সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর কবিতা


পেন্টিমেন্টো


ব্রহ্মপুত্র-পাড়ে আমরা দেখেছি তোমারে, আমরা জন্মভয়ে খুলি নি দেরাজ,
তুমি কাশে-কাশে এমনি ঘুরেছ গোল্ডফিশ, তুমি আমাদের দেখা-ও দ্যাখ নি,
আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার দাঁড়িয়ে ছিল প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের মতো, তারও
সময় ছিল না আরও দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে দেখবে পাতালাভিমুখী সে-মেরাজ,
এবং কাশগুলি যেন আস্তে-আস্তে মেপলের পাতা আৎকা শীতে চুনিগাঢ়,
আর ট্রেন ছেড়ে দিল, ব্রহ্মপুত্র দিল দৌড়, আমরার দেরাজে জিন্দা মণি
সাদা আর স্বচ্ছ আর গুঁড়ো-গুঁড়ো ভাঙা-কাচ, গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টি, লাখেরাজ।


কিন্তু তার আগে-পরে ক্ষয়ার্শা ধারয়দ্বসু আর্তক্ষয়ার্শার পর্শুপুরে
খারাপ বাতাস লাগে, বুলন্দ দরওয়াজা খুলে রাত্রি-রঙা কাঠের ঘোড়ায়
অশুর মিতান্নি হিত্তি, সমুদ্রের মানুষেরা, গথ হুন ভ্যান্ডাল মোগল
বেইমানির ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ছে সভ্যতার মুক্তাভস্ম-ওড়ানো দুপুরে;
আমরা কার চক্ষু দেখছি? চঞ্চু দেখছি? রবসপিয়ের নাপলেয়ঁ না শার্ল দ্য গল?
আমরা কোন্ বুলডজার গিলোটিনকে আসতে দেখছি কল্লা ফেলে জোড়ায়-জোড়ায়?
ওদিকে ফুটেছে হেইলো চাঁদের পেনামব্রা যেন পাঁচ-ছ’-শ’-কোটির উপরে।


নাম তার এমিলি লু, বয়স পঁচিশ, চীনা, তারই কাছে জীবনে প্রথম
জেরন্টলজির নাম শুনলাম, তিরিশ আমি, ‘আমারও ডেমেনশা আছে, জানো?’
শুনে কী ঝমঝম হাসে এমিলি যে কী বলব যে একশ’ ব্রহ্মপুত্র-জোড়া কাশ;
‘ও খালি বুড়ারই ব্যামো :)’ এমিলি, এখন বলো, পঞ্চাশের যৎসামান্য কম,
আর কোন্ কোন্ বালা কেবলই বুড়ার, বালা, আরও কোন্ অদ্ভুত আকাশ
আমাদের চিনতে তবু বাকি থাকে, এখনই কি আমি তার খঞ্জনি বাজানো
শুনতে পাই? নাকি আজও মেয়ের বয়সী ব’লে শুরু হয় নি শিক্ষা-কার্যক্রম?


ভালেন্তিনা ভালোভা-ও, তেইশ বছরের, তার ধ্যান জ্ঞান জীন-টেকনলজি,
আমাকে জানায় ক্যামনে চৌদ্দ পুরুষানুক্রমে স্বপ্নের ধরনও একই থাকে :
ডিএনএ স্ক্রিনিং যদি অসম্ভব, দু’জনের স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে স্রেফ
করা যায় গোত্র নির্ধারণ। ‘কিন্তু তা’লে,’ আমি বাগড়া দিই, যেন আমরা রোজই…
‘তুমি আমি একই স্বপ্ন দেখলাম যে সেদিন!’ ‘এর জন্যে আছে দ্বিতীয় হিসেব।’
ভালেন্তিনা গালে-হাত। আমিও দ্বিতীয়বার অদ্বিতীয়া দেখতে পাই তাকে,
আর, আর-কোনোদিন দেখি না জীবনে, পাক্কা ষোল বছরের খোঁজাখুঁজি।


অতৃপ্ত আত্মারা আসে ফেসবুকে, জুড়িয়ে-যাওয়া অ্যাড্রেনালিন জ্বাল দিতে।
তিন-ফুটে এক-গজ যদি, এরা সব সতের-শ’-ষাট; যদি চাও খতিয়ান
আমি জানি কত ধান কত দানা খুদ দিয়ে হ’য়ে যায় শেষে একটা নাম;
নাম নিয়ে ছিনিমিনি, এক্কা রিমি দোক্কা সিমি, কোন্ টাইমে ফ্রি থাকেন, মিতে?
এই তো প্রথম আমরা ফেসলেস বাঙাল আমরা নিজেদের ফেসভ্যালু জানলাম;
দু’হাতে বেজেছে তালি, পিঙ্গলার গলিপথে আছে যতকিছু মহীয়ান্
অর্ধেক করেছে নাম অর্ধেক চেহারা, বাসি রেত বয় কালো কালিন্দীতে।


তুমি ছেড়ে চ’লে গেলে। কী ছেড়ে কোথায় গেলে? কত ঘুম উজিয়ে তিব্বত?
কত ভ্রান্তি কত ক্লান্তি, বোয়ালে খোয়ালে আংটি, কেটে যাবে এই মলমাস?
কে তোমারে কোলে ল’য়ে আবার দোলাবে আর, কে বোলাবে কচি মুখে বুক?
‘ফিরে যাওয়া’— আহা, যেন ঘড়িও ফিরিতে পারে— আমি শুধু চিত্রার্পিতবৎ
প’ড়ে থাকি যেন আমি মেঘনার মোহানা আমি চাঁদপুরের চরে-ওঠা লাশ,
ন যযৌ ন তস্থৌ, ঢেউ নয় হাওয়া নয়, নয় স্বপ্ন, কামঠ শুশুক,
শুধু ঘৃণা— আর তা-ও এত ঠাণ্ডা, হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ মেরুর পর্বত।


বসফরাস-পারে একা রয়েছে দাঁড়ায়ে এক বলিহারী ঈয়ন-নয়না
আইয়া সোফিয়া। তাকে রক্ষিতা বলেছ তুমি, রক্ষয়িতা কে তা বলো নাই;
আপাদমস্তক ঢাকা রাতের কাফনে, তার স্তনবৃন্ত, দ্যাখো, ঝিকিমিকি
বিজুলিঝলকে জ্বলছে! তাকে অপবিত্রা ক’রে চ’লে গেছে যতেক হায়েনা
তাদের গোত্রের নাম রেখেছ সুব্রত তুমি, বা নিজেকে থ্যাঁতলানো টিকটিকি
আখেরি তড়পানোটুকু কাটা-পড়া ল্যাজে যার— আসো, আমি তোমারে শোনাই
বিচ্ছিন্ন স্তনের গান, যদিও নাদান তবু এক-আসমান দুধের দেওয়ানা।


তোমারে জানাই কেন এত ক্ষুধা তারে খায়, কত সুধা তার প্রয়োজন,
কার্থেজ নিনেভে ছাই, স্বাধীনতাহীনতায় পুড়ে চলে মেবার চিতোর;
নোতুন নাটক দ্যাখো— যে-পালায় খুন হবে নিজের নির্দেশে নাট্যকার :
ইরাক আফগানিস্তান লিবিয়ার রেগেস্তান, ভিয়েতনাম, যোজন-যোজন
প্রেক্ষাগৃহ— পূর্ণ— শুধু কুশীলবে, দর্শকের স্থলে বড়জোর অন্ধকার,
যাকে অন্ধকার বললে জিহ্বার কাবাব হবে কমুনিস্ট দাঁতের ভিতর—
ওসামা-সংহার-কাব্য— আমরা খালি মেপে যাই ওবামার বিচির ওজন।


চিড়িক সোসাইটি— ধূলি-ব্যালকনিতে আড্ডা দিচ্ছে খিল্লি খাচ্ছে একপাল কমবক্ত
হনুমান; মনিরের জারি শুনে লবেজান পালায় মালাই বিবিজান;
সৈয়দ তারিক চলে ব্রহ্মদৈত্য ঠ্যাং ফেলে, তাকে দেখে ঠুসু সারওয়ার
‘অই মাগি’ ডাক ছাড়ে, শহিদের আঁতে লাগে, নারীত্বের বিপদ্ সম্পদ্
কোঁকড়া-চুলে আণ্ডা পাড়ে; আসিফের খালু হ’ন আমাদের উপরে সওয়ার;
ইমন, ফুলন দেবী, অট্ট কাশে; অগা-কে বঙ্গেতিহাস শিখলায় মিজান :
বঙ্গবিজয়ীর নাম বখতিয়ার খিলজি নয়, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ।

১০
সমুদ্র-স্বনন। আর অশেষ ধানের খেতে ঘুড়ি ওড়ে বালিকার হাতে।
আবহসঙ্গীত বাজে গ্রেগরিয় চান্ট। তুমি ছেঁড়া শার্ট ময়লা জুতা, তুমি
কত যে সুন্দর তুমি কত মিষ্টি হাসো তুমি আমার অপেক্ষা বিকালের।
আমাদের লাল গাড়ি টয়োটা করোনা থেকে পথে যত সঙ্কোচেরা হাঁটে
তাদের করুণা আমরা তোমারে করি না। তুমি, যে বেগুনবাড়ির খালের
ওপারে দাঁড়ায়ে দ্যাখো একটা পরি পড়িমরি গরিবের মতো গোঁয়ার্তুমি
খালি-পায়ে হাঁটতে গিয়ে উড়েই গেল সে, যেন প্রজাপতি কুসুম্বের মাঠে।

১১
বেলায় সকলই মুছে যায়। মেয়েটা এ-খেলা খেলেছিল। একটা মেঘ
ধুন্ধুমার ছুটে আসছে বালিকার আঙুল নড়লেই। আমরা তামাম শৈশব
কাটায়ে দিলেম ওটা আমার আমার নাম, ঐ আদাপাদা। আমাদের
এ আরেক খেলা ছিল মেয়েটা জানে নি, শুধু আমাদের গোপন অমোঘ
বারে বারে পাঠিয়েছে নানান বাহানা নিয়ে কে জি গুপ্ত লেনে মামাদের
দোতলায় আর ছাদে, সিঁড়িঘরে আমরা করি আমাদের দ্বিতীয় প্রসব।
ছোট হ’য়ে বড় তুমি কী ক’রে যে হ’য়ে যাও— দেখতে দেখতে এসে যায় মাঘ।

১২
সমুদ্র-স্বনন। বৃন্ত খুলে যাচ্ছে একে-একে সারা আকাশের; ফুলেদের
রাঙা ঠোঁটে কিচিরমিচির করছে প্রচ্ছন্ন অতীত কিংবা সুপ্ত ভবিষ্যৎ—
তোমার উপরে কেউ এঁকেছিল আরও কারো খোমা, সেই খোমার আদল
তোমার মুখের মতো, হয়তো আরও-একটু ফরসা, হয়তো পরিশ্রমের স্বেদের
সকল সুরাগ ঊহ্য অলকাতিলকা-টিপে, আধা-রাধা আধা-বার্বি ডল।
তুমি, চিত্র-বাজিকর, মানুষ সরিয়ে নিয়ে রেখে দিতে পারো পরিচ্ছদ,
তারপর পোশাক-সই মানুষও বসিয়ে দাও— অতঃপর অপেক্ষা— ব্লেডের।

১৩
ব্লেড (নাকি সিমিটার?) -হাতে এক অ্যালারিক, নাম তার… জানি না; সরগম?
পুরিয়া সোহিনি আর শিবরঞ্জিনী, কার চেয়ে কার শোক গাঢ়তর?
নাকি গারা ভৈরবীতে, কাফি বাগেশ্রীতে এই কলিজার খুন বইতে পারে?
সমুদ্র-স্বনন, তুমি সঙ্গীতের সার তুমি, একই সঙ্গে স্থাণু ও জঙ্গম;
তারা ও উদারা আসছে একই অঙ্গে, তুমি শুধু শুয়ে থেকে ব্রহ্মপুত্র-পাড়ে
নিঃসংজ্ঞ জন্তুর মতো ছিন্ন হৃৎপিণ্ডের মতো কেঁপে উঠছো একলা থরোথরো…
রূপসী তিন বোন, তার একজন মরণশীল, বাকি দু’টি অমর— গর্গন।

১৭/১১/২০১১ – ২৮/১১/২০১১

 

হায়াসিন্থ-মেয়ে


বিদ্যা, আমি তোমাকে দেখি নি। আমি বারবেলায় গেছি একনম্বর,
রিটার্ডেড টায়ার্ড টায়ারে। মহাখালির দোতলা চৌমাথায়
কালই ধুধু ধূলিঘূর্নি উঠল; বিদ্যা, আমি খালি ঠাহর করি নি।
চারটা সীট খালি ছিল, ফাঁকা ছিল দু’- দু’-জোড়া অলিন্দ-নিলয়—
কী বিশাল পূষার আকাশ থুয়ে ভ্যাবাচ্যাকা চাকার তলায়
কেন যে গলালে গলা। আমার যেটুকু ফুল রেখে যেতে চাই
তা-ই নিয়ে ফিরে যাই কলুটোলা; বিদ্যা, আমি কাউকেও বলি নি।


সেই থেকে আমাদের সময় পৃথক্ আর আকাশ পৃথক্,
সেই থেকে আমাদের শরীর পৃথক্ আর কামনা পৃথক্,
সেই থেকে আমাদের ধমনি পৃথক্, তাতে ধুকপুক পৃথক্,
সেই থেকে আমাদের চোখ আর আলো আর আঁধার পৃথক্,
দ্বিতীয় গোলার্ধে উল্টো হেঁটে-হেঁটে পথে কত পতাকা রঙিন
পৎপৎ সাদার্নক্রস ঊর্ধ্বে অধে ঈশানে নৈর্ঋতে তুমি নাই;
আমাকে শিমুল-তুলা ধুনে ফেলছে ইস্টিশনে বৃষ্টির ব্লিৎসক্রিগ।


বৃষ্টি কিন্তু শুয়োরের চর্বিমাখা গা ভেজে না, রাজশাহি সিল্কের
ফিরোজা শাড়ির চেয়ে আরও দামি দোকান কোথায় উয়ারিতে
যে তুমি স্বপ্নেও ভাববে আমরা স্রেফ কাব্যে বড়-বড় বড়লোক
না হ’য়ে লটারি জিতব, ফাটকায় ওড়াব হাল্কা ব্রাউন শুগার?
আমি কিন্তু তোমাকে মারি নি, বিদ্যা, আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়ি নি;
আমি ঋণী, তথাপি খেলাপি নই, নকল করি নি দস্তখত
আমার মায়ের চেকটা কে যে নিল সোনালি ব্যাংকের ম্যানেজারই


জানত দাদু, ব্ল্যাংক চেকে ওরা মাত্র দু’হাজারে বিক্রি ক’রে দিলে
আমার গুডবয়-মার্কা সকল এসে-ই; আর তুমিও এসেই
আমাকেই দেখতে পেলে ঠুঁটো জগন্নাথ, সন্ধ্যা-শাহবাগের মোড়ে
তেলতেলে সুন্দরী ছেলে আঙুল আর চোখ মটকে দাদা দে দিদি দে
দ দত্ত দ দাম্যত দ দয়ধ্বম্ অরে দক্ষ সতী দে সতী দে
আজীবিক বন্ধুতারা আমারে কিংজ ক্রস-এ করে, রাত্রি লেলিহান,
জম্বি বা পল্টারগাইস্ট, হে ক্রাইস্ট, হে ক্রাইস্ট, তুমি ভেড়াশ্রেষ্ট, আইসো


