দিলশাদ চৌধুরীর অনুবাদ:  ল্যু স্যুনের গল্প- একটি ঘটনা

[লেখক পরিচিতিঃ ল্যু স্যুন (১৮৮১ – ১৯৩৬) ছিলেন একইসাথে চীনের একজন লেখক, প্রাবন্ধিক, কবি এবং সাহিত্য সমালোচক। তিনি ছিলেন আধুনিক চীনা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক ছাপচিত্রের ইতিহাসেও তার নাম উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত চীনা পদ্ধতি এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের আভা, দুয়েরই সমাবেশ ঘটে তার লেখায়। “একটি অপ্রয়োজনীয় ঘটনা” গল্পটি তার “এ ম্যাডম্যান’স ডায়েরি” গ্রন্থ থেকে সংগৃহিত।]

যেন চোখের একটি পলকেই আমার মফস্বল থেকে রাজধানীতে আসার পর ছয়টি বছর কেটে গেল। আমি যদি রাষ্টের তথাকথিত প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলো যোগ করা বন্ধ করে দেই যা আমি এতদিনে হয় দেখেছি নয় শুনেছি, তাও সংখ্যাটা নেহাৎ কম হবেনা। এখনো অব্দি সেইসব কোন ব্যাপারই আমার স্মৃতিতে তেমন দাগ কেটে যায়নি। আর যদি প্রভাবের কথা বলি, তবে সেগুলো কেবল আমার বদ মেজাজের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সত্যি বলতে, এই “রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ব্যাপার” গুলো, যতই দিন যাচ্ছে আমাকে কেবলমাত্র সাধারণ মানুষদের অবজ্ঞা করতেই শেখাচ্ছে। কিন্ত এর মধ্যে একটি নিতান্তই ঘটনা ছিল যা আমার কাছে বিশেষ অর্থপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাকে আমার বদমেজাজের পঙ্কিল ডোবা থেকে টেনে তোলা সেই ঘটনাটি আমি আজও ভুলতে পারিনি।

ঘটনাটি ঘটেছিল গণতন্ত্রলাভের ষষ্ঠ বছর, শীতকালে। উত্তরের খর হাওয়া চরমে ছিল। তা সত্ত্বেও, জীবনধারণের জন্য সকাল সকাল রাস্তায় বের হওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলনা। আশেপাশে কেউ ছিলনা বললেই চলে। কষ্টের শেষ সীমা অতিক্রম করে শেষে একটি রিক্সা খুঁজে পেলাম। রিক্সাওয়ালাকে আদেশ করলাম আমাকে ‘S’ গেইটে নিয়ে যেতে। ততক্ষণে উত্তরা হাওয়া থিতিয়ে এসেছে। ধূলার শেষ কণাটুকু উড়িয়ে নিয়ে রেখে গেছে এক মসৃণ চলার পথ। রিক্সাওয়ালা আরও ভালো করে চালাতে লাগল৷ ঠিক ‘S’ গেটে ঢোকার সময় রিক্সার সাজের এক অংশের সাথে কাপড় আটকে কে যেন মাটিতে পড়ে গেল। সে ছিল এক মহিলা। তার চুল ছিল ধূসর আর পোশাক শতচ্ছিন্ন। পথের ওপাশ থেকে হঠাৎ বের হয়ে রিক্সার ঠিক সামনে এসে সে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল। রিক্সাওয়ালাও গতি কম করেছিল যাতে সে ঠিকভাবে রাস্তা পার হতে পারে। কিন্তু তার শতচ্ছিন্ন জ্যাকেটের বোতামগুলো লাগানো ছিল না, আর ঠিক সেই মূহুর্তেই একটা দমকা হাওয়া জ্যাকেটের ভেতরে ঢুকে সেটিকে ওড়াতে শুরু করে৷ তখনই জ্যাকেটের এক প্রান্ত রিক্সার সাথে আটকে যায়। সৌভাগ্য এই যে, রিক্সাওয়ালা ঠিক সময়ে গতি কমিয়ে এনেছিল। নইলে মহিলাটি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে ভয়ানক আহত হত৷ ওইত সে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে আছে। রিক্সাওয়ালা থামল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে মহিলাটি ব্যথা পায়নি এবং যেহেতু প্রথম থেকেই ঘটনাটি কেউ দেখেনি, তাই রিক্সাওয়ালার বাড়াবাড়িতে আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম। লোকটি শুধু শুধু নিজের জন্য সমস্যা ডেকে আনছে, তাছাড়া সে আমাকেও দেরী করিয়ে দেবে। “কিছু হয়নি”, আমি বললাম, “চলতে থাকো”। আমার কথায় কান না দিয়ে… অথবা হয়ত কথা শুনতেই পায়নি, রিক্সাওয়ালা রিক্সার হাতল নামিয়ে রাখল। সে এগিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে বৃদ্ধা মহিলাটিকে তুলল এবং হাতের নিচে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল। ” আপনি ঠিক আছেন?” “আমার ভীষণ লেগেছে।”

আমি নিজের চোখে তোমাকে পড়তে দেখেছি, মনে মনে বললাম, আর সেটা বেশ আস্তেই ছিল। তাহলে তুমি ব্যথা কিভাবে পেতে পারো? অভিনয়, তাছাড়া আর কি! নিচু স্বভাবের কুটনি বুড়ি কোথাকার! আর রিক্সাওয়ালার কোন দরকার ছিলনা এসবের মধ্যে ঢোকার, নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে। ভালো, ঢুকেই যখন গেছে, দেখি এই ঝামেলা থেকে বেরোয় কি করে। মহিলার জবাব শোনার পর কোন সংকোচ ছাড়াই রিক্সাওয়ালাটি হাতের নিচে ভর দিয়ে এক পা এক পা করে তাকে রাস্তা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ব্যাটা কোথায় যাওয়ার চিন্তা করছে তা জানতে আগ্রহী হয়ে চোখ তুলে রাস্তা ধরে তাকিয়ে দেখি একটি পুলিশ সাবস্টেশন। যদিও ঝড়ো বাতাস তখন থেমে গিয়েছে, তবুও বাইরে কোন প্রহরী দেখা গেলনা। একাই বৃদ্ধা মহিলাটিকে নিয়ে নিশ্চিতভাবে রিক্সাওয়ালাটি ওই পুলিশ স্টেশনটির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। এই পর্যায়ে আমি নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি টের পেলাম। ব্যাপারটা এমন ছিল যেন, মূহুর্তের মধ্যে রিক্সাওয়ালার ধুলোমাখা ছোট্ট শরীরটি দ্রুত বড় হতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে এটি এতই বেড়েই চলল যে শেষপর্যন্ত উপরের দিকে মাথা তুলে আমার তাকে দেখতে হল। তারও বেশি যা হল, সেই মূর্তিটা ধীরে ধীরে শক্ত হতে হতে এক অসহ ভার হয়ে আমার উপর চেপে বসে থাকল, ততক্ষণ যতক্ষণ না সেটি আমার বড় পশমের কোটের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানসিক তুচ্ছতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। সেই সময়ে হয়ত আমার তেজ কিছুটা অসার হয়ে পড়েছিল, যেজন্য আমি একটুও নড়লাম না, জায়গায় বসে রইলাম, এমনকি কিছু ভাবতেও পারলাম না। পুলিশ স্টেশনটি থেকে একজন পুলিশকে বেড়িয়ে আসতে দেখে আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম এবং রিক্সা থেকে নিচে নেমে দাড়ালাম। সে হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এলো এবং বলল, “অন্য রিক্সা নিয়ে নিন। ও এখন আপনাকে নিয়ে যেতে পারবেনা।” কিছু না ভেবেই আমি পকেট থেকে মুঠোভর্তি টাকা বের করে পুলিশ লোকটির হাতে দিলাম। “দয়া করে ওকে এগুলো দিয়ে দেবেন।”

ততক্ষণে ঝড়ো হাওয়া পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল। রাস্তা ছিল নিস্তব্ধ। আমি চলতে লাগলাম, ভাবতে ভাবতে চলতে লাগলাম। কিন্তু তখন কোন কারণে আমি নিজের সম্পর্কে ভাবতে চাইছিলাম না। এমনকি ওই ঘটনায় আমার পূর্ব ব্যবহারের প্রসঙ্গ থেকেও আমি নিজের মনকে সরিয়ে রাখতে চাইছিলাম। যখন আমি রিক্সাওয়ালাকে দেয়ার জন্য পুলিশটির হাতে মুঠোভরা টাকা তুলে দিয়েছিলাম, তখন আমার মনে কি চলছিল? আমি কি তাকে পুরস্কৃত করতে চাইছিলাম? রিক্সাওয়ালাটির সম্পর্কে কোনো অভিমত দেয়ার যোগ্যতা কি আদৌ আমার ছিল? আমি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। আমি আজও প্রায়ই এই অপ্রয়োজনীয় ঘটনাটি নিয়ে ভাবি এবং ফলস্বরূপ প্রায়ই নিজের সম্পর্কে ভাবার মত অসহনীয় কাজটি করতে বাধ্য হই। আমার জন্য, গত কয়েক বছরে সাধারণ মানুষ বা মিলিটারি সম্পর্কিত তথাকথিত প্রয়োজনীয় ঘটনাগুলো যৌবনে মুখস্থ করা, “কনফুসিয়াস বলে” বা “পোয়েট্রি ক্লাসিক স্টেটস” এর সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, যার অর্ধেক লাইনও আজ আমার মনে পড়েনা। কিন্তু এখনো ঘটনাটি আমার চোখের সামনে ভাসে, কখনো কখনো মূল ঘটনার সময়ের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে। প্রতিনিয়ত আমাকে লজ্জিত করে, মানসিক উন্নতির তাড়না দেয় আর আমার আশা আর সাহসের পাল্লা ভারী করতে থাকে।

 

দিলশাদ চৌধুরী

জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৭ এপ্রিল, বরিশালে। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছেন বরিশালেই। বর্তমানে পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগে সম্মান তৃতীয় বর্ষে। বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের চাবিকাঠির সন্ধান পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। কাজ করছেন অণুগল্প, ছোটগল্প এবং অনুবাদ নিয়ে। লেখালেখি নিয়েই ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।