জুনান নাশিতের গুচ্ছ কবিতা

মিথ

আমার আঙুলগুলো ছুঁয়ে দেখো
নরম তুলতুলে ঠোঁট
রেশম ছায়ায় কাঁপে যে একরত্তি সুখ
তাকে ধরো
জড়াও বুকে
শিলায় গ্রন্থিত করো
লজ্জারাঙা শিহরিত মুখ।

রূপান্তরে পৃথিবীও মিথ
কখনো খোঁজনি তাকে?
সে তো পোড়ায় নিজেকে
ভাঙে তামাদি অতীত।

 

রিমঝিম রিমঝিম

শীত এলে ভালোবাসা মরে যায়
নাকি জেগে ওঠে?
আমরা জানি না
আমাদের ভালোবাসাবাসি
বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের চেয়েও
বিনিদ্র, বিনয়ী।
‘কাফকাজ লাস্ট লাভ’ আমরা পড়েছি
বহুবার, শৃঙ্গারের আগে
বেহালার বুনোট ছড়িয়ে
প্রতিটি সঙ্গম সুখে
প্রতিধ্বনিত নীরবে ‘লাভ এন্ড লাস্ট’
পড়েছি দু’জনে একাগ্র উদাস রাতে
তখন বসন্ত ছিল, নাকি শীত?
নাকি বর্ষা অথবা শরৎ?
কি ছিল কে ছিল তাকিয়ে দেখিনি
দেখেছি দু’জন দু’জনারে।

এখন পুরোটা বছর জুড়েই শীত
এখন দূরের মেঘনার বুকে
কুয়াশা প্রাচীর রিমঝিম রিমঝিম!

 

শেষ বৃষ্টির গান

বলেছিলাম,
পিথাগোরাসের রহস্য ঢাকা সন্ধ্যায়
তোমাকে শোনাব শেষ বৃষ্টির গান
আজ সেই বৃষ্টির দিন
আজ নীরবতার গন্ধ ছড়ানোর রাত
শুরু হোক তবে
ডুবে যাই অনিদ্রার আলিঙ্গনে
আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে ঘসি পাথরে পাথর
আগুন উঠুক জ্বলে
ধসে যাক মূর্তিমান বেদনার বাঁধ
হাওয়ার আদল নিক স্মৃতির কঙ্কাল।

একদিন দু:খ অথবা মৃত্যুর তারাখসা ভোরে
কিংবা শেষ চুম্বনের কালে
বিজয়ী ভস্ম এসে বলে,
শেষ বৃষ্টির রাতে জীবন উৎসর্গ করেছো তুমি
প্রেমে অথবা সমর্পণে

আমি কি তবে বেঁচে আছি?
নাকি ভেসে যাই
জলবিন্দুহীন ডানার ধূ ধূ আর্তনাদে?

 

ব্যাবেল

ঐক্যের বিপরীতে দাঁড়ালে পাহাড়ের গল্পগুলোও নিচু হয়ে যায়। সূর্যাস্তের যে ছায়া দূরের তেপান্তর ছাড়িয়ে আরো দূর দিগন্তে মিশে যাবে বলে সটান দাঁড়ায়, সেও একদিন দূর্বাঘাসে লটকে থেকে বিন্দুর চোখে অবলীলায় মিলিয়ে যায়।
ঐক্যের বিপরীতে দাঁড়ালে স্মৃতিগুলো খানখান, যেন তারা শতো টুকরার জমিন। ভিন্নতর ব্যাকরণ মেনে পাতাহীন রোদ্দুরের ঝাঁঝালো দিনে তুমি দাঁড়াতে পারো একা, তাতে যে ফাটল তাতে যে ব্যাকুল বেদনার নিঃসরণ গাঙ্গেয় দ্বীপজুড়ে বয়ে যাবে, তাকে ঠেকাবে কি দিয়ে?
তারচে এসো,
মৌলিক ভঙ্গিমায় দাঁড়াই
যত্রতত্র অকথ্য শল্যের বীজ ছড়িয়ে দেয়ার চেয়ে
এক হই
একক ও অবিভাজ্যতায় পলির ভেতরে বুনি
বহু কাঙ্ক্ষিত চেতনার নিঃশব্দ ব্যাবেল।

 

মৃতদের গল্প

আকাশ যে নীল নয়
এ কথা জেনে গেছে মৃতরাও
তারাও ওড়াতো ঘুড়ি এতোকাল
রঙধনু কেটে কেটে ভাসাতো ধীবরকালে
কতোশতো সাতরঙা নাও।

নেবুলা গুঞ্জনে আকাশ কি আজ ফালা ফালা?
শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে মৃতদের?

আকাশ যে নীল নয় এ কথা জানার পর
মৃতরাও পালালো শহর ছেড়ে
আকাশের গল্প নিয়ে সেই থেকে
খেদ নেই কারো আর

আকাশবিহীন অন্ধকার রাত পৃথিবীতে নেমে এলে
মিল্কিওয়ে ঘুরে ঘুরে
একাকী জোনাকি শুধু জ্বলে আর নেভে।

 

 

জুনান নাশিত

জুনান নাশিত কবিতা, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্যে বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করে চলেছেন।

কবি হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে। জুনানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুমারী পাথর’ দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাচিত সেরা দশ গ্রন্থের তালিকায় স্থান করে নেয়।

স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। ক্লাস নাইন থেকে কবিতার প্রতি তিনি পুরোপুরি মগ্ন হয়ে পড়েন। তবে তারও আগে ছড়ার জগতে ছিল তাঁর বিচরণ। মূলত কবিতা লিখলেও প্রবন্ধের প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর আগ্রহ। প্রকাশিত হয়েছে একাধিক প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থ। ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন ছড়া, গল্প ও উপন্যাস। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬টি।
জুনান নাশিত অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর জন্ম কুমিল্লায়। বর্তমানে বসবাস ঢাকায়।
সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতাও তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বর্তমানে জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

পুরস্কার ও সম্মাননা
• মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক — ২০১৬
• মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার — ২০২৩
• হিউম্যান রাইটস এওয়ার্ড ২০২৬

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top