পাইরেট ক্রস-এর থেনে, মাসুমেরে দেহো এনে একটা সবে ধন,
দশটা নয় পাঁচটা নয় আস্তা-আস্তা মহিলা কলেজ নয়, স্যর,
বললাম না এক, আর অদ্বিতীয়? কাগজের যে-মগজে হত্যা
দেয় ছুটি পরাগল আর রূপ সনাতন, তোলে ছড়ি চাঁদ
কেদার প্রতাপ রায়, মানসিংহ ইসাখাঁ লড়ে ইতিহাস বইয়ে
রক্তবৈতরণি বইয়ে অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গের লিঙ্গে কলিজায়
তোমারে বাঁচায়ে রাখে, বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে শেষে দু’হাজার-দশ।


এ কী হ’ল! তামশা নিকি? খামারেতে যমেতে-মুরগিতে টানাটানি;
ফলে-পরিচয় গাছে ফলিছে ফলুই, যত মাছ ততোধিক
কাঁটা বেছে গাঁ উজাড় গায়ে-গায়ে সন্ধ্যা লাগে, আর কাটা-ঘায়ে
সোডিয়াম বাতি জ্বলে এরশাদের পুণ্যনাম করিতে রওশন,
টেম্পু শুনে দৌড়ে আমরা কার্ফিউ নামাই, তুমি কার বাচ্চা, বাছা?
একলা ক্যানে কানতে আছ, মার্বেল হারাইছ? না অ্যাম্পুল? না পিস্তল?
না কিচ্ছু হারাই নাইক্কা, চুরি করছি, আপনারে মায়ের গর্ভ থিকা।


নাদান রে, কান্দন নাই। তোমার সাক্ষাৎ, বাবা, পাবা সুগন্ধায়।
বক্ষিলারে কাঁচা খাবে তোমার পন্নগ— ফণা? না, এ তো হৃদয়—
তার— তারই হৃদয় তোমার ধন, সামনে যার শান্তিপারাবার—
তার রেখে-যাওয়া আয়ু তোমার রেহাই, তার শেষ এসএমএস
তোমার অকাট্য অ্যালিবাই। তুমি তারে ল’য়ে চলো পতেঙ্গায়
সাগরসঙ্গমে; আচ্ছা, ও পঞ্চাশ চোর-বন্ধু, জানো সিন্ধু লবণাম্বু কেন?
পানির উপরে নীচে আমরা তবু একই সন্ধ্যা-সমুদ্রবেলায়।

২৮-০১-২০১২

 

লঙ্কাদহন সারঙ্গ

অওছার

অতিক্রান্ত সন্ধিলগ্ন— বিস্মৃতির তোগলকি উদ্যম
হামলে পড়ে; রুগ্ণ ভুগ্ন কনিষ্ঠার অশিষ্ট ভাষায়,
স্বর্গতা মা, জন্ম দিয়ে জ্বালিয়ে দিলে গোমোরা সদোম!
শুক্রনিঃশেষিত শিশ্ন ঘুরছে একা গর্ত-প্রত্যাশায়—
আস্তাবলে মাংসীকৃত রশ্মি, আহা, ঐশী মতিভ্রম!

বঢ়্হৎ

আবার রাস্তায়। আমি আমান ভাইয়ের হাত ধ’রে
অন্ধ হাঁটি। শিল্পকলা ন্যাকাডেমি। শুষ্ক ওষ্ঠাধরে
না-টানা গোল্ডলিফ। নেভে। প্রদীপদা কি আসছেন, সালাম?
দূরে যারা, তারকারা, কাউকে-কাউকে দেখেও চিনলাম
না, যদিও দেখে থাকি ন’মাসে-ছ’মাসে হয়তো টিভি—
আমাদের প্রাকার-পরিখা-ঘেরা আরেক পৃথিবী।
সুবর্ণা মোস্তফা উনি, আমার তিন-ক্লাস সীনিয়র,
কাছেই— ফরিদী নাকি? কে জানে। আমরা তো খালি ওঁর…
আলী যাকেরের পার্শ্বে উনি সারা, অন্য পার্শ্বে নূর,
কিন্তু আমি আঁতকে উঠি যাকে দেখে, সে শুধু তৈমুর;
আমার ক্লাসেই পড়ত, নাটক ছেড়েই দিচ্ছি, গানও
শুনতে তাকে কদাপি শুনি নি, তাকে কাজেই রাগানো
ফরজ, তখন আমি, হ্যাঁ আমি তখনই তোমাকেও
আবিষ্কার— তুমি কার সাথে কথা কও? নাকি কেউ
ঊর্ধ্বে-অধে ডানে-বাঁয়ে…? নাকি এটা শিল্পকলা নয়?
এক-আকাশ কাশ? মেঘ? সাদা, আর প্রহেলিকাময়?
মাধব-মালঞ্চী-কন্যা দেখতে গিয়ে দেখতে পাই যাকে
মাধব-মালঞ্চী-কন্যা উবে গিয়ে সে-ই খালি থাকে।
মাধব-মালঞ্চী-কন্যা দেখি নাই আমরা কোনোদিন;
মাধব-মালঞ্চী-কন্যা, হায়, আমরা কামের অধীন।

তান

ঈশ্বরের মতোই তুমি আমার কেউ নয়?
আমি ভাবছি, ভেবে কাঁপছি, গলার কাছে দলা
পাকাল দ্বিধা, কাজেই শেষে বলার অভিনয়—
হায় রে ছায়া, সামনে খোদ সূর্য-উজ্জ্বলা!
ঈশ্বরের গলায় তুমি ফতোয়া দাও— কাফের।
একফোঁটা এ-হৃদয়ে যত অভিজ্ঞতা, পাপের,
তাকেই তুমি হঠাৎ-ভুলে পরিয়ে দিলে যিশুর
কাঁটার মালা, যদিও তার তোয়াক্কাও কিছুর…
সফল হ’ল ঈশ্বরের অভিসন্ধি : আমি
জানতাম যা তোমার থেকে অসীম কমদামি।

২৭/১২/২০১১

 

না আমি বাঙালি নই, আমি কিছু বিশ্বাস করি না

মরিয়া তোমাকে খুঁজি, হাড্ডিমাংস কেটে ভাগা দিয়ে
রাখি লোকে-লোকারণ্যে, মাছি হ’য়ে যদি তবু ব’সো;
যত খুঁজি তত করি অস্বীকার, যত অস্বীকার
করি তত খুঁজি, হায়, যত নাই ততটাই আছো।
যখনই সন্ধান পাই, পৌঁছাবার আগে তুমি খুন
হ’য়ে যাও বাটে-ঘাটে, বাংলাদেশ ভর্তি খালি লাশ
প’ড়ে থাকে তোমার, আমারও আর থামে না তালাশ,
তালাশে ও লাশে চলে টম-জেরি, সারা বাংলাদেশে।

আমি যা-ই বলি তা-ই বিশ্বাস করি না, আমি যা-ই
বিশ্বাস করি না, বলি, আমি বলি : বিশ্বাস করি না।
মেঘ-প্রযুক্তির মেঘে গুঁতা লেগে ফিরে আসে কথা
আপাদমস্তক উল্টা, ভাগ্যে খালি আমি শুনতে পাই,
ভাগ্যে খালি আমি জানি আমার তাবৎ নাফরমানি
আমারই বিরুদ্ধে, নইলে আমার গভীর মিথ্যাচার
নিশ্বাস-ফানুস ফেটে বেরিয়ে পড়ত না জোনাকিরা
তামাম সুন্দরবন? ডিঙি নায়ে একাকী ক’জন
স্বজন বাদলার রাতে স্বপ্নরাঙা আন্ধারের গাঙে
চলেছে যেখানে গিয়ে নদীটা ঝাঁপিয়ে পড়বে খাড়া
অনন্ত মোকামে, আমি সেখানেও আত্মবলাৎকার।

এখনও তোমাকে খুঁজছি, এইমাত্রই যখন তোমাকে
ভর্তা করা হ’য়ে গেল সাত-সাতটি দেহের অজুহাতে
তুরাগের চরে, আমি পরবর্তী চরে পাহারায়
হাত আর হাতিয়ার জড়ো হ’তে দেখছি শুভাড্ডায়
কিংবা বাড্ডা কিংবা ঈদে কিংবা প্রবারণা পূর্ণিমায়;
তোমার পরের মৃত্যু রোধ করতে কিংবা ঘটাতেই
রঞ্জন রশ্মির মতো কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে
বেরিয়ে চলেছি বাইরে, তারও বাইরে, নীল চাঁদোয়ার
যে-কোণে তাকাই, খালি লাখে-লাখে তারা নিবে যায়।

ঘাতক পনেরো-কোটি একলৌটা ঘাতব্য/ঘায়েল,
তোমাকে যে খুঁজি আমি, সেও শুধু তোমাকে মারতেই,
এবং শেষবার। আমি চাই না তুমি আবারও জন্মাও
ক্রুশের শিকার হ’তে আমার মিথ্যার হারে, আমি
আমার মৃত্যুতে আজকে করতে চাই তোমার সৎকার;
বাঙালিরা, এবার আমাকে মারো, বাংলার দোহাই,
আমার ঈশ্বরকে তোমরা খুন আর কোরো না একবারও।

১৪/০১/২০১২

 

মোহানা

আলো— জ্বলে? আলেয়া?— এ কি সন্ধ্যা না ভোর?
ঢেউ ভাঙছে বেলায় কত ডাগর-ডাগর।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

ফুট-তিনেক দূরে তিনজন্ম-জপা,
তবু সমুদ্দুরে গজও হামেশা অপার।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

‘এসো’— এ-শব্দটি গাঢ় অ্যানেসথেটিক
আর আকাশ-ও.টি., মৃতজন্মা স্ফটিক।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

এসো, এই তিনফুট মোছো ঝড়-রাবারে,
নাকি এই কিম্ভূত ধাঁধা— আমার সারেং?
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

ভাসে ভাঙা সাম্পান কালো কর্ণফুলির,
শুনি— রাতজাগা গান গায় অনলচুলি।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

প্রিয় অগ্নিকে ডাক (শোনো) পাঠায় হবিঃ,
এসো— বজ্রের ঢাক বাজে, ঊহ্য রবি।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

এসো— দুষ্টুহাসি ডানাকাটা কিশোরী,
করো যৌবনাসীন এই প্রৌঢ় শরীর।
বেলা কাছে কি আসে? বেলা দূরে স’রে যায়?
হায়, দূরে ও কাছে মেশে কোন্ অবেলায়।

২০-০১-২০১২

 

তোমাদের দূর থেকে সালাম

মৃত্যুকে মহৎ জেনে হেঁটে গেছে সটান হেক্টর
দেবতাপত্যের সনে সম্মুখ-সমরে। পিতামহ
ভীষ্ম, সেও শরশয্যা-’পরে একা মরে। নিরন্তর
আমাদের মৃত্যুশীত; আর এমনকি মরার সময়ও
আমরা কী কুৎসিত জন্তু! যদিও মগজে তবু ভিড়
ক’রে আসে সুনীল সাইফুল্লাহ্ কিংবা শামিম কবির।

২১-০১-২০১২

 

টায়রা আঠারোয় পড়ল

সন্তানের জন্মকান্না শোনামাত্র ম’রে-যাওয়া মায়ের চোখের
হঠাৎ-বরফ-হওয়া আলোটুকু— আজকে সকালের—
টায়রা আজ আঠারোয় পড়ল— শোনো, ঘণ্টা বাজে সোনার রুপার আর শূন্যের রূপের
আমার তেত্রিশকোটি মন্দিরে-মন্দিরে, এই দেবনগরের—
আমার সমান হলি, কাতেল আমার, হায়, আমি তোর খোশার মতোই
খ’শে যাচ্ছি, ঝ’রে পড়ছি, সবুরে-মেওয়ার-দেখা-পেয়ে-অন্ধ চাষা
যেরকম গ’লে গিয়ে জল হ’য়ে উবে যায় মায়ামেওয়া গাছের গোড়ায়—
এবার মাড়াবি, মেয়ে, লেবুপাতা ঘাসেদের, এবার মাড়াবি, মা গো, আমার মরণ
এ-আলোয়— আজকে সকালের।

২৪-০১-২০১২

 

Facebook Comments

8 Comments:

  1. আমি অভিভূত. কাটাতে চাই কালবেলা কবিতার বুকে মুখ গুঁজে. না: না: আমি চান কচ্ছি. চান করতে চাই আর একটা জীবন.just stuck up in the rhizomatic moor.

    • Subrata Augustine Gomes

      Priyo Kaushik Bhaduri,

      apnake chan korate pere ekebare hamamkhana bodh korchhi nijeke 🙂

      onek onek dhonyobad.

      Subrata

      • না না আমাকে আবার ধন্যবাদ কিসের! আমি কবিতার মাঠে বুড়ো শালিক, ঘাড়ের ron -এ এল কেটে ঘুরি. কতটা বুঝি?! সুদুর অস্ট্রেলিয়ায় বসে পূব বাংলাকে এতটা আঁকা- মনে হয় মহীরুহ উড়ন্ত হয় পাঁজরের কার্গহ্যাচে শিকড়বাকড় ভরে.

  2. Bhalo laglo, kobi. Tonumodhya-r probaho ar Pulipolao-r swagotuktimoytar darun blending! “না আমি বাঙালি নই, আমি কিছু বিশ্বাস করি না” ebong “টায়রা আঠারোয় পড়ল” kobita duti bisheshbhabe bhalo laglo…obhinondon!

    তালাশে ও লাশে চলে টম-জেরি, সারা বাংলাদেশে।

    আমি
    আমার মৃত্যুতে আজকে করতে চাই তোমার সৎকার;

    টায়রা আজ আঠারোয় পড়ল— শোনো, ঘণ্টা বাজে সোনার রুপার আর শূন্যের রূপের
    আমার তেত্রিশকোটি মন্দিরে-মন্দিরে, এই দেবনগরের—
    আমার সমান হলি, কাতেল আমার, হায়, আমি তোর খোশার মতোই
    খ’শে যাচ্ছি, ঝ’রে পড়ছি, সবুরে-মেওয়ার-দেখা-পেয়ে-অন্ধ চাষা
    যেরকম গ’লে গিয়ে জল হ’য়ে উবে যায় মায়ামেওয়া গাছের গোড়ায়—
    এবার মাড়াবি, মেয়ে, লেবুপাতা ঘাসেদের, এবার মাড়াবি, মা গো, আমার মরণ

    Brilliant!

  3. Subrata Augustine Gomes

    Khan Shaheb,

    kaen je aemon shorminda koren re bhai! ki khoti je korchhi apnar! apnar podonokher dike takaiya bhulbhal podyo likhi, koshTo koira poRen je, shei to bodanyota-enough! tar upor…

    apne manuShTa asholei kharap!

    apnar chirodas
    Subrata

  4. Kobi,
    apni gali dyan, jhaRi maren, sob thik achhe….kintu achomka je bibrotokor kotha koye felben janle shalar comment-i kortam na!

    Honestly boli? Amar lekhalikhi ekhon sotti poRtir dike, nije to ter pai…..
    Onnodike, apni ujjol theke ujjolotoro hoye uthchhen, kobi….

    Sorbottom shubhechchha

    Masud Khan

  5. তনুমধ্যা সুব্রতর কবিতা আমার বরাবর ভাল লাগে । বাংলাদেশের কবিতার বাঁক যদি নিয়ে থাকে তা হয়েছে সুব্রত ও ব্রাত্য রাইসুদের হাত ধরে । এখন মজনু পাবলো শাহী শামীম রেজা ওবায়েদ আকাশ মেঘ অদিতি কচি রেজা শুভাশিস সিংহ জাহিদ সোহাগ আপন মাহমুদ কত নাম । এই কবিতাগুলি পড়ে অভিভূত আমি ।

  6. এ কালের চণ্ডীদাস !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *