নাভিদ চৌধুরীর ভ্রমণগদ্য-৫: স্পর্শ, অতঃপর

আমি চমকে নিচে তাকালাম। প্রথমে অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। কী হতে পারে ? আমি উথালপাথাল জোছনায় আলো হওয়া বৈরুতের কর্নিশে ( সমুদ্রের তীর ঘেঁষে বাঁধানো পথ) একা বসে আছি। রাত দশটা মতো বাজে, চারিদিক চুপচাপ। আমার সামনে ভূমধ্যসাগরের ফেনিল ঢেউ তীরে ভেঙে পড়ছে, পেছনে লেবাননের ধনকুবেরদের বিলাসবহুল বাড়িঘর। কাজের সূত্রে আমার প্রায়ই আম্মান হতে বৈরুত আসা হয়। এবার এসেছি তিন সপ্তাহের জন্য। বৈরুতের অপূর্ব সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। যত দেখি তত বৈরুতকে আরো দেখতে ইচ্ছে করে।

অন্ধকার হয়ে আসায় আবার এদিক-ওদিক তাকাই। হঠাৎ মনে হলো, কয়েকটা ছোট আ‌‌ঙুল আমার একটা হাত ধরে টানার চেষ্টা করছে। আমি মজা পাই, কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা অনিচ্ছার সাথে নিচে তাকিয়ে দেখি দেবশিশুর মতো একটা অপূর্ব রূপবান শিশু আমায় কোথাও টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমি ওর পিছুপিছু হাঁটতে থাকি, দেখি এই সন্ধ্যার অন্ধকারে সে আমাকে কোথায় নিয়ে যায়। আমরা কার্নিশের ওপর হলুদ ফুলের ঝোপের পাশে বসা এক মহিলার কাছে পৌঁছে যাই। মহিলা আরো দুটি শিশু নিয়ে বসে আছেন। একটা ছেলে সাত অথবা আট বছরের হবে, অন্যটি মেয়ে, হয়তো পাঁচ বা ছয় , দুজনেই দেখতে মায়াময়, নিষ্পাপ আর সুন্দর। আমি এতক্ষণ পর আমাকে টেনে আনা ছেলেটাকে বলি, হাবিবি, মা ইসমুকা (প্রিয়, তোমার নাম কী)? আনা করিম (আমি করিম), ছেলেটা অস্পষ্ট করে বলে। আমার মন মায়ায় ভরে যায়, আমি এবার করিমকে কোলে তুলে নিয়ে দাড়িয়ে থাকি। করিম আমার বুকে মাথা রাখে। আমি কিছুই বুঝতে পারি না, করিম মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে, মামা (মা)। করিমের মা আরবীতে একনাগাড়ে কথা বলে যান। আমি আরবী অতি সামান্য বুঝি, তাই হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। মাহিলা একবারের জন্যও কিছু চাইতে হাত বাড়িয়ে দেন না,কিন্তু ওনার অসহায়ত্ব আমি বুঝতে পারি।

করিম আমার গলা জড়িয়ে ধরে, এবার আশপাশের হেঁটে যাওয়া লোকজন আমাদের দেখে। আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করি। কিছুটা সঙ্কোচের সাথে কয়েকটা টাকা আমি মহিলার সামনে রেখে, জোর করে করিমকে নিচে নামিয়ে পালানোর চেষ্টা করি। করিম কাঁদতে থাকে, আমি আমার কান্না লুকিয়ে দৌড়াতে থাকি।

কাজের ব্যস্ততায় প্রায় চার-পাঁচ দিন সাগর তীরে আসা হয়নি। এই কটা দিন একটি দিনও যায়নি যখন আমি করিমের কথা ভাবিনি। দেশে থাকা আমার ছেলে আদি আর এখানে করিম আমার মনের ভেতরে মিলেমিশে গেছে। আমি করিমের মাঝে আদিকে খুঁজছি নাকি আদির ভেতর করিমকে ভাবছি, জানিনা। করিমকে আমি আর একটি বার দেখতে চাই। ওর এই আচরণের অর্থ আমায় জানতেই হবে।

আজ আমার সাথে আমার বন্ধু দিমা আছে। দিমাকে নিয়ে এসেছি আরবী অনুবাদের জন্য। আমি জানি না করিমকে খুঁজে পাব কি না, অথবা খুঁজে পেলেও ও আমায় চিনবে কি না। দিমা আর আমি পথের কিনারা ধরে হাঁটতে থাকি। দিমা বিরক্ত হলেও কিছু বলে না। বৈরুতে সন্ধ্যা নামে ধীরে, আকাশের লালিমা ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে দূরান্তরে। হলুদ ফুলের ঝোপ খুঁজে পেলেও করিম আর তার মায়ের দেখা মেলে না। আমি আকুল চোখে দিমার দিকে তাকিয়ে বলি, দিমা, অযথাই আজ তোমাকে নিয়ে এলাম। দিমা হাসে, বলে চলো আরো কিছুক্ষণ খুঁজে দেখি।

হঠাৎ করেই কে যেন পিছন হতে আমার দু’পা জড়িয়ে ধরে, বলে, বাবা, বাবা। আমার কীযে আনন্দ হয়, মনে হয় জোছনার সব আলো আমায় ঘিরে ধরে, আমি নিচু হয়ে করিমকে কোলে তুলে জড়িয়ে ধরি, বলি বাবা আমার। আমার গলা ধরে আসে, করিম আমার গালে গাল ঘষে। দিমা অদ্ভুত চোখে আমাদের কাণ্ড দেখে। দিমা আরবীতে করিমের সাথে কথা বলে, করিম আমাদের ওর মায়ের কাছে নিয়ে যায়। দিমা করিমের মায়ের সাথে কথা বলা শুরু করে।

করিমের পরিবার প্রায় পাঁচ বছর আগে সিরিয়া হতে লেবাননে এসেছে। লেবাননে দশ লক্ষ সিরিয় শরণার্থী নিদারুণ কষ্ট আর দারিদ্রের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। বৈরুতের আনাচে-কানাচে তাই শরণার্থীদের ভিড়। মাত্র চার লাখ মানুষের লেবাননের জন্য এতো শরণার্থীর ভার নেয়া একেবারেই অসম্ভব। লেবাননের দুর্বল অর্থনীতি আর জাতিগত দাঙ্গা অবস্থাকে করেছে আরো জটিল। করিমের বাবাকে পুলিশ অবৈধ শরণার্থী হিসেবে ধরে নিয়ে গেছে তিন মাস হলো। সেই থেকে তিনি নিখোঁজ। বেঁচে আছেন নাকি তাও অজানা। করিমের মা, তার সন্তানদের নিয়ে পথেই আছেন। সিরিয়াতে তাঁরা ভালো ছিলেন আর আজ তাঁরা পথের ভিখারি। একটা যুদ্ধ। শুধু একটা যুদ্ধ সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে।

মহিলা অঝোরধারায় কাঁদেন, দিমা ওর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, করিম আমার কোলে আইসক্রিম খায়, ওর ভাই আবুদ ও বোন সুহা মায়ের পাশে বসে আইসক্রিম খায়। আমি কী করব বুঝতে পারি না। দিমা করিমকে বলে, হাবিবি, তুমি মায়ের কাছে যাবে? ও যেতে চায় না, কাঁদে। আর আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারিনা। বৈরুতের রাস্তায় এক অবোধ শিশুকে জড়িয়ে ধরে আমি নির্লজ্জের মতো কাঁদি। আমি আমার অসহায়ত্বের জন্য কাঁদি। আমার ভীরুতা, সীমাবদ্ধতা, করিমের বাবা না হতে পারার লজ্জায় কাঁদি।

আমি আর দিমা করিমের মায়ের পাশে বসে পড়ি। করিম আমার গলা জড়িয়ে আছে, আবুদ আর সুহা বসে আছে দুপাশে। আমাদের পাঁচ জনের ব্যথা, না বলা কথা আর চোখের জল ভূমধ্যসাগরের নোনা বাতাসে মেশে। দিমা চলে যায়। আমি করিমের মাকে সামান্য টাকা দেয়ার চেষ্টা করি।

রাত গভীর হয়। নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্যের মাঝে সিরিয়ার এক ছোট শিশু বৈরুতের সাগরের তীরে এক অচেনা বাঙালির বুকে পরম নির্ভরতায় ঘুমিয়ে থাকে। শত সহস্র মাইল দূরে থাকা আমার ছেলে আদিকে আমি খুঁজে পেয়েছি। আজ আমি সারারাত জাগব। কারণ, আমার ছেলে আমার বুকে ঘুমিয়ে আছে।

বৈরুত ঘুমোয়। করিম ঘুমের মাঝে হাসে কি একটু? করিম, বাবা আমার, তুই ঘুমো, তোর বাবা জেগে আছে।

বৈরুত, মে, ২৯১৮

 

নাভিদ চৌধুরী
কজন উন্নয়ন কর্মী। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। কাজের সূত্রে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র জনপদে  যেয়ে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এই হঠাৎ দেখার গল্পগুলো, আচমকা ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, অতর্কিতে খোলা জানালা দিয়ে দেখা ক্ষণিকের সাথীর অনুভূতিগুলো তার লেখনীতে ধরা দিয়েছে। তার লেখায় ফুটে ওঠা মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা জাতির বিভেদ উপেক্ষা করে মানুষ‌ই মানুষের কাছে আসে, ভালবাসে। গল্পগুলো এই শ্বাশত মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।