জুনান নাশিত: শিল্পযাত্রায় রাহুগ্রাস: কবিতার মুক্তি

যা দেখতে পাচ্ছি আর যা দেখতে পাচ্ছি না এ দুয়ের মধ্যবিন্দু থেকেই শিল্পের উৎসারণ। শিল্পের নিজস্ব সত্তা আছে। কিন্তু শিল্পীর শিল্পসত্তা প্রভাবিত হয় নানা ভাবে। ব্যক্তি জীবনের ইচ্ছা, অনিচ্ছা অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ অবশ্যই শিল্পীকে তাড়িত করে। কিন্তু ওই ব্যক্তি একজন সামাজিক জীব, কোন এক রাষ্ট্রের বাসিন্দা। সে যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস করে তাও তাকে আলোড়িত করে। সামাজিক মানুষের অভিজ্ঞতার নির্যাসের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে তার শিল্পপট। তবে সমাজের সাথে শিল্পীর যোগাযোগ কতোটা প্রত্যক্ষ আর কতোটা পরোক্ষ তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ঢের।

শিল্পীর জীবনবোধ, জীবন দর্শন এবং বিশ্ববীক্ষা তার শিল্পকর্মকে প্রভাবিত করে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর তার জীবন দর্শন, জীবনবোধের গোড়ায় সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ হোক জল ঢালে নিত্যধারায়। তাই শিল্পীর চেতন ও অবচেতন মনসহ সকল সত্তার সঙ্গে সমাজের এবং বিশ্বজগতের এবং সর্বোপরি অর্থনীতির একটি কাঠামোগত মৌলিক সম্বন্ধ রয়েছে। শিল্প শিল্পীর একান্ত ব্যক্তিগত হয়েও তা সামাজিক ও জাগতিক।

এই যে সমাজ, এই যে জগত বর্তমানে তার স্বরূপটা কি? কেমনতর সমাজে আজকের শিল্পীরা বসবাস করছেন? শিল্পের মশাল হাতে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে যে তারুণ্য আজ সিদ্ধান্তের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছেন সে কি প্রত্যক্ষ করছে? কতোটকু স্পেস, কতোটুকু প্রতিবন্ধকতা তাকে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে ভাবনা জরুরি।

‘শিল্পযাত্রায় রাহুগ্রাস: কবিতার মুক্তি’ শিরোনামটিতে রাহুগ্রাস শব্দবন্ধটি লাগিয়ে এটিকে আগেই সীমায়িত করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ধরেই নেয়া হচ্ছে যে আজকের শিল্পচর্চা দুর্দশাকবলিত। একটা কূটদশায় পতিত। এ রাহু কি কেবল আমাদেরই গ্রাস করছে, নাকি এটি বিশ্বজনীন?

গত শতকের সত্তর কি আশির দশক থেকে শুরু করে আজতক যে নয়াউদারতাবাদের ঢেউ বিশ্বকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাতে দুলছি আমরাও। কারণ আমরাতো সকলেই একই গ্রামের বাসিন্দা। যার নাম বিশ্বগ্রাম কিংবা গ্লোবাল ভিলেজ।

নয়াউদারতাবাদ কিংবা বিশ্বায়নের এ যুগে পূর্ঁজিবাদের এক ধ্বংসাত্মক সময়ে আমাদের বসবাস। নয়াউদারতাবাদ বাজারকেন্দ্রিক ও চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী।মানবিক সম্পর্কগুলোকে সে কেবল প্রতিযোগিতার আলোকে মূল্যায়ন করে। মানুষের অন্তর্গত সকল বিষয়ে এর উপস্থিতি অত্যন্ত সরব। মহামারিসদৃশ মানবের নি:সঙ্গতা, বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়, সামাজিক পুঁজি শুন্যের কোঠায় নেমে আসা নয়াউদারতাবাদের সংকটের ফলাফল। নয়া উদারতাবাদে সবকিছুই বড়ো হালকা, অগভীর। এখানে সবকিছুই কেবলই পণ্য। এ সময়ে দয়া, মায়া,প্রেম, ভালেবাসা সব সবকিছুই নানা রঙের মোড়কে সাজানো নিছক পণ্য মাত্র। এ সময়ে আমরা যতোটা না একত্রিত তারচেয়ে বেশি বিভাজিত। পোলিশ সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ত বাউম্যান(জন্ম: ১৯ নভেম্বর, ১৯২৫/মৃত্যু: ৯ জানুয়ারি ২০১৭) এর বিশ্বয়ানের প্রকৃতি বিশ্লেষণ থেকেও একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘বিশা¦য়ন যতোটা একত্রিত করে, ততোটাই বিভাজিত করে।’ আরো বলেছেন, ‘প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে আমাদের সময় ত্বরান্বিত হচ্ছে, কিন্তু স্পেস কমে যাচ্ছে।’

প্রতিযোগিতা আর মুনাফার লক্ষ্যই বর্তমান ব্যবস্থার আদ্যপন্ত হওয়ায় এর বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে শিল্প তার আদর্শিক জায়গায় কতোটা দণ্ডায়মান সে এক মহা জিজ্ঞাস্য। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে চলছে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের এক কদর্যরূপ। এটি পূঁজিপতিদের সাথে রাজনীতিকদের এক গোপন সমঝোতা। যার মাধ্যমে চলে দলবেঁধে লুটপাট। অর্থাৎ একটা অসহনীয় ও অনৈতিক পরিবেশ শিল্পীসত্তাকে খামচে ধরছে প্রতিনিয়ত।

আরো রয়েছে ধর্মীয় উগ্রবোধ ও ধর্মান্ধতা। রয়েছে সন্ত্রাসবাদের নানা কসরত। এছাড়া পঠন পাঠনের দিক থেকেও শোচনীয় দুরাবস্থার শিকার বর্তমানের এই আমরা।

বিশ্বে কর্পোরেট কালচারের আগে রাজনীতি, সমাজনীতি যেভাবে আদর্শায়িত ছিল বতর্মানে তা অনেকদূরের বিষয়। নয়া সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে গিলে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে সংস্কৃতি হারাচ্ছে তার গতিপ্রকৃতি। যোগাযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে, ক্রমবিকশিত হচ্ছে বিশ্ব কিন্তু ক্রমসংকুচিত হচ্ছে মানবসত্তা।

আমরা পরিবর্তনের এক অস্থির সময়ের বাসিন্দা। শৃঙ্খলাহীন অগভীর চৈতন্যের এক দিশাহীন সাঁতারু যেন। বিশিষ্ট জার্মান মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কার্ল ক্রস(জন্ম: ১৫ আগস্ট, ১৮৮৬/মৃত্যু: ২১ অক্টোবর, ১৯৬১) বলেছেন, ‘চৈতন্যের মৃত্যু’ মানে পৃথিবীর প্রকৃত সমাপ্তি ।

এই যখন অবস্থা তখন বিশ্বতত্ত্বের এই দামামাকে আরো ক্ষুরধার করতে যাত্রা শুরু হলো নয়াগণমাধ্যমের। একে বিকল্প মাধ্যমও বলা হচেছ। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইন্সট্রাগ্রাম, লিংকডইনে আজ সকলে সরব। ফেসবুক যাত্রা করে ২০০৪ সালে।টুইটার ২০০৬ সালে। সময়টা এই সেদিনের হলেও বাস্তবতা হলো এগুলো আজ বিশ্বজুড়েই অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তাই বলে কি প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে? তা কিন্তু নয়। তারা একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করছে। এ লড়াই কেবল তাদের নয়, আমার আপনার সকলের।

