মঈনুস সুলতানের গল্প: নিমাতরা সাব ও জোড়া খোয়াব

এক.

সাজিয়ার বাচ্চাটা মারা গেল। প্রায় বছরখানেক ও পৃথিবীতে ছিল। ভারি সুন্দর হাসত। আপাত দৃষ্টিতে প্রায় অকারণেই বাচ্চাটা মারা গেল। এমন কোনো সঙ্গত রোগ-বালাই ওর ছিল না। মাত্র দিন চারেক জ্বর, সর্দি-কাশি ইত্যাদি, বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগলে হামেশা যা হয়ে থাকে। শিশুটির চোখ জোড়া ছিল ভারি অন্য রকম। সাজিয়া আমার বোন। ওর সাথে আমার বয়সের ফারাক সামান্য। আমাদের পরিবারের সবার একটু বড় বড় অন্য রকমের চোখ, এমনকি ফুফাতো ভাইবোনদেরও।

বারইপুরের পাগলা-চাচা বলতেন, এসব টানা টানা চোখ ইমোশন ও পাওয়ারের প্রতীক। ছোটবেলা থেকেই আমার ধারণা, পাগলা-চাচা নানা কিছু বিস্তর জানেন। সাজিয়ার বাচ্চার চোখ-জোড়া কিন্তু আমাদের পরিবারের লোকজনের মতো নয়, বরং আরেকটু অন্য রকমের, ক্যামন যেন ছলছলে বিষণ্ণ গোছের। সাজিয়ার বরের চোখ-জোড়া খানিকটা মঙ্গোলিয়ান টাইপের, তুলনামূলকভাবে ছোট আকৃতির, বোধ করি, তাবৎ কিছু মিলেমিশে হয়তো বাচ্চাটার এমন অপূর্ব চোখ হয়েছে। আমি একনজর দেখেই পাগলা-চাচার অনুকরণে বলেছিলাম — লাভ অ্যান্ড ইমোশন। সাজিয়া হেসেছিল। অথচ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্চাটা মারা গেল।

সাজিয়া আজ তিন দিন ধরে কেবলই কাঁদছে। পাগলা-চাচার কথা প্রায় ভুলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তাঁর স্মৃতি জোরেশোরে ফিরে আসলো মনে। আমাদের পারিবারিক পরিসরে উনার পাগল পরিচিতি থাকলেও, তাঁর মানসিকতায় বিকোলন কিছু ছিলো না। কথাবার্তা তিনি বলতেন না, প্রায় সারাক্ষণ মৌন থাকতে পছন্দ করতেন। আমাদের গাওগেরামের আঞ্চলিক জবানে ‘কথা’র প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘মাত’, চাচা মাততে পছন্দ করতেন না একেবারে, তাই বাড়ির বাইরের লোকজন তাঁকে ‘নিমাতরা’ বলে উল্লেখ করতো, এক জামানায় তাঁর পরিবারে বিত্ত ছিলো অঢেল, সামাজিক প্রতিপত্তিও ছিলো যথেষ্ট, তাই অত্র এলাকায় তিনি পরিচিত হতেন ‘নিমাতরা সাব’ এ অভিধায়।

পাগলা-চাচার বিষয়-আশায় নিয়ে চুপচাপ ভাবছিলাম, হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল, ছোটবেলার অবিকল ওই দিনটার তাবৎ কিছু। বৈঠকখানায়  চাচা বসে আছেন, দেয়ালে ঝুলানো ‘হাজার দুয়ারী প্যালেস’ এর বিরাট ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফটোগ্রাফটার ঠিক নিচে। ছবিটা এখন আর নেই, তুফানের সময় দেয়াল থেকে খুলে পড়ে ফ্রেমের কাচ ভেঙ্গে ছিল। তারপর কি হয়েছিল কে জানে। আব্বা ও চাচা একসাথে শ্রীহট্ট জেলার এম সি কলেজ থেকে এফ-এ পাশ করে কলকাত্তা হয়ে মুর্শিদাবাদে বেড়াতে গিয়েছিলেন। পাগলা-চাচা নাকি সে আমলে প্রচুর কথাবার্তা বলতেন। এক ইংরেজ সাহেবের কাছ থেকে সেকেন্ডহ্যান্ড একটি ক্যামেরাও কিনেছিলেন। তা দিয়ে মুর্শিদাবাদের নবাবী প্রাসাদ হাজার দুয়ারীর ছবি তুলেছিলেন। তো সেই ছবিটার নিচে পুরানো দিনের জমকালো চেহারার এক কুরছিতে পাগলা-চাচা পা জোড়া ফুটরেস্টে তুলে দিয়ে আয়েশ করে বসতেন। তিনি হরহামেশা বৈঠকখানায় ঢুকে কুরছিতে বেশ জাঁকিয়ে বসে উর্দু পত্রিকা ‘জং’ পড়তেন। মাঝেসাজে— আপাতত কোন কারণ ছাড়া আওয়াজ তুলতেন ‘আফসোস’, প্রতিধ্বনিতে সারা কামরা গম গম করে উঠত। সাজিয়া সেই সব দিনে খুব দেরি করে ঘুম থেকে ওঠত। পাগলা-চাচা ভোর হতে না হতেই মাঝেমধ্যে এসে হাজির হতেন আমাদের এখানে। একদিন সাজিয়া ঘুম ভাঙতেই, চুলটুল ঠিক না করে চাচার কাছে ছুটে যায়, রাতে স্বপ্ন দেখে সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল।

আমি ঘটনাটা মনে করিয়ে দিতে— সাজিয়ার কাছে স্বপ্নটার কথা বিস্তারিত খুলে বলি। সে কিছুতেই কোন সেই শৈশবে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছিল, এলোমেলো চুলে চাচার কাছে ছুটে গিয়ে স্বপ্নটার কথা বলে ব্যাখ্যা শুনতে চেয়েছিল, মনে করতে পারল না। বাচ্চাটার কথা ছেড়ে দিয়ে এবার সে পাগলা-চাচার জন্য আরেক দফা কাঁদে। পাগলা-চাচা ভীষণ অন্য রকম এক মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ চুল-দাড়িতে নাটকের স্টেজে বাউল বা সন্ন্যাসী চরিত্রে তিনি বেশ মানিয়ে যেতেন। ওনার প্রাচীন ধূসর বর্ণের আচকানের সব কটা বোতামই ছিল লালচে রঙের মরচে পড়া। শীত-গ্রীষ্ম উভয় ঋতুতে বিরাট এক কম্বল গায়ে চড়ানো থাকত। চাচার গায়ে জড়ানো ওই বস্তুটা কম্বল না লেপ, ছোটবেলা এটা আমার গবেষণার বিষয় ছিল। বয়সের ভারে কাপড়ের আস্তর অনেক দিন হলো উধাও হয়েছে, তাই ওটি গায়ে চড়ানোতে মনে হত, ওনার সারা শরীরে থোকা থোকা বিবর্ণ তুলো জড়িয়ে আছে। চাচা এই কিম্ভূতকিমাকার লেপ অথবা কম্বল গায়ে নিয়ে সারা তল্লাটে আকসার ঘুরে বেড়াতেন।

পরবর্তী জীবনে অবশ্য আমি ঢের পাগল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি, পাগলদের পর্যবেক্ষণ করা আমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের কেউই কিন্তু চাচার মতো লেপ-কম্বল কিছু গায়ে জড়াত না। চাচা বিবর্ণ কম্বলটি গায়ে দিয়ে হনহনিয়ে হেঁটে যেতেন। তাঁর যাত্রাপথ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল গাওগেরামের সর্বত্র। কখনো তিনি হেঁটে যেতেন — অনেক অনেক দূর— সবুজাভ পাহাড়ের অজানা গন্তব্যের দিকে। আমাদের বাড়ি থেকে মাইল দশেক দূরে ষাড়ের-গজ নামের শ্যামল সবুজ পাহাড়। চাচা হাঁটতেও পারতেন। হাঁটতে হাঁটতে তাঁর দেহরেখা দিগন্তের কাছে ছোট হয়ে মিলিয়ে যেত। কখনো তাঁর হাঁটা দেখে মনে হত, ওদিকে তাঁর না হাঁটলে চলছে না, পাহাড়ের দিকে যেন এক চক্কর মারা চাই-ই। একা একা তিনি হেঁটে গেলে, সড়কের হাবাগোবা ছেলেরা ভয়ে পথ ছেড়ে দিত। আবার ফাজিল ছেলেরা ঢিল ছুড়তেও কসুর করত না। কোন কোন শয়তান ছেলে সুর করে ছড়া কাটতো, ‘নিমাতরা সাব.. নিমাতরা সাব.. দেখছো নাকি নয়া খাব?’ এতেও তাঁর নীরবতায় চিড় ধরতো না। নির্লিপ্ত হালতে তিনি কেবল হেঁটেই যেতেন।

সরাফত চাপরাশি তখনও বেঁচে আছে। আমাদের বাড়িতে তার কাজ কী ছিল, সঠিক করে বলা মুশকিল। এক জামানায় সে ছিল বড়-চাচার আফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। আলিগড় থেকে বি-এ পাশ দেয়া বড়-চাচা নদীয়ায় মাজিসট্রেট ছিলেন। অকৃতদার মানুষটির মৃত্যু হয়েছিল সন্ন্যাস রোগে। সরাফত চাপরাশি নাকি তাঁর লাশ আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তারপর সে আর সরকারি কাজে ফিরে যায়নি। আমাদের বাড়িতে কী কারণে জানি থেকে গেছে। বুড়ো মানুষটি আমাদের হরেক রকমের গল্প-কেসসা শুনাতো। ওর কাছে শুনতাম, পাগলা-চাচা নাকি সারা রাতভর গোরস্তানের নির্জনে নিশ্চুপ হালতে বসে থাকেন। অথচ ফজরের নামাজের পরপরই তিনি এসে আমাদের বাড়িতে হাজির হতেন,  উনার দু’হাতে কমছে-কম তিন প্যাকেট, কখনো সখনো ছয়-সাত প্যাকেট কিংস্টর্ক সিগ্রেট থাকতো। সারাক্ষণ চাচা সিগ্রেট খেতে পছন্দ করতেন। সিগ্রেট খাচ্ছেন তো খাচ্ছেনই, একটার পর একটা হরদম। কারো সাথে কথাটথা তেমন একটা বলতেন না। মাঝে মাঝে দু-তিন দিনের জন্য উধাও হয়ে যেতেন। সরাফত চাপরাশি বলত, উনি নাকি জ্যোতিষ গণনা এবং জাদু জানেন। পাহাড়ের এক নির্জনে বসে সারা দিনভর তাকিয়ে থাকেন সূর্যের দিকে। চাচা নির্জনে চুপচাপ বসে একা একা কথা বলতেন, যেন নিজের সাথে অথবা দেয়াল, ফুলদানি বা অয়েল পেইন্টিংয়ের সাথে বেশ জমিয়ে গল্প করছেন। আমি কত দিন গোয়েন্দার মতো ঘাপটি মেরে ওসব কথা শুনেছি। ভারি সব অদ্ভুত অদ্ভুত রহস্যময় কথাবার্তা, কোনো অর্থ উদ্ধার করার কুদরত নেই। একা একা কথা বলতে বলতে চাচা মাঝে মাঝে রেগে যেতেন, হাত থেকে সব কটা সিগ্রেটের প্যাকেট ঝাঁকুনিতে ছুটে যেত এদিক-সেদিক, পরে আবার গলদঘর্ম হয়ে চেয়ার-টেবিল-দেরাজের নিচ থেকে তা খুঁজে নিতেন। লোকজন দেখলেই চাচা আবার নিশ্চুপ-নিঝুম হয়ে যেতেন। কথা বলে বা প্রশ্ন করে কেউ জবাব টবাব তেমন একটা পেত না।

বেশ কয়েকদিন পাহাড়ে কিংবা গোরস্তানে, আরো কোথায় কোথায় যেন গায়েব থেকে চাচা একদিন ভোরবিহানে আমাদের বাড়িতে ফিরে আসেন। বৈঠকখানার বড়সড় কামরাটি ‘আফসোস’ আওয়াজের প্রতিধ্বনিতে গম গম করে ওঠে। সাজিয়া ওই রাতে স্বপ্ন দেখে দারুণ ভয় পেয়েছিল। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে স্বপ্নের কথা বলতে চাইলে আম্মা বলেছিলেন, ‘খোয়াবের কথা রাতে বললে তাছির খারাপ হয়।’ সকালে চাচা ফিরে আসছেন শুনে আলুথালু চুলে সে ছুটে এসে প্রথমেই চাচার কাছে বলল, স্বপ্নে ও ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল, হঠাৎ করে ওর মুখ নাকি ভয়াবহ রকমের বিকৃত হয়ে যায়, নিজের বিকৃত মুখের দিকে তাকিয়ে ভয়ের চাটে ওর রক্ত জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে, গলা দিয়ে কান্না পর্যন্ত বের হচ্ছে না। হঠাৎ করে আয়নায় ওর মুখটা কীভাবে যেন আগের মতো ঠিকঠাক হয়ে গেল, ও ঘুম ভেঙে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। চাচা চোখ বন্ধ করে বললেন ‘ আফসোস…আপসোস খোয়াব’। সাজিয়া খোয়াবের ব্যাখ্যা শোনার জন্য চাচার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, তিনি চোখ খুলে বললেন— বেটি, তোর ফুটফুটে একটি ছেলে হবে, কিন্তু আফসোস..বাচ্চাটি বেশিদিন বাঁচবে না, মা হয়ে তাকে তোর গোর দিতে হবে। সাজিয়া সব শুনে, কেন জানি শরম পেয়ে  চাচার সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

 

দুই.

এখনও আমি মাঝে মাঝে সময় পেলেই এ ঘটনাটার কথা ভাবি। আমার চিন্তার পরতে পরতে কী রকম এক রহস্যময় লতাগুল্ম জড়িয়ে যেতে থাকে। কেমন যেন  বিষণ্ণ লাগে, মেঘ-ভাসা আকাশের মতোই আমার স্মৃতিমালায় পাগলা-চাচার মৌন মুখ নীরবে হাসে। মনে হয়, চাচা এখনো আমার অবচেতনে অজানা এক সমাধিফলকের মতোই রহস্যময় হয়ে আছেন। সংসারে দিনযাপন বলতে যা বোঝায়, তাতে তাঁর কোন আগ্রহ ছিলো না, ভালোবাসতেন তিনি নির্জন প্রান্তরে কিংবা ধানি-জমির আল ধরে হেঁটে যাওয়া। হাঁটতেন হামেশা গন্তব্যহীন, মনে হতো, তিনি যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, যোজন যোজন পথ-প্রান্তর। কৈশোরে পাগলা-চাচার বিষয়-আশয় নিয়ে ভেবে ভেবে আমার ভারি তাজ্জব লাগতো! মনে হতো, জগত-সংসারের প্রচলিত পথের সাথে ওনার কোনো মিল নেই, কেমন যেন রহস্যময় জ্যামিতিক আঁকা বাঁকা রেখাচিত্রের মতোই তাঁর গতি। তিনি কেবলই হেঁটে যেতেন। আমার অভিজ্ঞতার বাইরে, তাঁর পথরেখায় নির্জনতা থৈ থৈ করত।

বাড়িতে সরাফত চাপরাশিকে নিয়ে ভারি মজা হতো। আব্বা বলতেন, সরাফত ওয়ার্ল্ড গেজেট। আমিও ভাবতাম হয়তো-বা তাই। পৃথিবীর তামাম খোঁজখবর, সমস্যা এবং রহস্যের সমাধান সরাফত বুড়োর ঠোঁটে হামেশা মজুদ থাকত।  আমার ভাবনা জগতের যাবতীয় জটিল ব্যাপারে চাপরাশি একটা লামছাম ব্যাখ্যা দিতে পারত। বেশ রস মিশিয়ে বুড়ো মানুষটি লম্বা-চওড়া গল্প করত। আমাকে প্রায়ই বিজ্ঞের মতো দাড়ি দুলিয়ে বলত— নিমাতরা সাবের ওসব মক্কর বুঝবেন না। আমি বুঝতে পারতাম না, সরাফত বুড়ো যা বুঝে, আমি কি তার ছিটেফোঁটাও বুঝতে পারি না। সে বলত, বুঝলেন.. সব মহব্বত। আমার কৌতূহল হাজার ওয়াট বাতির মতো দপ করে জ্বলে ওঠতো। পরে— একটু বড় হয়ে সরাফত বুড়োর কাছে অনেক ইন্টারোগেশন করে জেনেছিলাম, পাগলা-চাচা নাকি তারুণ্যে বছর খানেক শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছিলেন। ওনার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন ভালো লাগত না, পরে লেখাপড়ার ধারকাছ দিয়েও যেতেন না। ওই বয়স থেকেই উনি ছিলেন একটু উদাসীন, অন্য রকম খানিকটা বিষণ্ণ প্রকৃতির। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে কলকাত্তার জাকারিয়া স্ট্রিটে বিরাট এক বাসায় একজন মাত্র ভৃত্য নিয়ে একা একা থাকতেন।

ওনার ক্ষয়িষ্ণু পরিবারে তখন পড়ন্ত অবস্থা। জমিদার পিতার জমি বিক্রিই নিত্যনৈমিত্তিক কাজ এবং প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাচা সংসারের ক্ষতি-বৃদ্ধি কিছুর ধার ধারতেন না। বাড়ির সাথে তাঁর  যোগাযোগ তেমন একটা ছিল না। জাকারিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে দিনকতক বসবাস করে অতঃপর বেরিয়ে পড়তেন, একা একা ভ্রমণে, কোথাও কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, চষে বেড়াতেন তামাম ভারতবর্ষ। তিন-চার মাস পর, সফরাদি শেষ করে কলকাত্তায় ফিরে এসে কয়েক দিন বিশ্রাম নিতেন, গ্রামের বাড়িতে পিতার কাছে টাকা পাঠানোর জন্য চিঠিপত্র লিখতেন, তারপর আবার বেরিয়ে পড়া.. নিরুদ্দেশ যাত্রা। রাজপুতনার ধূসর বালুকামময় মরুভূমি, আসামের গভীর অরণ্য, কাশ্মীরের তুষার নিবিড় নিসর্গ, চাচা যাননি কোথায়? চাচা একবার বেরোলে ফিরে আসতে ওনার কমছে কম তিন-চার কখনো পাঁচ-ছয় মাস লেগে যেত। জাকারিয়া স্ট্রিটের বাসায় ওনার ভৃত্যটা ছিল মহাবজ্জাত। সে নাকি চোর-ডাকাতদের সাথে জড়িত ছিলো। চাচার অবর্তমানে ওই বাড়িতে গভীর রাতে চোরাই মালের ভাগ-বাটায়োরা এবং জুয়া খেলা হতো।

একবার কেন জানি চাচা বিনা নোটিশে সপ্তাহখানেক পরে কলকাত্তায় ফিরে এসেছিলেন। ওনাকে দূর থেকে দেখে চাকরটা হকচাকিয়ে পালিয়ে যায়। তালা খুলে বাড়িতে ঢুকেই চাচার অবাক হওয়ার পালা। ওই হারামিগুলো কোথা থেকে এক মেয়েকে এনে বাড়ির অন্ধকারে বেঁধে রেখেছে। তারপর সরাফত রহস্য করে বলত, মহব্বত, বুঝলেন, দুনিয়াতে সব কিছু মহব্বত..।  চাচা কলেমা পড়ে মেয়েটাকে কোর্ট থেকে রেজিস্ট্রি করে আনলেন। চাচার পিতা তখন হাসপাতালে মরণাপন্ন, কোথায় যেন চাচার পারিবারিকভাবে বিয়েও ঠিক করা হয়েছে। একমাত্র পুত্রের এহেন কার্যকলাপের খবর শোনার দু-এক দিনের ভেতর হার্টফেল হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। দিনকতক পর. — মেয়েটাও কোথায় যেন কার সাথে পালিয়ে যায়। এর পর থেকে চাচাও লাপাত্তা। পার্টিশানের পর কলকাত্তার জাকারিয়া স্ট্রিটের বেওয়ারিশ বাড়ি এনিমি প্রপার্টি না কী যেন ঘোষিত হলো। গ্রামের অবশিষ্ট-যৎসামান্য জমিজমা ওনার সৎ বোনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাধ মামলা কাজিয়ায় তেমন কিছু আর অবশিষ্ট থাকলো না।

অনেক-অনেক দিন পর হঠাৎ করে চাচা আবার কোথা থেকে ফিরে এলেন বারইপুর গ্রামের পারিবারিক বসতবাড়িতে। ততদিনে তাঁদের দু-মহলা বাড়িটি বুনোলতা ও আগাছার স্তূপে  আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দালান ঘরটির দু-তিন দিকের দেয়ালও ভেঙে পড়েছে, কপাট,কাচের জানালা প্রভৃতি চোর-দাউড়রা খুলে নিয়ে গেছে। ঢাউস ঢাউস সাপ অবলীলায় ঘোরাফেরা করছে। তাঁর খেশ-কুটুম আত্মীয়-স্বজন বলতে শুধু আমাদের পরিবার।  চাচা আমাদের বাড়ি এসে থাকতে রাজি হলেন না, কারো সাথে তিনি তেমন একটা কথাটথা বলেন না ,কেউ প্রশ্ন করেও জবাব পায় না। এ মৌন ব্যক্তিত্বের সাথে আচার আচরণ কী রূপ হবে, এসব ভেবে প্রথম প্রথম আমাদের বাড়ির লোকজন বেশ বিব্রত হতো। ভাঙাবাড়িতে চাচা একটা কামরা একটু সাফসুতরা করে বসবাস শুরু করলেন। আমাদের এখানে রোজ আসেন। গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে দেখে, গায়ে জড়ানো অদ্ভুত কম্বলে কাপড়ের আস্তরণ বিশেষ আর অবশিষ্ট নেই, তাতে ফুটে বেরিয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ বিবর্ণ তুলা, তা জড়িয়ে তিনি ভারি অন্যমনস্কভাবে হেঁটে যাচ্ছেন, অনেক দূর কোনো ঝাঁকড়া তালগাছের দিকে, অথবা গভীর অন্ধকারে গোরস্থানের নির্জনতায়।

আস্তে আস্তে চাচার হাঁটাহাঁটি আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াল। চাচা আসলেই সাজিয়া আশপাশে ঘুর ঘুর করত, আমিও একদম ভয় পেতাম না। একা চাচার পেছন পেছন হেঁটে তাঁকে অনুসরণ করে চলে যেতাম ওনার বাড়িতে। উনি কখনো পেছন ফিরে তাকাতেন না, বাড়িতে আমাকে দেখেও অবাক হতেন না। আমি একা একা ঘুরতাম ঝাড়-জঙ্গল পুকুরের শ্যাওলা ধরা ঘাটে। আশ্চর্য সব রঙবেরঙের ফুল এখানে ওখানে ফুটে থাকতো। আমি কখনো অন্য কোথাও এ ধরনের ফুল দেখিনি। এগুলোর চাষ চাচা কখন করতেন? সরাফত চাপরাশি তাজ্জব এক ব্যাখ্যা দিত, তার ধারণা ছিলো, জীন্নে-মোমিন চাচাকে এসব অদ্ভুত ফুলের চারা সাপ্লাই করে। আমার কৌতূহল কমতো না, এক গাদা বিচিত্র ফুল ছিঁড়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম। সাজিয়া দু-তিনটে বোটানির বই পড়েছে। ও বলতো, চাচা ক্রস করিয়ে হরেক রকম কেমিক্যালস দিয়ে হরকিসিম ফুল ফোটাতে পারেন। ঠিক বুঝতে পারতাম না, এসব ক্রস-টস করার সময় চাচা কখন পান।

একদিন তাবৎ রহস্যের সুরাহা করতে আমি চাচার আধ-ভাঙা বাড়িটিতে চলে আসি। ঝোপঝাড় ডিঙ্গিয়ে অবশেষে বুড়ো করবী গাছের নিচে ঘাপটি মেরে বসেছি। ওখান থেকে জানালা দিয়ে চাচার কামরায় বেশ খানিকটা পরিষ্কার দেখা যায়। চুপচাপ বসে বসে, মশার গুঞ্জন শুনতে শুনতে চাচার বিষয় আশয়ের ওপর নজরদারি করেছি। দেখি, চাচা কামরায় পাথরের জলচৌকির ওপর তন্ময় হয়ে বসে আছেন, উনার দু’চোখে ঝরছে কেমন যেন নীলাভ আচ্ছন্নতা। হঠাৎ দেখি, মুখ-চেনা একটি ছেলে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে চাচাকে দেখছে। আমার বয়সী হবে, ওর উঁকি ঝুঁকিতে আমি বিরক্ত হই, সে আমার দিকেও তাকায়, আমি তাকে কী বলবো ঠিক বুঝতে পারি না, সেও চুপচাপ থাকে। ওখানে আমার উপস্থিতিই খানিকটে অনধিকার চর্চা, ওকে কি বলার থাকতে পারে।

এ রকম আরেক দিন আমি চাচাকে পেছন থেকে অনুসরণ করছি। উনি অনেকখানি পথ এগিয়ে গেছেন, আবার ওই ছেলেটাকে দেখি, একদম চাচার গায়ের সাথে সেঁটে গিয়ে হাঁটছে। আমার সহ্য হয় না। কিন্তু তাকে কী বলবো..। ছেলেটা চাচার কম্বলে ছোবল মারার মতো হাত উঠায়, চাচা চমকে পেছন ফিরে তাকে তাড়া লাগান, সে পিছিয়ে পড়ে, আমি থ হয়ে দাঁড়িয়ে যাই, চাচা আবার হাঁটতে শুরু করতেই ছেলেটা বিদ্যুৎ গতিতে ছোবল মেরে এক খাবলা বিবর্ণ তুলা তুলে নিয়ে এলোপাথাড়ি দৌড়ে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে অদৃশ্য হয়। চাচা এবার কিন্তু ফিরেও তাকান না। আমি আকাশপাতাল ভাবি, কিন্তু ঘটনার কোনো সুরাহা করতে পারি না। বাড়িতে এসে সবাইকে যা ঘটেছে বিস্তারিতভাবে বলি, কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। পরদিন সরাফত চাপরাশি নিউজ ভাঙ্গে।  ওই ছেলেটার বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে, একটু পাগলা টাইপের। চাচার কম্বল থেকে তুলা নিয়ে সে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি, ধানক্ষেতের ভেতর মুখে ফেনা তুলে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল । ও নিজে দেখে এসেছে, হাতে পায়ে খিঁচুনি, ঘোলা চোখে ড্যাব ড্যাব তাকিয়ে আছে, মুখে কথা নেই। চাপরাশি বিজ্ঞের মতো দাড়ি দুলিয়ে রায় দেয়— এ ছেলে বাঁচবে না, এর কপালে মৌত লেখা আছে । ছেলেটার মৃত্যুর সম্ভাবনাকে অবাস্তব মনে হয়। সাজিয়া কৌতূহলী হয়ে তাবৎ কিছু ফের শুনে, সব শুনে সে তব্দিলের মতো নিশ্চুপ হয়ে থাকে, কিছু বলে না সেও।

পর দিন বিকেল বেলা আমরা বারান্দায় বসে ভেটের মুড়কি দিয়ে চা খাচ্ছি। ছেলেটার বাপ-মা চাচাকে খুঁজতে খুঁজতে আমাদের বাড়ি এসে হাজির। তিনি নিশ্চুপ বসে ছিলেন বৈঠকখানার জমকালো কুরছিটিতে। তারা  চাচার পা জড়িয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে। চাচা কোনো দিনই কারো সাথে কথাটথা তেমন বলেন না, এদিনও স্রেফ নিশ্চুপ থাকেন। ছেলেটার জ্ঞান নাকি সম্পূর্ণ ফিরেনি,মাঝে-সাজে সে জ্বরে তীব্র ঘোরে আবোল তাবোল বকছে।  দিন কতক পর ফের চাপরাশির বাচনিকে শুনতে পাই, হাসপাতালের বড় ডাক্তার গোটাকতক ইনজেকশন দিয়েছেন, তাতে ছেলেটি আস্তে আস্তে ভালো হয়ে ওঠছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। চাপরাশি অবশ্য মন্তব্য করে—  ডাক্তার ফাক্তার কিছু না, পায়ে ধরে কান্নাকাটি করায়  নিমাতরা সাব তাকে মাফ করে দিয়েছেন। সাজিয়া হাসে, বিজ্ঞের মতো সে বলে—  পুরো ঘটনাটা সাইকোলজিক্যাল। ও সায়েন্স পড়েছে আমার চেয়ে ঢের বেশি, ও ভাবে কথা বলে যত্রতত্র বিজ্ঞান ফলাতে পছন্দ করে। সে ফের বলে, ছেলেটার সাবকনসাসে পীর-ফকিরদের নিয়ে সাংঘাতিক ভয় ছিল, এজন্য হঠাৎ করে নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে। আমি চাপরাশি ও সাজিয়া উভয়ের ব্যাখ্যা ভেবে নিয়ে ভাবি, সরাফত বুড়োর মতো বিশ্বাস অথবা সাজিয়ার মতো বিজ্ঞান কোনটাই আমার চরিত্রে নাই। আমি তাদের কথা মানতে পারি না; কূলকিনারা করতে গিয়ে এলোমেলো ভাবনার ভেতর ঘটনাটা একসময় স্রেফ ভুলে যাই।

 

তিন.

মানুষের গভীর অবচেতনে কখনো পরিচ্ছন্ন ইঙ্গিত ফুটে। মানুষ বুঝতে পারে—  কিছু একটা ঘটবে। সব মানুষের এসব হয় কি না জানি না, তবে কারো কারো হয়। সে সময় মানুষ গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কিছু একটা পরিবর্তনের, আশঙ্কায় চোখ থেকে ঘুম মুছে যায়। আমার মনে কী রকম শঙ্কা হচ্ছিল,  মনে হতো কিছু একটা ঘটবে, উৎকণ্ঠায় সারাদিন বুক টিপটপ করত। কিছু ভালো লাগত না। দিনে ঘুমানোর অভ্যাস কখনো ছিল না, এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আচমকা ঘুম ভাঙে, কী যেন স্বপ্ন দেখছিলাম। কিছু কিছু স্বপ্ন ঘুম ভাঙলে মানুষ হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না, আমি তন্ময় হয়ে স্বপ্নে ফিরে যেতে চাই। চাচার আধ-ভাঙা বাড়িটির আঙিনায় ফুটে থাকা রঙবেরঙের ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে, মশার গুনগুন গুঞ্জন, এসব ঘ্রাণ ও শব্দ এত দূর আসে কিভাবে, কী রকম ভয়ে বুক ধক ধক করছে। বিছানা ছেড়ে উঠতেই দেখি,  চাপরাশি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে বেরিয়ে পড়ছে। চাচা বেশ কয়েক দিন হলো আমাদের এখানে আসেননি। চাচা না আসলে, সরাফত বুড়ো মাঝে মাঝে টিফিন ক্যারিয়ারে করে ওনার বাড়িতে খানা পৌঁছে দিত। কী ভেবে আজ আমি তার সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করি। মেঘ-মলিন আকাশের মতো কেন জানি মন খারাপ হয়ে ওঠছে। সম্পূর্ণ এক অচেনা অনুভূতি, চাপরাশি সঙ্গে না থাকলে হয়তো কেঁদেই ফেলতাম।

কোন ক্রমে অতঃপর আমরা চাচার বাড়িতে এসে পৌঁছি, ঝোপে-ঝাড়ে ঝাঁক ঝাঁক মশা গুঞ্জন করছে, উঠানে ভাসছে অজানা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। সরাফত বুড়ো কামরার ভেতর ঢুকে পড়েছে, আমি দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে, আবছাভাবে সফেদ সুজনিতে আপাদমস্তক ঢাকা দেখে চমকে ওঠি! বিষয়টা পুরো বুঝতে না পেরে আমিও তাড়াতাড়ি কামরার ভেতরে ঢুকি, চাপরাশি জোরে জোরে ইন্নালিল্লা পড়ছে। থতমত খেয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। মিনিট দুয়েক কোনো শব্দই আমার মাথায় ঢুকে না। আমার একদম বিশ্বাস হচ্ছে না, জিজ্ঞেস করি, চাচা কি মারা গেছেন? চাপরাশি কাঁদে, কাঁদতে কাঁদতে বলে — উনি জিন্দালাশ, মরতে পারেন না, নিমাতরা সাব আউড়ি দিয়ে দিয়ে চলে গেছেন পর্দার আড়ালে।

আমি চাচার কামরা থেকে বেরিয়ে করবী ঝোপটার কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়াই। দেখতে দেখতে পাড়া-প্রতিবেশী লোকজন এসে জড়ো হয়। চাচার আত্মীয়স্বজন নাই নাই করেও আধ ঘণ্টার ভেতর বেশ কত জন মেয়ে-পুরুষ এসে কান্নাকাটি শুরু করে। আব্বাও এসে পৌঁছেন, তিনি জেদ্দা থেকে কিনে আনা বিরাট এক এহরামের সফেদ চাদরে লাশ ঢেকে দিয়ে আবে জমজম ছিটিয়ে  দেন। আমি কবরী ঝোপের নিচে ফের এসে দাঁড়াই। স্লো মোশন পিকচারের মতো দেখতে থাকি,লোকজনের তোড়জোড় ও কান্নাকাটি, লাশের গোসলের জন্য পানি আনা, কাফন দাফনের জোগাড়-যন্ত্র চলছে। ওই ছেলেটাও  দেখি বারান্দার এক কোণে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক দিন হলো তাকে দেখিনি,চাচার কম্বল থেকে ছোবল দিয়ে তুলা নেওয়ার পর এই প্রথম দেখলাম। আমি বারবার ছেলেটার দিকে তাকাচ্ছি, ও নিষ্পলকভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে ভাবের লেশমাত্র হেরফের নেই। ছেলেটাকে দেখে আর খারাপ লাগে না, আমি তার চোখের দিকে তাকাই, সত্যিই ভারি অন্য রকমের চোখ, আমি তো ও সব বুঝতে পারি না। চাচা বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন, ওর চোখ জোড়া ইমাজিনিটিভ না মিস্টিক।

এরপর থেকে ছেলেটাকে আমি মাঝেমধ্যে এখানে ওখানে দেখতাম। চাপরাশির মুখে একদিন শুনলাম—  ও নাকি প্রায় পাগলই হয়ে গিয়েছে। পীরের মোকামে সারাদিন বসে থাকে, কবরের নির্জনতায় রাত কাটায়। শুনে অবাক হতাম, পীরের মোকামের কথায় কৌতূহল বেড়ে যেত। পীরের মোকামের রহস্যময় ইতিহাস আছে, ভীষণ গরম মাজার। বেয়াদবির ভয়ে লোকজন বড় একটা ওই মাজারের পাশ দিয়ে যায় না। প্রায় বছর পঞ্চাশেক আগে পুকুর কাটতে গিয়ে লোকজন মাটির গভীরে এক তাজা লাশের সন্ধান পায়। আশ্চর্য ব্যাপার, মাটির এত গভীরে লাশের চামড়ায় কোথাও কোনো পচনের কোন চিহ্ন নেই! ধর্মপ্রাণ মানুষ জানাজা পড়ে লাশের নতুন কবর দেয়। রাতে গ্রামের অনেকেই ইঙ্গিতপূর্ণ স্বপ্ন দেখে, এরপর তৈরি হয় ‘পীরের মোকাম’, গাঁওগেরামের মানুষ ওখানে মানত করে। আমি একবার মোকাম জিয়ারত করতে গিয়ে ছেলেটাকে ফের দেখতে পাই। মাজারের আঙিনায় তন্ময় হয়ে বসে আছে, তার দু’চোখ থেকে যেন ছিটকে বেরুচ্ছে দ্যুতি । সমাজে একধরনের লোক আছে যারা কবর, মাজার, গভীর বনে জীবনযাপন করতে ভালোবাসে। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রহস্যময়তার সাথে গড়ে ওঠে ওদের গভীর লেনদেন, সে হয়তো মানবজীবনের অন্য এক রূপ, এ সব আমি ঠিক জানি না।

একদিন  রাতের বেলা কেন জানি ছেলেটার বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম, ঘুম আসছিল না, বইটই পড়তেও ভালো লাগছে না। উঠে গিয়ে কী ভেবে বৈঠকখানার জমকালো কুরছিটায় বসি। করোটিতে ওই ছেলেটার ঘটনা ঘুরতে থাকে। চান্দির চেরাগদানিতে কাঁপছে শিখা, তার আলোয় আলোয় হাজার দুয়ারী প্যালেসের ফটোগ্রাফটা আবছা হয়ে আছে। আমি  পিকচার ফ্রেমের দিকে চুপচাপ  তাকাই। মুর্শিদাবাদের নবাব হুমায়ুন ঝাঁ’র নির্মিত ঐতিহাসিক প্রাসাদ, তার সিঁড়িতে আব্বা ও চাচা দুজনেই দাঁড়িয়ে আছেন, ওদের তরুণ বয়সের ছবি, পার্টিশনের  কয়েক বছর আগে তোলা। হঠাৎ করে ছবির ফ্রেম আলো-আঁধারিতে দুলে ওঠে। তাজ্জব হয়ে চাচাকে যেন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি! তিনি হাঁটতে শুরু করেন, বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে তিনি খুব দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন, আমি পেছন পেছন রওয়ানা হই। তাঁর হাঁটার বেগ বাড়ে, তিনি রীতিমতো ছুটছেন পাহাড়ের দিকে। আমি দৌড়াতে শুরু করি। চাচা বিক্ষিপ্তভাবে এলোমেলো পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন…. আর কোথা থেকে যেন ভুঁই ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ছেলেটা। সে দনকলসের ঝোপঝাড় মাড়িয়ে, প্যান্টের পায়ায় শিশিরে ভেজা চোরকাঁটা বিঁধিয়ে চাচাকে অনুসরণ করছে। চাচাকে সে প্রায় ধরেই ফেলে, হাত বাঁড়িয়ে তাঁর কম্বল থেকে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে একগুচ্ছ আধ-ময়লা তুলা। কিন্তু সে চাচাকে বারবার চেষ্টা করেও স্পর্শ করতে পারে না। তিনি নির্লিপ্তভাবে হেঁটে যান তার নাগালের বাইরে।  পেছনে থেকে ছেলেটি তাঁকে অনুনয় করে কিছু বলে….। কিন্তু দেখতে দেখতে চাচা দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যান।

 

ছেলেটি এখন আর তাঁকে অনুসরণ করছে না। কিন্তু ক্রমাগত কাকুতি-মিনতি করে যাচ্ছে। ঠিক বুঝতে পারি না—  সে দাঁড়িয়ে পড়লো কেন। দেখতে দেখতে তার শরীর যেন যেন নরোম জমিতে দেবে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য! এ ধানিজমিতে চোরাবালি থাকার তো কথা না। দ্রুত তার কোমর অব্দি মাটিয়ে সেঁদিয়ে যায়, সে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে পুঁতে যাচ্ছে মাটিতে। আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু আমার পা-ও সামনে বাড়ে না। নড়াচড়ার সব ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। পায়ের নিচ থেকে যেন শিকড় বেরিয়ে তা গেঁথে গেছে মাটির গভীরে। কিন্তু, এ কী! আমার হাতে? আচমকা অবাক হওয়ারও একটা সীমা ক্রস করলে বোধ হয় মানুষ অবাকও হতে পারে না। বরং নির্বাক হয়ে যায়। আমার দুহাতে মানুষের কাটা দুটো পা ঝুলছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোথায় যেন একঝাঁক শিয়াল প্রাণপণে কেঁদে ওঠলো। আমার বুক খালি করে হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন। চাচা ঘোলাটে দৃষ্টির মতো হারিয়ে যাচ্ছেন দিগন্তে। সাঁঝের স্লান আভায় আকাশছোঁয়া বনভূমির ওপর ফুটে আছে আশ্চর্য নক্ষত্র ‘সোহাইল’। ঘেমে-নেয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। পুরানো দিনের যে  জমকালো কুরছিতে হামেশা চাচা বসতেন, ওখানে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চাচা মারা যাওয়ার পর আজকাল কেউ আর ওই কুরছিতে বসে না, আমি কেন যে বসতে গেলাম। সারা রাত অনেক করে চেষ্টা করি, স্বপ্নের স্মৃতিটুকু মুছে ফেলতে।

দিনের বেলা আমাকে রেলওয়ে স্টেশনে যেতে হয়। চাচি-আম্মা বাপের বাড়ি নাইওর গিয়েছিলেন, তিনি ট্রেনে বাড়ি ফিরে আসছেন। তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনতে স্টেশনে এসেছি। পালকি উঠে যাওয়ার পর আজকাল আমাদের বাড়িতে পর্দার বিচিত্র এক রেওয়াজ চালু হয়েছে। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে থামে। আমাদের বাড়ির প্রাইভেট রিকশার হুডে কাপড় পেঁচিয়ে নিয়ে পর্দার ঘেরাটোপ তৈরি করা হয়েছে।  সরাফত চাপরাশি ও রিকশাওয়ালা আরো দুজনের সহায়তায় চ্যাংদোলা করে রিকশাটিকে প্ল্যাটফর্মে উঠিয়ে ট্রেনের নির্দিষ্ট কামরার সামনে দাঁড় করায়। আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢেকে চাচি-আম্মা রিকশায় উঠে চলে যান পর্দার অন্তরালে । ঘণ্টা বাজিয়ে প্রলম্বিত ভেঁপুর আওয়াজে ট্রেন ছেড়ে দেয়। ফের একই পদ্ধতিতে রিকশাটিকে চ্যাংদোলা করে প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচের রাস্তার নামানো হচ্ছে, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তদারক করছি। হঠাৎ করে কেন জানি ট্রেনটি থেমে যায়। মানুষজন হইচই করে ইঞ্জিনের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। অ্যাকসিডেন্ট হয়তো, আমিও ইঞ্জিনের দিকে ছুটে যাই। সংকীর্ণ রেললাইনের পাশে বৃত্তাকারে অনেক লোকের ভিড় জমে গেছে, অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে উঁকি দেই; ওই ছেলেটার রক্তাক্ত শরীর চাকায় কাটা পড়ে লুটিয়ে আছে, মনে হয় এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু তার মুখে এক ফোঁটা চিৎকার নেই।

ঠিক জানি না আমি অবাক হয়েছিলাম কি-না? লোকজনের ভিড়ের চাপে পেছনে ছিটকে পড়ি। চাকায় লেগে আছে ওর রক্তাক্ত মাংস । ট্রেনের ওপাশ থেকে একটা লোক হেঁটে আসে, তার হাতে অবিকল কাল রাতে দেখা স্বপ্নের মতো একজোড়া মানুষের পা ঝুলছে, ঝরছে টুপটাপ রক্ত!! আমার মধ্যে কী যেন হয়ে যায়। এ রক্তাক্ত দৃশ্যের সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। ফিরে আসি প্ল্যাটফর্মে। সরাফত চাপরাশির তত্ত্বাবধানে চাচী-আম্মাকে নিয়ে রিক্সাটি চলে গেছে। তো আমি ধানি জমিনের আল ধরে হাঁটতে শুরু করি।

বেলা পড়ে আসে, মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে এলোপাথাড়ি হাঁটছি। দিগন্তে ষাঁড়ের-গজ পাহাড়ের সবুজাভ রেখা স্পষ্ট হয়ে আসে।  রোদ নিভে গেছে, তবে আকাশের ঝাঁক ঝাঁক মেঘে একপশলা লালচে সৌরকণা যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। কেন জানি সারা শরীর কেঁপে ওঠে। মনে হয় বুকের পাঞ্জর ভেঙ্গে-চুরে চলে যাচ্ছে রেলগাড়ির ইঞ্জিনটি।  কাঁপন থামতে চায় না, তা দেহমনে ধারণ করে ফের হাঁটি দিগন্তের দিকে। চাচাতো এ পথ ধরে হেঁটে যেতেন বনভূমিতে।  আলো ফুরিয়ে আসে। আঁধার এখনো জমে ওঠেনি। আমি ঘাড় বাঁকিয়ে আকাশে তাকাই। মেঘের পরিচ্ছন্ন জমিতে ফুটে ওঠেছে আশ্চর্যে এক নক্ষত্র। আমি বেশ কিছু দিন পর ফের ‘সোহাইল’ নক্ষত্রটিকে দেখতে পাই।

 

মঈনুস সুলতান

জন্ম সিলেট জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে ডক্টরেট করেন। বছর পাঁচেক কাজ করেন লাওসে-একটি উন্নয়ন সংস্থার কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে।

খণ্ড-কালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেস এর। কনসালটেন্ট হিসাবে জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক, মেসিডোনিয়া ও কিরগিজস্তান প্রভৃতি দেশে কাজ করেন অনেক বছর।

ইবোলা সংকটের সময় লেখক ডেমোক্রেসি এন্ড হিউম্যান রাইটস নামে একটি ফান্ডিং কর্মসূচির সমন্বয়কারী হিসাবে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা শহরে বাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরানো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।