লুইস গ্লিকের নোবেল প্রাইজ লেকচার ২০২০: কবি এবং পাঠকের জুটি অন্তরঙ্গ, সম্মোহক, উদ্দীপক এবং নিবিড়

আমি যখন খুব ছোট, বছর ৪/৫ হবো, তখন আমি নিজেই মনে মনে একটা বাছাই প্রতিযোগিতার আয়োজন করলাম, বিশ্বের সবচেয়ে সেরা কবিতা কোনটি হতে পারে?প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে এসে দুটি কবিতা নির্বাচিত হলো, ব্লেক এর ‘দ্য লিটল ব্ল্যাক বয়’ এবং স্টিফেন ফস্টারের ‘সোয়ানী রিভার’। লং আইল্যান্ড এর দক্ষিণ উপকূলে সিডারহার্স্ট গ্রামে আমার দাদির বাড়ির দ্বিতীয় শয়নকক্ষে পায়চারি করতে করতে আমি নিরুচ্চারে আওড়াই ব্লেক এর এই কালজয়ী কবিতাটি এবং মনে মনে গাইতে থাকি স্টিফেন ফস্টারের মন কেমন করা সঙ্গীতটি। আমার মনে হয় আমার বাবার বাড়িতে প্রচুর উপন্যাস এবং প্রচলিত রাজনীতির বইয়ের পাশাপাশি কিছু কবিতার এন্থোলজিও ছিলো। কিন্তু ব্লেক এর কথা মনে করলে আমার দাদির বাড়ির কথাই মনে হয়। আমার দাদি খুব পড়ুয়া ছিলেন না, কিন্তু তাঁর বাড়িতে ব্লেক এর বই ছিলো। ‘দ্য সংস অফ ইনোসেন্স অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স’ এবং শেক্সপিয়ারের নাটকগুলোর গানের একটি ছোট বই, আমি যেগুলোর অনেকগুলোই মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। আমার খুব পছন্দ ছিলো ‘সিম্বেলিন’ এর গানগুলো, যদিও তাদের এক বর্ণও আমি বুঝতামনা। তবুও তাদের অপূর্ব সুর-মুর্ছনা, ঝঙ্কারে এক ভীরু শান্ত বালিকার মন উদ্বেলিত হতো, বিশেষ করে ‘অ্যান্ড রিনাউন্ড বাই দাই গ্রেভ’ চরণটি দিয়ে আমিও আশান্বিত হতাম মৃত্যুর পরের পরিচিতি সম্পর্কে।

আমার কাছে সেরা লেখা বাছাইয়ের এই ধরণের প্রতিযোগিতা খুব স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তই মনে হতো, ছোটবেলার প্রথম পড়া মীথগুলো সম্মান, ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের জন্যে এরকম প্রতিযোগিতার গল্প দিয়ে ভরা ছিলো। আমরা দুই বোন এগুলোর ভেতর দিয়েই বড় হয়েছি। ফ্রান্সকে রক্ষা করা(জোন অফ আর্ক), রেডিয়াম আবিষ্কার(মেরি কুরি)। আরো পরে আমি এরকম শ্রেণী বিভাগের নেতিবাচক দিকটা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু সেই শৈশবে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো। মাত্র একজনই পর্বতচূড়ায় উঠবে, বহু দূর থেকে তাকে দেখা যাবে, পাহাড়চূড়ায় একমাত্র দৃশ্যমান হবে সে ই। তার চেয়ে একটু নীচের মানুষটি অদৃশ্য থাকবে।

যেমন, এই ক্ষেত্রে, কবিতা। আমি কেন যেন নিশ্চিত ছিলাম ব্লেক এই বিষয়টি জানতেন, এবং এর ফলাফলের বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন। আমি বুঝতাম তিনি বেঁচে নেই, কিন্তু আমার অনুভবে তিনি বেঁচে আছেন, যেন তিনি প্রচ্ছন্নে থেকে আমার সাথে কথা বলছেন, যেন তাঁর কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পাচ্ছি। আমার মনে হতো তিনি কেবলমাত্র আমার সাথেই কথা বলছেন। আমার নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হতো, আমি ব্লেক এর সাথে কথা বলার জন্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতাম, আসলে ব্লেক ও শেক্সপিয়ারের সাথে আমি তখন রীতিমত কথা বলছি।

আমার মনোজগতে এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী ব্লেক। কিন্তু আরো পরে আমি বুঝতে পারি, ব্লেক এবং ফস্টারের এই দুটি কবিতার লিরিকের ভেতরে কী দারুণ মিল। যেমন তখন, এবং এখনও নিঃসঙ্গ সঙ্গীত, আকুতি এবং বাসনার কাব্য আমাকে আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। এবং বড় হয়ে ওঠার পর সেইসব কবিই আমাকে বারে বারে আকৃষ্ট করেছে, যাদের লেখা পড়লে মনে হয়েছে যেন আমাকে উদ্দেশ করেই এই লেখাগুলো লেখা, অন্তরঙ্গ, সম্মোহক, উদ্দীপক এবং নিবিড়, স্টেডিয়ামে বক্তৃতা করছেন, এমন কবি নয়, আবার স্বগতোক্তির স্টাইলে লিখছেন এমন কবিও নয়।

এই যোগসূত্রটা আমার ভালো লাগতো, কবিতার বিষয়বস্তুর এই নিবিড় ঐকান্তিকতা, ধর্মযাজকের কাছে কনফেশনের মতন কিংবা বিশ্লেষকের কাছে দেয়া বয়ানের মত বিষয়বস্তুগুলো আমাকে আকৃষ্ট করতো।

দাদির বাড়ির দ্বিতীয় শয়নকক্ষে পুরস্কার প্রদানের এই একান্ত গোপন আয়োজন কবিতার সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক আরো নিবিড়তর করতো, কোনভাবেই তার ব্যতিক্রম হতোনা।

‘লিটল ব্ল্যাক বয়’ কবিতার মধ্যে দিয়ে ব্লেক আমার সাথে কথা বলতেন, তিনিই ছিলেন এই কণ্ঠস্বরের পেছনের লুকনো উৎস। তাঁকে দেখা যেতো না, যেমন দেখা যেতো না কবিতার ছোট কালো ছেলেটিকে, অথবা রূঢ়, সংবেদনহীন সাদা ছেলেটির দৃষ্টিতে যার প্রকৃত চেহারা কখনোই ধরা পড়তো না, তেমন করে। কিন্তু আমি জানতাম, তিনি সত্যি কথা বলছেন, তাঁর অনিত্য মানব শরীরের গভীরে রয়েছে এক আলোকিত ও পরিশুদ্ধ আত্মার আভাস; আমি জানতাম কালো ছেলেটি তার যে অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার কথা বলছে তার ভেতরে কারো প্রতি কোন দোষারোপ নেই, নেই কোন প্রতিশোধ স্পৃহা, সে কেবল সেই বিশ্বাসের কথাই বলছে যে, মৃত্যুর পরের আদর্শ পৃথিবীতে সে স্বীকৃতি পাবে, এবং এই আনন্দের আতিশয্যে সেখানে সে নাজুক ছোট সাদা ছেলেটিকেও হঠাৎ আলোর ঝলকের তীব্রতা আর তাপ থেকে রক্ষাকরবে। যেহেতু এই কবিতায় কোন বাস্তব আশাবাদ নেই, বরং কবিতাটি বাস্তবতাকে প্রত্যাখান করে, সে কারণেই কবিতাটি হৃদয় বিদারক এবং এটি হয়ে ওঠে একটি জটিল রাজনৈতিক কবিতা। কালো ছেলেটির গভীর মর্মবেদনা, বা যা হতে পারতো তার ন্যায়সঙ্গত আক্রোশ, অথচ যা থেকে সে নিজে, বা তার মা তাকে প্রাণপণে সরিয়ে রাখে, কবিতাটির পাঠক বা শ্রোতা সেই গভীরতম অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হয় অনায়াসেই। এমন কী যখন পাঠক নিতান্তই এক শিশু।

কিন্তু সার্বজনীন সম্মান একটি অন্য বিষয়।

আমাকে বরাবর সেই কবিতাগুলোই আকৃষ্ট করে, যারা পাঠক-শ্রোতার সাথে নিবিড়
যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম, যেখানে পাঠক-শ্রোতারও অবদান থাকে, একটা আস্থা তৈরির মাধ্যমে, একটা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে, এমন কী হতে পারে, কবিতাগুলো বিষয়বস্তুর দিক থেকে কবি-পাঠক-শ্রোতার এক যৌথ প্রয়াসের মত। যেমন এমিলি ডিকিনসন যখন বলেন, ‘আমি কেউ নই’, ‘তুমিও কি কেউ নও?’ ‘তাহলে তুমি এবং আমি মিলে একটি জুটি, কাউকে বোলো না!’ অথবা যখন এলিয়ট বলেন, ‘চলো, তুমি এবং আমি, যাই,/ যখন সন্ধ্যা মেলেছে আকাশের গায়/ অপারেশন টেবিলে শায়িত অচেতন রোগীর মতন…’। এখানে এলিয়ট বয়েজ স্কাউট দলকে ডাকছেন না, তিনি সরাসরি সম্বোধন করছেন পাঠককে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফোটে যখন শেক্সপিয়ার বলেন, ‘তোমাকে কি আমি একটি গ্রীষ্ম দিনের সাথে তুলনা করবো?’ এখানে শেক্সপিয়ার আমাকে একটি গ্রীষ্ম দিনের সাথে তুলনা করছেন না। বরং এক্ষেত্রে আমার একটি চমকপ্রদ রূপক এর বর্ণনা উপভোগ করার সুযোগ হচ্ছে, কিন্তু কবিতাটিতে আমার উপস্থিতির দরকার নেই।

আমি যে শিল্পমাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, সেক্ষেত্রে সামষ্টিক উপলব্ধি বা মতামতের বেলায় এক ধরণের ঝুঁকি থাকে। বরং একান্ত বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তার ভেতরেই রয়েছে এর নৈপুণ্য। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই পাঠকের কাছেও এর আবেদন গুরুত্বপূর্ণ যা তাৎক্ষণিকভাবে পাঠকের কাছে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করে নেয়।

এ ধরণের কবির কবিতার ক্ষেত্রে যখন দলগত বা সামষ্টিক প্রতিক্রিয়ায় কবি নির্বাসিত বা উপেক্ষিত হওয়ার পরিবর্তে প্রশংসিত বা সমাদৃত হন, আমি মনে করি সেক্ষেত্রে কবি বরং বিব্রত বোধ করেন, আশঙ্কিত হন। কেননা তাঁর কবিতা ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে লেখা, সমষ্টিকে নয়।

এটাই এমিলি ডিকিনসনের লেখার বিষয়বস্তু, সব সময় না হলেও প্রায়শই।

‘আমি কেউ নই,
তুমিও কি কেউ নও?’

এবং এই কবিতাটির পরের চরণ দুটি আমি খুব আগ্রহ ভরে পড়ি

‘তাহলে তুমি এবং আমি মিলে একটি জুটি, কাউকে বোলো না!
তাহলে ওরা আমাদের নির্বাসন দেবে, তুমি তো জানো…’

আমি যখন সোফায় বসে পড়ছি, তখন ডিকিনসন আমাকে বেছে নিয়েছেন, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমাদের দু’জনের মধ্যে এক অনন্য অদৃশ্য যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, আমরা একে অন্যের দোসর হয়ে উঠেছি, যার খবর কেবল আমরাই জানি, সারা পৃথিবীর কাছে আমরা ‘কেউ না’।

আমি এক্ষেত্রে টিন এজ বালিকাদের ওপর এমিলি ডিকিনসনের সর্বনাশা প্রভাবের কথা বলছি না। আমি এখানে বলছি, তাঁর লেখার মেজাজের কথা, যা পাবলিক লাইফের উপরে আস্থাশীল নয়, বরং তিনি মনে করেন এখানে সার্বজনীনতার নামে স্বাতন্ত্র্যকে মুছে ফেলা হয় এবং অকপট সত্য প্রকাশের জায়গা নিয়ে নেয় আংশিক সত্য। যেমন ধরা যাক, যদি মন্ত্রণাকারীর(এমিলি ডিকিনসন) স্বর পালটে ট্রাইব্যুনালের স্বর করে দেয়া যায়, ‘আমরা কেউ না, তুমি কে?’ সাথে সাথেই সম্পূর্ণ বক্তব্যের অর্থই বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অনুমান করি, আমরা যারা বই লিখি তারা চাই ব্যাপক পাঠকের কাছে পৌঁছুতে। কিন্তু কিছু লেখক দর্শক-শ্রোতায় পূর্ণ অডিটোরিয়ামের মত ব্যাপক পাঠকের কাছে এক বারেই পৌঁছানোর চেয়ে কখনো অস্থায়ীভাবে, কখনো পর্যায়ক্রমিকভাবে অথবা দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতেও একে একে আসা পাঠকদের মধ্যে দিয়েই ব্যাপক পাঠকের কাছে পৌঁছুতে পারেন নিবিড়ভাবে।

আমি বিশ্বাস করি, আমাকে নোবেল পুরস্কারের সম্মান দিয়ে সুইডিশ একাডেমি আসলে সেই একান্ত নিবিড় ব্যক্তিগত স্বরকেই সম্মানিত করছেন, পাবলিক উচ্চারণ যে স্বরকে কিছু উদ্দীপ্ত বা পরিব্যাপ্ত করতে পারে, কিন্তু প্রতিস্থাপন করতে পারেনা কখনোই।

অনুবাদ: লুবনা ইয়াসমিন
লুইজ গ্লিক

[২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অ্যামেরিকান কবি/প্রাবন্ধিক লুইজ এলিজাবেথ গ্লিক। সাহিত্যে নোবেল অর্জনকারী নারীদের ভেতরে লুইজ ১৬ তম। লুইজ গ্লিকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ শে এপ্রিল নিউ ইয়র্ক শহরে, বর্তমানে বসবাস করছেন অ্যামেরিকার ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্যামব্রিজ শহরে। পেশাগত জীবনে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক। লুইজ গ্লিক অ্যামেরিকান অ্যাকাডেমি এন্ড ইন্সটিটিউট অফ আর্টস এন্ড লেটারস এর একজন সদস্য।]

 

লুবনা ইয়াসমিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। প্রিয় কবি আবুল হাসান, প্রিয় লেখক পাওলো কোয়েলো।

বর্তমান আবাস কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সের টরণ্টো শহরে। তবে লুবনা ইয়াসমিন এর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ঢাকা শহরে।  সবচে’ প্রিয় বন্ধু প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করেন, উদযাপন করেন নিয়ত।

তাঁর কাছে কবিতা লেখা হয়তো কখনো কখনো নিজের সাথে কথা বলা, হৃদয়ের কথা বলা, আর কখনো কখনো শব্দ, ছন্দের বিন্যাসে একটা সৃষ্টিশীল ভাষার কোলাজ বোনা। 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।