রেজাউদ্দিন স্টালিনের চারটি কবিতা

দুরবিন

স্মৃতির অশ্বারোহী ফিরে আসি কাতর শৈশবে
যখন সবকিছু মূল্যবান ছিলো
চিনেবাদাম চকোলেট আইসক্রিম
মেলায় কেনা সবুজ টিয়ে আজো
কাঁধে এসে বসে
ঠোঁটদুটো সেরকমই লাল
গরম জিলাপি জিভ টেনে
লম্বা করে রাখে

পাঁপড় হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে
হাতের তালুতে
পয়সা জমিয়ে কেনা দুরবিন
তাকায় আত্মহারা দিগ্বিদিক
আর আরব্য জিনদের জাদুবলে কি
আশ্চর্য সবকিছু বড় হয়ে যায়
মানুষ- প্রকৃতি
স্মৃতির মহাদেশে সবই বর্তমান
এখনো চাঁদ ঘুমোতে যায়
আমার পকেটে
সূর্য দেরি করে পশ্চিমে ওঠে
আজো পত্রিকার শিরোনামে সাঁতার কাটে বঁড়শিতে গাঁথা সংবাদ
ছাপা হয় নতুন নক্ষত্রে জেসোলিনের
বেতার দুরবিন

কিন্তু আমি খুঁজছি কৈশোরে কেনা
সেই অমোঘ দুরবিন
আবার সবকিছু দেখবো বড় বড়
মানুষ ও প্রকৃতি

 

মুক্তস্বর

দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে ছিলাম হে
ঘুমের ভেতর কড়া নাড়লো কে
কড়া নাড়লো ডাক পড়লো
জাগিয়ে দিলো হে

ঘুমের ভেতর কড়া নাড়লো কে

বাইরে ভীষণ অন্ধকার না আলো
দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো খুব
কিন্তু হঠাৎ চোখের চেনা পথে
দৌড়ে গেলো চতুর বাঘ-ঘুম

নিঝুম রাতে ট্রাকের নাক ডাকা
দম্পতিদের নিদ্রা ভাঙে যেমন
তোমার ডাকের শব্দ শুনে তেমন
ভাঙলো আমার গভীর নীল ঘুম

এখন আমি বাইরে যেতে পারি
গাছের ছায়া মাখতে পারি গায়ে
মুক্তস্বরে বলতে পারি – মেঘে
নিদ্রা তুমি অন্ধ এবং কালো
জ্যোৎস্না ধুলো আকাশ কী সুন্দর

 

কতদূর ইথাকা

অনেকদূর হেঁটে এসে পেছনে তাকালে
আর বাড়ি দেখা যায় না
দৃষ্টির সূর্যপথ উঠে যায় মেঘবৃক্ষে
পেছনে কার বাড়ি
চণ্ডীদাসের নাকি কাহ্নপার
জ্ঞানদাস একবার বিদ্যাপতির নিমন্ত্রণে এসে
পথ হারিয়ে বহুদিন আলাউলের অতিথি ছিলেন
আর কালিদাসের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও
যেতে পারেননি মোহাম্মাদ সগীর

সবকিছু অচেনা অপরিচিত
গাছের দেহ সবুজ পাতারা কালো
নদীর পানি হলুদ
পাখির ডানা নীল
আর পথের ধূলা লাল

এভাবে কি চেনা যায়
যারা পেছনে সব দেখতে পারে
তাদের নাকের মধ্যে অদৃশ্য সুড়ঙ্গ
কাছাকাছি কপালে একটা সাঁকো
নিচে জলঘূর্ণি
আর গলায় সবুজ চাঁদ
পেছনে ফিরে বাড়ি দেখাটা কি খুব জরুরী
জন্মের পর থেকে হাঁটছি
আার মাঝে মধ্যে চেষ্টা করছি পেছন ফিরে দেখতে
আবছা দেখা যায় গোধূলির নাকে নক্ষত্র
এখন হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর
খুব ইচ্ছে পেছনে ফিরে দেখি
কতদূর ইথাকা

 

তুচ্ছকে যে ভালোবাসে

কোনো কিছু তুচ্ছ নয়
প্রতিটি বস্তু তার বৈশিষ্ট্যে হীরক
উইয়ের সামর্থ্য দেখি অসীম সঞ্চয়ে
ঘাসের ভ্রুর মধ্যে শিশিরের পাখি
ছাই সেও উজ্জ্বল চাঁদের বাসন
আমাদের সামর্থ্যের সীমা অব্যবহৃত
বুঝতে পারি না
দক্ষিণের মৃদু হাওয়া কিভাবে বদলে দেয়
লক্ষ লক্ষ ইলিশের গতি
ছেঁড়া পালে গান বাজে -গুণ টানো মাঝি
তুচ্ছ সব অপেক্ষার ধুলো সোনালি ধানের উৎসব
মায়ের ছোটো চুম্বনের বীজগুলো আজ মহীরুহ
কুনোব্যাঙ সাপ আর হিংস্রদের কথা আজ থাক
মাধ্যাকর্ষণ থেকে জগতের কোনো তুচ্ছ বিযুক্ত নয়
কত বিশাল সভ্যতা তুচ্ছ হয়ে পড়ে আছে
ইতিহাসে – ঘাসে
পাহাড় হঠাৎ কিভাবে পিঁপড়ে হয়ে যায়
মরুভূমি গলে যায় উটের গ্রীবায়
বুঝতে পারি না
শৈশবের অনুস্মৃতি কতটা মহান
তুচ্ছ ভুল বার বার করে তোলে তিক্ত ইউলিসিস
তুচ্ছকে যে ভালবাসে সেইতো সামাজিক

 

রেজাউদ্দিন স্টালিন

রেজাউদ্দিন স্টালিন (জন্ম ২২শে নভেম্বর, ১৯৬২) কবি, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি আশির দশকের অগ্রগণ্য ও সফল কবি হিসেবে বিবেচিত। তার রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশটি। কবিতায় অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: “পূর্ণ্যপ্রাণ যাবে”-১৯৮৩ সাল, “দাঁড়াও পথিকবর”-১৯৮৬ সাল (একটি যৌথ প্রকাশনা), “ফিরিনি অবাধ্য আমি”-১৯৮৫, “ভেঙে আনো ভিতরে অন্তরে”-১৯৮৭, “সেইসব ছদ্মবেশ”-১৯৮৯, “আঙ্গুলের জন্য দ্বৈরথ”-১৯৯২, “আশ্বর্য আয়নাগুলো”-১৯৯২, “ওরা আমাকে খুঁজছিল”-১৯৯৭, “সম্ভাবনার নিচে”-১৯৯৬, “পৃথিবীতে ভোর থেকে দেখিনি কখনো”-১৯৯৭, “আশীর্বাদ করি আমার দুঃসময়কে”-১৯৯৮, “হিংস্র নৈশভোজ”-১৯৯৯, “আমি পৃথিবীর দিকে আসছি”-২০০০, “লোকগুলো সব চেনা”-২০০১, “নিরপেক্ষতার প্রশ্ন”-২০০২, “পদশব্দ শোন আমার কন্ঠস্বর”-২০০৩, “পুনরুত্থান পর্ব”-২০০৪, “অবিশ্রুত বর্তমান”-২০০৫, “মুহুর্তের মহাকাব্য”-২০০৬ সাল, “অনির্দিষ্ট দীর্ঘশ্বাস”-২০০৮, “ভাঙা দালানের স্বরলিপি” ২০০৯, “কেউ আমাকে গ্রহণ করেনি”-২০০৯ সাল। রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, রুশ, জার্মান, চীনা, জাপানী ও ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

রেজাউদ্দিন স্টালিন  দীর্ঘদিন নজরুল ইনস্টিটিউটের উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।