সেলিম জাহান: কোভিড-অনুবর্তী পৃথিবী

বর্তমান সময়ের সঙ্কট, ব্যাপ্তি, সময় রেখা দেখে আমার মনে হচ্ছে, বিশ্বে এক ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ আবির্ভূত হচ্ছে অন্তত: মধ্য মেয়াদে। এ নতুন স্বাভাবিকতা প্রভাব ফেলবে ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও। এর ফলে মানুষের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গী, ব্যবহার যেমন বদলাবে, তেমনি বদলাবে মানুষের চারপাশ, পারিপার্শ্বিকতা।

এখন রাস্তায় বেরুলে তিনটে বিষয় বড় চোখে পড়ে। এক, সামাজিক জনদূরত্ব বজায়ের জন্যে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, দুই, হাতে দস্তানা ও মুখে মুখাবরনী পরিধান, এবং তিন, ন্যূনতম সময়ে অপরিহার্য কাজগুলো শেষ করা। এ সবগুলো মিলিয়ে আগামীতে হয়তো নিম্নোক্ত বিষয়গুলোই মানুষের কাছে নতুনভাবে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

মানুষ হয়তো স্বতস্ফূর্তভাবেই একে অন্যকে এড়িয়ে চলবে। নৈকট্য নয়, দূরত্বই মানুষের কাছে স্বাভাবিক মনে হবে। মানুষের সঙ্গ হয়তো তখন বিরল ঘটনা হয়ে যাবে। মানুষ মানুষকে সম্ভাষনের জন্যে করমর্দন, চুম্বন, স্পর্শ এড়িয়ে যাবে। তার বদলে জায়গা করে নেবে মৌখিক প্রীতি সম্ভাষণ, হস্ত উত্তোলন, হস্তদ্য় একত্র করে শ্রদ্ধা জানানো। সদা সতর্ক থাকবো যাতে কিছুতে হাত না লাগে, কিছু না ছুঁই, কোন কিছু না শুঁকি। ফুলের গন্ধ নেবো না, কচি কিশলয় ছুঁয়ে দেখবো না তার নরমত্ব, কাঠের মসৃণতা  উপভোগ করা? নবৈ নবৈ চ:।

মন খারাপ করে, তবু আমার কেন জানি মনে হয়, মানুষে মানুষে সন্দেহ, নির্লিপ্ততা, বেড়ে যাবে। পথে-ঘাটে চেনা-পরিচিতদের দেখলে আমরা আগের মতো এগিয়ে যাবো না, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সামাজিকতা বজায় রাখবো। যে কোন জায়গায় দাঁড়ালেই চোখ রাখবো কেউ কাছে চলে এলো কিনা। সরে সরে যাবো ক্রমাগত এক্কা দোক্কা খেলার মতো। কেউ ১০ ফুট দূরে স্বাভাবিক হাঁচি বা কাশি দিলেও সচকিত হয়ে যাবো। হাত নিজের অজান্তেই চলে যাবে পকেটে বা ব্যাগে পরিস্কারক বার করার জন্যে।

এখন আমরা বাইরে বেরুলে দেখে নেই চাবি, চশমা, মুঠোফোন সঙ্গে আছে কি না। ভবিষ্যতে দেখে নেবো পরিস্কারক, মুখাবরনী এবং দস্তানা আছে কি না সঙ্গে। আজকাল মুঠোখফোন বাড়ীতে ফেলে গেলে যে রকম অসহায় বোধ করি, আগামীতে পরিস্কারক, মুখাবরনী আর দস্তানা ফেলে গেলে তেমনই বোধ হবে। হাত হয়ে উঠবে আমাদের সবচেয়ে সুযত্ন সংরক্ষিত অঙ্গ এবং হাত ও মুখের বিচ্ছেদের জন্যে আমাদের বর্তমান সচেষ্ট থাকার প্রয়াস তখন রুপান্তরিত হবে স্বাভাবিক অভ্যাসে।

মানুষর চারপাশ আর পারিপার্শ্বিকতায় বহু পরিবর্তন নতুন স্বাভাবিকতার অঙ্গ হয়ে দাঁড়াবে। মানুষে মানুষে বন্ধনে ভিত্ করে নেবে তথ্য প্রযুক্তি আরো জোরে শোরে। মুঠোফোনের বর্ধিত ও সম্প্রসারিত ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আরো গেড়ে বসবে। পারস্পরিক সংবাদ আদান-প্রদান ও কুশল বিনিময় সবটাই হয়তে হবে ঐ মুঠোফোনে। চারপাশের তথ্য ও খবরাখবর পাওয়া, ছবি বিনিময় ইত্যাদির জন্যে আমরা বিরাটভাবে নির্ভর করবো সামাজিক মাধ্যমের ওপরে। জ্ঞান আহরন, যৌথ কর্মকান্ডের জন্যেও এগুলোই হবে আমাদের প্রধান বাহন।

বহু প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের জন্যেও আমরা মানুষের শারীরিক উপস্হিতি এড়িয়ে চলবো, সেগুলো হয়তে সম্পন্ন করা হবে সামাজিক মাধ্যমসমূহ ব্যবহার করে। এই যেমন, জন্মদিন পালন, বিবাহ, বিভিন্ন দিন উদযাপন। লোক উপস্হিতির পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এ গুলো সম্পন্ন করতে অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি বোধ করবে লোকজন। প্রাতিষ্ঠানিরক কর্মকান্ডের ব্যপারেও সেই একই কথা। বাজার হাট বলে বহু স্হানগত প্রতিষ্ঠান হয়তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তার জায়গায় আরো বেশী করে স্হান করে নেবে সামাজিক মাধ্যম-নির্ভর ক্রয়-বিক্রয়।

উপর্যুক্ত একটি চালচিত্র কি সত্যিই হতে পারে, না কি তা আমার উর্বর চিন্তার ফসল? ৯/১১ এর পরে বিমানবন্দরের সব রকমের কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশী এখন আমাদের জন্যে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরা স্বাভাবিক ভাবে জুতো জোড়া খুলে ফেলি, মুঠোফোন বার করে নেই, প্রক্ষালন ও রূপচর্চার নির্দ্দিষ্ট আকারের জিনিসপত্র ছোট থলেতে ভরে নেই। ২০০১ এর আগে এগুলো কিছুই ছিল না। কিন্তু এখন এটাই স্বাভাবিক, এবং আমরা তা মেনে নিয়েছি।

মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রীতির, প্রেমের আদরের, সোহাগের যে সব প্রক্রিয়া আমরা অহরহ ব্যবহার করি, তা’কি আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাবে? আমরা কি আর করমর্দন করবো না সুহৃদের সঙ্গে, বুকে জড়িয়ে ধরবো না প্রিয়জনকে? বয়োজৈষ্ঠ্য কি আর স্নেহের হাত রাখবে না বয়োকণিষ্ঠ্যের মাথায় ? প্রেমিক প্রেমিকা আর চুম্বনে আবদ্ধ হবেন না? হয়তো এ সবই একদিন গল্প-গাথায় পরিণত হবে। হয়তো এ প্রজন্ম কোন একদিন গল্প করবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে, ‘জানো, আমরা না….’? হয়তো!

 

সেলিম জাহান

ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।