ফিরোজ এহতেশামের পাঁচটি কবিতা

ঘাতকের মতো একা

সামনেই দেখি কুয়াশা-মাখানো নদী
নদীর ওপারে ঝাপসা মফস্বল
অতীতের ঢেউ বর্তমানের তীরে এসে বাড়ি খায়
তটে ডিঙিগুলো তটস্থ হয়ে করতেছে টলমল।

এরই মাঝে দূরে হঠাৎ তোমাকে জাহাজের মতো লাগে
থেকে থেকে আমি অস্থির হয়ে পড়ি,
নবতরঙ্গে নতুন প্রেরণা জাগে।

মাথার ওপরে উপগ্রহের আলো
খণ্ডকালীন মেঘ ভেসে গেল ভবিষ্যতের দিকে-
বিদ্যুৎ চমকালো।

এদিকে আমার বালুতে ডোবানো পা
হাত নাড়ি তবু তীব্র ইশারা গ্রাহ্যই করো না।
দূরে দূরে শুধু ঘোলা আলো জ্বেলে ঘোরো
চকিত গুপ্ত ঘাতকের মতো একা
কুয়াশা-মর্মে তোমাকে কখনও মৃদু মৃদু দেখা যায়
কখনও যায় না দেখা।

স্রোতের তলায় চোরাস্রোত আর ডুবো-পাহাড়ের চূড়া
জেগে ওঠে দ্রুত, জেগে ওঠে তোলপাড়

বালুকাবেলায় চিকচিক করে জ্বলে
জ্বলজ্বলে আর বিস্মৃত হাহাকার।

 

কত শব্দ

সর্বস্ব লুটে নিয়ে কত শব্দ নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করে।
আহা! কত শব্দ সমর্পিত হয়ে বলেছিল, ‘মরে যাব’।
কত শব্দ বসেছিল মনমরা হয়ে, কোনো শোকসভা থেকে যেন
গোপনে কেটে পড়েছে তার প্রিয়তম শব্দটি তো আর ফেরে নাই।
শোনো, ঐ চিৎকার করে উঠছে আতঙ্কে কত শব্দ
টুকরা টুকরা হয়ে গেল বোমার আঘাতে।
আর সেগুলো কুড়ায়ে নিতে গিয়ে বুম, ব্লাস্ট-
কত শব্দ বিস্ময়ে জব্দ হয়ে ঢুকে পড়ল গুহার ভিতর
বেড়ে উঠছে গোপনে গোপনে কত শব্দ
‘ভাণ্ডার’ খুলে ফিসফিস করে দেখিয়েছিল তার বিস্ফোরকগুলো।
কত শব্দ খোলেনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বন্ধ দরজাটা
আর তাতে পিঠ ঠেকিয়ে ভিতরে ভিতরে কত শব্দ নিঃশব্দে কেঁদেছিল
কত শব্দ হদিসও রাখেনি তার, দ্যাখো
পঁচে যাচ্ছে ব্যবহৃত হতে হতে কত শব্দ
রিকশা পাচ্ছে না শেষ রাতে।
আলোতে মুখটা তোলে নাই কত শব্দ ব্রিজের নিচে
বাচ্চাটাকে রেখে পালিয়েছে।
শূন্যে, দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
কত শব্দ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে মানসিকভাবে।
‘ভাইয়া বাড়িতে নাই’ বলে অকারণে দাঁড়িয়েছিল লাবণ্যময় কত শব্দ
চোখ বুজে বলেছিল ‘আর না, ছিঃ’
কত শব্দ ‘লাশ ফেলে দিব’ শুনে কার না
ভয়ে ভয়ে মনে হয় কোনো শব্দ বৃথা যায় নাই।
ঐ কত শব্দ সম্ভাবনাময়, ঘাড় কাত করে তাকাল এইমাত্র হায়
তাতেই কত শব্দ নিমিষেই কাত হয়ে গেল।

কত শব্দ অলংকার খুলে রেখেছিল কত যত্ন করে
আর তার অর্থ কত শব্দ বুঝতে পেরেছে এই এত দিন পরে…

 

ভোর হচ্ছে

শোন পূর্ব, তোমার কি যথাযোগ্যভাবে মনে পড়ে-
চিকচিক করছে ‘শো-রুম’ আর তার মধ্যে বসে আছে ‘গোলাম কিরণ’?
যে-কোন সাক্ষাতে যে বলে ওঠে-
‘ওঃ উস্তাদ, হলো কতদিন ধরে দেখা!’
অগত্যা আমাকে গরগর করে বলে যেতে হবে
‘প্রতিটি বাড়িতে কিন্তু ঠিকমতো আলো পৌঁছোচ্ছে না দিনমণি।
ছোটকালে অন্য একটা বাড়িতে থাকতাম
তাই আমাদের কোনো চাকরি হলো না।
মাতাল ছেলেরা এসে আমার ঘরের মধ্যে ভাত-গম খেতো
বুঝতে পেরেছি যতদূর,
ততদূর তাদের নাটক আর নাট্যশালা ছিল একটাই।
তবু চরিত্র সংকট,
তবু আলোর অভাবে সেই নাটক হলো না কোনোদিন।

 

সমর্থন

এ-বস্ত্র উড়িয়ে দিই বিতর্কিত বায়ুর প্রচারে
আর তুমি, রাষ্ট্রে, বুকে মুহুর্মুহু করেছো ব্যাঘাত
অথবা প্রকাশ্য সবই, সূর্য-সম্পাদিত আলো
মেঘে মেঘে নিযুক্ত হবার কালে আরও কত দূরের প্রসঙ্গে
পাঠিয়ে দিলাম সেই হাওয়া তোমার স্বীকৃতি পেয়ে
তোমারই অজ্ঞাত কোনো দেহে এসে বিজড়িত হয়।
উঁচুতে উঁচুতে তাই আলোড়ন ভুলে যাওয়া
স্তম্ভিত চিলের সব প্রাসঙ্গিক ডানা
আর আমার অসহযোগিনীর মুখে অবিন্যস্ত রহস্যে বিবৃত চুলগুলো
আজও কেন সমর্থন করি?

 

মর্মাহত প্রবালের পাশে

একদা তো ব্যক্তিগত প্রাণ ছিল, হায়
প্রিয় ঢেউ লেগে চলে গেছে সেই প্রাণে
ফেরে নাই কখনও সে। তারই অপক্ষোয়
পাথর হয়েছে কেন প্রবালেরা জানে

তীরে এসে দাঁড়িয়েছ নিজস্ব ভঙ্গিতে
রাতের হৃদয় কাঁপে তরঙ্গের তালে
বেজে ওঠে পূর্ণিমায় বিরহ সংগীতে
সেই প্রেম অস্মীভূত প্রবালে প্রবালে

ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়ে আরও আঁকড়ে ধরে
আজও কেন দ্বিধান্বিত সমুদ্র-সকাশে?
কত অশ্রু জমা রেখে বুকের ভিতরে
উথলে ওঠো মর্মাহত প্রবালের পাশে?

তোমাকে বিদীর্ণ করে ফুটে ওঠা ফুল
ধারণ করেছে কোনো পাথরের গান
স্মৃতিকে উসকে দিতে হাওয়া অনুকূল
এখনও কি জেগে আছি, তোমাতে অম্লান?

 

ফিরোজ এহতেশাম

জন্ম ২৪ মে ১৯৭৭। বেড়ে ওঠা রংপুরে। পড়াশুনা করেছেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। ১৯৯৪ সাল থেকে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। কবিতা, গল্প, মঞ্চ নাটক, প্রবন্ধ, ছড়াসহ নানান শাখায় তিনি লেখালেখি করেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১টি-অস্ত্রে মাখিয়ে রাখো মধু (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি ২০১০)। বাউল সাধকদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সাধুকথা’। সহ-সম্পাদক হিসেবে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছেন।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।