এইসব বিকল্প মাধ্যমগুলো সক্রিয় হওয়ায় সেন্ট্রাল হেজিমনি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় আধিপত্য আপাতভাবে ম্রিয়মান হয়েছে। আমরা সাবঅল্টার্ন বা প্রান্তীয়বর্গের স্বর শুনতে পাচ্ছি। কেন্দ্র আর প্রান্তের ব্যবধান কমে যাচ্ছে। যে প্রান্তীয় মানুষ তার বলার কোন জায়গা পাচ্ছিল না সেও পেয়ে গেল এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। নি:সন্দেহে এটি খুবই ইতিবাচক। কিন্তু শিল্প প্রসঙ্গে ভাবনাটাকে আরেকটু তলিয়ে দেখা দরকার বৈকি। কারণ শিল্পচর্চা নিছক আনন্দভ্রমণ নয়, এটি অবিরাম সংগ্রাম। এই সংগ্রামের পেছনে রসদ যোগায় শিল্পীর সুগভীর ধ্যান ও আর তার ব্যাপক উপলদ্ধি। শিল্প তার নিজস্ব রীতি দ্বারা আবদ্ধ। রীতিহীনতায় আর অলীক কল্পনায় অনেক কিছুই করা হয়তো যায় কিন্তু তা শেষপর্যন্ত স্ফুলিঙ্গহীন হয়ে পড়ে।

নয়ামাধ্যম কিংবা বিকল্প মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত সকলেই তার নিজস্ব শিল্পচর্চার সুরভিত উদ্যানটিকে অনায়াসে তুলে ধরতে পারছে। আগে যা ছিল অনেকক্ষেত্রেই প্রায় অসম্ভব। এতোটা সহজে এতোটা অনায়াসে নিজ নিজ শিল্পকর্ম প্রকাশের এ সুযোগ অবারিত হওয়ায় আমার জানতে পারছি নানা বৈচিত্র্যময়, নানা ঘরানার কবিতা, গল্পসহ শিল্পমাধ্যমের আরো নানাদিকের খবর। কিন্তু এই সহজতা একদিনে যেমন ইতিবাচকতার জন্ম দিয়েছে অন্যদিকে নঞর্থক কিছু ভাবনারও যোগান দিয়েছে। যখন একই প্লাটফর্মে আমরা অনেকগুলো কণ্ঠস্বর একযোগে শুনি তখন একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তখন হয়তো অতি জরুরি, অতি মূল্যবান কোন কথা হারিয়ে যায়। কিংবা আমরা চিহ্নিতই করতে পারছি না কোনটি দরকারি আর কোনটি অদরকারি। অথবা পরিবর্তন এতোটাই গতিময় যে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমান্বয় তৈরি করা সত্যিই দুরূহ হয়ে ওঠে।

গণমাধ্যমের বিশ্বায়ন একটা অনৈতিকতা দ্বারা দুষ্ট। আগে যা ছিল ধীর লয়ে বিবেচনার মাধ্যম। তাই এখন আন্দাজ করার, নিরূপিত হওয়ার সময়সীমার বাইরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কথাটিতে রক্ষণশীলতার কিছুটা আবছা আভাস রয়েছে। কিন্তু নিরপেক্ষ ও আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি ভাবলে এরকমটাই হয়তো উঠে আসবে। তবে এই বিকল্প মিডিয়া আজকের বাস্তবতা। একে অস্বীকারের কোন উপায় নেই। মিডিয়া মনোপলির এই যুগে একে কাজে লাগিয়েই শিল্পজগতকে যে এগুতে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেমন আমরা এখন তাই করছি। প্রতিষ্ঠিত কোন মাধ্যমে লেখা ছাপা হওয়ার পরও আমরা ফেসবুকের দ্বারস্থ হচ্ছি। কেন? বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্যে ই তো? তার মানে বিকল্প মাধ্যমগুলো আমাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো এ সুযোগ আমরা কতোটা দক্ষতার সঙ্গে, কতোটা যোগ্যতার সঙ্গে, কতোটা ইতিবাচকতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছি। বৃহত্তর পরিসরে যে শিল্প আমরা পৌঁছে দিচ্ছি তা কতোটুকু অতীত ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তা কতোটুকু আমাদের উন্নত সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারছে? যদি তা না নয় তাহলে আমাদের শিল্পজগতের মানগত অবস্থান নিয়ে কিন্তু সংশয় তৈরি হতে বাধ্য।

বিকল্প মিডিয়াগুলো যতোই বিশৃঙ্খলা, যতোই হযবরল অবস্থা তৈরি করুক এগুলো কিন্তু আমাদের ভিন্ন ভাবনার প্রয়াস তৈরিরও সুযোগ করে দিচ্ছে এ কথা ভুললেও চলবে না।

বিশ্বায়ন মূলত যে ছয়টি মূল থিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত তার অন্যতম এর তত্ত্বাবধায়কহীনতা। অর্থাৎ এটি কেউ নিয়ন্ত্রণ করবে না। কথাটিতে আংশিক সত্যতা রয়েছে। ঘুড়ি আছে, নাটাই নেই। এ কথা কি বিশ্বাস্য? আর নাটাইবিহীন ঘুড়ি কি উড়বে? মুখ থুবড়ে পড়বে না? এখানেও নাটাই আছে। তবে দৃশ্যমান নয়। অদৃশ্য।

বাজারই এর নিয়ন্ত্রক। আগেই বলেছি প্রতিযোগিতাই এর মূল ভিত্তি। মুনাফাই এর একমাত্র লক্ষ্য। বাণিজ্যই এর একমাত্র আরাধ্য। ভোগ আর ভোক্তাই তার মূল সূত্র। আর সব নস্যি। তো গণমাধ্যমগুলো এই মুনাফার যোগান কোথা থেকে পাবে? উৎস তাদের বিজ্ঞাপন। আর এর জন্যে দরকার সস্তা বিনোদন। তাই আজ আমরা সবদিকেই দেখি অতি সস্তার জয়জয়কার।

শিল্প, সাহিত্য থেকে শুরু করে সংস্কৃতির প্রতিটি পর্যায় সস্তার করুণ দশায় পতিত। অথচ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত কবিতার কি কাজ? এ হেন পরিস্থিতি থেকে কবিতার মুক্তি কোথায়?

বিশ্বায়ন যখন আমাদের এককেন্দ্রিক, একঘেঁয়ে ও একচেটিয়ার আড়তে বসিয়ে মুনাফার সরলাংক শেখায় কবিতা তখন সংবেদী ও উন্মুক্ততার শপথে জীবনকে আলোর ইশারা দেয়। কবিতা হলো সেই শিল্প যা একজন কবি জীবন নিংড়ে, আজীবন রক্ত ঝরিয়ে, বেদনার ক্ষতকে আরো উস্কে দিয়ে যন্ত্রণার শত ঝর্ণাকে ঝরাতে থাকেন তার প্রতি পংক্তিতে। কবি তার অতীন্দ্রিয় প্রজ্ঞায় যে অস্তিÍত্বের স্মারক রচনা করেন তাতে মেশে কবির গরিমা, ভাবনার অতুলনীয় সৌরভ।

নয়াউদারতাবাদের হাত ধরে নয়ামাধ্যমগুলো যখন সবকিছুকে খাটো করে আনে, হালকা করে, সস্তা করে কবিতা তখন আলোর উৎসারণকে বোধগম্য করে রঙবেরঙের আনন্দলোক তৈরি করে। কবিতা মহত্ত্বের কথা বলে। মহত্তমকে তুলে ধরতে জীবন বাজি রাখে। কবিতা এক নিরন্তরভ্রমণ। একটা শ্রমসাধ্য প্রয়াস। প্রেরণা ও সংগীত কবিতার প্রাণ হলেও এটি বড়ো পরিশ্রমের কাজ। চিন্তা, ভাবনা, সংশোধন, সংযোজন বিয়োজন ইত্যাদি কেবল প্রেরণা দ্বারা সিদ্ধ হয় না। এর জন্যে দরকার নিরলস পরিশ্রম আর সাধনা।
কবির জগত মহান, সুন্দর এবং নির্জন। সে নির্জনতা ভিক্ষা করে। কিন্তু এখন চারদিকে বড্ডো হৈচৈ,কলোরব। চারিদিক হযবররল।বিশৃঙ্খল। কবিতার জন্যে যে মনোসংযোগের সুযোগ দরকার তার ঘাটতি প্রবল।তন্ময়তার জন্যে যে অবসর দরকার তা তাকে দিচ্ছে কে?
এ যুগে, এ সময়ে আমরা ছিন্নমূল নই। কিন্তু শিকড়হীন এবং বিচ্ছিন্ন। আমরা পৃথিবীরই বাসিন্দা। আবার আমরা যেন কোথাও নেই। আমরা এক গোলকধাঁধায় নিপতিত। আমরা পুঁজির আরাধ্য ভোগ্য জীবনকে মেনে নিয়ে এক পরম পুলকিত যাপনে অভ্যস্ত। আবার একইসঙ্গে কাব্যিক আত্মার সৌন্দর্য অবলোকনে আগ্রহী। এ দুটি বিষয় বিপরীতমুখী। কবিতা কোন মিনিপ্যাক নয়। কিংবা ঘোষিত কোন প্যাকেজ। এটি ওয়ানটাইমের কোন বিষয় নয়। এটি আজীবনের দৌড়। সৎ ও সততার নিবিড়তাকে আশ্রয় করে কবিতা। কবিতা জীবন অভিজ্ঞতার সরলমত বয়ান। কবিতা সময়কে শিল্প করে তোলার নাম।

কবিতায় কোন মেকি, কোন ভড়ংএর স্থান নেই। কবিতা বলিষ্ঠ। কবিতা চিরন্তন। কবিতা শক্তিমান। এ শক্তির প্রবল ঢেউ যে কোন অপব্যবস্থাকে রুখতে সক্ষম। কারণ সে কোন ব্যবস্থাকেই সমর্থন করে না। সে সব সময়ই নতুন ব্যবস্থা চায়। নতুন কিছু করতে চায়। এর মানে কবিতা প্রবলভাবে ভবিষ্যমুখী। সে আগামীর সত্যকে বর্তমান করে তোলে।বর্তমানকে আগামী। তাই একটি আগুনমুখো কবিতাই হতে পারে পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। যেমনটা একসময়ে হতো। আজ হয়তো কবিতার সে রাজত্ব নেই। বিশ্বয়ানের বাঁধন ছেঁড়া ঢেউয়ে সে আজ তলিয়ে যেতে বসেছে। তবে এটি একটি পরিবর্তন মাত্র। আমরা এক অনির্ণিত পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে ভেসে যাচ্ছি। এই পরিবর্তনের ঢেউই হয়তো নতুন সময়কে আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারবে। পারবে ভেসে যাওয়াকে আটকিয়ে আমাদেরকে মৌনতার গৃহে স্থিততা দিতে।

কবিতার ইতিহাস আর মানবের ইতিহাস সমান্তরাল। মানবমুক্তি মানেই কবিতার মুক্তি। কারণ মানুষ অসীম সৃষ্টিশীল। নবমানবতাবাদের হাত ধরেই মানুষই পারে সকল অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে যেতে। কবিতাও তেমনি। কবিতার বিষয় বাস্তব। কিন্তু তার সারবত্তা অতিক্রম করে যায় সমূহ বাস্তবতাকেই। কবিতা সঞ্চারিত হয় প্রবলভাবে।

বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি ভাষার প্রভাবশালী কবি, নাট্যকার ও সমালোচক টমাস স্টেয়ার্নস এলিয়ট সংক্ষেপে টিএস এলিয়ট(জন্ম: ২৬ সেপ্টেম্বর,১৮৮৮/মৃত্যু: ৪ জানুয়ারি, ১৯৬৫) বলেছেন, ‘কবিতা বোধগম্য হবার আগেই সঞ্চারিত হয়।’

সঞ্চারণের এ ক্ষমতা নিয়েই কবিতা স্বদেশ, দেশের মানুষ ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সকল বিরুদ্ধস্রোতের গলা কেটে দিতে পারে। আন্তর্জাতিকতাবাদ ও জাতীয়তাবাদী ধারার বিপরীত বাস্তবতায় নির্মাণ করতে পারে এক অগ্রগামী আগামীর পথ।
এ জন্যে দরকার প্রবল যোগ্যতাসম্পন্ন অসীম সৃষ্টিশীল এক দায়, যার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে সত্যিকার কোন কবি তার সচেতনতা ও উপলদ্ধিকে সকল অসততা ও অন্ধকার থেকে দূরে রেখে নির্মাণ করে যাবে বস্তুবিশ্বের সকল প্রকার।

‘কবি হওয়া একটি অবস্থা, পেশা নয়’-বলেছেন মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট( জন্ম: ২৬ মার্চ, ১৮৭৪/মৃত্যু: ২৯ জানুয়ারি, ১৯৬৩)। পেশা না হলেও কবি যখন পেশাদারিত্বের সঙ্গেই কাজটি করবেন এবং সকল অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়েই চৈতন্যের বৃহত্তম মাত্রায় তার চিন্তাকে প্রতিফলিত করবেন তখন যে বিশ্বের দ্বার উন্মুক্ত হবে তা হবে অখণ্ড, কোন কোলাজ নয়। তা হবে পূর্ণ দৃশ্যচিত্র। অসম্পূর্ণ কোন খণ্ডচিত্র নয়।
প্রকৃত কবির স্বর মানবতার পক্ষে, সত্যের পক্ষে। তিনি বিবেকের কন্ঠস্বর। সকল মানবের সব ধরনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি নির্মাণ করতে পারেন এক অতুলনীয় ভুবন। যেখানে শব্দগুলো বিশুদ্ধ, চৈতন্যের মাত্রা ছুঁয়ে যায় অসীমতার অনন্ত চুড়া। অন্য সকলের অন্ধত্বকে তিনি তার দিব্যদৃষ্টি দিয়ে ঘুচাতে পারেন। এ সক্ষমতা রয়েছে কেবল একজন প্রকৃত কবির।

তাই কবিতার মুক্তি তখনই সম্ভব যখন কবি তার প্রকৃত ও সাহসী সত্তা নিয়ে, তার দিব্যজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, বর্তমানের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগু পিছু না ভেবেই অগ্রণী ভূমিকায় থেকে লড়াইয়ে নামবেন।
প্রশ্ন হলো, নামবেন কি?

তথ্যসূত্র:
১. ইন্টারনেট
২.নন্দনতত্ত্ব -জিজ্ঞাসা: তরুণ মুখোপাধ্যায়
৩. নব মানবতাবাদ: মানবেন্দ্রনাথ রায়
৪. রূপ, রস ও সুন্দর: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
৫. Globalization: The Human Consequences by Zygmunt Bauman
৬. ভবিষ্যতের কবিতা: শ্রীঅরবিন্দ

 

জুনান নাশিত

জুনান নাশিত কবিতা, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্যে বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করে চলেছেন।

কবি হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে। জুনানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুমারী পাথর’ দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাচিত সেরা দশ গ্রন্থের তালিকায় স্থান করে নেয়।

স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। ক্লাস নাইন থেকে কবিতার প্রতি তিনি পুরোপুরি মগ্ন হয়ে পড়েন। তবে তারও আগে ছড়ার জগতে ছিল তাঁর বিচরণ। মূলত কবিতা লিখলেও প্রবন্ধের প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর আগ্রহ। প্রকাশিত হয়েছে একাধিক প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থ। ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন ছড়া, গল্প ও উপন্যাস। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬টি।
জুনান নাশিত অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর জন্ম কুমিল্লায়। বর্তমানে বসবাস ঢাকায়।
সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতাও তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বর্তমানে জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

পুরস্কার ও সম্মাননা
• মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক — ২০১৬
• মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার — ২০২৩
• হিউম্যান রাইটস এওয়ার্ড ২০২৬

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top