কনকলতা কথকতা: খাতুনে জান্নাত

ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সিলেটমুখী রেলগাড়িতে উঠছে একটি পরিবার। বিশাল সদস্য বহর। দুটো ট্রাঙ্ক, চারটে ব্যাগ, দুটো বস্তা দুজন কুলিসহ সদস্য এগার। ঢাকা থেকে ‘সিলেট এক্সপ্রেস’ আসতেই হুড়াহুড়ি করে পিতার দু-হাতে দুই ছেলে। মায়ের জড়ানো এক হাতের কোলে ছয় মাসের ফুটফুটে ছোট ছেলেটি বড় বড় চোখ ও হরিণের চাঞ্চল্যে সামনে পেছনে তাকাচ্ছে। আরেক হাতে প্লাস্টিকের কচুয়া রঙের একটি ঝুড়ি। দুটো কিশোরী বেনীতে ফিতার আকাশি-গোলাপী ফুল বেঁধে ফ্রক পরা; তাদের নিজেদের হাতে নিজেদের ব্যাগ। কুটকুট ছোট ছোট অক্ষরে কথা বলছে, হাঁটছে আনমনে লবঙ্গ লতিকা। কোঁকড়ানো চুলের বাড়ির বড় ছেলেটির হাতে পেটমোটা একটি ব্যাগ। ব্যাগের ধরার বেল্টদুটো পাকানো দড়ির মতো যেকোনো সময়ই ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। তার পাশাপাশি-পেছনে নিকনো উঠোনের মতো ধবধবে সাদা পূর্ণাঙ্গ একটি মেয়ে। তার শরীর থেকে এ মেঘলা দিনেও ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে দুপুরের আলো।
কোঁকড়ানো চুলের বড় ছেলেটি মোটা কালোফ্রেম চশমার কাচে দেখছে ত্রিশ ডিগ্রি কৌণিক কোণে, মেয়েটির পরনে নৌকা ও নদী আঁকা প্রিন্টের শাড়ি। ব্লাউজের খোলা গলা আর হাঁটার কারণে উঁচু বুকের উঠানামা শুনছে খরগোস কান খাড়া করে। দামী একটি লাগেজের চাকা গটগট গটগট শব্দ করে মাঝারি হিলের একজোড়া করে ছুটন্ত মানুষদেরও খানিক থমকে দিতে থাকে মেয়েটি, চমকে দিতে থাকে চকচকে রূপ লাবণ্যে। মেয়েটি কাজলটানা চোখ তুলে আকাশ দেখে আর আড়চোখে ছেলেটার বাবার দিকে চায়। বাবা দু কদম পেছনে এসে জানতে চাচ্ছে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা। তার দু হাতে ৮ ও ১০ বছরের দুটো ছেলে ধরা তখনো। মেয়েটি শুধু মাথা নাড়ে। মাথা নাড়ার সাথে সাথে দুটো ঝুলন্ত কালো পাথরের কানের দুল ঝলকে উঠে। হিরামতি হিরামতি ও হিরামতি’ শিং মাছের খলবল হওয়া মনে মনে গায় রবি, কোঁকড়ানো চুলো। মেঘলা মেঘলা আকাশ ট্রেনের হুইসেল টেনে নিচ্ছে পিঁপড়ের দলের মতো মানুষের এলোমেলো সারি।
বয়স প্রায় আঠার ঊনিশের এ মেয়েটি রবিদের ফেঞ্চুগঞ্জের পড়শী। তাদের পাশের বাসায় ভাড়া থাকে মা-বাবা দুই ভাইবোনের সাথে। তার নাম কনকলতা। কনকলতা গাল কাত করে আকাশের দিকে চায়। সে এ বিশাল পরিবারটির সাথে এসেছে কেননা সে তাদের পূব-পাশের গ্রাম শ্রীমনে যাবে। সেখানে তাদের বাড়ি। আর যাদের সাথে সে এসেছে তাদের গ্রামের নাম কাশফুল। দুটো গ্রামও পাশাপাশি। বাবার কথোপকথনের ফাঁকে কনকলতার হাঁটার ভঙ্গী দেখে দেখে ছেলেটি এক ফাঁকে তার পেছনে চলে আসে। একে নিয়ে একাকী কত মধুরাত যাপন করেছে, দৃশ্যে দৃশ্যে সাজিয়ে নিয়েছে চিত্রকথা। লাগেজ টানা ও হাঁটার কারণে কোমরের অনেকটাই  অনাবৃত। এবার পেছন থেকে কোমরের বাঁকানো দৃশ্যে তার মাথায় আগুন ধরার জোগাড়; কেননা সে প্রথম থেকেই আগুন সাথে নিয়ে চলছে। বেবিটেক্সিতে কোন কারণে মেয়েটি তার পাশেই বসেছিল। সে থেকেই তার মাথায় কনকলতা… কনক… কনক…সে ভুলে যাচ্ছে কনক প্রবাসী কারো স্ত্রী! স্বামী বছর-দুয়েকের মধ্যে দেশে আসছে স্ত্রী লন্ডনে নিয়ে যাবে বলে। মহিলা নয়, কারো গৃহিণী নয় রবির চোখে শুধু কনক। ‘শোন কনক দু বছর দশ বছর হয়ে যাবে। তোমার গলায় বৃটিশ করার রহস্যের রশি ঝুলিয়ে দাসী বানিয়ে রাখবে। যেও না ঐ পুরুষের সাথে। নিও না ঐ পুরুষকে সাথে। ফিরে এসো এ হাতের ছায়ায়। ফিরে এসো অলিন্দে আমার।” মনে মনে কবি জীবনানন্দে বসিয়ে দিচ্ছে রবি সমাহার।”
দেখতে দেখতে সবাই লাল কাঁকড়া সিলেট এক্সপ্রেসের ভেতর ঢুকে পড়ে একে একে। হাতে ধরা টিকেট নিয়ে এক বগি থেকে আরো দুটো বগি পার হয়ে তারা মোটামুটি সিট পায়। মানুষ নয় যেন কোরবানির হাঁটে নিয়ে যাচ্ছে ট্রাকভর্তী গরু। হাতের কনুই দিয়ে গুতো দিচ্ছে।  একজন আরেকজনকে ধরে চেইনের মতো বানিয়ে দুই হাতে ঠেলেঠুলে একে ওকে গুতো ধাক্কা দিয়ে শেষমেশ যে দুটো সিট খালি ছিল একটিতে কনকলতা বসে । আর ঝাঁকড়া চুলের রবি দাঁড়িয়ে কী ভাবতে থাকে নিজেই ভেবে পায় না! বাবার এক ধমকে সে কনকলতার পাশে বসে পড়ে। তখন আকাশ তার কালো বেশ ছেড়ে হাসির ঝর্ণা ছুটায়। ঝমঝম বাদলের বরিষণ। প্রিয় সান্নিধ্যের শান্তি বার্তা। জানালা দিয়ে তীর্যকাকারে বৃষ্টি ঢুকতে থাকলে জানালা সংলগ্ন যাত্রীরা কাঠের জানালা টেনে দিতে থাকে এক এক করে। এক ঝাঁপ অন্ধকার পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রেলের কামরা। কালো-সাদা মিশ্রণের মতো একটা ঘোলাটে অন্ধকার আর স্টিলের হাতলওয়ালা কাঠের সিট যেন ভুতুড়ে কোন ঘরে বন্দি আসামী সকল।
ঢাকা থেকে আসা রেলের ভেতর ঠাসা মানুষ। সবাই আর রেল পাবে না বলে একেই শেষ যাত্রার যান ধরে নিয়েছে। অন্ধকার গাঢ় হতে থাকে ক্রমশ। কনকলতার পাশে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসা রবি চোখ বন্ধ রাখে কিছুক্ষণ। উপরে শান্ত সৌম্য রবি ভেতরে বোঝার চেষ্টা করছে কনকলতার মতিগতি। বোন ও মায়ের সাথে গল্পরত কনকলতার রিনরিনিয়ে উঠা হাসির মাদকে অনেক আগেই তাকে ডাকছিল তার দিকে। বরাবরেরর মতো কনকলতা সৌম্য স্বাভাবিক। খয়েরি লিপস্টিক পরা চিকন ঠোঁটে হালকা মিষ্টি হাসির রেশ। শাড়ির আঁচল চাদরের মতো করে মাথা ও শরীর ঢেকে দিয়েছে কী মনে করে! ভাবতে ভাবতে শরীরকে একটু চেপে রাখে রবি তার দিকে। বিপরীত কোনো আচরণ পরিলক্ষিত হলো না। শরীরকে কনকলতার উপর আরো চেপে ধরে। তার হাত একটু একটু করে পেছনে নিতে থাকে। কোন প্রতিবন্ধকতা না পেয়ে কনকলতার হাত আর শরীরের মাঝ দিয়ে শাড়ি শরিয়ে ব্লাউজ ও ব্রা’র নীচ দিক দিয়ে ভেতর ঢুকে পড়েছে উদগ্র আঙুল। না তাতেও কোন ভাবান্তর নাই। ধীরে ধীরে আঙুলগুলো হাইড্রার অগ্রভাগের শরীরের মতো বাড়তে বাড়তে পুরো হাতের তালুতে পুরে ফেলে পুরো স্তন। নিটোল টিলার চূড়ায় যেন উপবিষ্ট আনন্দ আকুল। হালকা কাঁপুনি দিয়ে আবার স্থির হয়ে যায় কনকলতা। রবি হাতে চেপে ধরে রাখে স্তন। মাথা ঝাঁ ঝাঁ-বৃত শরীরে আগুন। না সামলে নিতে হবে। নয়ত এ শরীরের অমৃত হারাতে হবে। হারাতে হবে ভালো মানুষীর বেশভাসও। বেশ কিছুক্ষণ পর হালকা ঘোলা আলো জ্বললে আরেক হাতে দৈনিক ইত্তেফাক মেলে ধরে চোখের সামনে । ঘুমন্ত আত্মীয়াদের বুক শরীর স্পর্শ করার ছোটখাটো অভিজ্ঞতা আছে উঠতি বয়সকালে রবির। রবি কনকলতার সমবয়সী হবে । মনে মনে কথা বলে, আমাকে তুমি ঠিক এভাবেই চেয়েছিলে কনক? একবারও বুঝতে দাওনি। কত মধুর প্রহর কাটাতে পারতাম ফেঞ্চুগঞ্জের টিলায় টিলায়। মধুচন্দ্রিমা যাপন হত প্রতি রাতে, বৃষ্টি রিমঝিম কলতানে শরীরের সহজিয়া গান বাজিয়ে নক্ষত্রের আলোয় ভেসে যেত। তোমার কপালে চাঁদের টিপ পরিয়ে দিতাম। চুমুর চুম্বকে মায়াবী হতো ঠোঁট  । চুমুতে চুমুতে আর্দ্র হত হাওয়ার রাত, মনটা ফুলে উঠত মৌসুমী সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আর পাখির নীড়ের মতো তোমার ঘুমচোখ। বুকের কপোত হত মুখোমুখি। তুমি এত সরল আলাভোলা আর ভেতরে দুষ্টু । এতটা লুকিয়ে রাখতে হয়? হাকালুকি হাওরে নৌকায় ভরে উঠত বাতাস ভরা হৃদয়-গান?
মা-বাবা সংসার গুছাতে ব্যস্ত। কেন যে এত দীর্ঘ করতে হয় সংসার? ছোট বাচ্চাটা মায়ের কাপড়ের তলায়। রেলের দোলায় জেগে জেগে জোঁকের মতো চুষে চলছে মায়ের নেতানো বয়সী-স্তন। বিড়াল ছানার মতো ম্যাঁ ম্যাঁও করে কখনো। হয়তো অপুষ্ট শরীরের কাতরানি মায়ের শুকনো শরীরের চামড়া; মুচড়ানো ভাঁজে চোখ দুটো পেঁচার মতো বাইরে বেরনো। বাবার হাতে ধরা ভাই দুটো রানা আর রকি পা তুলে বসেছে সিটে আর খোসাসহ বাদাম কামড়াচ্ছে, থুথু ফেলছে আর চিবুচ্ছে। রুনু ঝুনু বোন দুটো যেন জড়াজড়ি করে থাকা সোনালী সাপ। দুজনের মধ্যে কী এক অজানা বিভোরতা মগ্ন থাকে দিনরাত! মায়ের বকুনি, বাবার ধমক এসবেও তাদের মুখের হাসি মোটেই বিলীন হয় না। সংসারে রবি ছিল একা নিঃস্ব। নিজের কল্পরাজ্যে বিচরণশীল। দীপান্তরে পড়ে থাকা মহাপুরুষ-রাজ। মনের রাঙতায় সাজাতো সবুজ সিংহাসন। কিশোর কালে রবি যেমন লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের দেখত তেমন খুব ঘুরঘুর করত একবার মা-বাবার প্রেম দেখতে। জড়িয়ে ধরা কোন আদরের চুমু। কেমন স্পর্শ আর আদরে রাঙা তাদের জন্ম-জীবন। প্রেমের আহ্লাদী চিবুক বাড়িয়ে মা’র ভাঙা গলার আবদার, প্রেমাপ্লুত হাসি। নিস্তব্ধ রাতে কতবার তাদের চৌকির তলায় লুকিয়ে শুনতে চেয়েছে প্রেমালাপ। না কোন চুক চুক চুমু বা আহ্লাদ-স্বর শুনেনি কখনো। সবাই ঘুমিয়ে গেলে শরীরী হালকা-গাঢ় শব্দে সক্রিয় বাবা সৃষ্টি কর্মে রত হন। অর্ধমৃত কুমীরের মতো পড়ে থেকে বছর গড়িয়ে গেলে মা’র পোয়াতি মরণ। নতুন বাচ্চার ক্রন্দন নয়ত বাচ্চা মৃত জন্মান। জীবিত ছোটদের সেবা-যত্নে বড়দের লাগিয়ে দেয়া। এক ধ্যান; খাও বাঁচ, বড় হও আবার বিয়োও। জীবন যেন এক মানুষ তৈরির মেশিন। ‘তুমি কনকলতা তেমন হবে না। তুমি স্বর্ণলতিকার মতো রাঙিয়ে তুলবে বিজন পটভূমি। আমাদের ঘরে ভালোবাসার ফুল ফলবে দিনরাত। তোমাকে নিয়ে একই খেলা খেলবে তোমার বৃটিশ স্বামী। ভিক্ষুকের মতো অপেক্ষার হাত বাড়িয়ে ধরবে চাইল্ড বেনিফিট পাবার লোভ; তুমিও হবে মানুষযন্ত্র বানাবার মেশিন। বিলেতের শীতল পাউডার মাখতে মাখতে তোমার সোনারঙ ঝাপসা ঝাপসা মৃত মাছের মতো সাদা, কেবল সাদা হতে হতে পচে যাবে। তুমি চন্দ্রাননী। আলোয় আলোয় ভরে রাখবে যুথবদ্ধ তোমার আমার গেরস্থালী। আমি তোমাকে জাগিয়ে রাখব। এ বিকশিত তনুলতা হিল্লোল তুলবে সাগর শাহমিকা।’
বাইশ মাইল রাস্তা পার হতে রেলগাড়িটির কতক্ষণ লাগবে? হাতের নীচে আর্দ্র-দলিত কনকলতার  খাড়া বুকের বোঁটা মোটা ও দৃঢ় হয়ে সক্রিয়তা জানান দিচ্ছে ‘ আসো আসো। আমাকে গ্রহণ কর।’ আবারও আড়চোখে চোখ দেখার চেষ্টা করে রবি। কনকলতা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। ‘ঘুমিয়ো না ওগো কনক সুন্দরী জাগো, জাগো সোনার বরণ মেয়ে; আমরা জাগব যতদিন জীবন।’ হঠাৎ কনকলতা নড়ে উঠছে। কী যেন বলছে চোখের ইশারায়। দ্রুত হাত সরিয়ে পত্রিকার আরেক কোণা ধরে রাখে। অবশ আঙুল দিয়ে পত্রিকা ধরা হয় না বৃষ্টি শেষের খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাসে উড়তে থাকে মুক্ত পতাকা। গা ঝাড়া দিয়ে কনকলতার অবশ পা এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে। মানুষে ভর্তি। বাবার কোলে ছোট সোনামনি। হাত ইশারায় রবিকে যেতে বলে। বাবারা কী বুঝতে পারে গহন মনের বেদন!
আগুন-রবি আগুনের পিছু পিছু যায়। আগুনকে দুবাহু দিয়ে আগলায়। আহা শরীরের গন্ধে শরীর উৎলায়! পাউডার বা কোন পারফিউম নয় যেন বহু শতাব্দীর পুরনো কোন পাহাড়ী ফুল মেখে এসেছে বন-হরিণী। শরীর থেকে সে বাষ্প নাসারিন্দ্রীয় হয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘন বন আর তটিনীর সংযোগস্থলে। কস্তুরিমৃগ বুঝি একে বলে! ঘাড়ের কাছে মুখটা ঘষে একটু; চুলের মাদক চুইয়ে যায় নিম্নমুখী। আবার নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব বনরাজি ঢুকে পড়েছে মানুষের খোয়াড়ে। হাত মানুষ সরিয়ে সরিয়ে দেয় দুদিক থেকে। ঘাড়ের উপর দিয়ে সামনে থেকেও। এই তো দু বাহুর বেষ্টনীতে কনকলতা। এত সহজে কি জয় করা যায় হাজার বছর?
চলন্ত রেলের বাথরুমের দরোজা খোলে জোর লাগিয়ে। সন্তর্পণে আলতো স্পর্শে কনকলতাকে ঢুকিয়ে দেয় ভেতরে যেন দুলুনিতে পড়ে না যায়! হঠাৎ পেছনে একটি হাত বাড়িয়ে হেঁচকা টানে ভেতরে ঢুকিয়ে নেয় আস্ত রবিকে। হাতের টান এতই বেহিসেবি যে, যেন রবি এক ব্যাগ মাংসের চালান! চলন্ত রেলের দরোজা ধাম করে বন্ধ হয়। বিহ্বল লাজুক রবি ভাবে ‘কেউ দেখেনি তো?’ ততক্ষণে বোতামওয়ালা ব্লাউজ খুলে খুলে ফেলেছে শাড়ী কোমর পর্যন্ত নামিয়ে নিয়েছে কনকলতা।  বুক দুটো খাড়া হয়ে থাকে। এরপরও রবিকে ছলছল চোখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবার জোর প্রয়োগ করে তার মাথা নামিয়ে বুকে লাগায়। এতটুকু চায়নি বালক, এত মনোহর, এত সহজিয়া/ যেন চেয়েছিল আরও গভীর গরবিয়া… এভাবে চায়নি যেন সে, মানুষ কেন খুঁজে হন্যে হয়ে আপন জনরে/ কেন এ সংযোগ এভাবে বিষ ও বিষ্ঠার বাথরুমে!’
 ভাবার সময় দেয় না অভিজ্ঞ কনকলতা। লন্ডনী স্বামী তাকে বেশ শিখিয়েছে কামসূত্রের কলাকৌশল। আবেগে মথিত, অগ্নিতে উত্তপ্ত রবিকে নিংড়ে দু’মিনিটেই পান করে নেয় যৌবন মদীরা। মানবিক ভাবনা রেখে আগুন-রবিও গলে পড়েছে গরম স্রোতে, ভেঙে পড়েছে দেহের উল্লাসে দেহ। তারপর, ‘দুয়ার খান লাগাও’ বলে বেরিয়ে যায় দ্রুত। দরোজা লাগিয়ে অনেকক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে রবি পড়ে থাকে একা। যেন কোন গভীর গহ্বরে পড়ে রয়েছে অনন্তকাল। যেন হাত নয়, পা নয়, ডানাও নয় নর্দমার বিষাক্ত নোংরা বর্জ্যে পুঁতে রয়েছে হাত-পা-ধড় হীন দেহ-কাণ্ড। হিমাদ্রি মাইনাস হাজার ডিগ্রিতে হাজার বছর। বাথরুমের দুর্গন্ধ তার নাকে ঢোকে ঢকঢক ঢক। দরোজায় আঘাত পড়ে ঠকঠক ঠক ঠক, ঠক ঠক ঠক।
বাড়ি আসার পর দুদিন কেটে যায় ঘোরে বেঘোরে। এ বাড়িতে আর আসে না কনক। তৃতীয় দিন বেরিয়ে যায় রবি। শ্রীবন গ্রামের উদ্দেশ্যে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পা চলে সবুজবৃত গ্রাম, ঝোপ আর জঙ্গল। তার মনে খাবি খায় টিলা টক্কর। বাড়ির সামনে পেছনে কলতলায় কনকলতাকে দেখা যায় না কোথাও। দরজায় টোকা দিলে তার দাদী দরোজা খোলে। দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ পড়ছে লতা। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রার্থনা শেষ হলো না। তারপরও কদিন ঘুরেছে এদিক ওদিক তছনছ হয়ে যাওয়া মনকে যদি জোড়া দেয়া যায়। কেউ যেন খাঁচা থেকে আলগা করেছে ।চিকন হতে হতে ঝাপসা হয়ে আসে বুনো আলোছায়া পথ। বনের ভেতর ডেকে উঠে হরেক জাতের দুঃখ ভাঙানিয়া কিচিরমিচির। এলোমেলো পায়ে টিলা টক্করে ঠোকর খায় বিরাগী বাতাস।
অনেক চেষ্টা তেও কোনোভাবেই ঘটে না কোন মধু সংযোগ। চোখে চেখে নির্মীলিত হয় না জীবন। শূন্য খাঁচা ও ধড় নিয়ে ঘরের ঘুপচিতে কাতরায়, উপন্যাস কবিতার পৃষ্ঠা ভেসে যায় অশ্রুতে।
গ্রামে যেন উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে কী কথা! রবির কাছে আসার সাহস নেই সে গল্প আখ্যান। মাস খানেক পর বাড়িতে সোরগোল শোনা গেল। তিন দিন থেকে কনকলতাকে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। বান্ধবীর বাড়ি যাবে বলে বের হয়েছিল। মা বলছে, ‘তিন দিন থেকে তোর বাপও গায়েব। কিছুই বলে যায় নাই, ঘরেও আসে নাই।’ বাড়ির কর্তা না বলে যেতে পারে যেকোনোখানে, এটা তার অধিকার, তার সাম্রাজ্য! কী যে ভাবছে মা রবি ভাবে! বয়স বাড়লে বুঝি কথাও লাগাম ছেড়ে যায়!
সামনের ঘরে বাবার জানি-দোস্ত বড় মেসাব বড় চাচাকে বলছে, “মাইনা লওরে বাপ, তোমার ভাই নয় একখান ভুল করি লাইছে। কনকলতা মাইয়া খারাপ নায়। দেখতে যেলাইন সোন্দর, মনটাও কাঁচাসোনা। নয় কী লন্ডনী স্বামী ফালাই ছয় বাইচ্চার বাপ ফতুরারে কেউ বিয়া করে!’’ রবি শুনছে অট্টহাসি “তুই জানিস নারে বেহুশ বেদুইন/ মানুষ কেবল যন্ত্র, যন্ত্র বানাবার মেশিন!” দু্ই হাতে সজোরে চেপে ধরে কান। ‘ওরে কান বধির হ! নয় উড়ে যা মহাশূন্যের দিকে!’ মাথার ভেতর যন্ত্র ভেঙে পড়ার ঝনাৎকার! বিছানায় কাত হয়ে শোয়া রবি দেখতে পায় বাবার জানি দোস্ত বড় মেসাবের ঠোঁট উঠানামা করতে করতে থুথু গড়িয়ে পড়ছে ঘর থেকে বাইরে। থুথুর স্তূপ নয় যেন গলগলে লাভা; তার মোটা ঠোঁট যেন অগ্নি-পর্বতের চূড়া-মুখ; আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভা গলগল করে ছড়িয়ে পড়ছে মিয়ার সংসারের কোণায় কানায়। ফুলে ফেঁপে উঠছে লাভা; লাল কালো, খয়েরি উত্তপ্ত বিগলিত উদগীরণ— ঢেকে দিচ্ছে এগিয়ে যাবার সবকটা সুড়ং।
রবির একমাত্র নির্ভরতা বড় চাচা। যার প্রাণের ভেতর ছোট হুদহুদ পাখি সে। নিজ প্রেমের পরিণতি করতে না পারা অবিবাহিত সোনা মিয়া বড় চাচা নড়ছে না। ফেঞ্চুগঞ্জের ব্যবসার মূলধন থেকে শুরু করে ভালোবাসায় আদৃত করে রাখা প্রিয় ছোট ভাই মনি মিয়া মানে তার নিজের সংসারের এ পরিণতি! মুখ খুলছে না বড় চাচা; তাঁর চোখে-মুখে কোন ভাবান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে না; একটুও না…

খাতুনে জান্নাত

খাতুনে জান্নাতের জন্ম সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ১২ জুলাই ১৯৬৯।

পেশাগতভাবে শিক্ষকতা ও সমাজকল্যান মূলক সংগঠনের প্রধান হিসাবে বাংলাদেশের ৪টি জেলায় কর্মকান্ড চালান দীর্ঘদিন। ২০০৭-২০১৪ সাল পর্যন্ত বিলেতে বসবাস করার পর বর্তমানে বাংলাদেশে বাস করছেন।

১৯৮৯ সালে একটা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় তাঁর লেখা ছড়া , গল্প প্রকাশিত হয়।  দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৭ সাল থেকে বিলেতে অবস্থানকালে আবার সাহিত্যচর্চা শুরু করেন নতুনভাবে। তাঁর কবিতা নস্টালজিক অনুভূতি, নারী মুক্তি, প্রকৃতি, বোধ ও বিভেদ আবহ, ও উজ্জীবনমূলক।

কবিতাগ্রন্থ: দিনান্তে দেখা হলে (২০০৯) জীবনের কাছে ফিরে (২০১০), নিরন্তর রোদের মিছিলে (২০১২), মুঠো খুলে দেখি(২০১৬)। নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ‘ দ্য রে অফ লাইফ এন্ড নেচার‘ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে।  এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, জার্মান, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় বাংলা কবিতা ও তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে। উপন্যাস :শিউলির কথা (২০১৯)।

পুরস্কার: লক্ষীপুর সাহিত্য সংসদ পুরস্কার ২০১৬, কবিবরণ সম্মাননা ২০১৬ , বিশ্বশান্তি পদক ২০১৮ এবং কৃত্তিবাস স্মারক সম্মান।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।