অনুবাদ কবিতা: মাতাল তরণি


অনুবাদ: আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

 

অসাড় নদীর ভেতরে ঢুবে যাওয়ার সময়
আমি আর টের পাইনি আমাকে টানছে কোনো বাঁধন
উজ্জল লাল চামড়া নিয়ে গেছে বণিকদের লক্ষ্যে
রঙিন কাঠের খুঁটিতে গেঁথে তাদের নগ্ন।

আমি উদাসীন আমার নাবিকদের প্রতি
যারা বহন করছিল ফ্লেমিশ গম বা ইংলিশ তুলো
যখন বণিকদের সব গর্জন থেমে গেল
নদী আমাকে ভাসিয়ে দিল আমার ইচ্ছে মতো।

ভেসে গেলাম সেইসব হিংস্র ঢেউয়ের সমুদ্রে
যেগুলো শিশুদের কানের চেয়েও বধির। আর শেষ শীতে
আমি পালিয়ে গেলাম! বাঁধনহারা দ্বীপগুলো
এমন বিজয় উল্লাস সহ্য করেনি কখনো।

এই ঝড় আমার সমুদ্রবাহিত— জাগরণ সুন্দর করল
একটি বাকলের চেয়েও হালকা আমি নেচে উঠলাম ঢেউয়ে
যেটিকে মানুষ শিকারির অনন্ত রলার বলে ডাকে
দশ রাত্রি, বাতিঘরের বোকা চোখের আলো না হারিয়ে।

শিশুদের কাছে আপেলের মাংসের চেয়েও মধুর
সবুজ পানি বিদ্ধ করলো আমার দেবদারু গাছের পাটাতন
মুছে দিল আমার শরীরের বমি আর নীল মদের দাগ
রাডার আর হুকগুলো এলোমেলো করে দিয়ে।

আর সেই মূহূর্ত থেকে আমি গোসল করছি কবিতার সমুদ্রে
যা ভরে আছে নক্ষত্র আর শাদা ফেনার চুর্ণিত দুধে
দেখছি সবুজ, নীল আর নীল। যেখানে সুখী শাদা কিছু হারিয়ে যায়
আর এক ডুবন্ত মানুষ স্বপ্ন থেকে আসে নেমে ।

যেখানে নীল রঙ করে, হঠাৎ প্রলাপ আর
ধীর গতির নৃত্য তার সাথে অগ্নিরশ্মির আলো
মদের চেয়ে শক্তিশালী সঙ্গীতের চেয়েও বড়
আমাদের তীব্র ইচ্ছার তিক্তলাল জন্মালো।

আমি দেখেছি আকাশ আর জলস্তম্ভ, স্রোত ও ফেনা
ভেঙ্গে পড়ছে ঘন বিজলিতে
আমি দেখেছি রাত আর সকাল পায়রার ঝাঁকের মতো আনন্দিত
আমি তাই দেখেছি মানুষ যা কেবল পায় কল্পনাতেই ।

আমি দেখেছি কাছে আসা সূর্যকে যা অলৌকিক আতঙ্কে পূর্ণ
আর জ্বলে উঠছে লম্বা বেগুনি পিণ্ডতে
দূরে ঢেউগুলো তাদের পতনের কম্পনগুলো কীভাবে ছড়ায়
প্রাচীন নাটকের অভিনেতাদের মতো।

আমি স্বপ্নে দেখেছি অন্ধ তুষারের সবুজরাত্রি
ধীরে ধীরে তার চুম্বন উঠছে সমুদ্রের চোখে
ঝরছে স্বপ্নে না দেখা বীজরস
সঙ্গীতরত ফসফরাসের হলুদ নীল জাগরণ।

সারা মাস ধরে আমি অনুসরণ করেছি সমুদ্রের ফুলে ওঠা
ওরা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত ষাঁড়ের মতো আঘাত করছে তীরগুলি।
মা মেরীর উজ্জ্বল পা গুলোকে স্বপ্নে না দেখেই
সমুদ্রের হ্রেষাকে থামাতে ফিরিয়ে আনবে মুখজালি!

আমি আঘাত করছি অবিশ্বাস্য পুস্পগুচ্ছের বুকে
যেখানে প্যান্থারের চোখ আছে মানুষের চামড়ায়
ফুলের সাথে মিশে রঙধনু ফুঁসছে
সমুদ্রের দিগন্তে ছায়াডানা ছড়ায়।

আমি দেখেছি বিশাল জলাভূমি হিস হিস করছে
সেখানে আস্ত একটা তিমি নলের মধ্যে পঁচছে
পানির স্তুপ ঝরছে অবিরাম শান্তিতে
দূরত্ব গোসল করছে গহীন গর্তে।

হিমবাহ রূপালি সূর্য মুক্তোর ঢেউ লাল কয়লার আকাশ
বাদামী ঘূর্ণিজলের নীচে ভয়ংকর ধ্বংসাবশেষ
যেখানে জীবাণু চিবিয়ে খাচ্ছে অতিকায় সাপকে
সেও পড়ছে কেমন— কালো গন্ধের কুচকানো গাছ বেয়ে!

আমি চাইতাম সেই ডলফিনগুলিকে ছেলেমেয়েদেরকে দেখাতে
নীল ঢেউয়ের নিচে সেই সোনালি সঙ্গীতরত মাছগুলিকে
ফেনার ফুল আমার ডুবে যাওয়া ভেসে যাওয়াকে দোলাচ্ছে
ভাবছি— বাতাস যদি আমাকে তুলতো তার ডানাতে!

এক সময় শহীদের অসীম কূল কিনারাহীন ক্লান্তি
সমুদ্র যার কান্না আমার গড়ানোকে মিহি করছে
আমাকে দেখালো তার ছায়াফুল তার হলুদ মুখ
আমি রমণীর মতো নুয়ে থাকলাম তার পায়ে।

প্রায় একটি দ্বীপ, আমার বালিতে উড়িয়ে আনছে
ফ্যাকাশে রঙের সীগাল পাখিদের খাবার আর উচ্ছিষ্ঠ
আমিও কিছুক্ষণ এগিয়ে গেলাম আমার ক্ষীণ লাইন ছাড়িয়ে
ডুবন্ত মানুষ ফের ডুবল ঘুমে আমার নৌকার নিচে।

এখন আমি ঘূর্ণিজলে হারানো একটি নৌকা
ঝড়-তাড়িত ভেসে গেলাম পাখিশূন্য বাতাসে
আমি, যার লাশ সমুদ্র নোনা পানিতে ভেজা
কোনো মনিটর বা জাহাজ পারবে না তাকে তুলতে।

ধোঁয়ায় মুক্ত, উঠে গেছি বেগুনি কুয়াশা থেকে
আমি যে কিনা লাল আকাশকে ছিদ্র করেছি দেয়ালের মতো
ভেসে গেছি সূর্যরশ্মির শৈবাল নীল আর নীলের ঘন পুঞ্জে
গ্রহণ করেছি সেই স্বাদ যা আনন্দ দেয় সত্য— কবিকে!

কে দৌড়াল বিদ্যুতের আলোতে মাখা
একটি পাগল কাঠের লগি আর কালো সমুদ্রঘোড়া
যখন জুলাই পিশে দিয়েছিল তীব্র লাঠির আঘাতে
সমুদ্রআকাশ ভরে দিয়েছিল তার জ্বলন্ত চিমনিতে।

আমি কেঁপে উঠেছিলাম জলহস্তীর কষ্ট শুনে
যে কেঁদে উঠেছিল তাপ আর সংক্ষুব্ধ সমুদ্রআক্রমণে
আমি যে অনন্ত বিচরণশীল— নীল স্থিরতার বিরুদ্ধে
আমি আবার অনুতপ্ত হই প্রাচীন ইউরোপের দূর্গে।

আমি দেখেছি নক্ষত্রের দ্বীপপুঞ্জ
যার পাগল আকাশ খোলা সমুদ্রচারীদের জন্য
এটি কী সেই অতল রাত্রি তুমি যেখানে ঘুমাও, নির্বাসিত
বলো হাজারো সোনালী পাখি, হে ভবিষ্যতের শক্তি।

কিন্তু সত্যি করে আমি কেঁদেছি বেশি! ভোরগুলো হৃদয়বিদারক
প্রত্যেক চাঁদ ভয়ংকর আর  প্রত্যেক সূর্য তেতো
তীব্র কটু ভালোবাসা আমাকে খেয়ে ফেলেছে প্রমত্ত অবসাদে
আমার তলানি ভেঙ্গে পড়ুক। আমাকে নেমে যেতে দাও শুধু সমুদ্রে!

যদি আমি একটি জলডোবা চাই ইউরোপে
তাহলে সেটি হবে কালো পুকুর যেখানে সুগন্ধী রাত্রিতে—
উবু হয়ে বসে থাকা একটি শিশু চরিয়ে দিচ্ছে একটি নৌকা
যেটি মে দিনের প্রজাপতির মতো নাজুক ডানার।

তোমার অসাড় জলে স্নানরত হে ঢেউ
আমি আর তুলোভরা নৌকাগুলিকে অনুসরণ করতে পারছি না
পাল তুলতে পারছি না পতাকা আর অগ্নিশিখার ভেতর দিয়ে
হায় সাঁতরাতেও পারছি না কয়েদিজাহাজের ভয়ংকর চোখ বেয়ে!
২৫/০৭/২০১১

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *