ফারহানা রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

জাদুবাস্তবতা

‘চাঁদের উপর জোনাকির জ্বালে জ্বালে সেদ্ধ হচ্ছে আউশের রাঙা চাল’
অস্বচ্ছ পুরনো ক্যানভাসে আঁকা নানা রঙের মায়াবী স্নানে
সাদা মৃত্তিকার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা পুণ্যবতী মায়াগাছগুলো কৃষ্ণপক্ষের জ্যোৎস্নায় গান গায়…
নীলনদ পাড়ে ত্রিপল টাঙ্গিয়ে বসে আছে এক জিপসি জাদুকর।
একশ বছরের নীরবতা ভেঙে বাজিয়ে চলেছে বিষাদের অর্কেস্ট্রার সুর;
আর দাঁড়িকমাসমেত নিজের আলখেল্লা পরে ডুবে যাচ্ছে এক গোলাপি সভ্যতা!
হঠাৎ বৃষ্টির মতো মিহিস্মৃতি এনে
ঝরাপাতা বনে হেঁটে যায় কোনো কালো ছায়া
আর আমি উইদড্রোল সিনড্রোমে ভুগে ভুগে
ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে চলেছি এমনই সব জাদুবাস্তবতা।
এতদিন যারা বন্দি হয়ে ছিল সময়ের দেয়ালের আড়ালে।

 

প্রেম

তুমি কি রঙিন মোড়কে ঢাকা রাজপ্রাসাদ
বেদনার গুপ্তধন লুকানো থাকে তাতে?
যতই অতন্দ্র উন্মুখ হয়ে থাকো পাহারায়
ভেতরে-বাইরে যতই আকণ্ঠ তৃষ্ণা
গোলাপের নির্যাস!
.
বেদনার শরাবই মেটায় তৃষ্ণা
বিষণ্ণ চিতায়…
দীর্ঘতম নৈঃসঙ্গ্যে ঢেকে যায় চৈতালি বিকেল,
জ্যোৎস্নাসিক্ত আকাশ;
উদ্ভাসিত পানশালায়-
প্রেম! তুমি কি বিপন্ন ছায়া?
.
ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশে আছ ধূসর তটরেখায়?
ধোঁয়াশার কুণ্ডলী পাকাও হৃদয়ের গভীরে
হও প্রবঞ্চক ফসফরাস;
নাকি তুমি শুধুই ভ্রান্তিবিলাস!

শেষ মূর্তি

ক্ষুধা বা প্রেমের নৈসর্গিক যন্ত্রণায়
যেখানে নিজের ভেতরের অন্ধকার থেকে
আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ভ্রমণ
যেই সব ক্ষতের সৌন্দর্য কখনো তোমার
ছোঁয়াই হয়নি হয়তো বা
বুঝতে পেরেছ সেসব তোমাকে শুধু
বিভ্রান্তির ফাঁদেই ফেলবে
আর সুরাপাত্রের বর্ণিল চিত্রের ভেতর
বিস্ময়ের উদ্ভ্রান্ত যে চোখ নিয়ে
আমি তাকিয়ে থেকেছি আয়নার দিকে
সেখানেও তুমি চাও রঙিন সুতোয় বোনা তসবির
কখনো তোমার জানাই হয় না
ঠিক কোন কথার ফাঁদে জড়িয়ে
লাওয়ারিশের মতো
পথ ঘুরে ঘুরে আঁজলা ভরে
জমাচ্ছ ধুলোর পাহাড়,
যা দিয়ে তুমি
নিজের দু’হাতে
শেষ মূর্তিটাই বানিয়েছ অবশেষে…

 

স্বপ্নচারী

জলরাশি ছাড়ালেই সামনে আফ্রিকার বিষণ্ণ উপকূল
আন্দালুসিয়ার সোনালি বালুকাবেলা
নীল জামদানী আকাশের ক্যানভাসে নাক্ষত্রিক উপাচার
লাবণ্য ছড়ায় ধু ধু প্রান্তর
রূপসী পানির ধারা শব্দস্রোতের মতো উজ্জ্বল!
বড় চেনা মনে হয়
যুগ যুগ ধরে সেখানে পাথর
ভেঙে চলে
নেশাতুর এক ধূসর শ্রমিক
নিরুত্তাপ নদীর বুক চিরে নিবিড় বিচ্ছেদ তুলেছে যে পাহাড়,
তারই গা থেকে খুলে নেয় একটি একটি করে পাথর
এমারাল্ড, এমারাল্ড পেতে হবে তাকে
ক্যালেন্ডারের শেষের তারিখের মতো নৈঃশব্দ্যে ঢেকে আছে
শেষ পাথরটি
পৃথিবীর সুন্দরতম এমারাল্ড!
বহুবছরের রাগ-ক্ষোভ-ক্ষুধা মেঘকালো আঁধার জমেছে
শ্রমিকের নিস্তরঙ্গ মনে
দৃষ্টি সীমানার বহুদূরে পাথরটি ছুড়ে মারে সে
হেঁটে যায় অজানার পথে…

জীবনের শুরুতেই মানুষ জেনে যায় তার লক্ষ্য তবু হাল ছেড়ে দেয় সে।

 

ফারহানা রহমান

প্রধানত কবি, গল্পও লিখে থাকেন। চলচ্চিত্র সমালোচনাতেও আগ্রহ অনিঃশেষ। ১৯৭২ সালের ১৩ আগস্টে ঢাকায় জন্ম। বেড়েও উঠেছেন ঢাকায়। পড়াশোনা প্রথমে পল্লবী মডেল হাই স্কুলে, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে এইচ,এস,সি পরে ইডেন মহাবিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। উদার সংস্কারমুক্ত উচ্চ শিক্ষিত পিতা শেখ রহমতউল্লাহর ছায়ায় নাগরিক অনুষঙ্গে বেড়ে উঠবার কারণে সংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। মাঝে কয়েক বছর শিক্ষকতা এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার পর এখন পারিবারিক ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অপরাহ্ণের চিঠি (২০১৬), অপেরার দিনলিপি (২০১৭) ও লুকিয়ে রেখেছি গোপন হাহাকার (২০১৯), শ্রেণীশত্রু (গল্পগ্রন্থ) ২০২০, বিশ্বসেরা সিনামা কথা(চলচ্চিত্রের উপর লেখা গদ্যের বই) ২০২০। এছাড়া, দিপাঞ্জলি (যৌথ) ২০১৭ ও মনোরথ (যৌথ) ২০১৮। তিনি বই পড়তে, মুভি দেখতে ও বেড়াতে ভালোবাসেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।