ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স: কালের নায়ক (পর্ব-১)


গাজী তানজিয়া

Scattering unbeholden
Its aerial hue – P.B. Shelley

ছড়িয়ে আছে না দেখা তার
বায়বীয় রঙ। – পি. বি. শেলী

 

বারুইয়ার বাড়ির কাচারীঘরে মুখ কালো করে বসে আছেন কালী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। তাকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তিনি অভিযুক্ত না কি অভিযোগকারী। চোখ মুখ উদ্ভ্রান্তের মতো। কিছু বলতে চাইছেন। তবে যে বিষয়ে বলবেন সে বিষয়টা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন। যদি অভিযোগটা সঠিক না হয়! তাহলে মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য গ্রামের অত্যন্ত প্রভাবশালী জোতদার হেদায়েত আলী ক্ষেপে যেতে পারেন তার ওপরে। তবে সম্পূর্ণ অনুমানের ওপরে ভর করে তিনি এখানে আসেন নি। কিছুটা প্রমাণও আছে। প্রমাণ ততটা জোরালো না বিধায়, আর হেদায়েত আলীর সঙ্গে তাদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলে তিনি এসে নানা কথা জুড়ে দিলেন। দেশ গ্রামের কথা। দেশের রাজনীতির হালচাল, রাষ্ট্র পরিচালকদের মতিগতি, নানা বিষয়ে আলোচনা শেষেও ঠাকুর মশায় যখন উঠছেন না তখন হেদায়েত আলীর সন্দেহ হলো। তিনি জানতে চাইলেন, ঠাকুর মশায় কি বিশেষ কিছু বলতে আসছেন?

ঠাকুর মশায় যেন হালে পানি পেলেন। তিনি ইতস্তত করে তার অভিযোগের কথা জানালেন।

কথাটা শোনামাত্র হেদায়েত আলী হুঙ্কার ছুড়লেন, ছফা কোথায়? ছফা! তাকে এক্ষুনি ধরে নিয়ে আসো।

গৃহকর্তার এমন হুঙ্কারে ভেতর বাড়িতে ব্যস্ততা দেখা দিল। ভেতর বাড়ি, বাহির বাড়ি, উঠোন, পুকুরধার, কাচারীঘর সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খোঁজা চলতে তাকে। কিন্তু তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়!

ঠাকুর মশায় বাড়িতে পা রাখা মাত্র ছফা ছুট। নালিশ ফালিশ যা করার করে চলে যাক, তারপর মুখ কালো করে চুপি চুপি বাড়ি ঢুকে গেলেই হবে একসময়। দু’এক দিনের জন্য আব্বাজানের সামনে না পড়লেই হলো। বাড়িতে যখন ছফার খোঁজে সবাই অস্থির সে তখন নারকেল গাছের মাথায় টিয়া পাখির বাচ্চা খোঁজায় ব্যস্ত। পাখির বাচ্চা পুষে তাকে মানুষের মতো বোল শেখানোতে তার ভীষণ আনন্দ। কিন্তু সেবার যখন ময়না পাখিটা বোল শেখার শুরুতেই মরে গেল। ছফার সে কী কান্না। মৃত পাখিটাকে সে মানুষের মতো করে কবর দিয়েছিল।

সে যাক, এবার একটা টিয়া পাখি পেয়ে গেলে বেশ হবে।

বাড়ির সব জায়গা খোঁজাখুঁজি শেষ হলে বড়চাচী বিরক্তি ঝরিয়ে বললেন, যে দুরন্ত ছেলে! তাকে কি এই সময় বাড়িতে পাওয়া যায়!

একথা শোনার পর হেদায়েত আলী মহা বিরক্ত হয়ে ভেতর বাড়িতে ছফার শোবার ঘরে ঢুকে তার বইপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলেন। ছেলে পড়ে মাত্র ক্লাস থ্রিতে কিন্তু বইয়ের বহরও তো কম না! বাংলা ছাড়াও আরবী-ফার্সী-উর্দু কিতাব এক গাদা। এর মধ্যে ওই বই দুটো কোথায়, নিরক্ষর বাবা সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না। অগত্যা তিনি কাচারীঘরে ফিরে গিয়ে ঠাকুর মশায়কে বললেন, আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না কোন বই, আপনি বরং খুঁজে দেখেন না একটু।

কালী মন্দিরের পুরোহিতকে নিয়ে ভেতর বাড়িতে ঢুকতে দেখে যারপরনাই অবাক হলেন ছফার বড়চাচী। তাই সুযোগ বুঝে চাপা স্বরে ছফার বাবার কাছে জানতে চাইলেন, ‘তা ঘটনা কি এমন ঘটেছে যে, ঠাকুর মশায়কে অন্দরে টেনে আনতে হলো!’

ঠাকুর মশায় ততক্ষণে বই দুটো পেয়ে গেছেন।

হেদায়েত আলী ততোধিক বিরক্ত হয়ে বললেন, কি আর হবে ছেলে আমার রৌশন্যা চোরাকেও হার মানিয়েছে, মন্দিরে গিয়ে রামায়ণ-মহাভারত চুরি করে এনেছে।
হা খোদা! এ কেমন কথা। দেশে এতো জিনিস থাকতে ও রামায়ণ-মহাভারত চুরি করতে যাবে কেন?

কেন যাবে কে জানে? যে ছেলের ১৮ পারা কোরান মুখস্ত, ‌উর্দু-ফার্সী কিতাব পড়ে সে কেন রামায়ণ-মহাভারত চুরি করতে গেল, সেকথা ওই ‘রৌশন্যা’ ফিরলে তারে জিজ্ঞেস কইরেন।

বই দুটো হাতে নিয়ে ঠাকুর মশায়কে দূর থেকে চলে যেতে দেখল ছফা। মনে মনে ভীষণ অভিমান হলো তার। সেই তো বই দুটো সে ছুঁয়ে দিয়েছে, ঘরে এনে তার অন্যান্য বইয়ের সাথে একসাথে রেখেছে এখন ও দুটো অপবিত্র হয়নি? অথচ সে যখন বই দুটো ঠাকুর মশায়ের কাছে পড়ার জন্য নিতে চাইল তখন অপবিত্র হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে বই দুটো দিলেন না তিনি। প্রতিদিন বিকেলবেলা পাশের পাড়ার মনমোহন আচার্যের বুড়ি মা যখন গাছের তলায় বসে সংস্কৃতে ওই বই পড়েন, আর বাংলায় তরজমা করে বুঝিয়ে দেন সবাইকে তখন কী সুন্দরই না লাগে শুনতে! কী মজার মজার অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাহিনী। মনমোহন আচার্যের মায়ের কাছে চাইলে পাওয়া যাবে না, তাই একদিন পুরোহিত মশাইর কাছে বই দুটো পড়তে চেয়েছিল সে। কিন্তু তার যে কী ভয় অপবিত্র হওয়ার! আর এখন, বাড়ি ফিরলেই তাকে আব্বাজানের হাতে মার খেতে হবে।

শুধু মার খেলে কথা ছিল না। মারের সাথে সাথে তাকে ‘রৌশন্যা’ উপাধিও পেতে হলো বাবার কাছে।

‘রৌশন্যা’ খেতাব পাওয়া কোনো সুখের খবর না। কারণ রৌশন্যা ছিল ওই এলাকার কুখ্যাত সিঁদেল চোরের নাম। এই খেতাব পাওয়ার অপমান ছফা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। এর একটা মোক্ষম জবাব দিতেই হবে ঠাকুর মশায়কে।

ঠাকুর মশায় ঘুঘু দেখেছে কিন্তু তার ফাঁদ দেখেনি। কি করলে ঠাকুর মশায়কে জব্দ করা যায় দিনভর ভাবতে লাগল সে। এবং এক সময় পেয়েও গেল। খুঁজে পেতে সে কোথা থেকে একটা গরুর বড়সড় হাড় এনে মন্দিরে টাঙিয়ে দিল।

মন্দিরে গরুর হাড় ঝুলতে দেখে ঠাকুরমশাইর চোখ তো চড়কগাছ। গো মুত্র, গঙ্গাজল তাবৎ জিনিস ছিটালেও এই অশুচিতা থেকে মুক্তি পাওয়া ভার।

উপায়ান্তর না দেখে তিনি আবারও ছুটে গেলেন ছফার বাবার কাছে। গিয়ে সরাসরি পুত্রের অপকর্মের প্রতিবাদে নালিশ ঠুকে দিলেন।

হেদায়েত আলী যারপরনাই লজ্জিত হয়ে নিজে গিয়ে হাড়খানা মন্দির থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন। তবে পুত্রের ওপর রাগ তিনি এবার দমন করতে পারলেন না। তাকে এই অপরাধের জন্য বেদম মার দিলেন।

 

দুই

ছেলেকে পিটিয়ে হেদায়েত আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলে সারাদিনই নানা রকম দুষ্টুমি করে চলেছে। সে জন্য তিনি হুমকি-ধমকি দিলেও মার দেননি কখনো। কিন্তু ছেলে যে এহেন এক কাণ্ড করে বসবে সেটা তিনি ভাবতেও পারেন নি। ওই দুই খানা বই তার কাছে চাইলে তিনি কি কিনে দিতেন না? আবার না’ও দিতে পারতেন, যে বই মন্দিরে পড়া হয় সেই বই কি তিনি সাহস করে তার ছেলেকে কিনে দিতে পারতেন! যদি ছেলের ভিন ধর্মে মতি হয়! তবে মন্দিরের গায়ে গরুর হাড্ডি ঝুলিয়ে রাখাও তো এক মস্ত অপরাধ। এই কয়েক বছর আগেই নোয়াখালীতে হিন্দু মুসলমানে চরম দাঙ্গা হয়ে গেল। স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী এসে ঘুরে গেলেন। এই গ্রামে হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক ভালো। ধর্ম নিয়ে রেশারেশি নেই। কিন্তু আগুন জ্বলতে কতক্ষণ। দেশটা যেন প্রতি মুহূর্তে জ্বলার জন্য মুখিয়ে আছে। আর যেখানে এমন একটা দেশলাইয়ের খোঁচাই যথেষ্ট। কী যে করবেন তিনি তার এই অতি দুরন্ত ছেলেকে নিয়ে!

এই ছেলে হেদায়েত আলীর ভীষণ আদরের। বলতে গেলে অনেকটা ‘সাধনার ধন’। তাছাড়া তাঁর জন্মটা তাদের পরিবারের জন্য সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে। ছফার জন্মের পর থেকে তার ব্যবসায় লাভ হচ্ছে বেশ। এই কয় বছরে তিনি ক্রমাগত ধন-সম্পত্তি অর্জন করে বাবার রেখে যাওয়া মাত্র দুই কানি জমি থেকে মধ্যম শ্রেণীর জোতদারে পরিণত হয়েছেন। এর পেছনে তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধিও বিশেষ ভাবে কাজ করেছে।

বাবার রেখে যাওয়া মাত্র দুই কানি জমির ওপর ভর করে তারা দুই ভাই জীবন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। এটুকু জমির ওপর ভরসা করে তাদের পক্ষে বেঁচে থাকা কোনো মতে সম্ভব ছিল না। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা কাঠমিস্ত্রির কাজকে বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কাঠের যাবতীয় কাজ তারা করতেন। ঘর-বাড়ি, চেয়ার-টেবিল, খাট-পালং, সিন্দুক, লাঙ্গল সবই তারা তৈরী করতেন। তারা কাঠের কাজের এমন এক ধরনের টেকনিক আয়ত্ব করেছিলেন যে, তাদের তৈরী সিন্দুক কোনো ডাকাতের পক্ষে ভাঙ্গা সম্ভব হতো না। ঘরবাড়ি এবং ফার্নিচারের কাজ ওই গ্রামদেশে তেমন একটা জুটত না তবে যে জিনিসটার চাহিদা প্রায় সারা বছরই থাকত যেটা হলো, লাঙ্গল। বড় ভাইজান লাঙ্গল বানানোর কাজটিকে একমাত্র পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন এবং চাহিদাও ছিল। একটি লাঙ্গল তিনি দু’টাকা দামে বিক্রি করতেন। লাঙ্গলের স্থানীয় নাম হলো বারুই। বড় ভাইজান লাঙ্গল বানানোর কাজটা একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নেয়াতে বাড়িটার নাম হয়ে গেল বারুইয়ার বাড়ি। এই নামকরণটা অদ্ভুত ঠেকল তাঁর কাছে। তাঁদের সাত-আট পুরুষ আগে কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি যাঁর নাম শ্রীমল্ল। তাঁর নামে তাদের পরিবারের বিশেষ করে বংশের পরিচয় নির্দিষ্ট হয়েছিল। এতোদিন সবাই তাদের শ্রীমল্ল বংশ নামেই ডাকত। তবে শ্রীমল্ল কেন নাম করেছিলেন ব্যবসায়ী হিসেবে, ধনী হিসেবে না কি জীবন সংগ্রামে বা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সফল ভাবে টিকে যাওয়া এক যোদ্ধা হিসেবে সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে তিনি যে কোনো এক কারণে বিখ্যাত হয়েছিলেন এই গ্রামের ভেতরে, এটা বোঝা যায়। পরবর্তীকালে এই বংশের লোকেরা নিজেদের নামের আগে সওদাগর শব্দটা বসাতেন বংশগত পরিচয় (হেরিডিটিকাল আইডেনটিটি) বোঝাতে। বংশপরিক্রমায় শেষ দিকের পুরুষেরা নামের আগে কোনো উপাধি যোগ না করলেও বারুই উপাধিটা তাদের কাছে খুব সুখকর ছিল না। তাই হেদায়েত আলী ওই কাজ ছেড়ে দিয়ে কিভাবে পরিবারের আয় রোজগার বাড়ানো যায় সেদিকে মন দিয়েছিলেন। তিনি কৃষি কাজের দিকে বেশি করে মনোযোগী হয়েছিলেন। পাশাপাশি একটা ব্যবসায়ী-ধ্যানধারণাও তাঁর মধ্যে কাজ করত। তিনি জানতেন, উৎপাদিত শাক-সবজি মৌসুমের আগে বাজারে তুলতে পারলে তার দাম বেশি পাওয়া যায়। তাই তিনি শাক-সবজির চাষটা অগ্রিম করে বেশি অর্থ মুনাফা করতেন। আরেকটা কাজ করে তিনি বিজ্ঞের পরিচয় দিয়েছিলেন। তখন টিনের বাড়ির চল তেমন ছিল না, হয়ত কোনো ধনী লোকের ঘরের চালে টিনের ব্যবহার হয়ে থাকবে। তখন ছনের ছাউনির বাড়িই ছিল বেশি। কেউ কেউ ধানের খড়কে ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করত। ছনের ব্যবহারটা এত বেশি ছিল যে তিনি ছনের ব্যবসার দিকে ঝুঁকেছিলেন। প্রতিবছর পাহাড়ের ছন নিলাম ডেকে সেই ছন বাড়তি মূল্যে বিক্রি করে বেশ টাকাকড়ির মালিক হয়ে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে এনেছিলেন। এবং ক্রমান্বয়ে তিনি মধ্যম শ্রেণীর জোতদারে পরিণত হয়েছেন। তবে মানুষ হিসেবে তাকে সর্বাংশেই প্রথম শ্রেণীর বলতে হবে। কারণ তিনি তাঁর অর্জিত সম্পত্তি নিজ পরিশ্রম ও মেধার দ্বারা অর্জন করলেও তার ভাইকে বঞ্চিত করেন নি। তিনি তাঁর ভাইকে অর্থ-সম্পদের অর্ধেকের অংশীদার করেছিলেন। যার কারণে দুই ভাইয়ের মধ্যে সু-সম্পর্ক বজায় আছে। তবে সেই সময়ে তার মনে একটা দুঃখ বোধও ছিল। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে একটা কন্যা অকালে প্রাণ হারিয়েছে। অন্য দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে ছেলেটা রাতকানা মেয়েটা পাগলা স্বভাবের। স্ত্রীর যে শারীরিক অবস্থা তাতে তিনি যে আবার সন্তানসম্ভবা হতে পারবেন, আর পারলেও যে একটা সুস্থ পুত্র সন্তানের জম্ম দিবেন সে ব্যাপারে কিছুই আশা করা যায় না। তার পরও এই নম্র-ভদ্র এবং বিনয়ী স্বভাবের স্ত্রীকে কিছুতেই ঘরে সতিন এনে দিয়ে কষ্ট দিতে চাননি তিনি। তার পরও ঈশ্বরের কী অপার খেলা তিনি তার এই স্ত্রীকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। অজানা রোগে ভুগে তিনি অচিরেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েন। তখন তাঁর মামাত বোন আসিয়া একটা কন্যা সন্তান নিয়ে বিধবা অবস্থায় বাবার বাড়ি ফিরে এসেছেন। মামা ছিলেন সাধক প্রকৃতির। তাঁর বংশে বান্দরবানের কোনো এক সম্পর্কিত রাজকন্যার রক্তের সম্পর্ক থাকাতে ওই পরিবারকে ‘নয়া রাজার বংশ’ বলা হত। সেই মামাত বোন আসিয়া খাতুনের সঙ্গেই তার দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়। দ্বিতীয় বিয়ের পর তাদের একে একে সাতটি কন্যা সন্তানের জন্মের পর ছফার জম্ম হয়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সারা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা। ভারতবর্ষের মানুষের কাছে এই যুদ্ধটা যেন গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া। পরাধীন দেশ, সে আবার কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে! তার কোনো পক্ষ বিপক্ষ থাকার কথা না। শুরুতে যুদ্ধটা ইউরোপে সীমাবদ্ধ ছিল। ধীরে ধীরে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। ভারতবর্ষ পরাধীন হলেও এবং সে দেশের অধিবাসীদের এই যুদ্ধের সাথে কোনো লেনাদেনা না থাকলেও শাসকশ্রেণী অবিভক্ত ভারতকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে নিল। কারণ এত বড় উপনিবেশটির সম্পদ যুদ্ধের কাজে লাগাতে হবে। ভারতবর্ষের সৈনিকদের রণক্ষেত্রে পাঠাতে হবে কামানের খাদ্য হিসেবে। আমেরিকার যুদ্ধে যোগদান ও জাপান সিঙ্গাপুর দখল করার পর এদেশেও সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। পূর্ব রণাঙ্গনে জাপানিদের হাতে খুব মার খাচ্ছে ইংরেজরা। হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে কলোনিগুলো। রেঙ্গুন পতনের পর মনে হলো জাপানিরা এসে গেছে একেবারে দোরগোড়ায়। এরপর বৃটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কলকাতা দখলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। ইংরেজদের সাহায্য করার জন্য এসে গেছে আমেরিকা বাহিনী।

গ্রামে যুদ্ধের কোনো রেশ নেই। কামান বন্দুকের শব্দ নেই। তারপরও যুদ্ধের ধাক্কা এসে লেগেছে এই নিরীহ গ্রামগুলোতেও। প্রথম আঘাত এসেছে খাদ্যের ওপর। খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে সবখানে।

মহাযুদ্ধের দুর্যোগ একটা সাইক্লোনের মত পৃথিবীর সঙ্গে ভাগ্যাহত বাংলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষে মহামারীতে মানুষ মরছে- হাহাকার উঠছে চারিদিকে। দেশ জুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনও সাময়িকভাবে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ইংরেজ ও আমেরিকার যুদ্ধোদ্যম ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।

জাপানিরা আসছে, জাপানিরা আসছে! এই গুজব ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। জাপানের অগ্রগতি ইংরেজরা রুখতে পারবে না। রেঙ্গুন দখল করার পর জাপানী সৈন্য বাহিনী আসাম পেরিয়ে ঢুকবে চট্টগ্রামে। তাই সরকার থেকে পূর্ববঙ্গের চারটি জেলার সমস্ত ধান-চাল সরিয়ে নেয়া হলো। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার জন্য বাজেয়াপ্ত করা হলো বহু নৌকা। কয়েক হাজার নৌকা একেবারে ধ্বংসই করে দেয়া হলো। মানুষগুলো অনেকটা গৃহবন্দি হয়ে পড়ল। তারা কীভাবে জীবন চালাবে সে চিন্তা সরকারের নেই। এরকম কৃত্রিম অভাবের সময়ই শুরু হয় কালো বাজারের রমরমা। মজুতদারদের অসাধুতায় চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। যুদ্ধের আগে চালের মণ ছিল ছয় থেকে সাত টাকা। কোনো বছর আট টাকায় উঠলে লোকে বলত দেশটার কী হলো? সোনার ভরি পয়ত্রিশ টাকা চার আনা। বেয়াল্লিশ সালের ডিসেম্বরে চালের মণ তের থেকে চৌদ্দ টাকা, পরবর্তী এক বছরের মধ্যে তা পঞ্চাশ-ষাট, চট্টগ্রামে আশি টাকা ঢাকায় ১০৫ টাকায় পৌঁছে যায়।

চট্টগ্রাম-ফেনী-গৌহাটি-ডিগবয়-খড়গপুর থেকে মেদিনীপুর জুড়ে যুদ্ধের সে এক বিচিত্র বেষ্টনী। এক অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সর্বত্র যেন এক মাকড়সার জাল বিছিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে খাদ্যের অভাবে হাহাকার। শহরে শহরে ক্ষুধার্ত কঙ্কালসার ভিক্ষুকদের কাতর প্রার্থনা, ‘একটু ফ্যান দ্যান’, একটু উচ্ছিষ্ট, এঁটোকাঁটার জন্য। দোকানে চালের বদলে ক্ষুদ, তার সঙ্গে ইট-কাঁকর। এরই মধ্যে বড় রাস্তা দিয়ে চলে মিলিটারি কনভয়। জিপ-ট্যাঙ্ক, ওয়েপন ক্যারিয়ার। মাথার ওপরে ওড়ে ইংরেজ আর আমেরিকান যুদ্ধ বিমান। হাটে বাজারে চালের দোকানের সামনে অনেক মানুষ লাইন দিয়ে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে চাল নেই। কিছু চাল কালোবাজারে বিক্রি হয়। বড়লোকেরা কেনে সেই চাল, গরীব, মধ্যবিত্তরা দিন কাটায় চালের বদলে আলু খেয়ে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে আলুর বাজার বাজেয়াপ্ত হয় নি, সেই যা মানুষের ভরসা। অন্যদিকে সৈন্যদের জন্য প্রচুর খাদ্য গুদামবন্দি রয়েছে, সিংহলে রপ্তানি হচ্ছে চাল। অথচ এদেশের অভুক্ত মানুষেরা সব জেনেও লুটতরাজ শুরু করেনি। তারা এই সব কিছুর জন্য বিধাতাকে দোষ দেয়, কপাল চাপড়ায়। এ দেশের মানুষেরা এখনো কেড়ে খেতে শেখে নাই। এই সব মূঢ়, ম্লান, মূক মুখে কোনো ভাষা নাই। কে দেবে সেই ভাষা, সেই নেতৃত্ব কোথায় এখানে?

এমনই এক সময়ে জন্ম নেয় হেদায়েত আলীর কনিষ্ঠ পুত্র। তিনি তার নাম রাখলেন আহমদ ছফা। দুর্ভিক্ষের আঁচ গাছবাড়িয়া গ্রামে কিছুটা লাগলেও তাদের বাড়িতে লাগেনি। ধান তাদের জমিতেই নিজেরা চাষ করেন। তথাপি তার নানাবিধ ব্যবসায়েরও দিন দিন উন্নতি হচ্ছিল ছফার জন্মের পর থেকে।

ঐ সময়ে বাংলায় মুসলিমলীগ মিনিষ্ট্রি। কিছুদিন আগে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। সেখানে স্থলাভিষিক্ত খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি দুর্ভিক্ষ সামলানোর কোনো পদক্ষেপই নিতে পারছেন না। এর মধ্যে আবার হিন্দু মুসলমানের মাঝখানে ফাটল ক্রমশ বাড়ছে।

হেদায়েত আলী ছেলেবেলায় নিজে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। গ্রামে তখন কোনো স্কুল ছিল না ছাড়াও পাশের গাঁয়ে গিয়ে লেখাপড়া করার মতো আর্থিক সঙ্গতিও তাদের ছিল না। কিন্তু হেদায়েত আলীর ইচ্ছা তিনি তার ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষিত করবেন। তাদের তিনি লেখাপড়া শেখাবেন। আর সে জন্যই তিনি নিজ উদ্যোগে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণের পাশাপাশি বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। বড় ছেলেটা রাতকানা হওয়ায় সে বেশিদূর পড়তে পারেনি তবে লেখা পড়ায় তারও আগ্রহ কম না। সে ‘পদ্মাবতী’, ‘শহীদে কারবালা’, ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান’এর মুখস্ত বলতে পারে। সে যাই হোক, তার এই কনিষ্ঠ ছেলেকে তিনি মনের মতো করে গড়বেন। তাদের গ্রাম গাছবাড়িয়ায় তেমন কোনো বড় মাপের পণ্ডিত না থাকলেও মাত্র আড়াই মাইল দূরে আবুল ফজল সাহেবের বাড়ি। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের বাড়ি পাঁচ মাইল দূরে। তাছাড়া বাড়ির পাঁচ সাত মাইলের মধ্যে নেলীসেন গুপ্তা, মাওলানা মানিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এবং বহু গুণী ব্যক্তির জম্মস্থান। সেখানে তার ছেলে শিক্ষিত হবে না, হতেই পারে না। তবে যুদ্ধুটা বাধিয়েছে এক জ্বালা, দেশের বলতে গেলে বিশ্বজুড়ে এমন অস্থিরতা বিরাজ করলে কার ভবিষ্যৎ যে কি হবে কে জানে! দেশ জুড়ে চলছে দুর্ভিক্ষ।

 

তিন

পকেটে দেয়াশলাই নিয়ে ঘুরছে ছফা। দেয়াশলাইটা সঙ্গে থাকার একটা সুবিধা আছে, যখন তখন কাজে লেগে যায়।

সেদিন সে শুনছিল কথাটা। তাকে প্রতিদিন বিকেলবেলা বাংলা ও ইংরেজি পড়াতে আসেন জগদীশ স্যার। জগদীশ স্যার সেদিন আব্বাজানকে বলছিলেন,
ঢাকায় তো আগুন লেগে গেল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে।

শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খাঁ দাবী মানতে বাধ্য হলো?

এ দাবী না মেনে ওদের উপায় ছিল না। যে আগুন সবার ভেতরে ভেতরে সেই আগুন যখন দাবানলের মতো ছড়ায় তখন আর স্বৈরশাসকের কোনো উপায় থাকে না।
ছফার মনের মধ্যে কথাটা শুধু ঘুরপাক খেতে থাকে। ‘আগুন ভেতরে ভেতরে’। তার মানে মানুষের ভেতরে আগুন থাকে! তাই সেদিন স্যারের কাছে পড়তে বসে জিজ্ঞেস করল, মানুষের মধ্যে আগুন কীভাবে থাকে স্যার?

থাকে-যখন বড় হবা তখন বুঝবা।

এখন বলেন না স্যার, দেখি বুঝি কি না।

বুঝবি ব্যাটা বুঝবি, কিছুদিন যাক সবই বুঝতে পারবি, এখন পড় মন দিয়ে।

সেদিন পড়ায় কিছুতেই মন বসছিল না তার। ঘুরে ফিরে সেই আগুন এসে ঘুরপাক খায় তার মনের ভিতরে।

রাষ্ট্রভাষা কি স্যার?

রাষ্ট্রভাষা হলো, যে ভাষা রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা। একটা দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষাই হওয়া উচিৎ ওই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনার ভাষা বুঝলি?

আমরা তো সবাই বাংলায় কথা বলি স্যার, তাহলে বাংলাই কি আমাদের রাষ্ট্রভাষা?

দুঃখ তো সেইখানেই ব্যাটা! পাঞ্জাবী শাসকেরা বলে এখন থেকে উর্দু হবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা। সবাইকে উর্দুতে কথা বলতে হবে। লেখাপড়া করতে হবে। অফিসের কাগজ-পত্র সব হবে উর্দুতে।

সবাইকে উর্দূতে কথা বলতে হবে!

অনেকটা বিষণ্ন মুখে স্যার বললেন, হু।

ছফা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল, উর্দুভাষা সে কিছুটা শিখেছে বটে, মৌলভী সাহেবও জানেন কিছু কিছু। কিন্তু কাউকে তো সে উর্দুতে কথা বলতে দেখে না। এমন কি তার আব্বাজানও তো উর্দুভাষা জানে না। স্কুলের বন্ধুরা কেউ জানে না, আশেপাশে কেউ, কেউ না। আর সেই ভাষায় সবাইকে কথা বলতে হলে কি করে চলবে?

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত সেই ১৯৪৮ সালের শুরুর দিক থেকে। দেশ বিভাগের পর ১৯৫৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণ-পরিষদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধীদল দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রথম প্রস্তাবটিতে বৎসরে অন্তত একবার ঢাকায় পাকিস্তান গণ-পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল ভাষা বিষয়ক। এটিতে উর্দু এবং ইংরেজির সাথে বাংলাকেও গণ-পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন কংগ্রেস সদস্য পূর্ব বাংলার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবটি ২৪ শে ফেব্রুয়ারী তারিখে আলোচিত হয় এবং তমিজুদ্দীন খান সেটির বিরোধিতা করার পর পরিষদ কর্তৃক তা বাতিল হয়ে যায়। এবং পরদিন গণ-পরিষদে তুমুল বির্তকের ঝড় উঠলে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই প্রস্তাব তোলাই ভুল হয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটি জীবন মরণ সমস্যা…।’ অর্থাৎ এই ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়।

গণ-পরিষদে কংগ্রেস দলের সেক্রেটারি-রাজকুমার চক্রবর্তী প্রস্তাবটির সমর্থনে বলেন, ‘উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই কথ্য ভাষা নয়। তা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের উপরতলার কিছু সংখ্যক মানুষের ভাষা। পূর্ব বাঙলা এমনিতেই কেন্দ্রীয় রাজধানী করাচী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত, তার উপর এখন তাদের ঘাড়ে একটা ভাষা আবার চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। একে গণতন্ত্র বলে না। আসলে এ হলো অন্যান্যদের ওপর উচ্চ শ্রেণীর আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা। বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্য কোনো চাপ দিচ্ছি না। আমরা শুধু চাই পরিষদের সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি। ইংরেজিকে যদি সে মর্যাদা দেওয়া হয় তাহলে বাংলা ভাষাও সে মর্যাদার অধিকারী।’

কিন্তু মোজাহের এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী গজনফর আলী খান প্রস্তাবটিতে বিরোধিতা করে বলেন, ‘পাকিস্তানে একটিমাত্র সাধারণ ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হচ্ছে উর্দু। আমি আশা করি যে অচিরেই সমস্ত পাকিস্তানি ভালভাবে উর্দু শিক্ষা করে উর্দুতে কথাবার্তা বলতে সক্ষম হবে।’

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর এমন আচরণে বিস্মিত হয়ে তখন সকল প্রধান প্রধান দৈনিক গুলোতে সম্পাদকীয় লেখা হয়। এর মধ্যে দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, অমৃতবাজার, যুগান্তর, স্বাধীনতা ও আনন্দবাজার প্রধান।

দৈনিক আনন্দবাজার ‘পাকিস্তানের গণতন্ত্র’ শীর্ষক এক দীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যার এক অংশে লেখা হয়, ‘‘…পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মিঃ লিয়াকত আলী ঘোষণা করিয়াছেন যে পাকিস্তান ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ অতত্রব ইহার রাষ্ট্রভাষা বা গণপরিষদের আলোচনার ভাষা ‘মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষা’ ছাড়া আর কিছুই হইতে পারে না। মিঃ লিয়াকত আলীর মতে উর্দুই হলো মুসলিম রাষ্ট্রভাষা। তারপরও যে ধর্মভেদ ও সম্প্রদায়ভেদ আছে এরূপ কিম্ভুতকিমাকার যুক্তি এ পর্যন্ত কদাচিৎ শোনা গিয়াছে; বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাষ্ট্র ধর্মের দ্বারা চিহ্নিত করিবার চেষ্টাই বাতুলতা, তাহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভাষার ওপর পর্যন্ত ধর্মের সীলমোহর লাগাইয়া দিতে চাহিতেছেন। ভাষার পরিচয় স্থান হিসাবেই হইয়া থাকে ও স্থান হিসাবেই ভাষার প্রাধান্য ঘটিয়া থাকে। ইহার সহিত ধর্মের সম্বন্ধ কোথা হইতে আসিল? ‘মুসলমান রাষ্ট্র’ হইলেই তাহার ভাষা উর্দু হইবে কেন? তুরস্ক, আরব, পারস্য, আফগানিস্তান মুসলমান প্রধান এবং মুসলমান শাসিত রাষ্ট্র। তাহারা কি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিয়াছে। না প্রত্যেকের দেশীয় ভাষাকেই সেই মর্যাদা দিয়েছে?’’

এবং এর পরপরই রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি উপদলীয় কমিটি গঠিত হয়। এবং ভাষা আন্দোলন ভালোভাবে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করার পূর্ব পর্যন্ত উপদলীয় নেতারা প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র এবং অন্যান্য কর্মীদের সাথে যোগাযোগের জন্যে মাঝে মাঝে সফর শুরু করেন।

উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলা ভাষা বিরোধী চক্রান্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাকে ধ্বংস করার অন্যতম উপায় হিসেবে তাঁরা বাংলা ভাষার আরবি হরফ প্রবর্তনের উদ্যোগ ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমানই ছিলেন এই হরফ পরিবর্তন প্রচেষ্টার দার্শনিক এবং মূল প্রবক্তা।

কেন্দ্রীয় শিক্ষা দফতরের উদ্যেগে ১৮ই এপ্রিল ১৯৫০ থেকে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় মোট ২০টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদেরকে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়।

প্রত্যেক শিক্ষা কেন্দ্রে ২৫ থেকে ৩৫ জন ছাত্র শিক্ষা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেন এবং ছয় মাসকাল তারা ওই সব কেন্দ্রে শিক্ষা লাভে নিযুক্ত থাকে*।

না এটা চলতে পারে না।

কি চলতে পারে না?

উর্দুভাষা তো কেউ জানে না স্যার।

তুই বুঝতে পারছিস, যে এটা চলতে পারে না। এটা একধরনের জুলুম। এটা অন্যায় আর এই যে অন্যায়টা তুই মেনে নিতে পারছিস না বা নিতে চাইছিস না এটাই স্পিরিট। এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আগুন। এখন বুঝতে পারছিস কাকে বলে ভেতরের আগুন? আর এই ভেতরের আগুনই যখন বাইরে জ্বলে উঠবে তখন হবে দাবানল। সংগ্রাম-শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

ছফা অতসব শক্ত শক্ত কথা বোঝে না, সে বোঝে জ্বালাতে হবে। ভেতরের আগুনকে বাইরে জ্বালাতে হবে। কোথায় কোন ঢাকায় হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন তাদের গ্রামে তার কোনো আঁচ লাগেনি। তবে স্কুলে আজ সবাইকে জানিয়েছেন জগদীশ স্যার। অন্য সব স্যাররাও ছিলেন। ছাত্ররা মিলে আজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য মিছিল করেছে। মিছিলে গিয়েছে সেও। সেখানেই সে টের পেয়েছে আগুন। উত্তাপ আছে, তীব্রতা আছে, তেজ আছে একেই কি বলে ভেতরের আগুন! কিন্তু সেই আগুনে আশ মেটেনি ছফার। সব সময় মনে হচ্ছে জ্বলতে হবে- কিছু একটা জ্বালাতে হবে। ভাবতে ভাবতে মতলেব মুন্সির খোলেনের পাশ থেকে যাওয়ার সময় খড়ের গাদায় দেশলাইয়ের একটা জ্বলন্ত কাঠি ছুড়ে দিল সে। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল স্তূপীকৃত খড়। সেই আগুন দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল ছফার। আচ্ছা আগুন দেখলে তার এতো আনন্দ হয় কেন?

মুহূর্তে হৈহৈ আওয়াজ করতে করতে একটা লম্বা তল্লা বাঁশ নিয়ে ছুটে এলো মতলেব মুন্সি ।

কে লাগল আগুন- কে লাগাল? কোন ….পুত আমার এই সর্বনাশ করল। ভূতগ্রস্তের মতো ছুটছে সে উঠোনের এ মাথা থেকে ও মাথা।

মুন্সির অমন অবস্থা দেখে ছফার মনে হলো ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছে। আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। সে ওখান থেকে ছুটে পালাল।

তাণ্ডবের মধ্যেও ছফাকে ছুটতে দেখে মতলেব মুন্সি তার খোলেনে পুড়তে থাকা খড়ের গাদা নেভানোর চেষ্টা না করে সোজা হাঁটা ধরল তাদের বাড়ির দিকে।

এই রে! আজ বাড়ি ফিরলেই আব্বাজানের হাতে মার খেতে হবে। কেন যে সে আগুনটা জ্বালাতে গেল। তার বিদ্রোহ তার প্রতিবাদতো ওর বিরুদ্ধে না তবে আগুন কেন জ্বালাল! সে কারো ক্ষতিও করতে চায়নি। কারো ক্ষতি করা তার উদ্দেশ্য না। কিন্তু ওই আগুন জ্বালাতে ভীষণ ভালো লাগে যে তার! হাতের ভেতরটা কেমন নিশপিশ করে আগুন জ্বালাবার জন্য। এই ব্যাটা দেশলাইটাই যত নষ্টের গোড়া। আবার একে হাতছাড়া করতেও ইচ্ছে করে না। এই দেশলাইটা ছিল বলেইতো সেদিন ওই জিনিসটার স্বাদ নিতে পেরেছিল সে। আর এই দেশলাইটা আছে বলেই তার সঙ্গে সারাক্ষণ থাকে বলেই এখনো দু একদিন দু একটা টান দিতে পারে। সে যে বিড়ি খাওয়ার এমন একটা সুযোগ পেয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি আগে। দাদাভাইর বিয়ে দিতে গিয়ে যে সে এক রাতের মধ্যে পুরুষ মানুষের একটা অভ্যাস আয়ত্ব করে ফেলবে ভাবতেই পারে নি।

দাদাভাইর বিয়ে ছিল ফাল্গুন মাসে। দাদাভাই ধুতির ওপরে পাঞ্জাবি তার ওপরে আচকান ও কাঁধে অনাবশ্যক একটা শাল ও মাথায় আরো অনাবশ্যক একটা থোবাওয়ালা ফেজটুপি পরে কাহারদের পিঠে চড়ে বিয়ে করতে গিয়েছিল সাতবাড়িয়া গ্রামে। সাথে এক বহর বর যাত্রী। তারা যাচ্ছিল হেঁটে। একটু যারা বয়স্ক তারা গরুর গাড়িতে।

বিয়ে বাড়ি গিয়ে দেখে মহা ধুমধাম। অন্য সবার বিয়ের থেকে তার ভাইয়ের বিয়েটা যেন একটু বেশি জাঁকজমকপূর্ণ মনে হলো। একের পর এক বাজি পোড়ানো হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই বাজি পোড়ানো দেখতে ভীড় করেছে। তারা-বাজি, পটকা-বাজি আরো কত কত বাজি। ঘট্-বাজি বলে একটা বাজি পোড়ানো হলো, যেটা সে আগে কখনো দেখেনি। মাটির মধ্যে একটা মাটির ঘট পুঁতে দেয়া হলো সেই ঘটের মুখে একটা সলতে। সেই সলতেটাতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই এক দীর্ঘ আলোক রশ্মি শত শত তারার মতো ওপরের দিকে উঠে ছড়িয়ে গেল। খুশিতে সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলো। বাজিওয়ালা এরপর খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করল, এ তো কিছু না, এবার পোড়ানো হবে গোলা-বাজি। গোলা-বাজির সামনে এই ঘট্-বাজি তো কিছুই না। উপস্থিত ছোট্ট বালক বালিকারা তোমরা একটু তফাতে সরে দাড়াও। এই বাজি পোড়া দূর থেইকে দেখতে হয়।

ছফার এই প্রথম ওই বাজিওয়ালাকে ভীষণ ঈর্ষা হতে লাগল। বড় হলে সে এমন একজন বাজিওয়ালা হবে মনে মনে ঠিক করে ফেলল। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাজিওয়ালার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। সে খানিক পরপরই হুংকার ছুড়ছে, তফাত, তফাত যাও সবাই। এই বাজি চালনা কোনো যেন তেন লোকের কাজ না। এটা করতে কেলি লাগে, বিশেষ ধরনের কেরামতি ছাড়া এইটা পোড়ানো এতো সহজ না।

লোকটার কথা এবং হাতের উঠানামার মধ্যে আগুনের ছোঁয়া লাগা মাত্রই এক বিকট আওয়াজ উঠল। চিৎকার ছোটাছুটি ধোঁয়া আর গর্জনে চারদিক কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। একটা গোলকার অগ্নিকুণ্ড প্রায় আকাশ ছুঁয়ে গেল। আর তার মধ্যে থেকে বাজিওয়ালাকে উদ্ধার করা হলো প্রায় অচেতন অবস্থায়। বাজি এবং আগুনের সময়ের সামান্য হের ফেরের কারণে ঘটে গেছে দুর্ঘটনাটা। বেচারা বাজিওয়ালার দুটো আঙ্গুল উধাও। তাকে নিয়ে একদল লোক ছুটল কবরেজ বাড়িতে। অন্যদিকে বিয়ে বাড়ির উৎসব চলছে একই নিয়মে। ওদিকে একজন লোক যে তাদেরই বিনোদন দিতে আঙ্গুল হারিয়েছে এটা কারো কাছে তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে আকাশের মেঘ নিয়ে। ফাল্গুন মাসে ঝড় বৃষ্টি হওয়ার কথা না। ঝড়বৃষ্টি সাধারণত হয় চৈত্রের শেষ দিকে। কিন্তু ওইদিন বিয়ে দেখে, না কি জন্য আকাশ কালো মেঘে ভারি হয়ে গেছে। দূরের পাহাড়গুলো সব ধূসর ছায়ায় আচ্ছন্ন। যেন বড় বড় কয়লার ঢিবি। এই অবস্থায় নতুন বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরবে কী করে তারা! অন্যদিকে এতজন বরযাত্রী নিয়ে থাকাও যায় না। এতোগুলো লোকের থাকা খাওয়া এসব যাবতীয় চিন্তা ভাবনার মধ্যে প্রচণ্ড বেগে বাতাস শুরু হলো, কিছুক্ষণের মধ্যে বড় বড় ফোটায় টিনের চালে চিড়বিড়য়ে শব্দ করে বৃষ্টি নামল। বরযাত্রীরা সবাই প্যাণ্ডেল ছেড়ে যে যার মতো এক এক ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। ছফা তার আরো ২ একজন সঙ্গীসাথী নিয়ে আশ্রয় নিল রান্নাঘরের পেছনে ঢেকিঘরে। ঢেকিঘরের ওপরে চাল আছে কিন্তু চারপাশে কোনো বেড়া নেই। মাটির মেঝে খটখটে শুকনো আর পরিস্কার। সেখানেই ঢেকির মাঝ বরাবর বসল সে। সঙ্গীরা ঢেকির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টির ছাঁট আসছে ক্রমাগত। সঙ্গে ঠাণ্ডা বাতাস। একজন বলল, একটা বিড়ি খেতে পারলে বেশ হতো, বিড়ি তো আছে কিন্তু ম্যাচ্? এখন আগুন কোথায় পাব।

ছফার তখন দেশলাইয়ের কথা মনে পড়ল। বলল, আগুন দিতে পারি তবে-।

তবে কী?

বয়সে ওরা তার থেকে চার-পাঁচ বছরের বড় হলেও সাহস করে ছফা বলেই ফেলল, যদি আমাকে টান দিতে দাও তবে।

সেই আগুনের শর্তেই ছফার মুখে উঠে এলো প্রথম জ্বলন্ত আগুন। সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে ….।

মতলেব মুন্সির তো সত্যি সত্যি নালিশ করতে তাদের বাড়ির দিকেই যাচ্ছে। সে যেভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে পারে, না জানি আজ তার কথা আব্বাজানের কাছে কী কী বলবে সে!

এখন যে কী করে! ভীষণ অন্যায় হয়ে গেছে।ঝোঁকের মাথায় আগা-মাথা কিছু না ভেবেই কেন যে সে..! এখন কী-হবে!

বাড়ি ফেরা যাবে না। ওই দূর পাহাড়ে পালিয়ে যেতে হবে। মাত্র তো এখান থেকে মাইল দেড়েক দূর। কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি ওখানে। কী আছে সেখানে বাঘ-ভাল্লুক? আরো হিংস্র কোনো জন্তু যা পাওয়া মাত্র চিবিয়ে খাবে তাকে। বড়চাচী ও আব্বাজানের কাছে সে শুনেছে তাদের একজন পূর্বপুরুষ যাঁর নাম আজিজ ফকির। তিনি আল্লাহর ধ্যান করতেন ওই জঙ্গলে থেকে। তিনি কখনো বিয়ে ও ঘর-সংসার করেন নাই। সবাই বলে ওই জঙ্গলের হিংস্র পশুপাখী তাঁর বশ মেনেছিল। এমনকি তিনি নাকি বাঘও পুষতেন। তিনি বাঘের গলায় ডোলা ঝুলিয়ে বরুমতি নদীতে মাছ ধরতেন আর সেই মাছ বাঘ-কুলকে নিয়ে ভাগাভাগি করে খেতেন। সেও তাঁর মতো হবে। এই লোকালয়, এতো শাসন বাঁধন এসব ছিন্ন করে সেও ওই দূর পাহাড়ে চলে যাবে আজিজ ফকিরের মতো। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে সে পশুপাখিদের মতো…। তারপর কি? তারপর আর কিছু ভাবতে পারে না ছফা। ওই জঙ্গলে তার পক্ষে এই মুহূর্তে যাওয়া সম্ভব না। একটু ভয় ভয়ও করছে। কিন্তু আব্বাজান! আব্বাজান তো তাকে আজ ছাড়বে না। বাড়ি ফিরলে তো..। ছফার মনে হঠাৎ আলোর ঝিলিক খেলে যায়। দাদাভাই, একমাত্র দাদা ভাই পারে তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।

 

চার

কাচারীর বারান্দায় বসে হুঁকো টানছিলেন হেদায়েত আলী। এমন সময় দেখলেন দূর থেকে কেউ ছুটে আসছে তাদের বাড়ির দিকে- অনেকটা বিলাপ করতে করতে। মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল। কার আবার কী অঘটন ঘটল!

‘গেল রে আমার সব গেল রে। আমার সব কিছু পুড়ে ছারখার হয়ে গেল রে।’ বলতে বলতে ছুটে আসছে মতলেব মুন্সি। তাদের বাড়ির দুই তিনটা বাড়ি পরই তার ঘর।

কী হয়েছে মুন্সি অমন পাগলের মতো করছ কেন?

কী করব কন? ছফা আমার সব জ্বালাইয়া পুড়াইয়া দিল। এখন এক বছর ধইরে আমার হালের বলদ, গাই গরু খাবে কী? এই বর্ষায় আমার ঘরের চাল দিয়ে যে ঝুরঝুরইয়ে পানি পড়বে তা থামাবো কি দিয়ে।

কেন কী হইছে? হইছে কি বলবা তো। চেয়ার থেকে নেমে মোতালেব মুন্সির হাত ধরলেন হেদায়েত আলী।

ছফা যে খোলেনে (ধান শুকাবার উঠোন) আমার খড়ের গাদায় আগুন ধরায়ে দিল।

কও কি! স্তম্ভিত হেদায়েত আলী।

এহন আমার কী হবে কন ভাইজান। এমন ছাওয়াল আমি জীবনে দেহি নাই। কতা নেই বাত্তা নেই আগুন লাগাইয়ে দেয়। মতলেব তার ক্ষতির তুলনায় বেশি গড়াগড়ি ও হা-হুতাশ করতে লাগল।

হেদায়েত আলী বুঝতে পারেন, কিন্তু তার পরেও দোষ তো তার ছেলেরই বেশি।

ঠিক আছে মতলেব কাইন্দ না। বছরে তোমার যা খড়কুটো লাগবে তার দাম আমি দিয়ে দিচ্ছি।

এ ছেলে দেখি তাকে একদিন সমাজচ্যুত মানুষে পরিণত করবে। তার টাকা পয়সা ও দানখয়রাতের বহরের কারণে এখনো লোকে তার মুখের ওপর কিছু বলতে সাহস পায় না বটে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে কতদিন! সেদিনও সে সোলেমানের সবজিখেতের বেড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। সেই ক্ষতিপূরণও তাকে দিতে হলো। এ কী অলুক্ষুণে ছেলে তার! জিজ্ঞেস করলে কিছুতেই স্বীকার করবে না। দিন দিন তার মিথ্যা বলার অভ্যাস বেড়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময় রোগে-ভোগা এই ছেলেকে তিনি প্রহারও করতে পারেন না। কী করবেন একে নিয়ে! একে আর এখানে রাখা যাবে না। হোস্টেলে পাঠিয়ে দিতে হবে। এমনিতেও দিতে হতো তবে এখনি যাক। সেই ভাল।

হাইস্কুলে পড়ার জন্য হোক আর অতিরিক্ত দুষ্টুমির কারণে হোক ছফাকে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে যেতে হলো। তবে হাইস্কুলে বাড়িতে থেকেও পড়া যেত। এতোদিন সে তাই করে আসছিল। পথে যেতে একটু উৎপাত হতো এই যা। তবে উৎপাতটা খুব অস্বস্তিকর ছিল তার জন্য। হাইস্কুলের কড়া নিয়ম লুঙ্গি পরে স্কুলে ঢোকা যাবে না। অন্য দিকে ছফা প্যান্ট পরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারে না। তাকে যে দেখে সেই একটু দূর থেকে নানা মন্তব্য ছুড়ে দেয়। এমনিতে সে মহা দুষ্ট। তার কোনো ব্যাপারে কেউ কিছু বলে পার পেয়ে যেতে পারে না কিন্তু এই ব্যাপারটায় সেও একটু বিব্রত বোধ করে। কারণ গ্রামের লোকেদের সংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সে একধরনের শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করে। দেশে এক সময় সবার মধ্যে ইংরেজ তাড়াও মনোভাব তীব্র হয়ে উঠেছিল। ইংরেজদের শোষণ বিশেষ করে মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রতি (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা) তাদের কোনো বিশেষ দৃষ্টি না থাকলেও কথায় কথায় ল এন্ড অর্ডার মেনে চলতে মানুষকে বাধ্য করতে তারা যে নিপীড়ন চালাত এর প্রতিবাদে গোটা দেশ ভিতরে ভিতরে ফেটে পড়েছিল। এক পর্যায়ে ইংরেজরা এদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেও তাদের রেখে যাওয়া কিছু সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রতি এলিট এবং মধ্যবিত্তের একধরনের আকর্ষণ থেকে যায়। এবং তাদের মধ্যে একে ধরে রাখার এক তীব্র আকাঙ্খা কাজ করে যাচ্ছে সারাক্ষণ। কিন্তু দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের  আচার-আচরণ ও পোষাক-আশাকের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল। ব্যাপারটা ছফা বুঝতে পারত, আর তাই যখন তার প্যান্ট-শার্ট মূলত পাজামার ওপর শার্ট পরে স্কুলে যাওয়ার সময় ক্ষেতে কর্মরত কৃষকেরা ঠাট্টা করত, তাকে নিয়ে মজা করত, নানা বিদ্রূপ ছুড়ে দিত তখন সে এসব মুখ বুজে মেনে নিত। সে যখন হেঁটে যেত তখন তাকে যখন লোকজন বলত, ‘ধন মিয়ার ছেলে সাহেব বনার চেষ্টা করতাছে’। তখন তার খুব খারাপ লাগত। এই বুঝি সে শুধুমাত্র এই পোষাকটার কারণে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এই বিচ্ছিন্নতা তাকে ব্যথিত করত, তবে ছোট্ট ছফা এই নিয়ে যে লজ্জিতও হতো না তা তো না। তাই সে এই পোষাক আর পরবে না ভেবে নিল। তবে সে প্যান্ট ছাড়া লুঙ্গি পরে স্কুলে গেলে শিক্ষকরা তাকে ছাড় দিলেন না। তাদের মতে স্কুলের একটা ডিসিপ্লিন আছে, সেটা তাকে পালন করতেই হবে। নইলে তার হাইস্কুলে পড়ার দরকার নেই। ছফা পড়ল এক বিপদে। বিপদ বলতে বিপদ! পাজামা পরলে স্কুলে যাওয়া আসার পথে টিটকারি আর না পরলে স্কুলে ঢুকতে পারবে না। এখন সে কী পরে! অবশেষে শিক্ষকদের মন রক্ষার জন্য সে একটা পথ বের করল। বাড়ি থেকে বেরুবার সময় সে প্যান্টটা একটা ঝোলায় ভরে নেয় যাতে কেউ দেখতে না পায়। আর যখন সে তার এলাকার ত্রিসীমানা পেরিয়ে নিজেকে বিপদমুক্ত মনে করে, তখন লুঙ্গিটা ছেড়ে প্যান্ট পরে নেয়। লুঙ্গি আবার ঝোলায়। এভাবে একটা ঝোলাই বা কতদিন বহন করা যায়! তারচেয়ে বরং তার হোস্টেলে থাকাই ভাল। (ক্রমশ)

 

*  সূত্র- পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি -বদরুদ্দীন উমর, প্রথম খণ্ড/২য় খণ্ড/ ৩য় খণ্ড

Facebook Comments

One Comment:

  1. amazing, very nice !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *