তাই কবিতা


অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

তাই তাই তাই মামাবাড়ি যাই।

প্রথমেই দ্বন্দ্ব: তাই নাকি থাই (নাকি এমনকি দাই?)? বাংলায় চিরকাল দেখে-শুনে এসেছি থাইল্যান্ড। এই অস্ত্রাল মুল্লুকে, কর্মস্থলে একবার “থাই সূপ” আমার প্রিয় তা এলান করতেই, এক শ্বেতাঙ্গ কলিগনি জিগান মুরগির রানের কথা কইতেছি কীনা। পরে এদেরকে বলতে শুনি টাইল্যান্ড। তো তাই, তাই। তাছাড়া, আমাদের অনেক (দক্ষিণ) ভারতীয় কলিগ-কলিগা ত-এর ইংরেজি করেন টি-এচ, যথা ত্যাগরাজন্ হ’ন থ্যাগরাজন্, বোধ করি ত যে ট নয় এটা বোঝাতেই তাঁরা তা করেন, কিন্তু এই অ্যাংলোস্যাক্সন বর্বরদের দিয়ে আমাদের ভাষার সঠিক উচ্চারণ করিয়ে নে’য়া আর সূর্যকে দক্ষিণ দিকে উঠতে বলা একই ব্যাপার। ফলে ত্যাগ হ’য়ে পড়েন টিয়াগা, এমনকি থিয়াগাও না। বেহুদা এচ-এর অপব্যয়। এই বৈবাহিকদের দিয়ে আমি আমার দেশের নামটি অনেক চেষ্টাতেও ঠিকমতো বলাতে পারলাম না আজ ১৩-১৪ বছর। বলে, ব্যাংলাডেশ। ডেশ-এ আমার সমস্যা অল্প, কিন্তু ব্যাংলা! কেমন হ্যাংলা শোনায় না? আর আমরা ছোটবেলায় ব্যাংলাবেংলি করলে তো বড়রা পিটটিও দিতেন…

কিন্তু কী (কী) জানি আমরা ল্যান্ডটির বিষয়ে? ছেলেবেলা জানলাম ও-দেশের আরেক নাম শ্যামদেশ আর সেথায় শ্বেতহস্তী আছে। বড় হ’য়ে জানলাম যে তা ঠিক নয়, মানে শ্বেতহস্তীর ব্যাপারটা, বরং ওখানে শ্বেতহস্তিনী আছে এমন বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে জনাব আমি একটি ত্রিয়োলে লেখেন দেশটির বিষয়ে তাঁর জনশ্রুতিকে নির্ভর ক’রে:

সাদা হাতি আজও আছে শুনি
শ্যামদেশে (শ্যামের গোপিনী?),
বাংলায় শ্যামাঘাস ধুনি,
সাদাহাতি আজও আছে শুনি।
এদিকে কত-না জ্ঞানিগুণী
বিকিকিনি করেন বিকিনি :
সাদাহাতি-সাদাহাতি শুনি,
কোথায় সে-শ্বেতহস্তিনী?

কৈশোরে দেখেছি তাইল্যান্ডের নানা ফুটবল দল, যথা রাজবীথি (নাকি রাজভীতি?), ব্যাংকক ব্যাংক ক্লাব, ইত্যাদি, আমাদের আগা খাঁ গোল্ড কাপে খেলতে আসে, উদ্ভট সব সংস্কৃত-ভোটচীনা-মেশানো নাম উদ্ভটতরভাবে উচ্চারিত হয় আমাদের অমর কমেন্ট্রিটর হামিদ ভাইয়ের সু-কণ্ঠে : সিতিপং পংশ্রী, রান্নাচাই, ইত্যাদিং। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে আমার কতিপয় “ফ্লাইং বিজনেসম্যান” বন্ধুর তরফে সে-দেশের কত কেচ্ছা কত কুচ্ছো শুনি, হায়-রে, আর জানি যে সে-স্থানের মুদ্রার নাম “ভাত”!

এ-ই সব।

তো এহেন তাইল্যান্ডের কবিতা অনুবাদ করতে দিলেন আমাকে অংকুরদা (ভদ্রলোককে ঢিট করবার জন্য হিট ম্যান খুঁজছি- না পেলে আমার বৌকে লেলিয়ে দেব)। এই কবিদের কারও নাম কস্মিন্ কালে শুনি নি- এক পিরা সুধম-এর নাম জানতাম, তা ও আবার তিনি একবার সিডনিতে এসেছিলেন সপ্রিং রাইটিং ফেস্টিভালে, তো আমিও সেথায় ছিলাম, দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁর ঠিক আগের “বক্তা”— মানে কীনা, বাংলাদেশ থেকে আর কাউকে না-পেয়ে রাইটার্জ অ্যাসোসিয়েশনের সভানেত্রী আইরিনা ডান আমাকে ঠেলে উঠিয়ে দেন স্টেজে (আমি তখন ছুটা-কাজ করি ওখানে)…। কিন্তু পিরা-জি কবি ন’ন, কথাকার।

_____________________________________

ইন্টার্নেটে পাওয়া যায় না এমন বিরল যে-ক’টি বিষয় বিশ্বজগতে আছে তার প্রধানতম তাই কবিতা। তাইল্যান্ডের দিকে গুগলি চালালে যেসব ষাইটের ব্যাটা সাইটেরা ভিড় ক’রে আসে, তাদের, আপিসে, উন্মোচন করাটা বিপজ্জনক। তাই, অংকুরদা স্ক্যান ক’রে যে-ক’টা তাই কবিতা পাঠালেন তা-ই সম্বল ক’রে প্রথমে আমার আর পরে কবি মাসুদ খানের শ্বেতহস্তিদর্শন… কাজেই, ভূমিকায় প্রায় কিছুই বলবার আমার নাই। খোদার নাম নিয়ে শুরু করি (অ্যান্ড, ইফ খোদা কামজ্, ক্যান হাফেজ বি ফার ব্যহাইন্ড?)

__________________________________

কবিতাগুলি অনুবাদ করতে গিয়ে প্রথমেই আমার ভারি বিতৃষ্ণা হয়। আমি রেগেই পড়ি খানিকটা। কবিদের না-পেয়ে সর্বংসহ অংকুরদার উপরেই চড়াও হই : অই মিঞা! এইসব অখদ্যে-অবদ্যে আমার পড়তে কেন লাগব, লেট অ্যালোন অনুবাদ করতে? ইত্যাদি। বেশিরভাগ কবিতাই আমার কাছে লাগল আমাদের সত্তরের রাজনৈতিক চিৎকারসর্বস্ব পদ্যের মতো। পরে বুঝি যে এক্ষেত্রেও হস্তিদর্শন হচ্ছে বটে। অংকুরদার পয়লা কিস্তিতে পাঠানো প্রায় সবগুলি কবিতা ছিল ১৯৭৩-এর গণতন্ত্রকামী গণ-অভু্যত্থানেরই ফসল, ফলে সেসব রাজনৈতিক হবে না তো কি কলাকৈবল্যবাদী হবে? যদিও, কলা-ও তাইদের ভারি প্রিয়। এই যে অল্প ক’টি কবিতা আমরা অনুবাদ করলাম, তারও মধ্যে একাধিকবার কলা-ই কবিতার বিষয় হ’য়ে এসেছে। কলা-ই, কেবল। তো, পরে আবার আরেক দফা কবিতা অংকুরদা পাঠালেন, যাতে কিছু প্রাচীন তাই কবিতা আছে, আর আমার বেধড়ক ভালো লেগেছে সেসব (যথারীতি; প্রাচীন কবিতার গন্ধ নাকে এলেই, ভাদ্দর মাসের সারমেয় আমি)। আমার নিজের দেশের সমসময়ের কবিতার চেয়ে সেসব যে বড়একটা পিছিয়ে ছিল এমন মনে করা গেল না। অবশ্য কবিতার আবার আগানো-পেছানো কী রে বাবা।

তা এই তাই কবিতার বয়স বড় কম নয়। সেই চতুর্দশ শতকের সুখতাই (সুখদায়ী?) আমল থেকেই প্রায় অনবচ্ছিন্নভাবে এ-ভাষার কবিতা মেলে, এবং প্রায় তখন থেকেই নানা ছন্দঃশাস্ত্র, বাক্যবিজ্ঞান পাওয়া যায়, হয় পালিতে নয়তো পালি থেকে তত্তৎকালীন তাই অনুবাদ বা অনুলিখনে, যথা ছন্দলক (ছন্দোলক্ষণ), বুত্তোদয় (বৃত্তোদয়), ইত্যাদি। প্রায় প্রথমাবধি পাঁচটি আলাদা জাতের ছন্দের ব্যবহার হ’য়ে আসছে তাই কবিতায়, যথা :

১।। ক্লূং। তাই জাতির নিজস্ব উদ্ভাবন এটি, সংস্কৃত বা পালি থেকে কর্জ করা নয়। সচরাচর চারটি দু’-পর্ব (হেমিস্টিচ) বিভাজিত চরণে গঠিত শ্লোক নিয়ে এই ছন্দ। চরণের প্রথম পর্বগুলি দ্বিতীয় পর্বগুলির চেয়ে ঢের বড়; পর্বে পর্বে চরণে চরণে বেশ জটিল মিলবিন্যাস থাকে।

২।। ছন্ (ছন্দ)। এ-ভাগে পড়ে বিভিন্ন সংস্কৃত অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, যাতে সংস্কৃতের লঘু (“লহু”) ও গুরু (“খরু”) অক্ষরবিন্যাসের নিয়ম যথাযথ বজায় রাখতে হ’ত এবং কাজেই এইসব ছন্দের প্রয়োগ খুব সহজসাধ্য ছিল না। আমি অবাক্ মেনেছি দেখে যে আদি ও মধ্যযুগের শ্যামদেশীয় কবিরা ইন্দ্রবজ্রা, বসন্ততিলক, তোটক, মালিনী, স্রগ্ধরা, শার্দূলবিক্রীড়িত, ইন্দ্রবংশা, বংশস্থবিল, কমলা, ভুজঙ্গপ্রয়াত, উপেন্দ্রবজ্রা, উপস্থিতা, শালিনী, উপজাতি, চিত্রপদা, মাণবক, বিদ্যুন্মালা, প্রমাণিকা, ইত্যাদি নানা সংস্কৃত ছন্দে হরদম কবিতা লিখত। এমনকি খোদ সংস্কৃত কবিদের থেকে এককাঠি এগিয়ে তাঁরা এসব ছন্দে অন্ত্যমিলও ব্যবহার করত (যেমন সত্যেন দত্ত করেছেন বাংলায়)।

৩।। কাব্ (কাব্য)। এ-ছন্দও ভারত থেকে ধার-নেওয়া, প্রধানতঃ সংস্কৃত/প্রাকৃত মাত্রাবৃত্তের তাই সংস্করণ। তবে মাত্রার জায়গা নিয়েছে এখানে অক্ষর (সিলেবল)। এর প্রধান তিনটি রূপ : ক. “কাব্ ছবং ১৬ (সিরা হক্)”, ষোড়শাক্ষর; খ. “কাব্ সুরাংখনাং ২৮”, অষ্টাবিংশাক্ষর; এবং গ. “কাব্ যানী ১১ (সিপ্ এৎ)”, একাদশাক্ষর।

৪।। ক৯ন। এটিও, তাই জাতির নিজস্ব। এর প্রধান দু’টি রূপ : ক. “ক৯ন ৬”, এর চরণগুলির প্রতি পর্বে ৬ অক্ষর; আর খ. “ক৯ন ৮”, এর প্রতি পর্বে আট অক্ষর। এ-ছন্দেও চরণে-চরণে পর্বে-পর্বে জটিল মিলবিন্যাস লক্ষণীয়।

৫।। রায়। এই ছন্দেরও উৎস হয়তো পালি/প্রাকৃত ছন্দ, বা তাদের সঙ্গে প্রাচীন তাই ছন্দঃসমূহের সঙ্কর। এই ছন্দের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নাই, কিছুটা মুক্তবদ্ধ, কিছুটা মিশ্র, অনেকটা যেন পাশ্চাত্ত্য ভ্যের লিব্র্ বা সংস্কৃত “বৃত্তগন্ধী” গদ্য। বলা বাহুল্য যে তাই কবিদের মধ্যে এই ছন্দ একালে তো বটেই, সর্বকালেই জনপ্রিয়তম।

সুখতাই যুগের নানা লিখিত নথিপত্র পাওয়া যায়, ধর্ম, প্রশাসন, প্রভৃতি বিষয়েই প্রধানতঃ। তবে প্রকৃত সাহিত্যের উদ্ভবের জন্য এই জাতিকে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী “অযোধ্যা” আমলের জন্য। অযোধ্যা পর্বেই ব্যাপক হারে ভারতীয় ও ইন্দোনেশীয় (যবীয়) নানা গাথা ও উপাখ্যানের অনুবাদ ও অনুলিখন শুরু হয়। শুরু হয়, যাকে বলা যায় “কোর্ট লিটরেচর” বা দরবারি সাহিত্যের (যার একটি অকিঞ্চিৎকর নির্দশন আমাদের অনূদিত সওয়াল-জবাব )। এ-যুগের প্রথম বিখ্যাত রচনা লীলিৎ অঙ্গকরণ ছায়েং নাম, সম্রাটের প্রতি তাঁর সেনাপতি ও অমাত্যবর্গের বিশ্বস্ততার শপথ-গ্রহণ অনুষ্ঠানে গীত হ’ত এই গদ্যপদ্যময় স্তোত্রটি।

আর এ-সময়েরই আখ্যানধর্মী কাব্য রাজপুত্র লোর-এর মহাকাব্য, বিশেষতঃ তদন্তর্গত যে ছোট্ট, চমৎকার অংশটির তরজমা আমাকে দিয়ে করিয়ে অংকুরদা নিলেন, তার বাবদে কিছু বলতে ইচ্ছা করি। এই অংশটিতে, রাজপুত্র লোর-এর সঙ্গে তাঁর যুগল প্রণয়িনী, পড়োশি রাজ্যের দুই রাজকন্যা, দুই বোন, পেউন ও পাংতং-এর দেহমিলনের কিঞ্চিৎ আলঙ্কারিক বর্ণনা আছে। ভারি সুন্দর। তবে এর কাব্যসৌন্দর্য তত নয়, যতটা আমাকে ভাবিয়েছে, ভারতবর্ষে সে-যুগে (বা প্রায় কোনো যুগেই) প্রায়-অভাবনীয়, এইরূপ অনুলোম ত্রিভুজ প্রেমের সহজ, স্বাভাবিক, পাপবোধমুক্ত বয়ান। অসংখ্য গোপিনীপরিরব্ধ কালাচাঁদ আমাদের অপরিচিত অবশ্য ন’ন, কিন্তু তিনি তো আর ঠিক মানুষ ন’ন, দেবতা, এবং আরও বিশেষ ক’রে, তাঁর গোপিনীরা কেউই যে পরস্পরের সোদরা কি উদরজাতা এমনও শুনি নি। হ’তে(ই) পারে যে কাহিনিটি বহিরাগত, এবং এও খুবই সম্ভব যে এইরকম কোনো সম্পর্ক (তখনই বা) পরবর্তী কালে নিষিদ্ধ হ’য়েও গিয়েছে। কিন্তু তা যদি হ’য়েও থাকে-বা, এ যে তাই সমাজে একদা স্বাভাবিকভাবে গৃহীত হয়েছিল তা কিন্তু কবির বর্ণনার সহজতায় বেশ বোঝা যায়; আর, একবার যা সংস্কৃতিতে গৃহীত হয়, তার রেশ পুরোপুরি মুছে হয়তো কখনোই যায় না। এইসব ছোট-ছোট বৈশিষ্ট্যগুলিকে পর্যবেক্ষণ করতে না-পারলে একটা জাতিকে, একটা সমাজকে ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারা কঠিন।

আবার এ-যুগেই সূচনা হয়, তাইদের জাতীয় মহাকাব্য, রামায়ণ-ভিত্তিক, রামকীয়ন্-এর। এর অনেকগুলি আলাদা সংস্করণ, বর্মী সেনা-কর্তৃক অযোধ্যা ধ্বংসের সময় বিনষ্ট হয়। ঐ সময়ের পরবর্তী রামকীয়নের যে-সংস্করণটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তার সম্পাদক এবং আংশিক লেখকও ছিলেন সম্রাট্ প্রথম রাম। পরে তৎপুত্র দ্বিতীয় রাম এর বেশকিছু পরিব(র্ত/র্ধ)ন ঘটিয়েছিলেন, আর এর একটা নাট্যরূপেরও জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। বস্তুতঃ রামায়ণের এই তাই সংস্করণটি অযোধ্যা ও রত্নকোষী আমল দু’টোর (আদম-)সেতুবন্ধ-স্বরূপ।

তো এই রাজা প্রথম রামেরই রাজত্বের পঞ্চম বর্ষে, শ্যামদেশের এক অখ্যাত গ্রামের অখ্যাত পরিবারে জন্ম নেন, তাইল্যান্ডের বাল্মীকি বা কালিদাস বা রবীন্দ্রনাথ, সুন্দরন্ ফু। তাইদের পক্ষে তাই : কাব্যস্য রামকীয়ন্ কবি সুন্দরন্।

সুন্দরন্-কে নিয়ে গোটা একটা প্রবন্ধ লিখতে হয়তো হ’ত। কিন্তু, হায়, সময় নাই। ১৭৮৬ সালে তাঁর জন্ম। জন্মের পর-পরই বাবা সন্ন্যাসী হ’য়ে গৃহত্যাগ করেন আর কিছুদিন পর মা উপায়ান্তরের অভাবে পুনর্বিবাহ করেন। কালক্রমে রাজপুরীতে এক রাজকন্যার পরিচারিকার কাজ জোটাতে পারেন মা, এবং সেইসূত্রে সুন্দরনের রাজপুরীতে প্রথমবার প্রবেশ ঘটে (এর পর আরও অনেকবার তার এখানে ও এখান থেকে প্রবেশ-প্রস্থান ঘটবে)। সেসময়কার অধিকাংশ কিশোরেরই মতো, সুন্দরনেরও শিক্ষালাভ হয় এক বৌদ্ধ আশ্রমে, আর শিক্ষাশেষে সদ্যস্তরুণ সুন্দরন্ স্থানীয় প্রশাসনে একজন কেরানির কাজ পান। অবশ্য কাজে তাঁর মন ছিল না তা বলা বাহুল্য। জগতের আরও অনেক তরুণ কবির মতো, তাঁর হিসাবের খাতা ভ’রে উঠত কবিতায়-কবিতায়। এই পর্যায়ে তিনি একটা দীর্ঘ কবিতা রচনায় কলম দিয়েও, স্থৈর্যের অভাববশতঃ তাকে মাঝপথে পরিহার করেন, আর, এসময়ই, সেই সবে-গোঁপ-গজানো পোলাটার লগে এক রাজপুরবাসিনীর প্রেমের বিষয়টা চাউর হ’য়ে গেলে তিনি এবং তার প্রেমিকা উভয়েই কয়েদখানায় দাখিল হ’ন। ১৮০৬ নাগাদ তাঁদেরকে রেহা করা হয়।

এর পর বেশকিছুদিন কেটে যায় ভ্রমণে (একবার শৈশবে খোয়ানো পিতাকেও যান দেখতে) আর নানা “নিরত” বা ভ্রমণ-কাব্য রচনায়। এই ভ্রমণকাব্যগুলি তাই কাব্যসাহিত্যে অমর হ’য়ে আছে। আর তিনি লেখেন অনেক অনেক প্রেমের কবিতা, তাঁর প্রেমিকা, চান্-এর জন্য। ততঃপর দীর্ঘভ্রমণ আর নানা অসুখবিসুখ উতরে আবার ফেরেন ব্যাংকক, এবং বিয়ে করেন চান্-কে। কিন্তু, হায়, এই বহুপ্রতীক্ষিত, বহুতিতিক্ষিত বিয়ে সুখের হয় নি। সুন্দরন্ বোতলমুখী হ’য়ে পড়েন, আর এ নিয়ে নৈমিত্তিক কাজিয়ার এক পর্যায়ে চান্ তাঁকে ত্যাগ ক’রে চ’লে যান।

১৮০৯ সালে সম্রাট্ প্রথম রামের মৃত্যু হ’লে তৎপুত্র দ্বিতীয় রাম মসনদে বসেন। নিজে একজন উত্তম কবি হবার সুবাদে, সুন্দরনের কবিতার মূল্য তিনি বুঝতেন, এবং নিজের কবিতা বাবদে তাঁর পরামর্শও হামেশাই নিতেন। পরে অবশ্য মদ খেয়ে আত্মীয়বন্ধুদের উপর চড়াও হবার অপরাধে আবার বাধ্য হ’য়েই তাঁকে কয়েদ করতে হয়। এবার জেলে ব’সেই, সুন্দরন্ লিখতে শুরু করেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস : ফ্রা অভয় মানী (অভিমন্যু?)— তিরিশ হাজার চরণের, শ্যামদেশের প্রথম এবং প্রধানতম মৌলিক কাহিনিকাব্য, এক তাই রাজপুত্রের জীবনের বিচিত্র উপাখ্যান। জেলে থাকাকালেই কিস্তিতে-কিস্তিতে এটি প্রকাশিত হয়…

পরে দ্বিতীয় রাম-পরবর্তী রাজন্যদের কোপে প’ড়ে তাঁর জীবনে দুর্দশা নেমে আসে আবারও, ভিক্ষুর জীবনে চ’লে যান একসময়, পরে আবার সসম্মানে তাঁকে রাজপুরীতে নিয়ে আসা হয়, তিনি পান রাজকবির মর্যাদা। তাঁর কবিতা যেমন তার সর্বত্রগামী সহজতার জন্য, তার অফুরান প্রাণশক্তির জন্য তাইল্যান্ডের আপামর জনসাধারণের হৃদয় ছুঁয়েছিল, তেমনি তিনি ন্যাশনাল হীরো তে পরিণত হয়েছিলেন তাঁর বিচিত্র জীবনের জন্যও।

রত্নকোষী যুগে, কিছুটা যেন সুন্দরনেরই প্রভাবে, ভ্রমণকাব্য বা নিরত তাই কবিদের প্রধান কাব্যমাধ্যম হ’য়ে দাঁড়ায়, যে-ধারার একেবারে শেষদিক্কার উল্লেখযোগ্য রচনা লন্ডন নিরত, মম রচতাই-এর লেখা। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মম-কে পঞ্চম রাম পাঠিয়েছিলেন ইংল্যান্ড, মহারানি ভিক্টোরিয়ার নিকটে, রাজপত্রবাহকরূপে। রত্নকোষী যুগের আরও এক বিখ্যাত কবিতা-গান খুন চাং খুন ফায়েন যাতে ঐ সময়ের তাই জীবনের একটা বিশ্বস্ত প্রতিফলন দেখা যায়।

পঞ্চম থেকে সপ্তম রামের রাজত্বেই, তাই সাহিত্যে পাশ্চাত্ত্য প্রভাবের অনুপ্রবেশ ঘটতে আরম্ভ করে, আর এর প্রধান ফসল তাই গদ্য-সাহিত্য। এই সময় থেকে, মানে বিশ শতকের প্রথম দশকগুলি থেকে, উপন্যাস আর গল্প ক্রমে কাহিনিকাব্য ও খণ্ডকাব্যের জায়গা দখল করে, এবং বহু শতাব্দীর তাই কবিতার ভরাগাঙ মরাগাঙে বদলে যায়। এ-সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য, শিক্ষিত কবি প্রেম ছায়া (বা রাজকুমার প্রেম পুরাচ্ছত্র), যাঁর কবিতার অত্যন্ত সাবলীল অনুবাদ করেছেন মাসুদ খান (নীচে দেখুন)।

১৯৪২-এ একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের জায়গায় গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হ’লে, তাই সাহিত্যের দরবার-নির্ভরতা আরও যায় ক’মে, এবং বিষয়বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে উপন্যাস ও গল্পে। ১৯৫৮ সালে ফীল্ড মার্শাল সরিৎ তনরতের ক্ষমতা দখলের পর বাক্-স্বাধীনতাকে গলা টিপে মারা হয়। সরকারি অন্বীক্ষণ ব্যতিরেকে কোনো লেখা ছাপানোই অসম্ভব হ’য়ে পড়ে, কি বইতে কি কাগজে। প্রাগ্রসর কাগজগুলো প্রায় সবই বন্ধ ক’রে দেওয়া হয় আর তাদের লেখক-সম্পাদক-প্রকাশকদের কপালে জোটে জেল জুলুম। এর ফলে এসময়ে গল্প-উপন্যাস হ’য়ে দাঁড়ায় বৈচিত্র্যবর্জিত ও তোয়াজধর্মী। কবিতা কিন্তু, অনেকটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে হ’লেও, চলতে শুরু করে আবার। আর এমনই তো হবার কথা, নয়? যে-দেশেই যখনই মানুষের মুখ চেপে ধরা হয়েছে, তার নিঃশ্বাসে বেরিয়ে এসেছে কবিতা। তাইদেরও তাই। অঙ্গকরণ কল্যাণাপং-এর কবিতাগুলি সেই সময়ের স্বাক্ষর বইছে, এবং তাঁর কালের নিপীড়নগুলিকে না-জানলে তাঁর কবিতাকে নেহাত কোনো গৌণকবির উপদেশমার্কা, কবিকবিভাবমার্কা কবিতা মনে ক’রে ফেলবার ভয় আছে, বিশেষ ক’রে আমার মতো বৈদেশিকের।

আমাদের ভাগ্য ভালো যে আমরা, মানে অংকুরদা আর আমি, প্রায় যুগপৎ অন্তর্জালে অধ্যাপক স্বরাজ হংলাদারম-এর “পোস্টমডার্নিজম ইন টাই পোয়েট্রি : শাক্যশ্রী মীসমসুয়েব’জ্ টুক্টা রই সাই” নামে একটা রিভিউ আবিষ্কার করি অকস্মাৎ। প্রবন্ধটিতে অধ্যাপক হংলাদারম তাই কবিতাকে তিনটি সাহিত্যিক যুগে ভাগ করেছেন : আধুনিক-পূর্ব, আধুনিক, এবং আধুনিক উত্তর; এবং প্রাচীন অঙ্গকরণ ছায়েং নাম (উপর্যুল্লিত) স্তোত্রটি, অঙ্গকরণ কল্যাণাপং-এর কবির অন্তিম ইচ্ছাপত্র (নীচে দেখুন, মাসুদ খানের অনুবাদে), এবং শাক্যশ্রীর কবিতার তুলনামূলক আলোচনায় সাব্যস্ত করেছেন যে এগুলো যথাক্রমে প্রাগুক্ত তিন যুগের প্রতিনিধিত্বকারী। অধ্যাপক সাহেবের সিদ্ধান্তকে টায়-টায় মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খানিক অসুবিধার, বিশেষ ক’রে তিনি যে-অজুহাতে অঙ্গকরণের থেকে শাক্যশ্রীর কবিতাকে আলাদা করেন, তাকে খানিকটা আরোপিত মনে হয় বটে। অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হয় যে তিনি সাহিত্যের ন’ন, দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষক এবং সাহিত্যের ছাত্র আমরা ঠিক যেভাবে বুঝি এইসকল অভিধাকে, তিনি হয়তো সেরকম ক’রে বোঝেন / বোঝান না। তদুপরি, এও তিনি নিজেই ব’লে নেন তাঁর রচনায় যে যাঁদের কবিতা নিয়ে তাঁর আলোচনা— শাক্যশ্রী সমেত— তাঁরা নিজেরা যে ‘উত্তর-আধুনিক’ প্রভৃতি প্রতীচীন ধারণার বিষয়ে বড়-একটা ওয়াকিবহাল, তা না-হবার সম্ভাবনাই বেশি।

শাক্যশ্রীর বইয়ের আলোচনা-কালে, যে-যুগটিকে অধ্যাপক হংলাদারম উত্তর-আধুনিকতার যুগ ব’লে চিহ্নিত করেন, তার আদিপুরুষ ব’লে ধরা যায় নৌব্রত পংপৈবূন-কে (আমার স্বেচ্ছাচারী প্রতিবর্ণীকরণের জন্য ক্ষমা চাইছি)। নৌব্রতরও জীবন বেশ বিচিত্র : মফস্সলে জন্ম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন ব্যাংকক। স্নাতকত্ব লাভের পর গিয়ে মঠের সন্ন্যাসী হ’ন, বুদ্ধদাস ভিক্ষুর (এঁর কবিতার তরজমা খান সাহেব করেছেন) শিষ্যত্ব গ্রহণ ক’রে। পরে খণ্ডকালীন প্রকাশক, অধ্যাপক, এবং শেষমেশ ব্যাংকার। কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও সিদ্ধহস্ত। আর, বিশেষরকম সিদ্ধ-অঙ্গুলি বাঁশিতে। ৮০-তে এস.ই.এ. “রাইট” পদক পান, আর ৯৩-এ জোটে “জাতীয় শিল্পী”-র উপাধি।

