সেঁজুতি বড়ুয়ার সাতটি কবিতা

হন্তারক

নি:সঙ্গতার মৃদু ছায়াবনে
আমার অসুখ বেয়ে সরসর নামে
হন্তারক সাপ।

আমাকে জ্যোৎস্নায় ফেলে বধ করে
হাঁসফাঁস শরীরী পিপাসা
শুষে নেয় দীর্ঘশ্বাসে।

জড়িয়ে ডুবিয়ে দেয়
আশ্চর্য নির্মেদ ক্ষতে

তুমি কী জানো—
তার কাছে
কতোটা মুমূর্ষু আমি?

সাঁকোটা নাড়ায় সে
আমি শুধু নড়ি…

 

আমার আত্মা উড়ে যাচ্ছে

আমার আত্মা উড়ে যাচ্ছে, প্রিয়
কখনও ‘বউ’ বলে ডেকো না আর
শরীরী ক্ষুধায় টেনে নিয়েছিলে, যারে
বুক চিড়ে নিলে তার চির দীর্ঘশ্বাস!

‘মা’ বলে ডেকো না ছেলে, নিদয়া সন্তান
বুক চুষে মাতৃদুগ্ধ নয়, করেছিস রক্তপান!

এখন বাজারে তুলেছিস সংক্ষুব্ধ ফাঁসিকাঠে
আজই হোক শেষকৃত্য তার; কারণ সে মুমূষুর্ ‘নারী’
এ পৃথিবী পায় না যেন তাকে, অভিশপ্ত হোক মাটি!

 

পৃথিবীতে কৌমার্য বলে কিছু নেই!

অনিঃশ্বেষ স্নান চাই, স্প্রিংয়ের মতো ডিগবাজি খেয়ে পড়বো
মৌনি বগালেকে, সূর্যাস্ত আভা ছড়ানোর আগেই পৌঁছে যাবো
নাগরাজ্যের অদ্ভুত ইতিহাসে…
সর্পবেশী কোনো জল্লাদের কৃপাণ ঘাড়ে আসার আগেই
সমস্ত ছদ্মবেশ ছেড়ে, নাভীর কালো তিল ঢেকে হবো সাবিত্রী
ভ্রু-যুগলে ক্ষীপ্র ঘোড়সওয়ারের মাতম তুলে
লাগামটা ঠিকই ধরবো নিজহাতে, রসাতলে নামবো মোহনীয়
বাঁকা হাসিতে! সর্পপুত্রের রাখালিয়া আড় বাঁশির গমকে ছুটে যাবো
গাঁদাফুলের উপবাসী নাগলীলায়…পায়ে বেড়ি পরানোর সেরকম ইঙ্গিত পেলে
পাতালের দরোজা খুঁজে সাঁতরে বেরিয়ে আসবো শ্যাওলাধরা নোনা জলে
জলের আদিম বাঁক—উষ্ণ প্রস্রবণে…
— পৃথিবীতে সীতাফল বলে কিছু থাকলে আমিও রামফল কুড়াতে পারি
শিল্পিত তাঁবুতে শয়নে—স্বপনে কৌমার্যের সোমরস পান করতে করতে!

 

ফুরিয়ে যেও না হিরন্ময়!

সমস্ত রসদে তোমার ভেতরে পা সেঁধিয়ে যাচ্ছে
নীল অন্তর্বাসের ঘ্রাণে দ্যাখো, কীভাবে ডুবে যাচ্ছি
চূর্ণ—বিচূর্ণ সুখে হলুদাভ কামিজে ভাঙছো দণ্ডায়মান শরীর
তুমুল আহ্লাদে তখন কাঁপছে বনতল! ঢুকে যাচ্ছো অগম্য সংযমে
বেপরোয়া সাহসে আসো, আরো কাছাকাছি! চাপ দাও সমস্ত শক্তিতে
খেলাশেষে, বন্য বাতাসে শীতে ফের জেগে ওঠো— জৈবিক তাড়নায়
তোমাকে জাগাতে উন্মুখ আমিও! দ্যাখো, ক্যামন সন্তুর বাজাচ্ছি…

 

কলির সন্ধ্যা

লোকধর্মকে এরা লৌকিক মানে
ধান হলো ধান্যেশ্বরী মদ
আর অকারণে, কারণবারিকে নমস্য মেনে
ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে হলে—
আগাপাশতলায় আগুন লাগাতে এরা সিদ্ধহস্ত
উপায়ান্তরে মারে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা!
বয়:সন্ধিকালে এরা বুদ্ধিতে গাধার বেহদ্দ
তাই একটুকুতেই রেগে যায়—
মা’কে ডাকে ‘ভাতারখাগি’ অবশেষে ‘শালী’…
নগরসংকীর্তনে সাড়া দিতে দিতে বাবু সাজেন
ছিনাল নদের চাঁদটি; কানু বিনে ওদিকে
পৃথিবী আঁধার দেখেন বৈমাত্রেয় বোন শ্রীরাধিকা!

সাত কাঁদুনি গেয়েও জনক কলকে পায় না
ফাঁকতালে কন্যা, চোরকে বলে— ‘চুরি কর!’
আর ছেলে হয়েছে তালেবর
বিষমবাহু ত্রিভুজ সংসারে
সূচ হয়ে ঢুকে বেরোয় ফাল হয়ে
নওজোয়ান ঘরজ্বালানি পর জ্বালানির খোঁজে দেশান্তরী হয়…
মতিভ্রষ্ট পথচারীকে
জলের দামে নিজেকে বিকিয়ে দেয়
শ্রীরাধিকা সুন্দরী!

 

আমেন!

তিনি নাকি আদ্যোপান্ত সরল, যাহার ভেতর অঁাধার
দেখেন তারেই টানে তোলেন। বুকের কাছে আসন
ফেলেন সহজ অবহেলায়!

ইমানুয়েল বলত লোকে। উনি বলেন, ‘আমেন!’

এক যে ছেলে বাপ—মা হারা অষ্টপ্রহর জ্বলে
আর কারো নয় মাথা ব্যথা— পাশ ফিরে সব চলে
তিনি এলেন নিঃশব্দে রাতপ্রহরী হয়ে
নিলেন টেনে বুকের ভেতর বলেন, ‘আমার বাবা!’

এক যে মেয়ে ভুললো পথের করুণ পরিণতি
ঘর হতে পা ফেলেই যেন সুড়ঙ্গমুখ খোঁজে
বহুকালের উল্কা হাওয়া উড়িয়ে নিলো ওকে
লোকে ভাবলে : এ কী রে উৎপাত!
তিনি ভাবলেন— আমিই পথিক এখন পথ দেখাই

আশ্রিতকুল ঘিরে সাধক স্বপ্ন দ্যাখে ভবে
একটি যদি থাকত ওদের অশোক শোভন আশ্রয়?
অনাথ অবুঝ সন্তানেরা থাকত তবে আলোয়

পাড়ায় তখন গল্প ধুন্ধুমার, কুপিত চোখে ফেটে
পড়ে দারুণ ঘৃণার স্রোতে: সন্ত, এবার নতুন কী হবে?

অবশেষে দিনটি হলো শেষ। গলিত দেহ পাওয়া গেল
সহস্র জখমে!

সবাই দ্যাখে তাপস হাসেন ঊর্ধ্বমুখ পানে—
‘সব সাধনা বিফলে কি সাধ্য যদি মেলে!’

 

কল্পনাতীত

আয়ুষ্মান, তোমাকে খুঁজিনি
তোমার ভেতরে অন্তর্ধান করে
বিপন্ন স্যানাটোরিয়ামে সাঁতার কেটেছি
তোমারই অহং পাহাড়ে, আত্মজীবনীতে
এক নি:সঙ্গ সম্পর্ককে সমাধি দিয়েছি!

 

সেঁজুতি বড়ুয়া

 

 

 

 

 

সেঁজুতি বড়ুয়া মূলত কবি। ছোটগল্পের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্যও লেখেন। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চার। সিটি আনন্দআলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮-সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ভারত, নেপালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top