিশিডাক
কোন কোন রাত্রি নয় জ্যোৎস্না-ভূক!
পিতামহী ঘুমাই, আপাতত নেভাও ফসফরাস!
তুমিও ঘুমাও, ক্ষণকাল পর সুবেহ-সাদিক…

সাবেকী আদরে আটকাতে চাও আজও?
নূপুরগুলো হারিয়ে গেছে কতকাল!
শুকিয়ে বিবর্ণা স্নেহলতা ফুল!
আমাকে দেখে আজ অন্য সকাল…
শুধু তোমার চোখের ফসফরাস
হরণ করে রাত্রি-ঘুম, এখনও হরহামেশাই …
একটু বিশ্রাম পিতামহী, একটা সংকল্পের প্রস্তুতি!
জোন অফ আর্কের শিরস্ত্রাণ ভোরের প্রতীক্ষায়!

 

কবিতার পেছনের গল্প:

আমি খুব দাদির ন্যাওটা ছিলাম ছোটবেলায়, যদিও তাঁকে আমার প্রতিদিনের যাপিত জীবনে পাইনি খুব। খুব ছোটবেলায় আব্বার বদলির সুবাদে আমরা দুই ভাই বোন আর মা গ্রামে চলে যাই, ২/৩ বছর ছিলাম সম্ভবত। দাদির দু’পাশে আমি আর চাচাতো বোন ঘুমাতাম। সে যে কী এক অপার স্নেহ। পরেও প্রতি বছর শীতের ছুটিতে গ্রামে যাওয়া এবং দাদির আদরে সিক্ত হওয়া অব্যাহত ছিলো। আরও পরে দাদি আমাদের সঙ্গে থাকতে ঢাকায় চলে আসেন, অসুস্থতাজনিত কারণে। স্কুল থেকে ফিরে দাদির ঘরে যাওয়া আমার নিত্য অভ্যাস ছিলো। আমার টম বয়িশ কাজ কারবারে দাদি প্রায়ই বলতেন, মেয়েদের এতো চঞ্চল হতে নেই। বিয়ে দিলে সমস্যায় পড়বো। তাঁর সেই গ্রামের জীবনে কাকভোরে উঠে সংসারের চক্রে দিন পার করে দেয়া শেষে বড়জোর তিনি চিন্তা করতে পারতেন আমি পড়ালেখা করে যাবো, বড় বড় ডিগ্রীও পাবো, হয়তো পেশাজীবিও হবো, কিন্তু বিয়ে, সন্তানপালন এর ভেতরেই আমার জীবন প্রকৃত সার্থকতা পাবে। আমার দাদি বিচ্ছিন্ন কেউ নন, আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষই, বিশেষত নারীদের একটা বড় অংশ, যদি তাঁরা হন দুই এক প্রজন্ম আগের, তাঁদের ভাবনা ওই একই আবর্তে প্রবাহিত। আমার খুব সৌভাগ্য যে আমার বাবার মতন একজন মুক্ত চিন্তার মানুষের ছায়ায় বড় হয়েছি। তাঁর কাছে আমি তাঁর বড় মেয়ে ছিলাম না, ছিলাম তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনিই প্রথম আমার ভেতর সেই বালিকা বেলা থেকেই নারী পুরুষের সমতার ধারণার বীজ বুনে দেন। এরপরে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে চলতে চলতে এই ধারণা দৃঢ়বদ্ধতা পেয়েছে। নারী হিসেবে পিছিয়ে থাকা নয়, পুরুষের সমান তালে এগিয়ে যেতে পারা নারীর অধিকার। নারী কোন পৃথক সত্তা নয়, সে একজন মানুষ। তারও অসীম ক্ষমতা আছে সমাজে বিশেষ অবদান রাখবার।

যেহেতু আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী, সেই সুবাদে জর্জ বার্নার্ড শ’র ‘সেইন্ট জোন’ বইটি পড়তে হয়েছিলো পাঠ্য হিসেবে। একশ বছরের যুদ্ধের পরও ফ্রান্স ছিল বৃটিশের করায়ত্ত। প্রবল দেশপ্রেম এবং অদম্য সাহস আর রীতিমত একগুঁয়ে পর্যায়ের মনোবল নিয়ে জোন সেনাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেয় এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্রান্সের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনে। জোনের তেজী নেতৃত্বেই ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস হারানো রাজ্য, হারানো সিংহাসন ফিরে পায়, অবসান হয় তার পলাতক জীবনের। অথচ যখন ফ্রান্সের বার্গান্ডিবাসী একদল বিশ্বাসঘাতক জোনকে বৃটিশ সৈন্যদের কাছে সোপর্দ করে তখন রাজা টুঁ শব্দটিও না করে জোনকে ধরে নিয়ে যেতে দেখে। ডাইনি অভিযোগে, ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে ১৯ বছরের তরুণী জোন অব আর্ককে পুড়িয়ে মারা হলো ১৪৩১ সনে। ২৫ বছর পর ১৪৫৬ সালে আবার রায় হল জোন ছিল নির্দোষ। তাঁকে সন্ত(Saint) আখ্যা দেয়া হলো। জোন আমার কাছে নারী শক্তির প্রতীক, দেশপ্রেমের প্রতীক, সাহস আর আত্মত্যাগের প্রতীক, অদম্য এক সংকল্পের প্রতীক।। আমার ‘জোন অফ আর্কের শিরস্ত্রাণ’ কবিতাটিকে বলা যেতে পারে নারী শক্তির, নারীর অদম্য যাত্রাকে উদযাপনের উদ্দেশ্যে লেখা একটি উৎসর্গপত্র।

 

লুবনা ইয়াসমিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। প্রিয় কবি আবুল হাসান, প্রিয় লেখক পাওলো কোয়েলো।

বর্তমান আবাস কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সের টরণ্টো শহরে। তবে লুবনা ইয়াসমিন এর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ঢাকা শহরে।  সবচে’ প্রিয় বন্ধু প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করেন, উদযাপন করেন নিয়ত।

তাঁর কাছে কবিতা লেখা হয়তো কখনো কখনো নিজের সাথে কথা বলা, হৃদয়ের কথা বলা, আর কখনো কখনো শব্দ, ছন্দের বিন্যাসে একটা সৃষ্টিশীল ভাষার কোলাজ বোনা। 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।