সুজিত ওংতেস ১৯৭৩ বিপ্লবের জাতক, যার পরিচয় পাওয়া যাবে আমাদের অনূদিত তাঁর কবিতাটিতে। খমতুয়ান খান্তনু-ও, এই বিপ্লবেরই অংশভাক্ শুধু ন’ন, তার অন্যতম কর্ণধারও ছিলেন। প্রকৃত নাম (আবারও প্রতিবর্ণীকরণের বাবদে মার্জনা ভিক্ষা করি) প্রসার্তভরণ ভূসুশীলাপধরণ; খান্তনু (শান্তনু?) তখল্লুসে কবিতা, আর কসুম ফিসাই নামে লেখেন গদ্য। কঠিন, তিক্ত বিদ্রূপের জন্য সতীর্থদের কাছে “লৌহকবি” ব’লে পরিচিত।

চিরানন পিৎপ্রীছার জন্ম দক্ষিণ তাইল্যান্ডে। কৈশোরেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। ব্যাংককে ছুলাঙ্করণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর-পরই, মাত্র আঠারো বছর বয়সে, ঝাঁপিয়ে পড়েন অক্টোবর ১৪, ১৯৭৩-এর গণ-অভু্যত্থানে। ১৯৭৬, অক্টোবর ৬-এর হাঙ্গামার পর ৫ বছরের জন্য বনবাসে চ’লে যান। পরে বিদেশে পড়াশোনা ক’রে আবার দেশে ফেরেন, আর প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও বন্ধু সেক্ষাণ প্রসার্তকুল-কে বিয়ে করেন। ১৯৮৯-এ রাইট পদক-পাওয়া চিরানন অবশ্য বিপ্লবের চেয়ে নারীমুক্তি বিষয়ক কবিতার জন্যই প্রসিদ্ধ বেশি।

আরও অন্য কবিদের বিষয়ে তেমন কোনো (পড়ুন “কোনো”) তথ্য আমরা (পড়ুন “অংকুরদা”) জোগাড় করতে না-পারায় তাঁদেরকে দূর থেকে নমস্কার করি। আর সাষ্টাঙ্গ, আভূম প্রণাম রাখি প্রিয় কবি, প্রিয় অগ্রজ বন্ধু, মাসুদ খানের পাদপদ্মে। জীবনের নানা খানা থেকে তিনি আমায় উদ্ধার অতীতে করেছেন। বর্তমানেও করলেন, আরেকবার, অংকুরদার হাত থেকে। ইতি ২৫ জুন ২০০৮, সিডনি।

 

সি প্রাত
(আনু. ১৪৪৫-১৫৪৬)

 

সওয়াল জবাব
(মালিকা শ্রীমতী চুলাকাক-এর সঙ্গে কবি’র)

মালিকা :
 হাবা খরগোশ লাফায় চাঁদের পানে,     আহা কী আহাম্মক!
 হেন রাতকানা, দ্যাখে না কী ভয়ানক   নীচে তার আস্তানা।
 হামেশা যেমন ময়ূর করে বাহানা       নাচতে মেঘের সাথে,
 নিজের অবস্থান না-জেনেই মাতে       সর্বনাশের টানে।
কবি :
 বোকা খরগোশ লাফায় বেজায় উঁচু        উজ্জ্বলতার দিকে,
 যতদূর নিতে পারে সে চোখ-দু'টিকে      দূর আকাশের মাঝে।
 কিন্তু কখনও বাঁধ ভেঙে যায় লাজের      সব পশুপাখিতরু
 সাথি খোঁজে, আজ আপনিও তাই করুন,  বান্দা হাজির, হুজুর!

(Si Prat, Repartee, with Lady Sri Chulalak.
English Translation by Alan Marshfield)

 

অজ্ঞাত
(আনু. ১৬৫৫-১৬৮৮)

রাজকুমার লোর-এর মহাকাব্য থেকে
[এক বিবাহিত রাজকুমার তাঁর প্রতিবেশী রাজ্যের রাজার দুই কন্যার প্রেমে পড়েন, যে রাজার সঙ্গে সেসময় তাঁর যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধে এই প্রেমিক-ত্রয়ীর মৃত্যু হ’লে দুই রাজ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।]

 দ্যাখো ঐ তিন প্রেমিকেরে, যারা রাজকীয়, যারা উচ্চে,
 বাহুগুলি আহা খামচে ধরেছে মাংস, শরীর ছুঁচ্ছে
       অন্ধের মতো অন্য শরীর, অশেষ প্রশংসায়,
 লালসায় আর ভোগের আশায়, দয়িতের লাল ওষ্ঠে
 বেহেশতি সুরা চুষে-চুষে খেতে, নিজের দু'ঠোঁট ঘষটে—
       একটা যুগল এভাবে কেবল চিপড়ায়, আঁকড়ায়।
 পরস্পরকে আদর করছে বাহুরা, নিকটে টানছে;
 মাংস, দৈবী মাংসের কাছে অনুনয় কাঁচা মাংসের,
       নবনি-নবীন মাংস করছে পরস্পরকে ধন্য।
 প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলগুলি যৌবন চলে উসকে;
 মুখগহ্বর, পবিত্র মুখ, অনুনয় করে মুখকে—
       মুখেরা, যাদের সৃষ্টি হয়েছে আরেক মুখের জন্য।
 পুরুষ-বক্ষে মিলেছে এখন তুলতুলে নারী-বক্ষ,
 কক্ষ, পুণ্য কক্ষকে ঐ অনুনয় করে কক্ষ,
       জঘনে গরম জঘন গলছে, স্নেহে স্নেহ গ'লে যায়।
 অহহ নহলি-শৃঙ্গারে-জাগা মরমে পরমানন্দ,
 আহা একাধারে-মিলে-মিশে-থাকা আস্বাদ, সৌগন্ধ;
       উভয়েরে গেলে রাঙা কামনারা নশ্বর কলিজায়।
 ফুল ফুলে ওঠে, খুলতে চেষ্টা করে সে ফুলেল অঙ্গ,
 কলির উপরে কলি, আরও কলি, ফুলের কলির দঙ্গল,
       কলিতে-কলিতে কূলে-কূলে-ভরা একটা পুষ্করিণী।
 দ্যাখো অলিটার চেপে ধরা আর পাকড়ানো, মিহি স্পর্শ,
 পদ্মের খোলা-বোজার সঙ্গে ভৃঙ্গের হাত-মকশো;
       একে অন্যের ভিতরে ঢুঁড়ছে মধু-র নির্ঝরিণী।
 অনাবৃত সে তো, কেননা এমন বেপরোয়া নহে স্বর্গের
 পুকুরও, নয় তা ভরা এরকম মদিরায়, মধুপর্কে,
       এই মেয়েটির মাংস-পুকুর যেরকম সুমসৃণ।
 'তোমার মোহন পুষ্করিণীতে এত খুশি এত ফুর্তি
 লাগে মাছেদের, গড়াগড়ি খেতে, লাফাতে, খেলতে, ঘুরতে
       অবারিত-দ্বার পদ্মের মাঝে সারারাত সারাদিন।
 'আহা সুন্দর বস্তিদেশটি, যেন নির্মল আরশি,
 আর মিঠা জলে থৈথৈ ঐ গুহার চতুষ্পার্শ্বে
       ঐ অদ্ভুত সুখের আকর, তুলনারহিত ঢিবি!'
'প্রভু আরোহণ করেছেন আজ শিখরে নিজের কর্মের,
 আমার সোনালি স্তনদু'টো নিয়ে মাতুন-না তিনি নর্মে।
        ওগো প্রাণপতি, রাখো এ-মিনতি, জড়াও সোহাগে নিবিড়।'
 কুমারী পেউন হলেন যখন রমণপরিক্লান্তা,
 দ্বিতীয় পরিটি, তাঁর ছোট বোন, এবার রাজার কান্তা,
        অপাপবিদ্ধা আর সুন্দরীতমা পাংতং বিবি।

(Anonymouos, From The Epic of Excellency Lor.
English Translation by Alan Marshfield)

 

সুন্দরন ফু
(১৭৮৬-১৮৫৫)

‘প্রথম’-এর বুদ্ধপ্রতিমার কাছে ব’সে লেখা পঙ্ক্তিমালা থেকে

বৃক্ষ হ’য়ে আমাকে তুমি বাসা বাঁধতে দাও;
তা দেব এক শাখায় আমি লুকাব কিশলয়ে।
চান্দ্র সৌন্দর্য হও, প্রেমপুষ্প- তা-ও,
ফুল তুলতে উড়াল দেব আমি নায়ক হ’য়ে।

পদ্ম হও, আমিও লেগে পড়ি অলির কাজে,
পরাগরেণুগুলির তবে করি ইস্তামাল।
হও সাগর, বড়বা হ’ব আমি তোমার মাঝে,
তোমার নাম গেয়েই হ’ব তোমাতে পয়মাল।

শীতল গুহা, আমি তোমার রাজহংস-নিভ
সাঁতার দেব বানের তোড়ে, প্রবল জলাবর্তে,
শীতলতম মাংস, তুমি হও আমার বিভু,
তোমার বিভা পেলেই আমি দেবতা হ’ব মর্ত্যে।

(Sunthorn Phu, from Lines Written Near the Statue of the Buddha of Prathom.
English Translation by Alan Marshfield)

 

ফ্রা মহামন্ত্রী শুভ
(১৮০৯-১৮৫১)

