ধূসর মননের কবি: সিলভিয়া প্লাথ  লেখা ও অনুবাদ: দিলশাদ চৌধুরী 

[“আমি যখন চোখ বন্ধ করি, সমস্ত পৃথিবীর যেন অকালমৃত্যু ঘটে। আবার যখন চোখ তুলে তাকাই, সবাই আবার বেঁচে ওঠে…”
কথাগুলো মায়াময় বিষাদের কবি সিলভিয়া প্লাথের। এবছর ২৭ অক্টোবর পালিত হল তার ৮৮ তম জন্মবার্ষিকী। ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন শহরে ১৯৩২ সালে এই অপূর্ব সুন্দরী কবি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক বাবার কঠোর শাসনে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ছিল তার শৈশব। যার কারণে তার শিশুমনে হতাশাই জায়গা করে নিয়েছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই হতাশা রূপ নেয় বিষন্নতায়। মাত্র ৩১ বছরের জীবনে অনেকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি যা সফলতা পায় ১৯৬৩ সালে। ১৯৫৬ সালে সমসাময়িক কবি টেড হিউজকে বিয়ে করেন এবং দুই সন্তানের জননী হন। কনফেশনাল পোয়েট্রির উন্নতিতে অবদান রাখায় প্লাথ বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন। ১৯৮২ সালে মরনোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন তিনি। দ্যা কলোশাস এন্ড আদার পোয়েমস (১৯৬০), এরিয়েল (১৯৬৫), সিলেক্টেড পোয়েম (১৯৮৫) ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এছাড়াও মৃত্যুর অল্পকিছুদিন আগে “দ্যা বেল জার” নামে প্লাথের একটি আধা আত্মজৈবনিক উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছিল। ধূসর জগতের এই কবিকে স্মরণ করছি তার কবিতার মাধ্যমে। ]
আয়না
আমি রূপালী এবং নির্ভুল, আমার কোন অতীত ধারণা নেই।
আমি যাই দেখি তৎক্ষনাৎ গিলে ফেলি, ঠিক যেমন থাকে তেমনভাবেই, ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার ধোঁয়াশায়।
আমি নিষ্ঠুর নই, কেবল সত্যবাদী
ঈশ্বরের ক্ষুদ্র এক চতুষ্কোণ চক্ষু যেন
বেশিরভাগ সময়ই আমি বিপরীত দেয়ালে ধ্যানমগ্ন থাকি।
আমি নাজানি কতকাল ধরে দেখছি,
গোলাপি, ছোট্ট দাগে ভরা,
হয়ত ওটা আমার হৃদয়ের অংশ,
কিন্তু ঝিকঝিক করছে।
কিছু মুখ আর অন্ধকার বারবার আমাদের আলাদা করে দেয়।
এখন আমি একটি হৃদ,
এক মহিলা আমার পেঁচিয়ে রয়েছে।
নিজেকে বোঝার জন্য খুঁজে দেখছে আমার ক্ষমতা,
তারপর সে মিথ্যুকগুলোর দিকে তাকায়, মোমবাতি অথবা চাঁদ হয়ে।
আমি তার পেছন দেখতে পাই এবং বিশ্বাস নিয়ে প্রতিবিম্বিত করি তাকে,
হাত নেড়ে চোখের পানি দিয়ে সে আমার পুরস্কৃত করে।
আমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সে আসে আর যায়
প্রতিদিন সকালে তার মুখ অন্ধকার সরিয়ে দেয়,
আমার মধ্যে সে ডুবিয়ে দিয়েছে তার ভেতরের ছোট্ট বালিকাকে,
আর আমার ভেতর থেকেই বার্ধক্য,হিংস্র হাঙরের মত
তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
( মূল কবিতা “Mirror” ১৯৬১ সালে রচিত। ১৯৮৫ সালে সিলেক্টেড পোয়েম বইয়ে প্রকাশিত।) 
প্রান্ত
মহিলাটি নিঁখুত এখন,
তার লাশ সাফল্যের হাসি হাসছে,
গ্রিক নেসেসিটির মায়া তার আলখাল্লার কুচিতে বহমান।
তার নগ্ন পা দুটো যেন বলছে,
এতদূর আসার পর অবশেষে সব শেষ হল।
 প্রতিটি মৃত শিশু কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল,
যেন সাদা সাপ,
প্রতিটি ছোট দুধের কলসের জন্য একটি,
কলসগুলো এখন খালি।
গোলাপের পাঁপড়ির মত তাদের নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছে সে,
যেমনটা হয় বাগানের দৃঢ়তায়, রাতের ফুলের গভীর মিষ্টি কণ্ঠ থেকে সুগন্ধির রক্তক্ষরণ।
চাঁদের এখানে দুঃখ পাবার কিছু নেই,
সে নিষ্পলক তাকায় তার চক্রের মধ্য দিয়ে
তার অভ্যাস আছে এসবে।
তার দাগগুলো ফেটে চিড়ে যায়।
( মূল কবিতা “Edge” থেকে অনুদিত। প্লাথ আত্মহত্যা করার কয়েকদিন আগে এই কবিতাটি লেখেন। কবিতায় আত্মহত্যাকে একধরনের সাফল্য হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। কবিতাটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তার সিলেক্টেড পোয়েম কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া।)

দিলশাদ চৌধুরী

জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৭ এপ্রিল, বরিশালে। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছেন বরিশালেই। বর্তমানে পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগে সম্মান তৃতীয় বর্ষে। বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের চাবিকাঠির সন্ধান পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। কাজ করছেন অণুগল্প, ছোটগল্প এবং অনুবাদ নিয়ে। লেখালেখি নিয়েই ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।