আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

নর্থ ক্যারোলাইনা

কোরাকে কেন চিলেকোঠায় বন্দি করে রাখা হল তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। দক্ষিণে অন্য সব কিছুর মত তুলোচাষ থেকে এর উৎপত্তি। তুলোর কারখানা চালু চালু রাখতে দরকার আফ্রিকান গোলাম। মহাসাগরের অপর পার থেকে জাহাজ ভরে ভরে আনা হয়েছে সেই মানুষগুলোকে আর এখানে এসে তাদের জন্ম দিতে হয়েছে বেশি বেশি সন্তান। না হলে তুলোর চাহিদার জোগান দেয়ার এত মানুষ পাওয়া যেত না।

এ এমন এক ইঞ্জিন যার পিস্টন অবিরাম ঘুরতে হবে। যত বেশি গোলাম, তত বেশি তুলো। আরও বেশি তুলো উৎপাদনের জন্য চাই আরও বেশি বেশি জমি কেনার বেশি বেশি টাকা। এমন কি, দাসপ্রথা অবসানের পরও অন্তত এক পুরুষ ধরে এ অবস্থা বলবত ছিল। নিগ্রো গোলাম ছাড়া এসব কল্পনাও করা অসম্ভব ছিল। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাদারা সংখ্যায় কালোদের দ্বিগুণ। কিন্তু লুজিয়ানা ও জর্জিয়াতে সাদা-কালোর সংখ্যা প্রায় সমান সমান। আর এ সীমানা পেরিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ছবিটা একদম আলাদা। সেখানে সাদার চেয়ে কালোর সংখ্য অন্তত লাখ খানেক বেশি। তাই সেখানে মুক্তিপাগল গোলামরা যেমন মুক্তির জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, তেমনি তাদের উপর নির্যাতন হত অকল্পনীয় মাত্রায়।

জর্জিয়া, কেনটাকি, দক্ষিণ আমেরিকা আর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে মালিকদের বিরুদ্ধে তুমুল দাসবিদ্রোহ হয়েছিল। সাউদাম্পটন বিদ্রোহ দমনের পূবে টার্নার এবং তার সাঙ্গাতরা পঁয়ষটি জন নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করেছিল। আর বেসামরিক মিলিশিয়া আর পেট্রোলাররা আরও অন্তত তিন গুণ মানুষকে খুন করেছিল পিটিয়ে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হয় তারা ষড়যন্ত্রকারী, নয়ত তাদের সহযোগী কিংবা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এত মানুষ খুন করার একটাই উদ্দেশ্য আর তা হল মানুষকে সন্ত্রস্ত করে তোলা, একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা। ঠিক কত মানুষকে এভাবে খুন করা হয় তার সঠিক হিসাব কেউ জানে না।

“এখানে, একেবারে বাড়ির পাশেই থাকে যে কনেস্টবল সে আসলে এ রকমই একজন পেট্রোলার,” মার্টিন বলল।

“প্রায় জাগায়ই পেট্টোলার মনে করলিই যকন ইচ্চে তুমারে হয়রানি করবে,” কোরা সাই দিল। সে এখানে আসার পর পয়লা সোমবার, মাঝরাতের একটা ঘটনা। মার্টিনের মেয়ে, তার পরিবারের লোকেরা ফিরে এসেছে। তাদের সাথে এসেছে নীচে রাস্তার ওপারের আইরিশ পাড়ার ফিওনাও। মার্টিন তাড়াতাড়ি চিলেকোঠার কাছে কাঠের খাঁচার পরে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোরা তখন গুটিয়ে রাখা হাত-পা একটু মেলে দিয়েছিল যাতে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। এ ক’দিন সে একবারের জন্যও দাঁড়াতে পারেনি। সেটুকু জায়গা এখানে নেই। ইথেল আসতে চাইলেন না। একটা গাঢ় নীল পর্দা দিয়ে জানালাটা ঢাকা থাকে যাতে ছোট্ট মোমবাতির মিটমিটে আলোও বাইরে না যায়।