গরিব রাজকুমার থেকে

কেচ্ছা তবে শুরু করি। গরিব রাজপুত্র লান-দাই
একা ভুঞ্জে রাজ্যপাট, একাকী রাজসফরে যায়
চত্বরে-চত্বরে এই শহরের, ব্রহ্মা-মন্দিরের
দোলনাটির সামনে; ওর ডেরা ঐ পুরানো জিরজিরে
কেল্লাটার এক কোণে, সবগুলি বুরুজ যেটার
ভেঙে প’ড়ে গেছে কবে, একদা যে-দেয়াল কাচের
মতন ঝকঝকে ছিল, আজ বাসা আঁকড়া গাছের।
দুশমনেরা দূরে থাক, ভূতেরাও ঘেষে না তো সেথা
কেননা রাত্রিদিন একটা খেঁকি কুত্তার পাহারা
সেখানে। সে দোরে-দোরে বাঁশিতে বাজায় কত সুর
যাতে দিনমানে জোটে কিছু সবজি, চাল ও মসুর।
কেউ তাকে খেদায়ও না, কুলবধূ কিংবা কুলটারা
যথাসাধ্য হেদায়েত করে, পাছে বদ-দোয়া লাগে।
এবং সন্ধ্যায় ছায়া ঘন হ’লে চতুর্দিকে জাগে
মশাদের পঙ্গপাল। আর রাজকুমার লান-দাই
ধোঁয়া দেয় সেই বূ্হ্য ভেদ ক’রে ঢুকে গিয়ে শুতে
স্ফটিক-পালঙ্কে নয়, খরখরে খড়ের বিছানায়
বাদশাহি গড়িমসি, গাঁজাভরা ছিলিম তালুতে—
আবার বিহান হয়, সূর্য ছোটে কর্মব্যপদেশে,
হস্ত পদ প্রক্ষালন ক’রে নেয় ভাঙা সানকিতে সে,
তারপর ভাঙে সে রোজা মাছের চামড়া ও শুকনো ডালে,
অতঃপর নাইতে নামে ঘরের কাছেই শীর্ণ খালে।

(Phra Maha Montree Sub, from Poor Prince Lan-Dai.
English Translation by Alan Marshfield)

 

মম রচতাই
(১৯শ শতক)

লন্ডন-ভ্রমণ থেকে

অবধান করো তবে সুবিদিত ইংল্যান্ডের কথা,
অর্ধেক পৃথিবী যার পদতলে আজ অবনতা।
ছ’শ’ মাইল দৈর্ঘ্য তার (এটি আমি বলছি না বানিয়ে),
প্রস্থ কেউ মাপে নি (দুশ্চিন্তা নাই আমারও তা নিয়ে)।
উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে দ্বীপটি বহুদূরে, তার
পরনে পিরান তার নকশা-তোলা সবুজ পাহাড়।
একশ’টি নগর তাতে। করে ত্রিশ-হাজার জাহাজ
তামাম জাহান জুড়ে নিত্য পণ্য জোগানোর কাজ।
লন্ডন, রাজধানী তার, যেখানে বসেন সম্রাটেরা,
সুরক্ষা টাওয়ার আছে, তবু নয় প্রাচীরে তা ঘেরা।
এ-নগরী অলঙ্কৃত উঁচু-উঁচু সাতশ’টি গির্জায় :
তাদের দু’খানি থেকে অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়।

নামজাদা নাটশালা কত নগরীর এখানে ওখানে
সুচারু সাজানো আর নিত্য মুখরিত কলতানে :
তাদের নাটকগুলি আমাদের-গুলির মতো না,
নাটক-ফাটক দেশে বদ্ধ ঘরে কখনও হ’ত না।
সাতটার সন্ধ্যা নামে প্রেক্ষাগৃহগুলি ভ’রে দিতে
দিবালোক-সমুজ্জ্বল দীপালোকে, উত্তুঙ্গ সঙ্গীতে।
মাঝ-রাতে সাঙ্গ হয় পালা, নামে কানাতের ঢাকা,
সকলেই পেতে পারে এ-আমোদ, ট্যাঁকে থাকলে টাকা।

(Mom Rachothai, from London Journey [1857].)

কবির শপথ

এ-আকাশ, এ-সাগরগুলি নিয়ে কে করবে কারবার?
অনিঃশেষ বিস্ময়ের খনি এই সংসার বিরাজে,
জাগতিক যতকিছু বিছানো হবে তা সারেসার
রোজ-হাশরের আগে আসমানের-জমিনের মাঝে।

আমরা মালিক নই মেঘেদের অথবা হাওয়ার,
অথবা আসমান আর জমিনের কোনো উপাদানও
মানুষ করে নি সৃষ্টি, সূর্যের বা চাঁদের, অথবা
এমনকি সামান্য ধূলিকণার একখানা পরমাণু।

মানুষ চাতুরী দিয়ে, হত্যা দিয়ে কেবলই জবর—
দখলে নিরত থাকে লোভ-বশে, শ্বাস-টানা লাশ,
ত্যাগ করে শুভবোধ, ভুলে যায় নিজের কবর,
আত্মার মর্যাদাটুকু, তারও আর নাই রে তালাশ।

ছড়ানো-ছিটানো এই দুনিয়ায় আছে যা-সকল
জান্নাতুল ফেরদৌসেরও রূপ তার তুলনায় ফিকে,
জমিকে হামেশা চাঙা ক’রে তোলে যে-আকাশ, জল,
স্বর্গাদপি গরীয়সী করে তারা এই পৃথিবীকে।

আদিগন্ত তেপান্তর, ঘন বন, দুস্তর বিরান,
উত্তুঙ্গ পর্বত, যারা মেঘেদের টেক্কা মেরে চলে,
শাখামৃগ, বলীবর্দ, পরাক্রান্ত শার্দূল, বারণ,
পিপীলিকা, আর আরও যত প্রাণী আছে জলে-স্থলে

আত্মার আত্মীয় এরা সব মানুষের, এরাই তো
বহু জন্ম-জন্মান্তর-তরানো পরান-সখাসখী,
সময়ের বিরাট্ বিস্তার-মাঝে তাদের দায়িত্ব
দিশারির, মানুষেরা চলে যার আলোক বিলোকি’।

অন্যেরা উঠুক গিয়ে মহাকাশ ছাড়িয়ে উপরে,
যথেচ্ছা হাঁটুক তারা চাঁদ আর নক্ষত্রের পথ,
আমি তো প্রতীজ্ঞাবদ্ধ, আমি এই মাটিতেই প’ড়ে
থাকব সব জীবনে মরণে, এ-ই আমার শপথ।

অধীর হ’ব না মোটে বোধির জন্যেও, বা নির্বাণ
তাও প্রত্যাখ্যান ক’রে টেনে যাব জন্মের ঘানিটি
এ-বিপুল বিস্ময়ের অনুবাদ ক’রে গাইব গান
শত-শত কবিতায় ব্রহ্মাণ্ডকে জানিয়ে প্রণতি।

মুছে যাব এই দুঃখী মানুষের পৃথিবীর আঁসু
যাবৎ না-ওঠে স্বর্ণযুগের সূর্যটি পূর্বদিকে;
তখনই আমার ছাই মিশবে এ-ধুলায়- এ গতাসু
দেহের জীবাশ্ম দেবে পাহারা নোতুন পৃথিবীকে।

মানুষ আস্বাদ করতে যদি আর না-পারে কবিতা,
নোতুন সে কোন্ প্রভু বেদখল করবে গদি তার?
এমনকি ধুলা ও ছাই, এরাও চাইবে না হ’তে মিতা
ফোপড়া-পারা মানুষের নীরক্ত আত্মার শুষ্কতার।

কবিতার জায়গা যদি না-ই হয় এই দুনিয়াতে
তাহলে, হে প্রিয় মানুষেরা, দাও আমাকে বিদায়,
আমি চ’লে যাব এক মনোরাজ্য গড়ার নিয়তে
রামধনু পঙ্ক্তির রত্নপ্রভায় শোভিত কবিতায়।

আমি মুগ্ধ ক’রে রাখব আকাশের মুল্লুকগুলিকে
সুললিত কবিতার অমূল্য সম্পদে নিশিদিন,
ভিতরের বিভূতিকে কালি ক’রে যাব আমি লিখে,
আমার কবিতা বাঁচবে শাশ্বতেরও চেয়ে বেশিদিন।

(Angkarn Kalayanapong, A Poet’s Pledge.
English Translation by Chamnongsri L Rutnin)

 

নৌব্রত পংপৈইবূন
(১৯৩৯—)

আন্তর্মহাদেশিক প্রশ্ন

কে যেন কী যেন হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে কাদার উপর—
ঐ মাংসের দলা, কীটভক্ষ্য, প্রায় প’চে-ওঠা,
ও কি ছিল অঙ্গ কোনো দোলনায় দোদুল, ঘুমে-ছোঁওয়া?

ফুলে উঠছে তারুণ্যের কাঁচা মাংস, অমাংস হ’য়ে যেতে-যেতে;
কাদার গোরস্তানে প’ড়ে আছে যন্ত্রণাক্ত স্মৃতি।

এর দিন দীর্ঘ হবে এখন, রাত্রিও দীর্ঘ, সর্বৈব অবশ-করা ঠাণ্ডা
বহিঃস্থ আঁধারে এক, এত গাঢ় যে তা বেড়ে চলে সীমাহীন।
তোমার জন্যে এটি, সারাজীবনের জন্যে এ তোমার মাল।

কে ওখানে গাদি করছে নরম, গলন্ত মাংসপিণ্ড—
রক্তভর্তি লাল গর্তগুলি, এর কাদা-গলা যত জ্বালামুখ,
ছাৎলাপড়া কালচে খোশা, নাপাক, নোংরা আসামির?

ঐ দেহ সাদা ছিল। পবিত্র! আমার গূঢ় গিরিখাত জাগে ওর জন্যে।
নীরব দু’চোখ ওর, আধ-খোলা, ভাসমান, উপরের দিকে চেয়ে-থাকা।
হায় ও-চোখের থেকে আমি চোখ সরাতে পারি না।

এখন বিশ্রাম নাও। ঘুম যাও। ক্লান্ত তুমি। সব ব্যথা জুড়াল এখন।

আর তুমি,
মহান্ আমেরিকান সখা!
কী ভাষায় বললে, তুমি জলের মতন পরিষ্কার
বুঝতে পারবে? কী শব্দ তোমাকে বাধ্য করবে চেয়ে দেখতে,
তীরের মতন বিঁধে থাকবে চিত্তে যতদিন চৈতন্য না-হয়?

কত রক্ত তোমার দরকার? এর পরে ঠিক কার?
আর কত লাশ চাও— লাশ!— ঐ বোকা যোদ্ধাদের?
আরও কত দেখতে চাও এই দৃশ্য?
কোন্ ছবি এমনকি তোমাকে
শিহরিত করবে আর থামাবে? এবার থামো,
থামো, মনুষ্যত্বের দোহাই!

(Naowarat Pongpaiboon, Intercontinental Question [1975].)

মামুলি আলোড়ন

একটা চিলের সামান্য পাখসাট
একটু হ’লেও কমায় রবির তাপ,
একটা পাতার ঈষৎ এক কাঁপন,
এলান করে সে হাওয়ার আবির্ভাব।

ছোট-ছোট ঢেউয়ে আলোর একটা ঝলক
জানায় স্বচ্ছ জল এটা, নয় কাচ এ।
চোখের কোনায় আবছা ব্যথার আভাস
জানায় ভিতরে জ্যান্ত হৃদয় আছে।

রুদ্ধ দুয়ারে শিকলের ঝনঝন
দুরবস্থার কান্নাকে করে গাঢ়,
তখনই সেখানে একটা প্রদীপ-শিখা
জানায়— ‘একটা পথ খোলা আছে আরও।’

অনেক সবুরে ক্লান্ত, ঘেমো ও তাতা
মুঠি শেষকালে সজোরে ঘা মারে ঠিকই,
ওঠে আর নামে— এবার জানে সে পুরো
সুখ কাকে বলে, তা কত প্রকার, কী-কী।

জখমি আঙুল, কোনোমতে পাকড়ানো,
আলতো এগোয়, বাকি বলটুকু দিয়ে,
যেন শীর্ণ ও গর্বিত আগাছারা
পাথুরে ফাটলে নড়ছে মাথা উঁচিয়ে।

শূন্যতা এক চল্লিশ বছরের।
এক নীরবতা, অন্ততঃ চার-কোটির।
মাটি হ’ল বালি, গাছেরা হ’ল পাথর,
সাড়া নাই আর জগতে কিছুরই প্রতি।

পাখিরা যেমন ভুলে থাকে আকাশেরে,
পানির ব্যাপারে চির-উদাসীন মাছেরা,
মাটিকে দ্যাখে না মাটি-জাবড়ানো কেঁচো
কিংবা আর্বজনাকে চেনে না মাছিরা।

নিথর ডোবায় গুঁড়ি মেরে আসে ক্ষয়;
তবু এ-পচনবিধুর স্থানেই কাঁপন
তুলেছে কী-এক নব-অভু্যত্থান,
কড়া নাড়ছে কি সেখানে কমলকানন?

কাঁপে ওয়াদা এক, কোনো অশুভের নয়,
আকার নিচ্ছে মহিমা, রূপের সাথে,
আর এ আবছা সুনসানিয়াত-মাঝে
শুরু হয় এক সুমহৎ শুরুয়াতের।

ঢোলের বাজনা শোনো ঐ মন্দিরে।
দ্যাখো আঁখি ম্যালে আরেকটা শুভদিন।
বন্দুক থেকে বেরুনো গুড়ুম, শোনো,
ও যে জনতার জেহাদের সঙ্গিন।

(Naowarat Pongpaiboon, Mere Movement.
English Translation by Chancham Bunnag)

শম্বূক-পথ *

উঁচু আগাছার মধ্যে দিয়ে
চলে পথ ফাঁকা, অজানিত,
ও-পথে রুপালি রেখা আঁকে
শামুকখানি, সে বেশ জানে তো

যে, দিনটা চূড়ায় উঠলে পরে
গনগনে সূর্যটা তার নাঙা
চাবুকের জিবে চেটেপুটে
খাবে এই আগাছার ডাঙা।

ক্রমশঃ রুপালি রেখাখানি
ধরা পড়বে আগ্রাসী রশ্মিতে,
হীরক-দ্যুতিতে যেন এক,
বদলে যাবে উধাও নস্যিতে।

শামুকটি তখন বলি দেবে
নিজ মাংস, ফানা হ’য়ে খোদ,
ব’নে যেতে নিজকীয় খোদা
অবশেষে, জন্মের শোধ।

কাজেই পথখানি চ’লে গেছে
এক খাঁটি আদর্শের দিকে,
যাবৎ শাসন আগাছার,
লড়াকু হৃদয়ও থাকবে টিঁকে।

সৃষ্টি সদা ব্যথার ফসল,
বহু কৃচ্ছ্র, বহু যন্ত্রণার,
ঘন মেঘে বিজুলি যেমন,
প্রত্নে বাস যেমন সোনার।

এসো তবে, ভাগ নাও এই
যাতনার, মিলে সব সাথি,
আলোর প্রত্যাশা যদি করো
ল’ড়ে যাও আঁধারের সাথে।

প্রথম যে-কাজটা আমরা করব
তা এক রুপালি পথ আঁকা,
দুনিয়ায় আজও মেলা জমি
আছে, যাতে চলে নাই চাকা।

* ১৯৭৩-এর “অক্টোবর বিপ্লব”-এর সময়ে লেখা, যখন তানোম্-প্রপাত সরকারকে উৎখাত করা হয়। ‘আগাছা’ এখানে স্বৈরাচারী শাসন, আর ‘ছোট্ট শামুক’ এই আন্দোলনে জীবন বিসর্জন দেওয়া আমজনতা।

(Naowarat Pongpaiboon, The Way of the Snail.
English Translation by Michael Wright)

 

সুজিত ওংতেস
(১৯৪৫—)

লিটল স্টার

টুইঙ্কল টুইঙ্কল
লিটল স্টার

সাত প্রকারের তালের কুঞ্জপথে
চ’লে গেছে জৌ কুন-তন
ডাকুর জীবনে, আর-কোনোদিন
করে নি প্রত্যাবর্তন।

পাতায় মুড়িয়ে ভাত, তার বাপ-মা
এখানে ওখানে সন্ধান
করে তার, আর সব্বাই বলে
নিহত তাদের সন্তান।

রেলগাড়ি থেকে শোনে, টিয়াপাখি ডাকে,
গাড়ি থেকে, ঝিঁঝিগুঞ্জন,
কা-কা-কেকা-রবে সবদিকে জাগে:
কই তুই জৌ কুন-তন?

কাকভোরে তুই চ’লে গেলি ঘর ছেড়ে
(জানত কেবল ভাই-বোন)
গ্যারিবল্ডির মতন দেশের
স্বরাজ করতে অর্জন।

হাউ আই ওয়ান্ডার
ওয়াট ইউ আর

খদ্দরের ঝোলাটা কাঁধে ঝুলিয়ে
বারান্দাটা ছাড়ল শেষে কুন-তন,
চোখের জলে সিক্ত প্রিয় বইটি;
আগের রাতে কী ক্রোধ, কী-যে ক্রন্দন!

ও কুন-তন, অনেক-রাত-অবধি
কাঁদলি তুই, রক্তেভেজা ক্যাম্পাস—
পতাকাখানি চাও-ফ্রেয়ার তীব্র
তোড়ে ভাসল, ছাড়িয়ে গেল দিশপাশ।

আপ অ্যাবাভ দ্য ওয়ল সো হাই
লাইক আ ডায়মন্ড ইন দ্য স্কাই

তোর মা ডাকে তোকে, শোন্ রে কুন-তন,
দ্যাখ্ কী নীল সে যে কষ্টে।
বাপটা ব’সে আছে: তুই তো গুণ্ডা না,
শরীরে দাগ কেন অস্ত্রের?

পড়ালেখাই খালি সহ্য হ’ত তোর
শরীর ছিল এত দুর্বল,
মায়ের অবাধ্য হো’স নি কোনোদিন,
বাপের ছিলি তুই গর্ব।

পড়ে নি কেউ তোর মনের বিশ্বাস,
ইন্দ্র-হেন সবজান্তা
ছিল না তারা কেউ, তাছাড়া কর্তারা
তাদের রেখেছিল আন্ধা।

তুই যা চেয়েছিলি তাই তো করেছিস—
বাপ-মা ভুগেছিল তার দায়,
সূর্যমুখী চোখ খুলেছে ভোরবেলা,
সন্ধ্যামালতীরা সন্ধ্যায়।

বাপ-মা গেছে স্মৃতিসৌধ-পাদদেশে
ঘোষিত যেথা গণতন্ত্র,
তাদের শোক, আর গর্ব, আর এক
মহান্ বাণী- নাই নাম তোর।

(Sujit Wongtes, Little Star.
English Translation by Alan Marshfield)

 

খমতুয়ান খান্তনু
(১৯৫০—)

ভিখারির গান

আমার দশটি আঙুল নীচে
আমার মাথাটি মাটিতে
তোমার ব্যস্ত পায়ের কাছে
ফ্যালো পয়সা এ-বাটিতে
রহম করো এ-দুর্বলে
এমন দুর্দশা-কাতরে
ছেলে- মেয়ে উপোস করে
দিবা- রাত্র নয়ন জলে
একটা ছেঁড়া কাঁথা পেলেও
আপা- ততঃ যেত চ’লে
আপা- ততঃ যেত চ’লে

আমি পথভোলা কুকুর
সুফান জেলায় ছিলাম আগে
আমার বুলি হাস্যকর
আমার দিয়ো না গো ভাগিয়ে
ওগো সুশ্রী পরিপাটি
তুমি দিয়ো না ক’রে মানা
আমায় চাল দাও আধ-বাটি
কিংবা কলা দাও আধ-ফানা
তুমি বারেক করলে দয়া
পাবে সারাজীবন দোয়া
সারা- জীবন দিবারাতি
সারা- জীবন দিবারাতি

অলস ছিলাম না একদমই
আমরা খেটেছি সুবোশাম
আমরা চাষ করেছি জমি
পায়ে ফেলে মাথার ঘাম
আমরা নিয়েছিলাম ঋণ
মহা- জনেরা বড়ভাই
আমরা দেনার দায়ে দীন
হ্যাংলা কুত্তা আমরা তাই
ঝুলছে বেহায়া জিব-খান
পেটটা করছে খালি চোঁ-চোঁ
ধানের চাষি মাগছে ধান
তোমরা বুঝতে পারলে বোঝো
তোমরা বুঝতে পারলে বোঝো

মাথা বিকিয়ে ভিখ্ মাগি
আমরা আঁস্তাকুড়ের ময়লা
একটা ফুটোকড়ির লাগি
আমরা চোখের জলে সয়লাব
কাঁদে আমার খুকু-খোকা
ক্ষুধায় গোঙায় ব্যথায় কোঁকায়
পেটে কিল মেরে হাত পাতি
লভি আজরাইলের খাতির
চলি ফকির-কাফেলায়
আমরা খেত থেকে রাস্তায়
আমরা মরলে পরে বাঁচি
আবার বাঁচলে ম’রে থাকি
পথের ধারে যাদের পাঁচিল
তারা ক্ষুধার জানেটা কী

তাদের জগৎ বহুত আচ্ছা
তাদের সদাই উঁচু মস্তক
নাদুস- নুদুস তাদের বাচ্চা
তাদের কাজ-কারবার মস্ত
তারা চষে পেষে তোলে
তারা সারা শহর ছায়
তাদের চক্ষু উপড়ে ফ্যালে
যারাই নজর তুলে চায়
আমরা তাদের পোষা পশু
তারা পরস্পরের শ্বশুর
পালা ক’রে তখ্তে বসে
আনে সকলেরেই বশে
তারা ছাড়ে না কো কিছু
তাদের নজর সদাই নিচু
তোমরা জানো তো সখারা
তারা হয় যে কারা-কারা
তারা হয় যে কারা-কারা

(Khomthuan Khanthanu, A Beggar’s Chant.
English Translation by Chancham Bunnag)

 

ওয়াত ওয়ানলায়াঙ্কূন

কলা-চুরি

একটা গলিতে আমার বাসা,
সে-গলির নাম “কলা”।
কাছেপিঠে এক বাঁদর থাকে,
বাঁদরের প্রিয় কলা।
কিন্তু সে থাকে যে-আঙিনায়
সেখানে হয় না কলা।
ঘুমাতে যাবার আগে রোজ রাতে
পেট পুরে খাই কলা।
বাড়তি যে-ক’টা টাকা তাই দিয়ে
কিনে আনি আমি কলা।
কিনে আনি আর পাশে রেখে দিই
কাঁদি-কাঁদি পাকা কলা।
রোজ কাজ করি, আর মাস-শেষে
বেতন ওঠাই কলা।

এক সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখি
একটাও নাই কলা,
পেট চোঁ-চোঁ আর ঝাপসা চোখ,
আঁতিপাঁতি খুঁজি কলা।
তখন দেখি-কি, বাঁদরটা আছে
আঁকড়ে আমার কলা।
লাথি মারি তাকে গা-রিরি রাগে,
কেড়ে নিই সব কলা।
রাগে ফেটে পড়ি যখন দেখি
খোশা আছে, নাই কলা।

তখন জানতে পারি, বাঁদর
খায় নি আমার কলা।
পড়োশিরা একজনকে দেখেছে
চুরি ক’রে নিতে কলা।
একজন দিনমজুর, যে নিজে
কখনও খায় না কলা,
কিন্তু দু’বেলা বাচ্চাটা তার
ভাতে মেখে খায় কলা।
দিন আনে খায়, কেনার উপায়
ছিল না তো তার কলা।
বাচ্চাটা ভুখা কাঁদছিল, তাই
চুরি করেছে সে কলা।

(Wat Wanlayangkoon, Lost Bananas.
English Translation by Alan Marshfield)

 

চিরানন পিৎপ্রীছা
(১৯৫৫—)

পুষ্পের ঔদ্ধত্য

মেয়েদের আছে দু’টি হাত
আঁকড়ে ধরতে জীবনের যত সারাৎসার;
রেশমি জামা, গোলাপের জন্যে না নেহাত,
শক্ত কাজের যোগ্য পেশী-তন্তু তার।

মেয়েদের পা-ও আছে দু’টো,
আকাঙ্ক্ষার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে তর্-তর্,
একসাথে দাঁড়াতে রুখে প’রে নিজ জুতো,
অন্যের কাঁধে না-দিয়ে ভর।

মেয়েদের রয়েছে নয়ন
খুঁজে পেতে নয়া জিন্দেগানি,
পুরুষদের ফাঁদে ফেলতে নয়,
তন্নতন্ন করতে বিশ্বখানি।

আর আছে হৃদয় মেয়েদের
অবিচল, চির-অভিনব,
সীমাহীন শক্তির আধার,
কেননা সে সম্পূর্ণ, মানব।

মেয়েদের রয়েছে জীবন,
যুক্তির বর্মে সে করে দোষত্রুটি রোধ,
কারো লালসার কভু হয় না ইন্ধন
মুক্ত মননের মূল্যবোধ।

ফুলের রয়েছে তীক্ষ্ন কাঁটা,
মুগ্ধ প্রেমিকের লাগি ফোটে না তো তারা,
রক্ষা করে তারা এককাট্টা
জমির উর্বরতার ধারা।

(Chiranan Pitpreecha, The Defiance of a Flower.
English Translation by Sudchit Bhinyoing)

জীবন

দড়াম ফাটে ব্যথা, বেঁধে দুদ্দাড়,
দপদপিয়ে স্নায়ু লাফায়, ধোঁকে,
গরম ছোটে ঘাম ঝোরা-ক্ষুরধার,
কুহেলি-ঠুলি, আহা, পরায় চোখে।
ছায়ারা বদলায়, করে ঘোরাফেরা,
অথির রেখাগুলি পালায়, মেলে।
বিগত সুদিনের ধুধু স্বপ্নেরা
বর্তমান ছেড়ে পাখনা ম্যালে।

যায় প্রথমতম লব্জের পানে…
…প্রথম হাঁটি-হাঁটি-পা-পা এবং
সেখান থেকে সোজা ঠ্যাঁটা যৌবনে…
পঁচিশ বছরের তাজা জীবন!

দুর্দশায় কত, কত-না পুলকে
মায়ের কাছে শিখে-শিখে সতত,
মায়ের-ভালবাসা-পূর্ণ বক্ষে
কেটেছে দিনগুলি গানের মতো।

কষ্ট ঝাঁকি মারে কী দুর্বিষহ!
পুরোটা দেহ, আহা, মুচড়ে ওঠে।
জন্ম-যন্ত্রণা জাগছে, অহহ!
তীব্র চিৎকার দীর্ণ ঠোঁটে।

হায় রে তবু ঐ ছোট প্রাণখানি
আমার প্রাণে ঢালে স্বর্গসুধা।
স্বপ্নরাজ্যের খুদে এক প্রাণী
কত আকাঙ্ক্ষায় ভরে বসুধা!
দুঃসাহসে ডাকি— খোকা, জন্মা!
আত্মবিস্মৃত একজন মা…

(Chiranan Pitpreecha, Life.
English Translation by Chancham Bunnag)

শাক্যশ্রী মীসম্সুয়েব
(১৯৫৭—)

দস্তানা

দস্তানা-পরা হাত আজ ছোঁয় দস্তানা-পরা হাত
হাত বদলায় বদলায় দস্তানা
কিছুই থাকে না আগের মতন আর
জীবাণুমুক্ত দস্তানা-মাঝে হাত
মাংস পায় না আর মাংসের আঁচ
হাতের গন্ধ মেশে না হাতের গন্ধে
বড়দের হাতে যে-লানত-ই নেমে থাক
বাচ্চার হাত আজও আছে ঠিকঠাক
এখনও নাঙ্গা পর্যটমান তারা
বাচ্চার হাত ঠিক যেরকম হয়
যেখানে যা পারে হাতড়ায় পাকড়ায়
আবর্জনার হাজার পাহাড় আছে
ঢুঁড়ে বেড়াবার যাতে
পরিত্যক্ত এক দস্তানা পায় সে অকস্মাৎ
কী আমোদ আহ্লাদ
সে তৎক্ষণাৎ হাতটা গলায় তাতে
এবং তখন অবধি সেটাকে খুলে ফেলাটাও সোজা
কিন্তু যতই বড় হয় হাতদু’টি
দস্তানা খোলা ততই হয় কঠিন

(Saksiri Meesomsueb, Gloves.
English Translation by Chamnongsri L Rutnin)

বাসন-মাজা বাচ্চা

থালায় বাজছে চামচের টুংটাং
থালার উপরে থালা ফেলবার আওয়াজ
প্রতিধ্বনিত হয় মাইল-মাইল জুড়ে
ব্যবহৃত খালি থালিগুলি হয় হাওয়া
খাবার-ভর্তি নোতুন থালারা ঢোকে
অভুক্ত যারা একে-একে এসে বসে
বেরয় যাদের হ’য়ে গেছে খাওয়াদাওয়া
এঁটো থালে-থালে-ফেরতা ভুক্তাবশেষ
বড় থেকে বড় উঁচু থেকে হয় উঁচু
উঠতেই থাকে আরও আরও আরও উচ্চে
আর শেষে শুরু করল আকাশ বাওয়া
ঐ তো এখন মেঘেদের বেয়ে উঠছে
আহা রে বাসন-মাজা বাচ্চাটি তুই

একশ’ হাজার অযুত নিযুত কোটি
কেটে যাবে তোর এ-খাবারে মোটামুটি

চাঁদ ওগো প্রিয় চাঁদ
ভয় নেই আমি আর চাইব না আর চাইব না ভাত

(Saksiri Meesomsueb, Child Dishwasher.
English Translation by Chamnongsri L Rutnin)

 

রূপান্তর

একটা লোষ্ট্রখণ্ডও সে গুড়ুম ফাটতে পারে
বোমার মতো ছোঁড়া হ’লে রাগে
শত্রুরা সব কচুকাটা কাতারে-কাতারে
একটা মন্ত্রে বেঁচে ওঠার আগে

কাঠের বন্দুকও হত্যা করতে তো ছাড়ে না
সত্যিকারের অস্ত্র ভাবলে তায়
সামনে পিছে ডাইনে বাঁয়ে ঘায়েল শত্রুসেনা
ফের বেঁচে যায় একখানা পাতায়

বাচ্চারা এই মাথায় করে পাড়া
পরক্ষণেই শান্তশিষ্ট তারা
বাচ্চা ছেলেটিকে গুণ্ডা ছেলে
ভয় দেখিয়ে কাঁদায় খেলার ছলে
ছোট্টটি যায় কাঁদতে-কাঁদতে বাড়ি
বাপের কাছে করে আহাজারি

বন্দুকটি খেলনা ছিল খালি
না-বুঝে বিদিশা
বাপটি ধাড়ি ছেলের কানে ঢালে
রাগের তপ্ত সিসা

কেড়ে নিয়ে ফেলল ভেঙে সে তো
খেলনাটি আর কত-যে চোটপাট
অথচ হায় ছিল ওটার ভিতর
নিছক নরম কাঠ

ভয়-দেখানো ছেলের চোখে ওটা
হ’ল আসল বন্দুক এখন হায়,
হাতগুলি তার বেড়ে গেল হোথা
সত্যি-সত্যি প্রায় বিনা-ব্যাখ্যায়

সত্যিকারের অস্ত্রগুলি তার হাতে আজ, দ্যাখো,
কাঠের-খেলনা-হেন হেলাফেলার
যে-ক্রোধ তুমি রুয়েছ তার হৃদয়ে তা এখন
আরম্ভ করেছে হায় রে সত্যিকারের খেলা

(Saksiri Meesomsueb, Change.
English Translation by Chamnongsri L Rutnin)

ঢাকা-পড়া

দ্যাখো, পড়ো, তুরন্ত ছাড়িয়ে যাও, পিছনে তাকাও
মেয়েটি চেঁচিয়ে বলে, বাবা
শহরটা আর মাত্র দশ কি.মি. দূরে

দূরের পাহাড়গুলি
বড় হয়, আরও বড়, চ’লে আসে কাছে
দু’চোখে আঙুল চেপে মেয়েটি তাদের আটকে দেয়
এত বড়, তবু ঢাকা প’ড়ে যায় কয়েকটি আঙুলে

দৃষ্টির সবটুকু জুড়ে যখন পাহাড়
দেখা যায় বুদ্ধের প্রতিমা
শহরের দিকে যত এগুচ্ছ ততই বড় তিনি
পিছনের পাহাড়টিকে বিলকুল ঢেকে দেন শেষে
শহরটির দিকে তিনি মুখ ক’রে বসা
নীচে যেটি রাঙা হ’য়ে উঠেছে সন্ধ্যায়

শহরটার প্রাণকেন্দ্রে, সেতুর পিছনে
আকাশে লগির খোঁচা মারছে ইয়া-ইয়া ইমারত
কত শত গাড়ি কত ভিন্ন চেহারার
ভিন্ন মডেলের আর ভিন্ন আদলের
পিঁপড়া-হন্তদন্ত ছোটে দালানগুলির ফাঁকে-ফাঁকে

বাবা আচমকাই ব্রেক চাপে
সামনের গাড়িটা ধাক্কা লাগিয়েছে আরেকটা গাড়িকে
খিস্তি, গালি, চিল্লাহল্লা- সব দোষ তোর!
কাড়াকাড়ি, মারামারি, কেউ একটু ভাবতেও থামছে না
লাল নীল সবুজেরে করছে না রেয়াত
অহো কী হাঙ্গামা যানজটলার, প্রভু বুদ্ধ, ত্রাহি!
বাচ্চাটা বিড়বিড় করে, হুঁ হুঁ
সেই মহামহীয়ান্ অমিতাভ কোথায় গেলেন
আমরা দূর থেকে যাঁকে দেখে এগিয়েছি
এই পৌর এলাকায় প্রবেশের আগে?
এখানে এ-শহরের ব্যস্ততম অংশে
এইসব দানবীয় দালানের দল
লুকিয়ে ফেলেছে তাকে বেমালুম এই
শহরের লোকজনের রক্তচক্ষু থেকে।

(Saksiri Meesomsueb, Hidden.
English Translation by Chamnongsri L Rutnin)

 

ফৈবরিন খাও-ঙাম
(?—)

কলাপাতা মেয়ে

ও আমার কলাবাগানের কলাপাতার কুমারী,
মুড়ে দিতে সাদা ভাত খোরাকির তরে
যখনই যেতাম মাঠে, কিংবা দূরে জমাতাম পাড়ি,
দিনকাবারির মতো খাবার পাঠাতে সাথে ক’রে।

তুমি ভাত পাঠিয়েছ, যখনই চাগিয়ে উঠত ক্ষুধা,
গরম ভাতের ভাঁপে নরমসরম হ’ত দুপুরেরও রবি;
প্রতিটা ন’লায় থাকত কী-যে এক মোহন সুরভি,
আমাকে মাতাল রাখত দিনমান— অয়ি নেশালুতা,

রূপসী কিশোরী রম্ভা, তোমাকে বেসেছিলাম ভালো,
পাহারা দিয়েছিলাম ঈর্ষাভরা শিশুর উৎসাহে;
তারপর ছাড়াছাড়ি এমন এক নির্লজ্জ লিপ্সায়
দিনবদলেরও হাওয়া পারে না লুকাতে যার কালো।

আধুনিক জমানায় স্বজনবিহীন,
অন্তঃসারশূন্যতার স্বর্ণযুগে ফাঁকা,
অগভীরতার কালে বিরহমলিন,
নিরাশার বারবেলায় ভুল পথে চাকা।

চৌরাস্তার মোড়ে এক পলিস্টাইরিন বারনারী
আমাকে নিল সে টেনে; হায়, এ কী আজব বিমারি!
খিলি-পান-রাঙা ঠোঁটে খিলখিল হেসে
আমাকে কলাবধূর কোল থেকে কেড়ে নিয়েছে সে।

পৎপৎ থামাও তবে, ও আমার স্ফূর্ত কদলিকা,
শিগগিরই ধূসর হবে তোমার ঐ সবুজ জামাটি;
আমরা যখন শুনি সঙ্গীত, প্লাস্টিকে-ঢাকা,
সে-ই আমাদের কলা-গীতির সমাপ্তি।

(Phaiwarin Khao-Ngam, Banana-Leaf Maiden.
English Translation by B Kasemsri)

মায়ের হাতের খাঁটি রেশম

মা লাগায় তুঁতগাছ শুঁয়াপোকাগুলিকে খাওয়াতে,
বেজায় মেহনতের কাজ এটা, অধ্যবসায়ের,
রেশমের আঁশগুলি বেছে তোলে স্বপ্নবৎ নানা চেহারাতে,
বোনা হ’য়ে চলে আহা সৃজনীর কাপড় মায়ের।

প্রতিটি তন্তুই তার চেতনায় ছোপা
প্রতিটি বস্ত্রের মাতৃসুলভ সীবনে;
হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকের তালে চলেছে পা,
হাতেরা ববিনটিকে ঠেলে যাচ্ছে সামনে পিছনে।

আমাকে দিয়েছিল মা এ নোতুন শাল,
ভালবাসা গাঁথা এর হরেক সুতোয়;
মমতায়-ভরা এক জীবনের সবগুলি সাল,
প্রত্যেক জরিতে-লেসে জড়ানো হৃদয়।

আমার মায়ের তোফা, আমি তুলে ধরি এই শাল,
পরতে-পরতে যার মহার্ঘ রেশম,
একরোখা চেতনা তার, আর তার উন্নত, বিশাল
হৃদয়ের উদারতা, মায়ের দুধের উপশম।

আমি আজও স্পষ্ট দেখি তার সূক্ষ্ম হাত
মাঝে-মাঝে ইস্তামাল হ’ত যার আমার পাছাতে;
ঐ দু’টি হাল্কা হাতে ঠেকিয়েছে নিয়তির সকল আঘাত,
সব বালামুসিবত, ছেলেকে বাঁচাতে।

এই হাতে সে করেছে কর্মযজ্ঞ একটা জীবনের
সম্পাদন; বিশ্রামের, মজুরির তোয়াক্কা করে নি,
ঘড়ি ধ’রে বসেছে সকালে রোজ বুননে, সীবনে,
চরকা ঘুরে গেছে আহা একই তালে দিবসরজনি।

রূপসী মেয়েকে শিখিয়েছে
হামেশা তামিল করতে তাঁতির হুকুম,
অন্ধের মতো চলতে তাঁর পিছে-পিছে—
মা’র বুড়ো হাত আর সইছে না জুলুম।

ছেলেকে দিয়েছে পাঠ আত্মমর্যাদার: বলেছে সে,
মা’কে ভালবাসো যদি, কখনও থেমো না;
এমনকি কাফনে যদি ঢাকে ওরা শেষে
আখেরি দমতক তোর না-মরুক মুক্তির কামনা।

একদিন হ’য়ে যাব আমিও বিগত।
তোমরা, বাচ্চারা, নেবে বুননের ভার—
মায়ের রেশমে তৈরি সন্তানের সুতো
পুরানো কাপড়ে তোলে নোতুন বাহার।

(Phaiwarin Khao-Ngam, Real Silk from Mother’s Hand.
English Translation by B Kasemsri)

Facebook Comments

One Comment:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *