আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্প: ফণী আসছে ফণা তুলে

সকাল বেলা খবরের কাগজ খুলে অবাক হয়ে গেল লালি। দৈনিক কাগজের শিরোনাম দেখে কেঁপে উঠল তার বুক। লালির বয়স মাত্র উনিশ,  তবে সামনের মাসে সে বিশে পা দেবে। এবার তার জন্মদিনের উৎসব বেশ জমকালো হবে সে জানে। এক সংখ্যা পার হয়ে সে এবার দুয়ে ঢুকবে। এই পৃথিবীর এতসব ঝামেলা পার হয়ে এভাবে নিপাট বেঁচে থাকাটা তো চাট্টিখানি কথা নয়। সামনের মাসের মাঝামাঝি থেকে সে হবে বিশ বছরের একজন তরুণী। তার মানে লালি গত উনিশ বছরের রোড অ্যাক্সিডেন্ট,  আগুন,  দালান ধস,   ভূমিকম্প,  রাস্তাঘাটে সন্ত্রাসীর আক্রমণ, বাস-ধর্ষণ সবকিছু পার হয়ে দিব্যি ইউনিভার্সিটিতে পা দিয়ে বি.এ পড়ছে। খুব চিন্তা করে দেখলে এটি হেলাফেলার কথা নয়। এই দেশে এটি একটি অর্জন।

কিন্তু আজ সকালে খবরের কাগজের শিরোনাম দেখে প্রথমে সে হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ বিগত কয়েক সপ্তাহ খবরের কাগজ খুললেই সে দেখতে পাচ্ছিল বেশির ভাগ খবরই নোয়াখালীর কাছে ফেণীর খবর। সেখানে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, যেহেতু নুসরাত ছিল একজন কিশোরী প্রতিবাদী মেয়ে। এবং নুসরাতকে নিয়ে এই কয়েক সপ্তাহ ছিল খবরের কাগজগুলো মুখর। সমগ্র দেশবাসী এবং সমাজ ছিল জাগ্রত। নুসরাতের বিচারের জন্যে সমগ্র দেশে বয়ে গেছে প্রতিবাদী সভা। মাদ্রাসায় পড়া নিরীহ একটি কিশোরীকে এভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে ভীষণ এক অপরাধ। এবং এর বিচার হতেই হবে। তবে লালি কৌতুকের সাথে এটিও লক্ষ্য করে দেখেছে যে নুসরাতকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ষড়যন্ত্র করে পুড়িয়ে মারার পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও কতকগুলো নারীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। কেউ তাদের স্বামীর হাতে,  কেউ বা অন্য কোনো ষড়যন্ত্রীর হাতে। এবং একথা ভেবে সে অবাক হয়েছে যে,  যে কোনো বীভৎস মৃত্যু মানুষকে আকৃষ্ট করে। এবং সেই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একের পর এক হত্যা করে নারীদের আরও কতিপয় সন্ত্রাসী মানুষ।

মানুষ তাহলে কী? এটাও ভেবেছে লালি। কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি।

আজ খবরের কাগজের শিরোনাম দেখে প্রথমেই লালি হুররে বলে চেঁচিয়ে উঠল। ভাবল খবরের কাগজে একটা ফোন করে তাদের ভুল ধরিয়ে দেবে কিনা। কারণ এত ভোরে লালির চেয়ে কেউ আগে খবরের কাগজটা খোলে নি। কাগজে ফেণীর জায়গায় ভুল করে ছাপা হয়েছে ‘ফণী’। এবং এই ভুল ক্ষমার অযোগ্য। বিশেষ করে একটা দৈনিকের জন্যে।

কিন্তু না, দূর থেকে খবরটা পড়েছিল সে,  এখন কাছে এসে ভালো করে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেল। না,  এই ফণী তো সেই ফেণী নয়। এ যে আরও ভয়াবহ খবর। এ যে শত শত মানুষকে একসঙ্গে মেরে ফেলার,  একসঙ্গে বন্যার তোড়ে,  ঝড়ো হাওয়ায়, বজ্রপাতে,  জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার আকাশী ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়বে কীভাবে মানুষ?

খবর পড়তে পড়তে লালির শরীর শিরশির করে উঠল ভয়ে।

খবরের কাগজ হাতে প্রথমেই সে ছুটে গেল তার দাদির ঘরে। সেই মহিলা কেবল মাত্র এই বাড়িতে ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে আর ঘুমোন না। নামাজ পড়ে,  কোরান পড়ে,  তসবি গুনে,  বাড়ির সকলের জন্যে দোয়াদরুদ পড়ে তিনি সময় কাটান। এবং ভোরবেলা নিজে নিজেই ইলেকট্রিক কেতলি অন্ করে এককাপ চা নিজে তৈরি করে খান। কাউকে হাঁকডাক করে ওঠান না। তিনি জানেন,  এই বাড়িতে সকলেই চাকরি করে,  সুতরাং কাউকে কিছু বলতে হয় না। তাছাড়া তিনি নিজেও এককালে চাকুরীজীবী ছিলেন, নিঃশব্দতার ভেতরেই সবকিছু সুসম ভাবে সেরে তুলেছেন।

কিন্তু তার এই নাতনিটি অনেকটা যেন তার মতোই। সে ও অনেক ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। রাতের বেলা সকলের আগে বিছানায় যায়। সে ফেসবুক করে না,  ইউ টিউবে বেশি সময় নষ্ট করে না,  বয়ফ্রেন্ড থাকলেও- বয়ফ্রেন্ড থাকাটা আজকাল একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার- সুতরাং বয়ফ্রেন্ড থাকলেও তার জন্যে তার প্রাণ হাঁকুপাঁকু করে না;  অবশ্য এটা তার তিন নম্বর বয়ফ্রেন্ড,  লালি নিজের মুখে তার দাদিকে বলেছে,  যে মুহূর্তে সে দেখে ছেলেদের ভেতরে মেয়েদের প্রতি একটা তাচ্ছিল্য ভাব,  সেই মুহূর্তে সে সম্পর্ক ত্যাগ করে!

লালির কথা শুনে তার দাদি মনে মনে মিটি মিটি হাসেন,  মনে মনে বলেন,  ওরে বুঝবি রে বুঝবি,  ঠগ বছাতে বাছতেই তোর গাঁ উজাড় হয়ে যাবে!

কিন্তু কখনো ভুলেও তিনি এসব কথা নাতনিকে বলেন না,  কারণ নিজের জীবন দিয়েই তার এই নাতনি জীবন বুঝে যাবে,  যেমন তিনিও এককালে ভালোভাবেই বুঝেছেন!

এই সাত সকালে লালি ছুটে এলো তার দাদির ঘরে। হাতে তার খবরের কাগজ।

লালি বলল,  দাদিরে,  খবর খারাপ!

দাদি সেকথা শুনে তার গুণগুণ করে ওজিফা পড়া থামিয়ে বলে উঠলেন,  খবর তো রোজই খারাপ শুনি,  নাতনি।

লালি বলল,  তার চেয়েও আজ খবর খারাপ। এই যে দেখেন।

কথা বলে লালি তার সামনে খবরের কাগজটা মেলে ধরল।

দাদি তাকিয়ে দেখলেন,  খবরের শিরোনামে লেখা আছে,  তেতাল্লিশ বছরে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ১৯৭৬ সালের পর এত শক্তিশালী ঝড়ের মুখোমুখি হয়নি ভারতীয় উপমহাদেশ। উপকূল জুড়ে আতঙ্ক,  সতর্কতা দেশব্যাপী,  সমুদ্রের সব জেলেকে কূলে ফিরে আসার আকুল আহ্বান,  জেলে পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত,  পাশের দেশ ওড়িশা লণ্ডভণ্ড,  আটজনের মৃত্যুর খবর,  বাঁধ ভেঙে তিন জেলায় বাংলাদেশের জনপদ প্লাবিত,  লক্ষ লক্ষ মানুষ সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছেন,  পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি হওয়ায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন,  এর মধ্যেই সেখানে খাওয়ার পানির অভাব ঘটেছে,  অনেক মানুষ যারা বৃহস্পতিবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন,  ভোরে সাহস করে বাড়িতে ফিরে আসেন,  কিন্তু দুপুর বারোটা পনেরো মিনিটে আবার ঝড়বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এবং ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে জোয়ারের পানি কলকল করে নদীতে বাড়তে থাকায় মানুষেরা ভয় পেয়ে আবার অশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটতে থাকেন। কয়রা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানার এক ঘণ্টার ভেতরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ ১১৬ টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন।

‎ঘ ‎মোকাবেলায় সরকারের সব সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সমন্বিত ভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিদেশে থেকেও দেশের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক এবং তাঁর তত্বাবধানে সারাদশে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে, যেমন সেনাবাহিনী,  বিমানবাহিনী,  নৌবাহিনী   এবং কোস্টগার্ডসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শুক্র ও শনিবার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ঘণ্টায় ১৯৫ কিলোমিটার গতিবেগে পাশের দেশ ভারতের ওড়িশা আঘাত হানার ফলে শতশত ত্রিকালবর্ষী গাছ তাদের গোড়া উপড়ে মাটিতে পড়ে।  উপড়ে পড়ে যাওয়ার পরেও ঝটিকা হাওয়ায় মাইলব্যপী উড়ে চলে গেছে নিরুদ্দেশের পথে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে রাজ্যের বেশির ভাগ অংশ বর্তমানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। গ্রামাঞ্চলের কোনো খবর নাই, সেখানকার পরিস্থিতি বর্তমানে বোঝা যাচ্ছেনা,  যেহেতু সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের সকল জনপদকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।

এই ঘূর্ণিঝড় যে কোনো সময়ে ঢাকায় আঘাত হানতে পারে।

এদিকে নারী সংগঠনগুলো ঝড়ের ফণী নামকরণ নিয়ে এর ভেতরেই প্রতিবাদ মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেন সবসময় নারীর নামে এইসব প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়কে ডাকা হয়,   সে বিষয়ে নানামুনির নানা মত,  তবে এই নামকরণ নিয়ে এদেশের নারীরা মোটেই সন্তুষ্ট নন। রিটা,  ক্যাটারিনা,  নার্গিস,  স্যান্ডি,  রেশমী এই সবই নারীর নামে নাম। এরা সব প্রকৃতি ও মানব বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। ফলে সোভেনিস্টিক সোসাইটির পুরুষ সদস্যদের দ্বারা এসব নামকরণে নারী সমাজ বিক্ষুব্ধ। ঘূর্ণিঝড় চলে গেলেই তারা মিছিল বের করবেন বলে খবরে প্রকাশ।

 

দাদির হাতে কাগজ দিয়ে এদিকে লালি অস্থির হয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল। দাদি তার স্লো রিডার,  লালির মতো অতো দ্রুত পড়তে পারেন না,  তার ওপর যে কোনো জিনিস পড়তে গেলে তার চশমা লাগে।

এখনও চশমা চোখে দিয়েই তিনি পড়তে লাগলেন। আর লালি তার পড়া শেষ হবার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

পড়া শেষ করে দাদি বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তারপর চুপ করে লালির মুখের দিকে তাকালেন।

লালি বলল,  দাদি,  বুঝতে পেরেছেন,  কেন এই ঝড়ের নাম ফণী দেওয়া হয়েছে,  এটা সিম্বোলিক, অর্থাৎ আমাদের ফেণীর নুসরাতকে খুন করা হয়েছে তাই ফেণী একটা জায়গার নাম হলেও সে রূপক ভাবে এখন ফণী হয়ে ফণা তুলে প্রতিশোধ নিতে আসছে! সমস্ত দুনিয়া সে এখন লণ্ডভণ্ড করে দেবে।

দাদি রাবেয়া খাতুন নাতনির এহেন ব্যাখ্যা শুনে কিছু কেশে, কিছু গলা ঘড়ঘড় করে অবশেষে বললেন,  আরে,  এটা ঠিক কথা হলো নাতো লালি। এ একটা কাকতালীয় ঘটনা। মানে এরকম একটা নাম।

তবে হ্যাঁ,  ব্যাপারটা গুরুতর বটে। কাল সারারাত আমাদের এখানে ঝড়ো বাতাস হয়েছে। এখন তো বুঝতে পারছি,  কেন।

লালি বলল,  এখন যদি এই ফণী আমাদের ঢাকায় আঘাত হানে তো আমরা পালাবো কোথায়?  আমাদের এই সূত্রাপুরের কোথাও তো সাইক্লোন সেন্টার নেই।

লালির কথায় চিন্তিত হলেন রাবেয়া খাতুন। বললেন,  সেটা তো একটা চিন্তার বিষয় হলো,  নাতনি।

নাতনি বলল,  তার ওপর আমরা থাকি দশতলায়। ঝড়ে যদি এই বিল্ডিংয়ের মাথা ভেঙে যায়,  তখন কী হবে? এই বিল্ডিং তো ভূমিকম্প প্রুফ নয়,  আবার এর ভিত্তি যে খুব জোরালো সেটাও মনে হয় না,  তাহলে আমাদের কি এখনই দেশের দিকে রওনা হওয়াটা উচিত কাজ হবে না,  দাদি?

দাদি সেকথা শুনে মাথা চুলকে বললেন,  তাহলে তোমার বাবাকে কথাটা বলো। কিন্তু আমরা তো দক্ষিণের মানুষ,  এই সময়ে ওদিকে যাওয়া কি ঠিক সিদ্ধান্ত হবে?  এদিকে দেখছি খবরে উঠেছে,  কপোতাক্ষ নদের পাড়ে দেওয়া বেড়িবাঁধ যে কোনা সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষজন সব অস্থির হয়ে সময় কাটাচ্ছে। এর মধ্যে যদি ফণী ছোবল হানে,  তাহলে তো সেখানকার অবস্থাও এখানকার চেয়ে আরও খারাপ হবে।

দাদির কথা শুনে লালি খুশি হলো না,  সে বলল,  তাহলে আমরা কী করবো? কোথায় যাবো?

লালির দাদি এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, নাতনি,  অপেক্ষা করো। আমরা তো বাইরে বেরোচ্ছিনে সহজে দালান ছেড়ে। আমাদের অতোটা চিন্তা না করলেও চলবে। তাছাড়া দেখ,  পত্রিকায় লিখেছে,  ঝড় ওড়িশায় আঘাত করার পরে কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে,  বেশি শক্তি হঠাৎ করে খরচ করে ফেললে যা হয়,  মানুষও হুমড়ি খেয়ে পড়ে,  ঝড়ও হুমড়ি খায়। তাতে মনে হচ্ছে এদিকে ঝড় আসতে আসতে তার দাপট কমে আসবে।

আর যদি দাপট না কমে?

লালির এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ কালো হয়ে এলো,  ঝড় বইতে লাগল,  একটু দূরের মানুষও চোখে দেখা যাচ্ছে না,  ইতিমধ্যে লালির বাবা মা ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক। তারা টেলিভিশনে বার বার করে সতর্ক উচ্চারণ শুনছেন, সারারাত একফোঁটাও ঘুমোতে পারেন নি,  বার বার করে উঠে লালির ঘরে উঁকি মেরে গেছেন,  লালি এবার তার মাকে বলল,  মা,  এই ঝড় যদি আমাদের দালান ভেঙে ফেলে তখন কী হবে?  তক্ষুনি তোমাদের বলেছিলাম দশতলায় বাসা ভাড়া করো না।

লালি এ বাসার একমাত্র সন্তান। সুতরাং তার কথার দাম অনেক।

লালির বাবা বললেন, এত চিন্তা করো না মা,  আল্লা ভরসা। শুনলাম শনিবারে ভারত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সময় ঝড়ের গতি ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার থেকে ১৮৫ কিলোমিটারে নেমে আসবে। বড় ধাক্কাটা যাবে ভারতের ওপর দিয়ে। আজ আর বাইরে বেরিও না।

কিন্তু লালির মনে ভরসা হলো না। সে ঘরে এসে ফেসবুকে বসে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। শেয়ার শুরু হয়ে গেল অচিরেই। সকলেই লালির মতোই উদ্বিগ্ন।  লালির এক বন্ধু জানালো তারা একতলার একটি দালানে থাকে,  সুতরাং ঝড়ে যদি দালান ভেঙেও পড়ে তবু হয়ত ততখানি ভয়ের কারণ নেই। আরেক বন্ধু লিখল,  তারা শহরের চৌদ্দতলায় থাকে,  ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেয়ে দক্ষিণখানে তাদের আত্মীয়ের একতলা দালানে আশ্রয় নিয়েছে। লালির বর্তমান বয়ফ্রেন্ড জানাল যে তারা থাকে ধোলাইখালের ঠিক উল্টোদিকে। তাদের বাড়ি টিনের চালের, দেয়াল অবশ্য ইটের। না,  তাদের ভাড়া বাসা নয়,  এটা তার পৈত্রিক বাড়ি। ভবিষ্যতে কোনোদিন মাল্টিস্টোরি হবে,  সে তো হবেই,  তবে টিনের চাল উড়ে গেলেও সমস্যা নেই, পাশেই তার নানাবাড়ি আছে। লালির এক গরিব ফেসবুক বন্ধু,  নাম তার শারমিন,  সে লিখল,  সভ্যতা ও সমৃদ্ধি ততখানিই অহংকারের যতখানি তারা মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে;  যে সভ্যতা এবং সমৃদ্ধি মানুষের নিরাপত্তা বিধান করে না , তা মূল্যহীন।

মাল্টিস্টোরিকে খোঁটা দিয়ে যে সে লিখল তাতে সন্দেহ নেই।

ফেসবুক দেখে লালির মন আরও খারাপ হয়ে গেল।

একটু পরে সে নিজের ঘরে ঢুকে চুপ করে বিছানায় কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। এই কাঁথাটা আড়ঙের। বেশ দামী। কাঁথাটা লালির প্রিয়,  কারণ এই কাঁথার সর্বশরীরে বাংলাদেশ জড়িয়ে আছে। গাছ পালা,  নৌকা,  কুলো,  জল,  পালকি,  কাহার,  কৃষক,  কুমোর,  বঁটি,  বটগাছ,  মাছ,  জেলে,  জাল,  কী নেই এই কাঁথায়। যেন সমগ্র দেশ জড়িয়ে রেখেছে লালিকে। লালি গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। বাইরে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি,  মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া,  মাঝে মাঝে প্রাণ কাঁপানো বজ্রপাত।

অতিরিক্ত উদ্বিগ্নতায় লালি একটুপরে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙলো তার দুপুরে। বাড়িতে মা রান্না করেছে খিচুড়ি আর ইলিশ। খাবার টেবিলে বসে লালি নাক শিঁটকে বলল,  মানুষ মরে যাচ্ছে ভয়ে, আর আপনি আজ ইলিশ খিচুড়ি রান্না করেছেন,  মা?

মা জবাবে বললেন,  তো খেতে তো হবে। না খেলে মানুষ যুদ্ধ করবে কীভাবে?

নিমরাজি হয়ে টেবিলে বসলেও লালি পেট পুরেই খেল। তারপর টেলিভিশনের সামনে বসে থাকল। তার চোখের সামনে বন্যার পানি যেন পিল পিল করে বাড়তে লাগল। মানুষের বাড়িঘর সব ঝড়ে,  বাতাসে,  বজ্রপাতে চারদিকে ছত্রখান,  তার ভেতরেই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে মানুষ,  গায়ে তাদের এককানি কাপড় মাত্র,  পুরুষদের শরীরে একখানি মাত্র গামছা,  এখনও আমাদের মানুষ এত গরিব দেখে মন খারাপ হয়ে গেল লালির। তার সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের গল্প মনে পড়ে গেল। এ গল্প ছেলেবেলায় তার দাদির মুখে শোনা। গাছের ডালে,  ঘরের চালে,  বাদাবনে,  জঙ্গলে মানুষের মৃতদেহ পড়েছিল সমস্ত উপকূল জুড়ে। পরে বড় হয়ে সে ছবিও দেখেছে এই ঘূর্ণিঝড়ের। তার মনে হল,  এর পরের বছরই তার দেশ একটা রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে গিয়েছিল,  সেখানেও যে কত রকমের মৃত্যু,  কত ধরণের হত্যা,  আগুন,  অপমান,  দুর্যোগ।

পৃথিবী বড় অনিরাপদ একটি বাসস্থান,  ভাবল লালি।

ভয়ে,  আশঙ্কায়,  উত্তেজনায় শরীর কাঁপতে লাগল তার।

রোববার এসে গেল।

অনেকটা ধীরে সুস্থে রোববার এলো বাংলাদেশে। সেদিন আকাশে সামান্য মেঘ। আগের রাতে ফণী আপন মনে তার শক্তি হারিয়ে নীরবে বিদায় নিলো বাংলাদেশ থেকে,  তখন লালির ঘুমের মাঝরাত। পরদিন লালির কোনো কলেজ ছিল না। সে ধীরে সুস্থে ঘুম থেকে উঠে ভারী মন নিয়ে বিছানায় বসে নাস্তা সারল।

কাজের মেয়েকে বলল,  রাতে ঝড় হয়েছিল?

কাজের মেয়ের নাম লাভলি। সে একগাল হেসে বলল,  আল্লা আমাগো বাঁচাইছে, আপুমনি। আজ আকাশ ফকফকা। রাইতেও ঝড় হয় নাই। ইন্ডিয়াগো ক্ষেতি হইছে জবর। আমাগো এই সামান্যি টুকটাক।

লালি গম্ভীর মুখে খবরটা শুনল। তার হাসি এলো না। সে কাজের মেয়ের মুখে হাসি দেখে বরং কিছুটা বিরক্ত। অবশ্য মনে মনে।

একটু পরে বিছানা ছেড়ে উঠে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ালো। কোনো প্রসাধন করল না। এখন সে বাইরে বেরোবে না। বিকেলে হয়ত বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও যেতে পারে।

সে চলে এলো তার দাদির ঘরে। এসে দাদির পরিষ্কার টানটান বিছানায় সটান শুয়ে পড়ল।

অনেকক্ষণ। দাদি নাতনির অবস্থা দেখে চেয়ারে বসে পেপার পড়তে পড়তে বললেন, কী ব্যাপার,  নাতনি?  ঘুম হয়েছে?

লালি মুখ কালো করে বলল,  আচ্ছা,  দাদি,  আপনি একটা কথা বলতে পারেন?

কী কথা,  লালি?  রাবেয়া খাতুনও এবার গম্ভীর হলেন।

লালি বলল,  এই যে কয়েকদিন ধরে আমাদের টিভি আর খবরের কাগজগুলো মাতম শুরু করে দিল ফণীকে নিয়ে,   তো শেষে অবস্থাটা হল কি?  পর্বতের মূষিক প্রসব হয়ে গেল না?  এরা এত বাড়াবাড়ি কেন করে দাদি,  বলতে পারেন?

রাবেয়া তার নাতনির দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনে মনে মনে অবাক হলেন। ভাবলেন,  এখন তিনি যা ই বলেন না কেন,  নাতনি তার মুখিয়ে আছে ঝগড়া করার জন্যে। যেন তিনিই আবহাওয়াবিদ!

জীবন সংগ্রামে পোড় খাওয়া রাবেয়া একটু চিন্তা করে বললেন,  তাইতো!

লালি ঝটকা মেরে বিছানায় উঠে বসে বলল, কথা সত্যি না হলে আমার রাগ ধরে, দাদি!

 

পরিচিতি

কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক ১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোর জেলার চুড়িপট্টি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোলাম রফিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী। শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে।
লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়তে চাইলেও বাবার আগ্রহে ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডন যান। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মনোবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তী ছ’বছর যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

সাহিত্য জীবন :
আনোয়ারা সৈয়দ হকের প্রথম ছোটগল্প পরিবর্তন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। কলেজে পড়াকালীন সময়ে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্প, কবিতা লিখেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালে লেখালেখির পাশাপাশি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে ছিলেন। প্রথম উপন্যাস ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার ‘সেই প্রেম সেই সময়’ ও ‘বাজিকর’ উপন্যাসে সাধারন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। ‘নরক ও ফুলের কাহিনী’ উপন্যাসে লিখেছেন তার ছেলেবেলার কথা। ‘বাড়ি ও বণিতা’ উপন্যাসে চিত্রায়িত হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সামাজিক সমস্যা।
তিনি বিশাল একটি সাহিত্য ভাণ্ডার তুলে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। এপর্যন্ত ১১টি ছোটগল্প, ৩৩টি উপন্যাস, ৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৭টি প্রবন্ধ, ২৫টি শিশুসাহিত্য, ১টি অনুবাদ, ১টি
স্মৃতিকথা ও ১টি ভ্রমণকাহিনী রচনা করেছেন। আশার কথা তাঁর কলম এখনও সচল ও বেগবান।

পুরস্কার ও সম্মাননা :
• ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক- ২০১৯
• উপন্যাস শাখায় নৃ প্রকাশনী থেকে ছানা ও নানুজান-এর জন্য পাঞ্জেরী ছোটকাকু আনন্দআলো শিশুসাহিত্য পুরস্কার – ২০১৯
• উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা এলাডেমি সাহিত্য পুরস্কার- ২০১০
• কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার – ২০০৭
• ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার – ২০০৬
• অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
• মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার
• শিশু একাডেমি পুরস্কার

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সহধর্মিনী। তাঁদের দুটি সন্তান, কন্যা বিদিতা সৈয়দ হক ও পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হক।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।