এক সময় মার্টিন গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “তার পড়শির ছেলে একজন নাইট রাইডার; ওদের কাজ পলাতক নিগ্রো পাকড়াও করা।”

দাস মালিকদের পক্ষে এই পেট্রোলাররাই হল আইন বরদার। এরা শয়তানের শয়তান। নিষ্ঠুরতায় এদের তুলনা নেই। এরা পারে না এমন কোন জঘন্য কাজ নেই।

ওভারসিয়ারের চেয়েও খারাপ। কোরা মাথা নেড়ে একমত হল। যে কাউকে এরা অকারণে হেনস্থ করে। তাদের কাছে সাদা-কালো বাদবিচার নেই। খামারের বাইরে যাবার পাস না দেখাতে পারলে তাকে বেদম পিটিয়ে স্থানীয় জেলে পুরে দেয়। যে সব কালো গোলাম মুক্ত হতে পেরেছে তাদের কাছে সব সময় মুক্তির কাগজ থাকতে হবে। নইলে দাসব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে আবার গোলামী করতে হবে। অনেককে তারা গোপন পথে পাচার করে দূরে কোথাও দাস হাটে নিলামে চড়িয়ে বেচে দেয়। আর বেয়াড়া গোলাম যারা নতি স্বীকার করে না তারা পালানোর চেষ্টা করলে সোজা গুলি করে মেরে ফেলে। ইচ্ছেমত দাসপাড়ায় চড়াও হয়ে লুটপাট করে, মেয়েদের বেইজ্জতি করে। এমন কি মুক্তগোলামদেরও তারা রেহাই দেয় না।

দাস বিদ্রোহ দমনে এই পেট্রোলাররাই প্রকৃত যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হল। অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার করে তারা। মহান এই দাস বিদ্রোহে রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়েছিল। তা ছিল রাতের অন্ধকার আকাশের নীচে আলোকের ঝর্নাধারা। কোরা সেভাবেই ভাবে। মার্টিনের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল খুব ছোট এবং বিশৃঙ্খল। বিদ্রোহীরা শহরের মাঝ দিয়ে ঝাড়ু দেয়া অস্ত্রপাতি সজ্জিত হয়ে এগিয়ে যায়। অস্ত্র বলতে তাদের হাতে ছিল দা, কোদাল, ছুরি আর ইটের টুকরো। কালোদের মধ্যে গাদ্দারের অভাব ছিল না। অনেকে সাদাদের দেখানো লোভে পড়ে দলত্যাগ করে সাদাদের সাথে গিয়ে ভেড়ে। আর পরিকল্পনা মাফিক অ্যামবুশ করে বিদ্রোহীদের সাবাড় করে দেয়। সরকারি সহায়তা তারা পেয়েছিল পুরো মাত্রায়। ঘোড়সোয়াররা বন্দুকের গুলিতে বিদ্রোহীদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রথমেই এই পেট্রোলাররা বিদ্রোহ দমনে ভলানটিয়ার হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদ্রোহ দমনে তারা কালোদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। সন্দেহভাজন, এমন কি রাস্তা থেকে উৎসুক জনতার মধ্য হতে অনেককে ধরে ধরে জেলে পোরে। এত লোক জেলে পুরেছিল যে, জেলখানায় তিল ধারনের জায়গা ছিল না। তারা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। আর যাতে বিদ্রোহ না ঘটানোর সাহস পায় সে জন্য এই নিরাপরাধ মানুষেদের বেশির ভাগকেই খুন করে। প্রতিশোধমূলক এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। পেট্রোলাররা ফ্যাক্টরিতে হামলা চালিয়ে দোকানপাট লুট করে।

বিদ্রোহ পুরোপুরি দমন করা হয়। কিন্তু কালোদের উপর তার বিরাট প্রভাব পড়ে। পরবর্তী আদমশুমারিতে কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা বিপুলভাবে কমে যায়।

“আমরা এসব জানি। আর বল না তো।”

মার্টিন সেখান থেকে নামার সময় কাঠের খাঁচাটা ভেঙে গেল।
“এসব কথা আর কত শোনব। শুনতে ভাললাগে না। আমরা আর কত বড় ?” কোরা খেদোক্তি করে।

গত শরতে এক ঠাণ্ডা সন্ধ্যায় নর্থ ক্যারোলাইনার এক ক্ষমতাবান ব্যক্তি কৃষ্ণাঙ্গ সমস্যার সমাধানকল্পে এক সভা আহ্বান করেন। রাজনীতিকগণ দাস বিতর্কের জটিলতা নিয়ে হাজার কথা বললেন। ধনী খামার মালিক যারা কালোদের পশুর মতো খেদিয়ে তুলোর খামারে এনে জড়ো করেছে তারা হায় হায় করে উঠল, এই বুঝি তার রাজত্বের অবসান ঘটতে চলল। উকিল বাবুরা গাঁদায় আগুন  জ্বালার মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় রইলেন। কোরাকে মার্টিন আরও জানালেন যে, সেখানে স্বয়ং জেমিসন স্থানীয় খামারমালিক এবং সিনেটর হিসেবে হাজির ছিলেন। অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা চলে।

তারা অনি গ্যারিসনের খাবার ঘরে একত্রিত হন। অনি জাস্টিস হিলের উপর বসবাস করেন। চূড়োটার এমন নামের কারণ এখান থেকে নীচে মাইলের পর মাইল দেখা যায়। আর তাতে পৃথিবী কত বড় সে সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। এই রাতের সভার পর থেকে এ ধরনের জমায়েতকে বলা হবে জাস্টিস কনভেনশন। আয়োজনকারীর পিতা ছিলেন কটন ভ্যানগার্ডের অন্যতম সদস্য এবং অন্যকে এই অত্যাচার্য তুলোচাষে উদ্বুদ্ধ করতে পারঙ্গম এক ব্যক্তি। অনি বেড়ে উঠেছেন তুলোর লাগামহীন মুনাফার মধ্যে আর তার আবশ্যিক ক্ষতচিহ্ন নিগারদের মধ্যে। তার ধেনো মদ গিলে মলিন মুখে লম্বা লাইনে অপেক্ষারতদের নিয়ে যত তিনি ভাবেন ততই তার মনে হয় তিনি তো প্রথমটাই চেয়েছেন আর দেখতে চাননি এই ক্ষতচিহ্ন। তাহলে কংগ্রেস কেন দাসবিদ্রোহ আর উত্তরের উস্কানি নিয়ে এত চিন্তিত, এত সময় কেন নষ্ট করছে? সকলেই তো তুলো থেকে মুনাফা তুলতে চায়!

পরবর্তী দিনগুলোয় পত্রিকাগুলো খবর ছাপে যে, এই নর্থ ক্যারোলাইতে অন্তত তিন লাখ দাস ছিল। প্রতি বছর প্রায় সমান সংখ্যক ইউরোপীয়ান, অধিকাংশই আইরিশ ও জার্মান স্বদেশে দুর্ভিক্ষ আর রাজনৈতিক হানাহানির শিকার হয়ে বোস্টন, নিউইউয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া পালিয়ে আসে। রাজ্য সভায়, খবরের কাগজগুলো বারবার এ প্রশ্ন তুলছে, কেন এ ইয়াংতি জনস্রোত বন্ধ করা যাচ্ছে না? কেন তাদের দক্ষিণে পাঠানো হচ্ছে না? বিদেশী পত্রিকাগুলোয় বিজ্ঞাপন দিয়ে, শ্রমিক সরবরাহের সুবিধা নিয়ে নানান গল্প ফাঁদা হচ্ছে। দালালরা শহরের সরাইখানা, গরিবি এলাকায় গিয়ে সভা-সমাবেশ করছে রোজ রোজ, জাহাজ ভরে লোক আনা হচ্ছে। এখানে এনে তাদেও নামিয়ে দেয়া হচ্ছে খেত-খামারে কাজে লাগানোর জন্য।

“সাদাগের ককখনো তুলো তুলতে দেকিনি,” কোরা বলল।

মার্টিন বলল, “জীবনেও দেখিনি উন্মত্ত জনতা মানুষকে ছিঁড়েফুড়ে মারতে। তুমি শুধু দেখে যাবে, কখনো বলতে পারবে কেন মানুষ এমন উন্মত্ত হল? কেন এসব বন্ধ করা হচ্ছে না?”

সত্যিই তো, তুমি একজন আইরিশের সাথে কখনো একজন আমেরিকানের মতো আচরণ করতে পারবে না। তা সে সাদা কিংবা নিগার যা-ই হোক না কেন। দাস কিনতে পয়সা গুণতে হয়, তাদের পুষতে খরচাপাতি আছে। অন্যদিকে, সাদাদের জন্য দিতে হয় মোটামুটি বেঁচে থাকার মত মুজুরি। তার মানে, দাস হানাহানি আর শেষ তক শান্তি বজায় রাখার লড়াই এটা। ইউরোপীয়ানরা আগে থেকেই চাষবাস জানত। এখানে এসে তারা আবার চাষবাসই করছে। তারা এদেশে এসে একবার বসত গাড়তে পারলে তারা আমেরিকান সমাজে মিশে যেতে পারে। দক্ষিণের সমাজের বন্ধু বা অংশ হয়ে যায় তারা। ভোটের দিন তারা প্রত্যেকে পুরো এক ভোটের মালিক, কালোদের মত পাঁচ ভাগের এক ভাগ ভোটার নয়। আর্থিক বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু জাতিগত হানাহানির প্রশ্নটাও বিবেচনায় আনতে হবে। দাসপ্রধান রাজ্যগুলোর মধ্যে নর্থ ক্যারোলাইনার অবস্থান সবচেয়ে ভাল।

সত্যিকার অর্থে তারা দাসপ্রথা বিলোপ করেছে। বিপরীতে অনি গ্যারিসনের দাবী, তারা নিগারদের খতম করেছে।

“মেয়ে, বাচ্চাকাচ্চা আর পুরুষ মানুষ সব গেল কনে?” কোরার প্রশ্ন। এমন সময় পার্ক থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল। তখনও তারা দু’জন চিলেকোঠায়। তারা একটু থমকে গেল।

মার্টিন বলল, “দেখলে?”

সে রাতে নর্থ ক্যারোলাইনা সরকারের প্রায় অর্ধেক এই গ্যারিসনে জমায়েত হয়েছে। তারা সেখানে যত গোলাম বিক্রির জন্য আনা হয়েছিল সবাইকে ভাল দামে কিনে নিল। ঠিক যেমন কয়েক দশক আগে ব্রিটেন দাস ব্যবসা বন্ধের সময় করেছিল। অন্য যেসব রাজ্য তুলোচাষের জন্য বিখ্যাত তারা বাকী গোলামদেও নিয়ে নিল। তুলোচাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে ফ্লোরিডা আর লুজিয়ানায়। কিন্তু এখন সেখানে দক্ষ কালো গোলামের আকাল পড়ে গেল। বুরবন স্ট্রিটে একবার ঘুওে আসলেই বোঝা যায়, এর কী বিরূপ ফল সেখানে হতে পারে। এটা একটা বেদনাদায়ক বর্ণসংকরের রাজ্য সেখানে সাদা-কালো রক্তে এক নতুন বর্ণসংকর আমেরিকান সমাজ জন্ম নিচ্ছে। সাদাদের রক্তের সাথে কালোদের রক্ত মিশে একটা দোঁআশলা জাতের জন্ম হচ্ছে। তাদের ইউরোপীয় পূর্বপুরুষের খাঁটি রক্ত মিশরীয় কালোয় দূষিত হয়ে এমন এক নতুন জারজ জীবনপ্রবাহ গড়ে উঠছে, এমন নতুন এক অস্ত্র তৈরি হচ্ছে যা তাদেরই গলা কাটার জন্য যথেষ্ট।

নর্থ ক্যারোলাইনায় কোন কালো নারী-পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নতুন জাতি আইন (Race Laws) করা হয়েছে। মুক্তি অর্জনকারী কালোদের হয় খেদিয়ে দেয়া হয়েছে, নয়ত গণহারে হত্যা করা হয়েছে। ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করতে যারা ভূমিকা পালন করেছিল সে সব ভেটারেনদের পদকে ভূষিত করা হয়েছে। টাকা দিয়ে তাদের ভাড়া করে আনা হয়েছে। কাজ খতম করার সাথে সাথেই সেখানে সাবেক প্রেট্রোলাররা নাইট রাইডারদের দায়িত্ব পালন করছে। তারা ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অবশিষ্ট কালোদের নির্মূল করেছে। সেখানে তারা নতুন আইন কার্যকর করেছে এবং মুক্তি অর্জনকারী সাবেক গোলামদের সেখান থেকে উৎখাত করেছে। ভাগ্যহত এসব কালো নারীপুরুষদের যে কোন ছুঁতোয় ভিটেমাটি থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

শনিবার সকালে ঘুম থেকে জেগে কোরা সেই গোপন ছিদ্রপথে চোখ রেখে দেখতে শুরু করল। ততক্ষণে লুসিয়ার দেহ খন্ড বিখন্ড করা হয়ে গেছে। সেখানে বাচ্চারা খেলা করছে। তোমরা একই “মুক্তির রাস্তা” বানিয়েছ, কোরা মনে মনে বলল, “কত দূর যাবে এ রাস্তা?”

মার্টিন মনে করেন, যতদিন কতল করার জন্য একজনও কালো মানুষ পাওয়া যাবে ততদিন এসব চলবে। চারিদিকে মৃতদেহ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, চিল-শকুনে সেসব লাশ খাবলে-খুবলে খাচ্ছে। একটা সাবাড় হতে না হতেই আরেকটা লাশ সেখানে জমছে। এবাবে লাশের পাহাড় জমছে। ছোটবড় সব শহরেই চলছে এই শুক্রবারের নরহত্যার মেলা। কোন কোন জায়গায় খুন করার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করে সেখানে কালোদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। নাইট রাইডাররা যদি নতুন কাউকে ধরে আনতে না পারে সেদিন যাতে এদের কাউকে খতম করে উৎসব করা যায় সেজন্যই এ ব্যবস্থা।

কালো কাউকে আশ্রয় দিলে এ আইনের আওতায় সাদাদেরও ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করা যেতে পারে, তবে সাদা কোন মৃতদেহ প্রদর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। মার্টিন জানালেন যে, একজন শে^তাঙ্গ কৃষক কিছু কালো নারী ও শিশুদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। তার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ঘরের মধ্যে আটকে পড়া সাদা-কালো মানুষগুলো পুড়ে এমন কয়লা হয়ে যায় যে, কে সাদা, কে কালো তা চেনার কোন উপায় ছিল না। যেহেতু কে সাদা, আর কে কালো তা বোঝার কোন উপায় ছিল না তাই আইন ভেঙে পাঁচটি লাশই গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু কেউ এ নিয়ে সামান্য ফুস কাড়তে পারেনি।

এসব কথা কোরার আর ভাল লাগছিল না। সে জানতে চাইল আর কত কাল তাকে এভাবে গর্তে লুকিয়ে থাকতে হবে? মার্টিন জবাবে বললেন, “তুমি নিশ্চয়ই আমাদের দুর্দশার কথা বিবেচনা করবে।” (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।