একগুচ্ছ কবিতা: অভ্র ঘোষাল

রোজ 

ঠান্ডা মাথায় শরীর হেলিয়ে টেবিলে তুলে রাখি পা,
অবহেলায় হাতের আঙুলে ধ’রে থাকি সিগারেট।
অথচ কেউ জানে না,
মাথার ভেতর ধিকিধিকি আগুন জ্বলে –
সে আগুন পোড়াতে পারে না কিছু,
শুধু নিজেই নিজেকে পোড়ায় আর ছাই হয়ে
উড়ে যায়।
রং-তামাশার কাব‌্য নিয়ে শ্রাদ্ধ করি না, তার বদলে হাই তুলি
শুয়োরের মতো কাজের চেয়ারে শুয়ে-ব’সে থাকি –
বুকের ভেতর জমতে থাকে কাঁচের সুগোল মার্বেল,
দু’দিন তিনদিন, যেন সমস্ত জীবন ধরে জড়ো হ’তে থাকে;
না-দেখে না-দেখে স্বপ্নগুলোর প্রেমে পড়া হয় না,
মাথার ভেতর কথা বলে তিন-চারশো লোক।
শীত, বড়ো শীত, বসে থাকা দায় এই ঘরের ভেতরে।

 

এসে দ‌্যাখো 

কেউ নেই, এঘর ওঘর ঘুরে দ‌্যাখো,
বাগান কিংবা বারান্দা ঘুরে দ‌্যাখো – কেউ নেই।
আকাশ-পাতাল খুঁজে নিলেও কাউকে পাবে না।
ক্রমশ এক অন্ধকার থেকে আর-এক অন্ধকার, আর উত্তরবিহীন নীরবতা-
অথচ বৃষ্টির মেঘ আমাকে ডেকেছিলো লাল মাটির পথের পাশে খড়ের চালায়।
একটুখানি তাকিয়ে দ‌্যাখো,
চতুর্দিকে মস্ত ফাঁকি –
কুলুঙ্গিতে রয়ে গেছে তেল-সিঁদুরের দাগ,
তুলসীতলায় রয়ে গেছে আধ-গলা মোমবাতি।
ফিরে তাকাও এদিক-ওদিক, থেমে গেছে দেখতে পাবে নিত‌্যদিনের সমস্ত কাজ –
রয়ে গেছে শূণ‌্য সভায় শূণ‌্যতর আলো।
একটু দ‌্যাখো মরা গাছের হলুদ পাতায়,
দুলতে থাকে ধুঁকতে-থাকা অন্ধ আলোর আবেগটুকু।
শুনে দ‌্যাখো সারা বাড়ি এদিক-ওদিক,
শুনতে পাবে সাপের মুখে ব‌্যাঙের চাপা কান্না শুধু।

 

স্মৃতিটুকু

মনে প’ড়ে গেলো বহুদিন পরে
বিকেলবেলায় বৈশাখী ঝড়ে
বিকল মাথায় অসাড় দু-চোখে
ভেঙেছে আমার ঘুম।

চোখ মেলে দেখি উদাসীন মনে
রক্তপ্লাবিত ভিতর মহলে
ঘরবাড়ি আর মাঝ অঙ্গনে
বৃষ্টির মরশুম।

আকাশের নদী জলে জলময়
হিংস্র নীরব শ্বাপদের ভয়
স্রোতের টানে ভেসে চলে যায়
কাঠ, ফুল, মৃতদেহ।

খোলা জানলায় কিছুটা সময়
রোজ এভাবেই শেষ হয়ে যায়
বসে থাকি একা খোলা দরজায়
বুকে বাজে কার স্নেহ!

শুধু ক্ষণিকের পরমায়ু যার
সেই মানুষেরই কতো অভিমান
কতো অহমিকা, কতো মূর্খতা
কতো শত হুঙ্কার!

বহুদিন পরে গোধূলিঘাতক
অন্ধকারের ঝড়
ঠান্ডা রক্তে রেঙে দিয়ে গেলো
বিছানা-বালিশ-ঘর।

দিগ্বিদিকের স্থির বাতাসে
জলের শব্দ চুপ,
আশিটি টগর রয়েছে সাজানো
টেবিলে পুড়ছে ধূপ।

 

আমাদের রাত 

শুধু স্বার্থপর হ’তে পারি না ব’লে ভালোবেসে যাই,
একটু-আধটু কাঁচা জায়গা মনের মধ‌্যে নেহাৎ এখনও আছে তাই,
থামিয়ে ব’সে থাকতে পারি না ভাবের দেওয়া-নেওয়া।
ব’সে থাকি ভাঙা ঘাটে, নদীর ওপারে, দেখি, কিছু নয়, মাছটা, পাখিটা,
ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়ে ভিড় করে, খেলে বেড়ায়।

নেহাৎ স্বার্থপর নই ব’লে চুপচাপ ব’সে না-থেকে,
প্রত‌্যেকটা তারাগলা রাত কবিতা নিংড়ে নামিয়ে আনি তোমার দরদী বুকে,
মাতাল রাতের শরীর ছুঁয়ে যায় শালবন থেকে উঠে-আসা চাঁদ।
তোমার ঠোঁট ছুঁয়ে ব’সে থাকি, মনের ভেতর মদের বৃষ্টি নামে,
নিঃশব্দ, রোমাঞ্চকর জ‌্যোৎস্না-ভরা উঠোন বেয়ে দুটো ছায়া গড়িয়ে পড়ে –
সদ‌্যোজাত শিশুর মতো ভালোবাসা হাত বাড়ায়।

 

অভ্র ঘোষাল

কলকাতা নিবাসী। নৃতত্ত্ব বিষয়ে, বিধাননগর সরকারি কলেজে বিএসসি তৃতীয় বর্ষে পাঠরত।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।