ফেরদৌস নাহার: জ্বলছে ভোরের ললাট আর মমির মুখোশ

এক কুহেলিকাময় প্রহরে আমি প্রথম কবি আজীজুল হকের কবিতা সমগ্র পাঠ করি। অবশ্য তার আগে বিচ্ছিন্ন ভাবে আরও কিছু। পাঠ-সৌজন্যে বুঝেছিলাম এই কবি এক রহস্যময় নিগূঢ়তম শক্তি ধারণ করে আছেন। তিনি যা কিছু বলেন তা সবই ভারি গোপনীয়, কিন্তু দুর্বোধ্যতায় আচ্ছন্ন নয়। কবি আজীজুল হকের প্রকাশিত তিনটি কবিতার বই- ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে (১৯৫৮-৬৮), বিনষ্টের চিৎকার (১৯৬৮-৭০), ঘুম ও সোনালি ঈগল (১৯৭৭-৮৮)। পড়তে পড়তে উপলব্ধি করলাম, তার কবিতা ক্রমশ হয়ে উঠেছে গতানুগতিকতার বাইরে, তাৎক্ষণিক সময় থেকে দূরে- জ্বলজ্বলে অনির্বাণ। কবিতায় যে প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, ক্রোধ, ঘৃণা, বা প্রতিবাদ থাকা উচিৎ তা সবই আছে, তবে বড়ো নিভৃত নম্রতায়। উদ্ধত কোনো কিছুতে এই কবি আস্থা রাখেননি।

কবিতার কোন সুনির্ধারিত সংজ্ঞা নেই, কারণ জীবনের কোন চূড়ান্ত সংজ্ঞা  নেই আর নেই বলে আমি যাকিছু একটা বলার সুযোগ নিতে পারি না আমি কেবল এই বোধের উপর দাঁড়াতে পাড়ি যে, কবিতা জীবনের নিগূঢ়তম অভীষ্টসিদ্ধির শিল্পসুন্দর এক উপায় বিশেষ…”

(আজীজুল হক: আস্তিত্বের সংরাগ অভীপ্সার আলোয়)

সময় বয়ে যায়। আমার দৃষ্টি বেশ ক’বার পাতা উলটে দেখে নেয় তার সমগ্রসম্ভার। একটু অবাক হয়ে অনুভব করলাম ব্যক্তি আজীজুল হক জীবনান্দীয় স্বভাবের একজন। সুদূর মফস্বলের নিপাট প্রকৃতি থেকে তিনি তুলে নিয়েছেন তার কলমের প্রাণরস। যেমন জীবনান্দের রক্তে চিরকাল জেগে ছিল প্রিয়তম বরিশাল। আর রূপসী বাংলা তো সেই বরিশালেরই আরেক রূপ। তেমন করেই আজীজুল হক যশোরের বুক আঁকড়ে রয়ে গেলেন। একবারও ফিরে তাকালেন না রাজধানী কিংবা অন্য কোনো বড়ো শহরের দিকে। বারবার মনে হয়, এসব কি যশোর মনে রাখবে! কী জানি কতো কিছুই তো ভুলে যাই আমরা। তবুও আশা, তবুও ভালোবাসা…।

 

দৃশ্য : এক

কোনো এক নির্জন বেলাভূমিতে হেঁটে চলছেন আজীজুল হক- কবি আজীজুল হক। খুব নির্জনতার মাঝে মানুষকে অন্যরকম দেখায়। বিশেষ করে মানুষটি যদি হন একজন কবি, তাহলে তো আরও। উড়ন্ত চুল আর পাঞ্জাবির ঝুলকে এলোমেলো করে দিয়ে বাতাস ছুটে বেড়াচ্ছে। আজীজুল হকের সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি কেবলই হেঁটে চলছেন, স্লো-মোশন ছবির মতো তার এই চলা ক্রমশ ছাপ ফেলছে প্রকৃতিতে, সমুদ্রের দু’চোখে। কবির দুপা জলে ডোবা, জল ছুঁয়ে আছে তাকে।

জানি যশোর শহরটা চিটাগাঙের মতো সমুদ্রের পাশে নয়। সেখানে বঙ্গোপসাগরের জল ভরা বুক ছুঁয়ে ডাক দেয় না কোনো গাঙচিল, কিন্তু আজ সমুদ্রকে ধারণ করে আছেন কবি আজীজুল হক নিজে। যদিও যশোরে রয়েছে কপোতাক্ষ এবং চিত্রার মতো বয়ে চলা নদ-নদী। কিন্তু আমি যে বিশ্বাস করি, প্রতিটি কবি জন্মগত ভাবে সমুদ্র ধারণ করে। এই কবিও তা থেকে বিচ্ছিন্ন নন। কেবল তার সমুদ্রটি অকারণ তর্জন গর্জনে অস্থির হয় না। সে স্থির, মৌসুমী বায়ু ভারে স্নিগ্ধ ও শোভন, গভীর ও মনোরম।

তিনি ঝিনুক কুড়িয়ে নিলেন। তারপর তা থেকে মুক্তা খুলে পাঞ্জাবির পকেটে ধারণ করলেন। এরকম অসংখ্য মুক্তা তার পকেটে শোভা পাচ্ছে, যা কিনা আরও আগেই তিনি আয়ত্ব করেছেন। সহসাই বাতাসে চুল উড়িয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে বলে উঠলেন-

আজন্ম দুহাতে এক অদৃশ্য প্রেতের সাথে যুদ্ধ করে করে

  আমিও অদৃশ্য এই লোকালয় থেকে

  কিছু দূরে গেলে এক ধূসর প্রান্তরে

  পিছু পিছু হাঁটি, অন্ধাকারে তাকে তাড়া করি,

  যদিও নিশ্চিত জানি সে

  আয়ুর নিষিদ্ধ রেখা অতিক্রম করে না কখনো

(ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে)

এ কেমন যুদ্ধ! এই যুদ্ধের যে যোদ্ধা, তার হাতে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে কলম। কিসে এতো তাড়া। কবির চোখে নক্ষত্রের প্রভা। সোনালি কাঁকড়া, হলুদ বালি আর নিঃসঙ্গ ছায়ার নিচে নিজেকে আবিষ্কার করেন। আবিষ্কার করেন ভণ্ড সমাজ ও বন্ধুদের মাঝে। সুতীক্ষ্ণ শব্দের স্রোত, মসৃণ রূপালি ঢেউ আর ইস্পাতের কঠিন চাকার নিচে নিয়ত পিষ্ট হচ্ছে আত্মার আলো। আর তখন সমুদ্রপারের বুনোবৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ে তার দেহে।

  কেমন আক্রান্ত আমি অন্তহীন প্রবল বৃষ্টিতে দ্যাখো না, নির্বিকার

  ভিজে যাচ্ছি শুধু পকেটের সিগারেট দেশলাই নীল খাম ছবি

  সনাক্ত কার্ডের পাতা ভিজে যাচ্ছে গলে যাচ্ছে ক্রমে ঢল আর

  ঢল, বঙ্গোপসাগর থেকে ধাবমান ক্রোধ অবাধ জলের স্রোত

  চুলের শিকড় বেয়ে নেমে যাচ্ছে নিচে, জামার ভিতরে গলে

  ধুয়ে নিচ্ছে শরীরের ঘ্রাণ শিরার সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে যাচ্ছে

  জল, স্নায়ুর ভিতর দিয়ে মগজের কোষে

(আক্রান্ত বৃষ্টিতে)

 জলের ছিটায় কবি আজীজুল হক চমকে তাকান! দেখেন সমুদ্রের বুকে পা ফেলে হেঁটে আসছে রূপসীর শব। কী আশ্চর্য ডুবে যাচ্ছে না সে। বরং নাটকীয় ভঙ্গিমায় আলতো পা ফেলে হাঁটছে সে। পরস্পর চোখাচোখি হলো, কবি কি তাকে দেখে খুশি হলেন, নাকি রূপসী কবিকে দেখে, ঠিক আন্দাজ করা গেল না। হয়তো উভয়ই উভয়কে দেখে।

 

দৃশ্য : দুই

আজীজুল হক একটি সিগারেট ধরালেন। একবার চোখ তুলে আকাশটা দেখে নিলেন। তাকে অতিক্রম করে রূপসীর শব চলে গেল অন্য কোনো ডিসেকশন টেবিলে। হয়তো অদৃশ্য ছুরি কাঁচিতে ক্ষত-বিক্ষত সে তখন। উহ! কবি আর ভাবতে পারছেন না। এই মুহূর্তে কবির চোখ চাইছে সুবর্ণ রৌদ্র ভেঙে সকালের সোনালি ডানায় উড়ে যেতে। তিনি নিটোল জলের কাছাকাছি এক মুক্তাবতী ঝিনুক রমণীর শুয়ে থাকা প্রত্যাশা করলেন। এই অঘোর ঘোরের মাঝে কবি আজীজুল হক নিজেকে মেলে ধরলেন প্রেমান্ধ জাগতিক পুরুষ হয়ে। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে আনমনা সমুদ্র দর্শন…। মনকে ঘুরিয়ে নিতে চান, পুরোপুরি পারেন না। এ তার কী হলো!

 যদি বলো ব্যাধ আমি, তুমি নও আমার শিকার

  আমাকে লোলুপ করে তোমার শরীর, মৃগনারী,

  তবে তুমি কার? তবে তুমি কার যদি আমার ধনুক

  বাঁকা হয়, সাপের জিহ্বার মত শর যদি কারো বুক

  দাবী করে, আর তুমি শতখণ্ড অস্থি মাংস হৃদয় নখরে?

  অথচ তোমার ঠোঁটে স্তনে আর ঊরুর কিনারে রাত্রির আঘাত

(ছায়া শিকার)

আর দশজন পুরুষের মতো তার কাছেও কি নারী এক অনিবার্য বিষয় হয়ে আটকে রইলো? হোক, তবে সেই নারী যেন দীর্ণ প্রেক্ষাপট ভেঙে অন্তত তার কাছে অবলীলায় পৌঁছতে পারে, বিশ্বাসের সাথে। কারণ তাদের দেহে রাত্রির আঘাত দেখে কবি কষ্ট পান। তার সেই কষ্ট যন্ত্রণার অভিঘাত হয়ে জীবনের মিথ্যে খোলস ছাড়তে সাহায্য করছে। শুদ্ধতার বিপরীতে বসে অনেকেই প্রেম ও মনীষাকে ধ্বংস করেছে, আর করেছে বলেই কবি আজীজুল হক গভীর নেপথ্যে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের অস্তিত্বকে স্মরণ করেন। চিন্তামগ্ন মুখাবয়ব, খুব ধীরে চোখ বোজেন, তারপর দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে মন্ত্র উচ্চারণের মতো বলে চলেন-

  আদিম সমুদ্র থেকে অন্তিমের স্থলভাগ জুড়ে

  বিশাল পাহাড় এক অনুত্তম সূর্যকে ছুঁয়ে

                  পড়ে আছে, যেন

  মহাকাল শিলাভূত, মসৃণ পিচ্ছিল

                  একদিন মানব সমাজ

  ওইখানে যাবে, এখন যন্ত্রণা শুধু আজ, এখন কেবল

  শব থেকে শবের সিঁড়িতে একটি আকাঙ্ক্ষা হেঁটে যায়

  জীবনের নামে, এখন সে জীবনের নাম

  স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম

(যন্ত্রণা)

তখন সূর্যাস্তের আলো তার রক্তিম আভা চারদিকে মাখিয়ে দিচ্ছে। সাগরদাড়ীর মধুসূদন পুরো সাহেবি কায়দায় তার পাশে দাঁড়ালেন। মধুর হাতে মেঘনাদবধ, গলায় ক্রুশ, আর গালে দাঁড়ি। খুব স্থির কণ্ঠে কুশলাদী জিজ্ঞেস করলেন। আজীজুল হকের ধ্যান ভেঙে গেল! তার পাশে মধুসূদন। অপলক দৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছেন, পিছনে দুইহাত। পৃথিবীর সব সৃষ্টিশীলদের আশ্রয় এই সমুদ্র। সেখানে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব সমান। আজকের সন্ধ্যায় তাই একাকার হয়ে যায় উনবিংশ শতাব্দীর মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বিংশ শতাব্দীর আজীজুল হক। সবকিছু অতিক্রম যোগ্য, যদি হয় সময়ের অখণ্ড পরশ পাথর।

 

দৃশ্য : তিন

গতকাল ঝড় হয়েছে। সৌর জগতের ছিন্নভিন্ন আগুনকে শীতল করা বরফ ঝড়। তারপর আবারও রৌদ্র-তাপ-দাহ। অণু-পরমাণুর যৌথ মিলনে গড়া পৃথিবীতে অনিবার্য সব ঘটনা স্লেজ গাড়ি করে দৌড়ে চলছে, বরফ ভেঙে। দুরবীন দিয়ে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্রের উপনয়ন। তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাস, সময়ের ইতিহাস।

ইতিহাস কি রূপকথার সমান্তরাল? এই যে কবি পৃষ্টার পৃষ্টা উলটে যাচ্ছেন, লিখে যাচ্ছেন ইতিহাসের চরিত্র দিয়ে স্বপ্নের রূপকথা। ড্রাগন থেকে বুদ্ধদেব, আমাজন রেইনফরেস্ট থেকে পেসেফিক মহাসাগর, স্মৃতিগন্ধা অনার্য রূপসী থেকে সেমেটিক রমণী। হয়তো তাই কোনো না কোনো ভাবে ফিংচু নদীও এসে মিলেছে বঙ্গোপসাগরে। আর তাই কবি আজীজুল হক ও শিল্পী লিও চাও যেন সমার্থক যমজ, কবিতায়- ছবিতে। যাদের হৃদয় ভালোবাসার জন্য অভিন্ন আকুলতা নিয়ে বেঁচে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে, তাদের ব্যথা এক অভিন্ন, ইতিহাস ও আগামীর প্রতিনিধি।

মনে করো, ইভের সান্নিধ্য ছেড়ে আমি এক আদিম পুরুষ

  সুপ্রাচীন ব্যাবিলনে নিগূঢ় চুম্বন রেখে বিবাহিত রূপসীর ঠোঁটে

  নিখোঁজ হয়েছি তারপর সিন্ধুর সে বাঁধ ভেঙে গেলে,

  বিনগ্ন দ্রাবিড় নারী, তাকে ডেকে তখন বলেছি,

  তুমি আমি এখানে ছিলাম এই সত্য শিলীভূত হোক

                          মিথ্যা হয়ে যাক

  মহেঞ্জোনগররাতে পুনর্বার উভয়ের সম্ভোগ আশ্বাস

(প্রাক-উত্তর পর্বের সঙ্গীত)

অতৃপ্ত বোধ ও পুরাণ প্রার্থনা নিয়ে রাধা থেকে শুরু করে আজকের বনলতা পর্যন্ত সকলের সাথেই তার যোগাযোগ। অসীম প্রেম ও অনন্ত মমতা দিয়ে প্রগাঢ় চুম্বন আঁকেন। রক্তমাংসে জীবন্ত এই সময়ের কবি, সহসাই হয়ে ওঠেন মধ্যযুগের রাজন্য প্রেমিক। ওই তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কবির মাথায় শোভা পাচ্ছে বিম্বিসার যুগের প্রেমিক পুরুষের শিরোস্ত্রাণ। যার ধ্রুপদী রক্তে বেজে উঠছে চিতার অগ্নি-কামনা এবং সুনিপুণ বজ্র-আলিঙ্গন-

  মাছের কাজল চোখ, সুনীল ময়ূরী গ্রীবা, মুখ,

  কুমারী ঝিনুক ঠোঁট, সবসব দ্রুত করাঙুলে

  স্পর্শ করি আমি এক স্মৃতিবিদ্ধ বিনষ্ট যুবক,

  ধূসর শঙ্খের মত স্তনে ধানের দুধের গন্ধ আর

  শ্যামল সুঘ্রাণ ওঠে শরীরের পলল মন্থনে

 

  প্রেম এক মৃত্যু ছাড়া দিতে পারে কী বা

  আমি তাকে নিয়ে যাই বন্দরের বেসাতি গুঞ্জন

  এবং নগর থেকে সন্ধ্যারেখা নদীর নিকটে,

  সেখানে চিৎকার করিনদী, তুমি কি সময়ভ্রষ্ট!তবে

  ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন তীক্ষ্ণ কেন প্রান্তর অবধি?

(বিনষ্টের চিৎকার)

 

দৃশ্য : চার

ঘুম নেই কবি আজীজুল হকের। স্থানীয় কলেজের জনপ্রিয় অধ্যাপক। সবার প্রিয় স্যার। বাংলা ক্লাসে যার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি আকৃষ্ট করে রাখে ছাত্রছাত্রীর মুগ্ধতা। মানবিক সম্পর্কের গভীরতা, ধ্রুপদী যাত্রার নস্টালজিয়া, বিশ্ব বাতায়নে অশ্ব ক্ষুরধ্বনি, সর্বোপরি কবিতার নাড়ির স্পন্দন- কখন কীভাবে মৌলিক তৃষ্ণায় উচ্চারিত হয়, সবকিছু বড়ো ভালোবেসে জানিয়ে দেন তিনি। সেই মানুষটির চোখে ঘুম নেই। কী হয়েছে তার!

এইমাত্র হেঁটে গেল জীবনানন্দের ছায়া। আজীজুল হক তা টের পেলেন। আচ্ছা কবি জীবনানন্দ দাশ এখন কোথা থেকে এলেন, বরিশাল নাকি কলকাতা? জিজ্ঞেস করতে হবে। বরিশালে তো ভালোই ছিলেন, কেন যে অযথা কোলকাতায় পাড়ি জমালেন বুঝি না। বেশতো দিনকাল কাটছিল মেঠোচাঁদ, বুনোহাঁস, শিশিরের শব্দ, নক্ষত্রের রাত আর ধানসিড়ি নিয়ে। এসব ভাবতে ভাবতে ভীষণ কষ্ট হতে থাকে কবি আজীজুল হকের। তিনি যেন সহসাই জীবনানন্দ হয়ে ওঠেন, ঘাই হরিণের অস্থিরতায় যখন দিশেহারা চারদিক, তখন ক’জনই বা পারে জীবনানন্দ হয়ে সেই যন্ত্রণাকে ধারণ করতে!

আমি আর সেইসব যন্ত্রণাকে সঙ্গে করে নিয়ে
  হাঁটিনা এখন, সেইসব ইচ্ছার নায়ক আমি নই
  সুপ্রাচীন অশ্বত্থের অস্বচ্ছল কোটরের ফাঁকে
  প্রেতডানা পাখিদের সোনালি রূপালি রঙ
ডিমের খোলসা
  গ্রহে রাখি না হাত,

            (যন্ত্রণার মৃত্যুতে, ইচ্ছার নায়ক)

এক অবিচ্ছিন্ন হাহাকার তাকে তাড়া করে ফিরছে। আজীজুল হক ছটফট করছেন। কী করবেন তিনি? কোথায় যাবেন? কার কাছেই বা যাবেন? প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের মুখ অস্পষ্ট হয়ে আসে। এক অন্তহীন অস্থিরতা দিগ্বিদিক একাকার করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে। টগবগ টগবগ ধ্বনিতে মাতিয়ে তুলেছে রক্তধুলোর মাঠ। ফাঁকা রাস্তা প্রায় স্তিমিত চারদিক। জ্বলছে নীলাভ আলো। মস্তিষ্কের অপার ক্ষেত্রে রণবাদ্য বেজেই চলছে একটানা। জীবনানন্দ তখনও রয়েছেন। হয়তো কিছু বলতে এসেছিলেন, কিন্তু কবির অস্থিরতা দেখে চুপ করে আছেন। হয়তো বলতেন কোলকাতার শুষ্ক বাতাসের কথা, আর নাগরিক শব্দের অসহ্য একাকীত্বের গল্পগুলো। সেই ট্রামটির কথাও হয়তো শোনা যেত, ৫৪’র ১৪ই অক্টোবর যেটা বালিগঞ্জ থেকে বনলতার প্রেমিককে পাঠিয়ে দিয়েছিল হাসপাতালে। নাহ্ এসব কিছুই শুনতে আজ প্রস্তুত নন কবি আজীজুল হক, যশোর নিবাসী নিভৃত অধ্যাপক, যার বুকের ভেতর বয়ে যাচ্ছে শালপ্রাংশুর ছায়া এবং বনান্তরের গভীরতা।

 

দৃশ্য : পাঁচ

কবিতা মূলত তার কাছে কী? এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় কবিতার গৃহস্থ আজীজুল হকের কাছে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। নির্মোহ, নির্লিপ্ত উদাসীনতায় তিনি কবিতার দিকে সটান চোখ তাকালেন। ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকা দেহ, সে দেহ কবি না কবিতার? শব্দের করতালি কবির হৎপিণ্ড চিবিয়ে খাচ্ছে। তাই কোনকালেও ভাল থাকে না একজন প্রকৃত কবি। আজীজুল হক দীর্ঘশ্বাস চেপে জানালায় এসে দাঁড়ালেন, দেখলেন—

ওই তো অদূরে কেউ একজন হেঁটে আসছে, খুব চেনা তার হাঁটার ভঙ্গি। আরে এতো সে-ই, যাকে না-চিনে পারা যায়! হাতে বাঁশি, কাঁধ পর্যন্ত এলোচুল, কালো জোব্বা গায়ে সামনের দিকে ঝুঁকে, লম্বা পা ফেলে আসছেন। সুলতান, শিল্পগুরু এস.এম সুলতান। তিনি আসছেন। আজীজুল হকের মন ভাল হয়ে যায়। এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন ছিল তাকে। দৌড়ে সদর দরজায় ছুটে যান কবি। জড়িয়ে ধরেন পরস্পরকে। মাথার চুলে ঝাঁকুনি দিয়ে শিল্পী জানালেন, এইমাত্র নড়াইল থেকে এলেন। ভয়াবহ খরা আর ঋণগ্রস্ত সময়ের ঝড় চারদিক যখন ওলট পালট করে দিচ্ছে, তখন সুলতানের আগমন কবি আজীজুল হকের চেতনাকে জোরালো শক্তি এনে দিলো। নড়াইলের স্নিগ্ধতা আর শিশু-স্বর্গের স্বপ্ন দুহাত ভরে নিয়ে এসেছেন তিনি। বহুদিন পর যেন ছাইরঙা মেঘ ভেঙে অনাবিল বৃষ্টি এলো। কবি আর শিল্পী, কারো মুখে কোনো কথা নেই। আজ কথা বলছে মেঘ, আকাশ এবং প্রকৃতি।

  আশ্চর্য নয় যে কবিতা কখনো কখনো
অনবদ্য থাপ্পড় মারে
  এবং অনেক বিখ্যাত চোয়াল উনিশশো আশি নব্বুই
  দুহাজার খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রীরী জ্বলতে থাকে
  যন্ত্রণাটি আপাদমস্তক লোকজ, তবে রসোত্তীর্ণ
  এবং আশ্চর্য নয় যে তার কাঁধে ভর দিয়ে
  তুমি আমি উভয়েই কালোত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারি

                   (কবিতা কখনো কখনো)

পাশাপাশি নতুন দিনের কাছে চাইলেন অমর প্রতিশ্রুতি। এ যেন অনন্য উপলব্ধির নিগূঢ় প্রতিচ্ছবি। কারণ ততোদিনে আমরা কি জানিনি, যতই ছদ্মবেশ থাকুক না কেন, মাটির অপর রূপ সম্ভাবনা, আর মানুষের অপর নাম অস্তিত্ব। তাই অন্ধকার যতই ঘন হোক কিংবা সূর্য যতই দুষ্প্রাপ্য হোক- কবির অম্লান চাওয়া আগামীর কাছে-

  এসো আমাদের কবিতাগুলিকে ওইখানে দাঁড় করিয়ে দেই সারিবদ্ধ,
  বুড়ো শব্দের নতুন দাঁতগুলিকে হাতুড়ি মেরে বিচূর্ণ করি
  বিযুক্ত করি মৈথুনরত অনুপ্রাসগুলিকে
  ভাড়াটে জরায়ু জারজ স্বপ্ন এবং প্রসিদ্ধ হাসি কান্নাকে
ছিঁড়ে ফেলি
  মাতাল পণ্ডিত মহাজন তস্কর সম্রাট কবি এবং সম্পাদকের
হাত থেকে
  উদ্ধার করি কবিতাকে

                                 (রক্ষিতা)

আজীজুল হকের চোখে আগুন দেখে অবাক হয় যান শিল্পী সুলতান। তিনি কবির কাঁধে হাত রাখেন। আজীজুল হক তখনও কাঁপছিলেন। সুলতান তার বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিকে। কবি আপন মনে বলে চলেন- মুখোশের আড়াল থেকে বের হয় আসুক সাহসী স্রষ্টা, নির্ভেজাল সত্য…। আর একথা তো চিরকালই সত্যি- চারিদিকে এতো এতো ভণ্ডামী বা মুখোশ চর্চার মাঝেও বেঁচে থাকে নির্ভেজাল লড়াকু কোনো মানুষ। যদিও সে একাকী, কিন্তু সে-ই তো প্রকৃত লড়াকু। দাবা খেলে, এবং শেষটায় পালটে দিয়ে যায় সমস্ত মিথ্যে চাল এবং চালাকি।

সুলতান বাজাচ্ছেন রাগ ছায়ানট। চোখ বোঁজা, সুর গড়িয়ে ক্রমশ বিস্তার বাড়িয়ে চলছে। দিনের আলো কিছুটা কেঁপে উঠলো। শিল্পীর বাঁশি ক্রমশ গ্রাস করছে চারদিক…।

দৃশ্য : ছয়

কবি ঝুঁকে আছেন তার লেখার খাতায়। কবিতা লিখছেন, ভালোবাসার কবিতা। উত্তেজনা, রাগ-অনুরাগ সবকিছু তাকে ঘিরে নেচে যাচ্ছে, যেন ওরা খুব নীল কোনো পরী। ওরাও কবির গোপন ব্যথার কারণ, আর তাই কবিতার উপর সব রাগ উজার করে, আজীজুল হক নিজেকে মেলাতে চান মূলস্রোতের রক্তধারায়। অতীতের অনাবৃত বেদনার ইতিহাস বা বর্তমানের সহস্র প্রবহমানতা সবকিছু যেন বিশ্বাসঘাতকের রূপ ধরে অগ্রসরমান। সেখানে একজন কবির নিজেকে পোড়ানো ছাড়া কিইবা করার থাকে…

  একটি গোলাপকে আমি উত্তেজনার মধ্যে আনতে চেয়েছি
  একটি উত্তেজনাকে গোলাপের মধ্যে
  হে হৃদয় উত্তেজিত হয়ো না
  দ্যাখো না বাগানে গোলাপের শেষ নেই, দ্যাখো না

 আমার কবিতাকে তবে আমি কোথায় লুকিয়ে রাখবো?
  অতীতটা আজ অনাবৃত যে,
  বর্তমানটা সহস্রাক্ষ,
  ভালোবাসার কী দাম যদি তার মধ্যে না থাকে আকাঙ্ক্ষা
  আকাঙ্ক্ষার কী দাম যদি তার মধ্যে না থাকে যন্ত্রণা
  যন্ত্রণার কী দাম যদি তার মধ্যে না থাকে আগুন

  আমার কবিতাকে যদি আমি আগুনে পোড়াতে পারতাম
                  (ভালোবাসা, একটি গোলাপ ও আগুন)

আসলে সারাজীবন একজন কবি তো তার নিজের কথাই বলে থাকেন। তিনি যা কিছু ভাঙতে চান বা গড়তে, তা সম্পূর্ণই নিজেই ভাঙাগড়া। আজীজুল হক তা ভাল করেই জানেন, জানেন বলে কষ্টটা আরও তীব্রতর হয় ওঠে। আর এসব কারো সাথে ভাগ করে নেয়া যায় না।

লেখার খাতা থেকে উঠে দাঁড়ান। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথকে। আহ কী বিশাল আশ্রয়! বাঙালীর এতো বড়ো ছায়াস্থান আর কোথায় আছে। রবীন্দ্র রচনাবলী ছুঁয়ে দেখেন, গীতবিতানের পাতা উলটান একান্ত আগ্রহে। স্বদেশ পর্বে এসে থমকে যান, ভেসে আসে সুচিত্রা মিত্রের সেই অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বর-

সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে

সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥

আঁখি মেলে তোমার আলো

প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,

ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে॥

বৈতালিক টানের সুর প্রবেশ করছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। শিহরণে কেঁপে ওঠেন, চোখ ভিজে ওঠে অজান্তে। গীতবিতানের স্বদেশ পর্বে থমকে থাকে তার আবেগ। রবীন্দ্রনাথই তো শেখালেন সমস্ত অস্থিরতাকে বশ করে একবিন্দুতে স্থির হতে। আর তাই বুঝি সকল প্রেম একসময় স্বদেশপ্রেমে রূপ নেয়। সকল অস্থিরতা নির্বাণ লাভ করে দেশপ্রেমের অবয়বে।

অবশেষে প্রশান্ত দিনের শেষে কবি আজীজুল হক রক্তকালিতে লিখে ফেলেন ঘাসের বুকে মিশে থাকা বাংলাদেশকে—

ঠিক এই মুহূর্তে আমি অসতর্ক বরং নির্ভ
  আগের চেয়ে যেন
  পদ্মা মেঘনার জলে এমন ডুবে যাচ্ছে আমার
  সীমা বারুদের মন্ত্রকবচ
  এখন আর ভালোবাসার জন্য আমি কাঁদছি না,
  এবং এই মুহূর্তে আমার আশ্রয় এমনই দুর্গম যে
  বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ডকে ছিঁড়ে তবে আমাকে
  স্পর্শ করতে হয়
                      (ঠিক এই মুহূর্তে)

স্বদেশের জন্য আবেগ ও ব্যথায় চুরচুর হওয়া হৃদয় নিয়ে অনেকদূর যেতে হবে কবিকে। একথা একজন সৃজনশীল মানুষের চেয়ে কেইবা বেশি জানে! বুক ভরা এই প্রেম নিয়ে যেতে হবে সুদূর…। কবি আজীজুল হক যাবেন, সাথে করে কিছু কি নেবেন- ওই প্রেম ছাড়া! সাথে যাবে নীলনিদ্রা, শব্দছোবল, বিদগ্ধ অভিজ্ঞান এবং অভিমান।

কলমের মুখ বন্ধ করলেন। উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ঠেলে। একবার দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন। অনেক সময় বয় গেছে। দু’কানে সমুদ্র গর্জন। কে পারে ফেরাতে আজ! দু’হাতে টেনে ধরে রাখতে চায় সংসার, সঙ্গী, সন্তানেরা। আজ আর পিছে ফিরে দেখা নয়। সহস্র জলকণার স্পর্শ উন্মূল টানছে। আহ্ কী শীতল! যশোর শহরটা সমুদ্রের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে! সব ফেলে কবি আজীজুল হেঁটে হেটে চলে যাচ্ছেন সাগরের দিকে। আর একটু পরেই তিনিও পা রাখবেন নরম-মসৃণ জলের আবহে। ডুবে যেতে নয়। ভেসে থাকবেন অনেককাল, বাংলা কবিতার সাথে গল্প করবেন সারাবেলা, ঝিনুক কুড়িয়ে প্কেটে পুরবেন, ঢেউ কেটে পঙ্ক্তিগুলোকে নাও করে ভাসিয়ে দেবেন নীলজলে। লোকালয়, কোলাহল কিছুই তার নয়, সব ফেলে চলে গেছেন কবিতা মহাসাগরে। তার যে অনেক কাজ, অন্তহীন অভিযান।

কেটে গেছে পৃথিবীর বারোয়ারি দিন ও রাত…

 

শেষ দৃশ্য

সবাই খুঁজছে তাকে, কেউই পাচ্ছে না কবিকে। তাদের মাঝে দু’একজন বলছে, তারা নাকি দেখতে পেয়েছে, সমুদ্রের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে, সূর্যের দিকে মুখ করে একমনে শিল্পের শঙ্খ বাজাচ্ছে কবিতার নামাবলি গায়…।

 

ফেরদৌস নাহার

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগীত রচয়িতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং কানাডা থেকে কম্পিউটার ট্রেনিংপ্রাপ্ত এই বোহেমিয়ান ও চিরতরুণ কবি বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাস করছেন। বইপড়া, ভ্রমণ (যাকে তিনি ‘ঘুরণ’ বলেন) এবং কফিশপে ধোঁয়া ও ঘ্রাণে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ১৭টি কাব্যগ্রন্থ, ৩টি প্রবন্ধের বই এবং বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত ৪০টিরও বেশি যৌথ সংকলন, যার বেশ কিছু কাজ ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি প্রখ্যাত ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর বহু জনপ্রিয় গানের রচয়িতা হিসেবে তিনি বিশেষভাবে খ্যাত এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছবি আঁকা ও ব্লগিংয়ের কাজও করে থাকেন। শিল্প ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার ২০২২’ এবং ‘অনুপ্রাণন সম্মাননা ২০২২’-এ ভূষিত হন।

ইমেইল: [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top