গল্প:খালাস


গাজী তানজিয়া

পুলিশ ভ্যানের শক্ত পাতের বেঞ্চিতে বসে থানায় যেতে যেতে ভাবছিলাম, রিমান্ডে ঠিক কতটা টর্চার করা হয়!

ব্যাপারটা যতো সহজে সমাধান করতে পারব বলে ভাবছিলাম, ততটা সহজ বোধ হয় হলো না। সব কাজের মধ্যেই একটা কিছু ফাঁকফোকর থেকেই যাবে । আর সেই অনাকাঙ্খিত ছিদ্রগুলো থাকে বলেই ফোকর গলিয়ে ঢুকে পড়তে পারে পুলিশ। নইলে চেষ্টাতো কম করিনি। খবরটা পাওয়ামাত্র ট্যুর-ফ্যুর সব ফেলে ছুটে এসেছিলাম..।

তালা খুলে ঘরে ঢুকতেই উৎকট তীব্র গন্ধে নাক ঝাঁঝিয়ে উঠল। সঙ্গে হৃৎপিণ্ডটাও এতো দাপটের সঙ্গে লাফাতে লাগল যেন ছুটে বেরিয়ে আসবে। গন্ধের উৎসটা মনে হয় পূব দিকেই। তাই আমি ঘরে ঢুকে অন্য কোনো দিকে না তাকিয়েই সোজা ড্রইংরুম ধরে, ডাইনিং রুম এর বাঁক পেরিয়ে চলে গেলাম সর্ব পূবের ঘরে।

আমি বাড়িতে না থাকলেও রান্নাঘরের একটা জানালা খোলা থাকে। যে কোনো ধরনের গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে এই সতর্কব্যবস্থা সব সময়ই নেয়া হয়। আমি সব ব্যপারেই খুব বেশি সতর্ক। তাই ছোটো খাটো বা বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনাই এখনো আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ঘরের বাইরে যাবার সময় আমি কম করে হলেও তিনবার চেক করি ঘরের চাবি নিয়েছি কিনা সাথে। দরজা-জানালা সব ঠিকঠাক মতো লক করেছি কি না ইত্যাদি। কিন্তু আমার মতো অতি সতর্ক মানুষও যে এমন বিপাকে ফেঁসে যেতে পারে, সেটা আমার নিজের বেলায় না ঘটলে অন্তত বিশ্বাস করতাম না। এমনকি আমি বাথরুমে ঢুকলেও সাবানমাখা অবস্থায় হঠাৎ করে ট্যাঙ্কের পানি শেষ হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় এক বালতি পানি আগে থেকে ধরে রিজার্ভ করে রেখে দেই। সেই আমার বেলাতেই যে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটবে ভাবাই যায় না! এ ব্যাপারে আমি নিজেকে খুব একটা দোষারোপ করতে পারি না। আবার সব চেয়ে বড় দোষটা আমাকেই দিতে হয়। আমি মাসখানিকের জন্যে বাড়ির বাইরে যাচ্ছিলাম। এই সময়ে বন্ধু গুল্লু এসে ধরে বসল।

প্লিজ দোস্ত, তুইতো বাড়িতে থাকবি না, ভাবছিলাম…,সেই কয়টা দিন..! ধ্যাৎ! তোর ট্যুরটাও এমন সময় পড়ল…।

কি বলবি সহজ করে বলতো, এতো প্যাচাস না।

না মানে তুইতো জানোস আমার অবস্থা। কবিতা লিইখ্যাতো পেটই চলে না তার ওপরে বাড়ি ভাড়া! অনেকদিন ধইরা বাকি পড়ছে। তাই বাড়িওয়ালা দুই দিনের নোটিসে দিল নামাইয়া। এখন কি করি! এখন আমি যাই কই? ঢাকায় না থাকতে পারলে যে আমার নতুন চাকরিটাও আর থাকবে না।

থাক থাক আর বলতে হবে না। তুই কি করে ভাবলি বলতো গুল্লু, আমি একা একটা মেয়ে এ বাড়িতে থাকি তার মধ্যে তোকে এসে থাকতে এলাও করব!

না ঠিক সেটা ভাইবা আসিনাই দোস্ত। আজিজের অড্ডায় শুনলাম যে তুমি ট্যুরে যাইতাছ; তাই ভাবলাম এই ব্লাঙ্ক সময়টার জন্য যদি উপকার কর।

কিন্তু আমিতো আমার হাউজমেডকে ছুটি দিয়ে দিছি।

নো প্রবলেম দোস্ত, আমার ওসব লাগে না।

আমি এমনিতে ভীষণ শুচিবায়ুগ্রস্ত। এই কদিনে ও বাড়ির যে কি অবস্থা করবে ভাবতেই আমার অন্তরাত্মা শিউরে উঠল। আবার আমার ভেতরে বাস করে যে একজন খুব সহানুভূতিশীল মানুষ, সে বলে উঠল, ওকে থাকবি নো প্রবলেম। কথাটা বলে ফেলে আবার নিজেকেই নিজে একটা থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করল। আজকাল কতো ধরনের ক্রাইম হয়…। কিন্তু গুল্লু ও ধরনের ছেলে না। কিন্তু…, ও যে হতচ্ছাড়া বাড়িঘরের অবস্থা যে কি করে রাখবে! আবার পরক্ষণেই ঐ শুচিবায়ুগ্রস্ত সত্তাটাকেও কড়া চোখ রাঙানি দিলাম একটা।

কিন্তু সেই থাপ্পড়টা যে এখন ১০০% পাওনা হয়ে গেছে তাতে আর সন্দেহ নাই। মানুষ মানুষকে এই রকম বিপদে ফেলে! এমন একটা মামলা ঝুলিয়ে দিয়ে গেল! এখন এটাকে খালাস করব কি ভাবে?

রান্না ঘরে ঢুকে এগজস্ট ফ্যানটা ছেড়ে দিলাম। জানালাটা একটু ভেজানো ছিল, পুরোটা খুলে দিলাম। খুলে একটু নিঃশ্বাস নিতেই মাথার বুদ্ধির জটটা খুলে গেল। আরে, এই গন্ধ বাইরে বের হলেতো মুশকিল। এই রক্ত মাংশের গলিত গন্ধ। শুধু শেয়াল কুকুর না মানুষেরও এই গন্ধ অতি পরিচিত। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা ইতোমধ্যেই একবার উকি দিয়ে নাক কুঁচকে জানালাটা ভেজিয়ে দিলেন। আর একটু পরই যে পুলিশ নিয়ে এসে হাজির হবেন না সেকথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমি দ্রুত জানালা ও এগজস্ট ফ্যান বন্ধ করে দিলাম। কিন্ত্ত এখন! আমার সারা ফ্ল্যাটময় ছড়িয়ে আছে ঐ অসহ্য গা-গুলানো গন্ধ। আমার ভীষণ ভয় করতে লাগল। এর মধ্যে যদি কেউ আমার সাথে দেখা করতে বাড়িতে এসে পড়ে! তখন কি হবে? কী বলব আমি? কিন্তু এই জিনিস আমি সরাবই বা কিভাবে? নীচের তলায় রয়েছে এ্যাপার্টমেণ্টের গাদা গাদা সিকিউরিটি আর ড্রাইভারেরা।

না, কিছুতেই না। আমার একার পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব হবে না। কিন্ত্ত কে! কে এখন আমাকে হেল্প করবে?

গুল্লুকে আমার এখন প্রায় খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। শালা! কেউ কারো এই রকম ক্ষতি করে? একদিকে এই দুঃশ্চিন্তা অন্যদিকে তীব্র গন্ধে আমার গা গুলোতে শুরু করেছে। মাথাটা ভন ভন করে ঘুরছে ছাড়াও পেটের ভেতরের যাবতীয় পদার্থ সব ঠেলে বাইরে চলে আসতে চাইছে। আমি ছুটে বাথরুমে চলে গেলাম। উগরে দিলাম যাবতীয় জঞ্জাল। আর ঠিক তখনই আবিষ্কার করলাম বাথরুমে গন্ধটা কম। অগত্যা একটু ধাতস্থ হয়ে বসলাম ওখানে। কিন্তু এভাবেতো বাথরুমে বন্দি হয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। বুদ্ধি একটা বের করতেই হবে। এবং সেটা খুব দ্রুতই। কী করি, কী করি এখন! এমন সময় আমার ফোনে রিং বাজতে লাগল..।

ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে আমার কাজের ছেলে রণ্টু বলল, ম্যাডাম আপনি কি ফিরছেন? এখন আমি কাজে ফিরমু? তখন আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না ওকে কি বলব। ও এলে আমার উপকার হবে নাকি ক্ষতি? তাই বল্লাম, রণ্টু এখন আমি একটু ব্যস্ত আছি, তুই পরে ফোন দে।

এই ফাঁকে আমি বাথরুম থেকে ছুটে বাইরে এলাম এবং আবার সেই ঘরে। গিয়ে দেখলাম জিনিসটা কতটা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। রণ্টু আসলে আদৌ কিছু বুঝতে পারবে কি না। ও ছাড়া এই মুহূর্তে আমার আর কোনো উপায়ও নেই। গুল্লু শালা! ওকে ফোনেও পাচ্ছি না। অঘটন ঘটিয়ে দিয়ে কোথায় যে পালিয়েছে কে জানে! এর আগে অনেকেই আমাকে বলেছে, গুল্লুটা একটা মাফিয়া। ভান ধরে থাকে..।

কথাটা তখন বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি ঠাট্টা। আসলে বন্ধুদের প্রতি আমার অতিরিক্ত বিশ্বাস…, এখন আমাকে ডোবাতে বসেছে।

অগত্যা নাকে মুখে ভালো করে কাপড় জড়িয়ে রাজ্যের দোয়া-দরুদ সব পড়ে নিয়ে বন্ধ ডালাটা খুললাম। ডালার নীচের ভারি কাচের চার পাশের বর্ডার গুলো ছিল এ্যাশ কালারের। কিন্ত্ত এখন এগুলো কালো দেখাচ্ছে। কাচের নীচের ভেতরটাও বরফহীন গাঢ় কালো অন্ধকার। আচ্ছা এটা আমারতো ? আবারও একবার আমি বাইরের গেট-আপটা দেখে নিলাম। হ্যা এটাতো আমারই। কিন্তু ভেতরের কালারটা এমন চেঞ্জ হয়ে গেল কি করে? ধ্যাৎ, এসব নিয়ে কি এখন ভাববার সময় আছে? আমি বরং কাচের পাল্লাটা সরাই।

কাচের পাল্লাটা সরাতেই যা দেখলাম তাতে আতঙ্কে আমার চোখ আপনিতেই বন্ধ হয়ে গেল। হাঁটুসমান রক্তের ভেতরে ভাসছে সবকিছু। দেখব না দেখব না করেও দেখলাম। একটা কাটা পা, এক-জোড়া আধ খোলা চোখ..।

নাহ্ আমি আর কিছু দেখতে চাই না। আমি ঝপ করে ডালাটা বন্ধ করে দিলাম। ওঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এলাম নিজের ঘরে। গড়িয়ে পড়লাম বিছানায়, আমার বোধহয় সেন্স ছিল না। কতোক্ষণ ছিল না জানি না। তবে যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমি একজন কাউকে খুঁজছিলাম। হ্যা একজন কাউকে ভীষণ দরকার এখন। এঘরে রাতে একা থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিছুতেই না। তাই আমি আমার কাজের ছেলে রণ্টুকে ফোন করলাম।

রণ্টুর বয়স এখন ১৩/১৪ বছর হবে। বয়স কম হলেও সে যথেস্ট চালু। বুদ্ধিশুদ্ধি তুলনামূলকভাবে একটু বেশিই মনে হয়। তবে ও ছেলে ভালো। আমাকে খুব সম্মান করে। এই বিপদে সে আমাকে ছেড়ে যাবে বা এই বিশেষ ব্যাপারটা জনে জনে বলে বেড়াবে বলে মনে হয় না। তাই রণ্টুকেই ফোন করলাম।

রণ্টু ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এসে হাজির হলো। রণ্টু ফিরে আসার আগে সিকিউরিটি একবার ইণ্টারকমে ফোন করলে ভয়ে আমার আত্মা উড়ে যাবার জোগাড় হয়েছিলো।

অবশেষে রণ্টু এলো। সে ঘরে ঢুকতেই তাকে আমি বললাম, রণ্টু কেমন আছিসরে বাবা!

রণ্টু এই সম্বোধন শুনে মুখে কিছু না বললেও বিস্মিত ভঙ্গিতে তাকাল আমার দিকে। কারণ আমি সাধারণত বাবা, সোনা ডাকার মতো আদিখ্যেতা কারো সাথে করি না। আর তাছাড়া ওর আর আমার বয়সের যে পার্থক্য তাতে ‘ভাই’ ডাকটা চলে, কিন্ত্ত বাবা একটু বেশি হয়ে যায়। কিন্তু বিপদে পড়লে যে সবাইকে ‘বাবা’ ডাকতে ইচ্ছে করে এই প্রথম বুঝলাম। তাই মনের অজান্তেই ডাকটা বেরিয়ে গেছে।

রণ্টু ঘরে ঢুকে স্বাগত সম্ভাষণে একটু ভড়কে গেলেও এবার সে তার নিজের স্বভাবে ফিরে গিয়ে নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ম্যাডাম গন্ধ কিসের? ঘরে কি ইন্দুর মরছে নাকি?

এবার যেন আমার ধড়ে প্রাণ এলো, ইঁদুর! হ্যা ইঁদুর। কেউ যদি এর মধ্যে ঘরে ঢুকেও পড়ে তাকে অন্তত এই বলে নিবৃত্ত করা যাবে। ইঁদুর, তারও তো রক্ত মাংশের শরীর। অতঃপর আমি কিছু রাখঢাক ও গোপনটোপন করে রণ্টুকে ব্যপারটা বুঝিয়ে বলি। আগেই বলেছি রণ্টু ওর বয়সের তুলনায় একটু বেশি চালু।

সে এবার তার বড় বড় চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। তার এই হাসির অর্থ আমি জানি। অর্থাৎ সে কাজটা পারবে না বা করতে চাইছে না।

বললাম, পারবি না কেন? এটা এমন কি কঠিন কাজ? যাবতীয় সবকিছু টুকরা করাই দেখলাম। তুই জাস্ট শুরুতে পলিব্যাগে ঢোকাবি─ তারপর বস্তায় ঢুকিয়ে বস্তাটা লিফটে তুলে নিয়ে সোজা নীচে। তারপর খেজুরবাগান মসজিদের মোড়ে খামারবাড়ি পোস্টাপিশের পাশে যে বড় ডাস্টবিনটা আছে ওখানে রাতে ফেলে দিয়ে আসবি ব্যাস্। পারবি না?

যামু কি হাইটা?

কেন, রিকশায় যাবি।

রিকশা রাজি হইব?

রিকশাওয়ালা কি জানবে নাকি তুই কি নিয়ে যাচ্ছিস!

কেন গন্ধ!

বলবি ময়লা ফেলতে যাই।

বস্তা ভইরা!

কেন বস্তাভরা ময়লা হতে পারেনা? যে বাড়িতে বেশি মানুষ থাকে তাদের বস্তাভরা ময়লা হয় না?

না সেজন্যতো প্রতিদিন ঘরে ঘরে সিটি কর্পোরেশানের ক্লিনাররা যায়।

ঠিকতো, কথাটা আমার মনেই ছিল না। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম।

রণ্টুও আর কোনো কথা না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকে।

রাগে আমার গা জ্বলে যায়, মনে হয় কষে ওকে একটা থাপ্পড় দেই। কিন্তু না, এখন না। এখন কিছুতেই রাগ করা যাবে না। আমি মনে মনে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করতে থাকি।

ম্যাডাম একটা কাজ করলে হয় না?

কি কাজ?

আমি বরং একজন সুইপার ডাইকা আনি, সে এই জিনিস খালাস কইরা দিক।

সুইপার! মানে তুই সুইপার কোথায় পাবি? মনে মনে প্রমাদ গুনি আমি।

এইটা পাওন সোজা। এই যারা ময়লা নিতে আসে অরা। অফ টাইমে আইসা আমাগো কামডা কইরা দেবে।

ঝটিতে বললাম─ নো। এরপর বেশ শান্তভাবে বললাম, না─ মানে তুই কর না। সুইপারকে যে টাকাটা দিতাম সেটা না হয় তোকে দেব। ঘরের মধ্যে একটা সুইপার ডেকে আনব! তুই জানিস না আমার যে শুচিবায়ু। তার চেয়ে বরং তুই দে না বাপ! এবার রণ্টুর হাসিটা প্রায় কান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সে বলে, ঠিক আছে দিমুনে।

দিমুনে মানে কি? চল এক্ষুনি কাজে লেগে পড়ি। তার আগে তুই এক প্যাকেট ব্লিচিং পাউডার কিনে নিয়ে আয়। যাতে গন্ধটা কম ছড়ায়।

রণ্টু ব্লিচিং পাউডার কিনে এনে ছড়িয়ে দিলে গন্ধের ঝাঁঝটা একটু কমলেও গন্ধটা রয়েই গেল।

আমার বাড়ি থেকে ডাষ্টবিন পর্যন্ত রিকশাভাড়া পাঁচ টাকা কিন্ত্ত রণ্টু রিকশা একটা ঠিক করে নিয়ে এলো পঁচিশ টাকায়। এখন ও যা বলবে তাই-ই সই। আমার কিছু করার নেই। ওগুলো এ্যাপার্টমেণ্টের ডাস্টবিনে যেখানে সবার ময়লা জড়ো হয় সেখানেও ফেলার উপায় নেই। এর তীব্র গন্ধ ছাড়াও পরিমাণেও এতো বেশি যে!

রণ্টুকে যখন বস্তাসহ রিকশায় তুলে দিয়েছি তখন বাজে রাত ৯টা।

ওকে তুলে দিয়ে ঘরে ফিরে রাজ্যের দোয়া দরুদ পড়ছি , এমন সময় দরজায় বেল বাজার শব্দ। ইন্টারকম না─ বেল বাজছে।

যাক বাবা! তাহলে রণ্টুটা ফিরে এসেছে। ঘাড়ের ওপর থেকে বেওয়ারিশ লাশ নেমে যাবার অনুভূতি। সেটা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।

আবারও বেল বাজছে..।

আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম, কিন্তু একি! পুলিশ!

রাস্তার টহল পুলিশ রণ্টুকে তার বস্তাসমেত ধরে এনেছে।

রণ্টু যখন রিকশায় যাচ্ছিল তখন মোড়ের পুলিশ যখন গন্ধ পেয়ে জিজ্ঞেস করল বস্তায় কি? অমনি রণ্টু কোনো কথা না বলে রিকশা থেকে নেমে ভোঁ-দৌড়।

পুলিশও তার পিছু পিছু ধাওয়া করল, তখন আর যায় কই?

আমাকে ও রণ্টুকে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে থানার সেকেন্ড অফিসারের ঘরে।

সেকেন্ড অফিসার ভদ্রমহিলা বোধহয় কানে কম শোনেন। আমি যা বলছি তার কিছুই মনে হয় তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। একটা কটনবাড দিয়ে কান চুলকাচ্ছেন আর পেনসিলটা কিছুক্ষণ পর পর এক্সারসাইজ খাতার ওপর ঠুকছেন।

আমি তখন রিমান্ড নিয়ে ভীষণভাবে ভাবছি। আমার হাত ও পায়ের হাড্ডি-গুড্ডি গুলো অটোম্যাটিক ব্যথা করতে শুরু করেছে। আচ্ছা, এরা ঠিক কখন, কোন পর্যায়ে রিমান্ডে নিয়ে যায়? আদালত থেকে অর্ডার আসার পরে? নাকি তার আগেই একবার প্রাথমিক ধোলাই..।

সে যাই হোক, আমি আমার বিষয়টা খুলে বলে চুপচাপ বসে রইলাম। এছাড়া কিছু করারও নেই।

বস্তাটা তখন গেছে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে। অন্যদিকে রিমান্ডবিষয়ক রাজ্যের দুশ্চিন্তা এসে আমাকে ঘিরে ধরেছে। থানা পুলিশ বলে কথা! কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়াবে কে জানে?

তবে আমার ভাগ্যটা বোধহয় ভালো ছিল। বিশেষ রকম ভালো ছিলই বলতে হবে। লঘু পাপে গুরু দণ্ড পেতে হলো না। ভোর হবার আগেই ফরেনসিক বিভাগ থেকে রিপোর্ট এলো। পুলিশের রিপোর্ট এতো তাড়াতাড়ি আসার কথা না। কিন্ত্ত অতিরিক্ত দুর্গন্ধ এই কঠিন কাজটা সহজ করে দিয়েছে।

রিপোর্ট-এ স্পষ্ট লেখা আছে যে, ওগুলো কোনো বিপজ্জনক দ্রব্য নয়। ওগুলো স্রেফ পচে যাওয়া গরু, মুরগির মাংশ, রুই মাছ, ইলিশ মাছ ছিল।

কর্তব্যরত সেকেন্ড অফিসার এমন দুর্ধর্ষ অপরাধী হাত থেকে ফসকে যাওয়ায়-হতাশায় দ্বিগুণ রাগ নিয়ে তাকালেন আমার দিকে। ওগুলো মাছ-মাংশ ছিল আগে বললেই হতো!

বলেছিলাম তো, কেউ বিশ্বাস করল কই?

এতোগুলো মাছ-মাংশ প্রায় আধ মণেরও বেশি হবে। পঁচল কি ভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর তখন ঐ পুলিশ মহিলাকে দেবার কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাই বললাম, জানি না।

তবে কাণ্ডটা গুল্লুই ঘটিয়েছিল। ঘন ঘন লোডশেডিং-এর কারণে আমার ডীপ ফ্রীজটা মাঝে মাঝেই ঘড়ঘড় শব্দ করে ওঠে। এটা গুল্লুকে বলা হয়নি। তো একদিন সেই শব্দ শুনে গুল্লু নিজে নিজেই ফ্রিজ ঠিক করে বন্ধু কৃত্য করতে গিয়ে ফেলল নষ্ট করে। করবি তো কর সেই ফ্রিজ নষ্ট করার অপবাদ মাথায় তুলে নেবার ভয়ে ও বাড়ি ছেড়ে পালাল। এ্যাজ এ রেজাল্ট ফ্রিজের বরফ সব গলে মাছ মাংশ পঁচে একাকার।

কিন্তু পুলিশ অফিসারকে প্রশ্নের সাফ সাফ জবাব না দেয়াতে আমার ভীষণ অপরাধ হয়ে গেল। আবার গেলাম ফেঁসে। থানার সেকেন্ড অফিসারের আমার ওপর থেকে রাগ কমার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। তিনি তখন আমার নামে অন্য কেইস ফাইল করার পাঁয়তারা করছেন। কারণ দেশ তখন জরুরী অবস্থা থেকে নিস্তার পেলেও এরা তার ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই আমার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটা ইনভেস্টিগেশন কিভাবে কল করা যায় সেই ভাবনা তিনি ভাবতে লাগলেন।

বললেন, ‘আপনার ফ্রিজ ভর্তি এতো খাবার, আপনার আয়ের উৎসটা একবার খতিয়ে দেখতে হবে!’

Facebook Comments

One Comment:

  1. প্রেডিক্টেবল তবে মজা লাগছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *