আমি তাঁকে বলি পথ ও পাখিজন্মের কবি। কখন কবে কী করে তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছি, কাছে আসতে শুরু করেছি তা মাপজোক করে বলা মুশকিল। কারণ আমার সামনে কোনো একটি রূপে তিনি আবির্ভুত হননি। তাঁর সাথে পরিচয়ের মুহূর্ত অনেক। কখনও তিনি কবির প্রতিকৃতি, কখনও প্রিয় ব্যান্ড মাইলস-এর খুব প্রিয় গানগুলোর গীতিকার, কখনও স্বাদুগদ্যের প্রাবন্ধিক, কখনও কড়া সম্পাদক প্রকাশক, কখনও নিভৃতচারী আঁকিয়ে আর কখনওবা নির্ভীক ভ্রামণিক। ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে বলা যায়, এই পঁচিশ বছরে একাধারে তিনি আমার স্নেহপ্রবণ অগ্রজা, আমার আশ্রয় বিশ্বাসের অটল পাহাড় এবং সাহস ও সততার অপর নাম। কাছে থেকে টের পাই বৈষম্যের বিপরীতে তাঁর নির্ভীক কণ্ঠস্বর। দূর থেকে সর্বদা তিনি আমার ভালোবাসার জলপাই আয়ু।
ফেরদৌস নাহার। কবি। প্রাবন্ধিক। ভ্রামণিক। গীতিকার। আঁকিয়ে। সম্পাদক। তাঁর সাথে পঁচিশ বছরের এই সাণ্ণিধ্যের লাবণ্যসূত্র কবিতা। শুধুই কবিতা। কবিতার প্রতি প্রেম, ভালোবাসা, আস্থা, সততা ও অভিমান নিয়ে যে দীর্ঘ যাপনের অভিজ্ঞতা বয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁর প্যাঁটরায়, তা দেখে, জেনে বিস্মিত হই, অভিভূত হই, তাঁর সঙ্গলাভের কাঙাল হই। তুখোড় সব বর্ণিল পালক তাঁর মন ও মননের ভুবন সাজিয়েছে। দুর্গম পথকে করেছে উজ্জ্বল, কাঁধকে করেছে নির্ভার। তাঁকে যতটা অনুভব করি, জানি তার আধখানা। দু একটি ধাপ পেরিয়ে এটাই বুঝেছি, সবকিছু ছাপিয়ে তিনি দাঁড়াতে চান কবি পরিচয়ে। ঋজু অথচ কোমল। একই সাথে বোহেমিয়ান বাতাসে ঘুরে ঘুরে আসা উদ্ধত আয়ু।
খুব নিরপেক্ষ থেকে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলা বা লেখাটা আমার পক্ষে একটু দুরূহ। স্বীকার করে নিই আগেই, আমি তাঁর প্রতি বেশ ভালো রকমের দুর্বল। বিশেষত জীবন ও শিল্পের প্রতি তাঁর সততা ও সাহসের। আমার কাছে তিনি চিরসবুজ এক মানুষ। আজ জন্মদিনে তাঁকে একপ্রাণ ভালোবাসা ছাড়া হয়তো আর কিছুই জানাবার নেই। তবু, কবিতার সূত্রেই যাঁকে পেয়েছি, কবিতার অনুভবে, শব্দসুষমায় তাঁকে দেখে নিতে চাই আরও একবার।
পিঁপড়ার শুঁড় টেনে নিচ্ছে কবির জীবন
স্বভাবের ইচ্ছে, গতি প্রকৃতিসমূহের বাইরে মানুষ যেতে পারে কি? কোনো বিধিনিষেধের কড়াক্কড়ে নিজেকে সীমিত রাখতে মানুষ রাজী নয়। খোলা ভাষায়, ঔদার্য্য অবমুক্তির গান যেখানে গীত হয় সেখানেই ছুটে যেতে চায় বার বার।। জন্মেই নিয়মের রজ্জুতে বাঁধা পড়া মানুষ মূলত মুক্তির পথিক। আর তাই অবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার ভেতর তীব্র ভাবে জিইয়ে থাকে। জগতের ক্ষমতাসীন নিয়ম-কানুনের চাপে সেগুলো প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয়, অবরুদ্ধ হয়। তবে এটাও ঠিক মাটির শেকল কেটে কম মানুষই পারে মনের উড়ালপনার সাথী হতে। ফেরদৌস নাহার সেটা পেরেছেন। আর তাই তাঁর কবিতায় বিশাল উড়াল আর ভ্রমণের গন্ধ। তাঁর জীবনরূপান্তরের ঘোড়া ছুটে চলেছে কত না অজানা স্টেশনে, অবিচল পাহাড় ও সমুদ্রের কিনারে কিনারে, জিপসির তাবুতে তাবুতে।
একটি জীবন ফেরদৌস কবিতার জন্যে বাজি রেখেছেন। একটি অমূল্য মানব জীবন। বিদ্যার ভারে ভারাক্রান্ত হওয়ার দর্প, কর্পোরেট জীবনের সাচ্ছল্য কিংবা খ্যাতির চটচটে লোভ— সবকিছুই দলে গেছেন অবলীলায়। শিরদাঁড়াটা সোজা। তাই বাংলাদেশের লেখক-রাজনীতির সস্তা চক্রগুলোর ষড়যন্ত্রে তাঁর কিছুই যায় আসে না। তিনি জানেন এই অশোভন অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার অনেক ঊর্ধে তিনি ও তাঁর কবিতা।
কবির সৃষ্টিতে কখনও কখনও তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ প্রচ্ছন্ন থাকে। ফেরদৌস নাহারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাঁর মতোই তাঁর কবিতা খানিকটা অভিমানী, চির পথিক। কিছু কবিতা ধরে আছে অসম্ভব রাগ, জেদ। বিশেষত তাঁর প্রথম যৌবনের কবিতাগুলো। আছে অভিমান নিয়ে দূরে সরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া কোনো অনির্দিষ্ট গন্তব্যে। কিছু কবিতা পথের নেশায় বৈরাগী। পাখিমন নিয়ে আরও উচাটন। একাকী যাত্রায় জন লেনন ও ইমাজিন তাদের মর্মার্থ নিয়ে অন্তর্গত স্টেরিওতে বেজে যায় যেন— এ্যাবাভ আস অনলি স্কাই। কিছু কবিতা জন্মের ইতিহাসে সমতা আক্রান্ত স্বপ্নের ভেতর ডুকরে ওঠে যেন পথভ্রষ্ট হওয়ার শঙ্কা তাদের। স্মৃতিলগ্ন বিষাদের আঙুলছোঁয়া কিছু কবিতাও প্রতিবেশীর নৈকট্য নিয়ে আসে। আসে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে প্রাচীন সবুজের মতো কিছু কবিতা। কোনো কোনো কবিতা রাক্ষসের বত্রিশ পাটি দাঁতের খোঁজ লুকিয়ে রাখে তাঁর কাছে। কামড়ে চুম্বনে গরল ও অমৃত মাখিয়ে করে নিতে পারে তার বশবর্তী। আর হাজার বছর পর রথের মেলায় তাকে বেচতে এসে মুদ্রা করে খোদ কবিকে। কেমন তবে এই কবির কবিতা?
ফেরদৌস নাহারের কবিতা রোমান্টিক ও পরাবাস্তব বৈশিষ্ট্যগুলোর চমৎকার মিশেল। কবিতার ইতিহাসে রোমান্টিক যুগে কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে কবি নিজে। তাঁর আপন চিন্তা, ভাবনা আবেগ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে উঠছে তখন। আর সাররিয়েল বলতে, সাদামাটা ভাষায় আমরা বুঝি অযুক্তি ও অবচেতন। ফেরদৌস এদেরকে মিশিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে। বিধি নিয়ম যুক্তিতর্কের গণ্ডির বাইরে অবচেতন মনকে রূপায়িত করার যে প্রক্রিয়া তাতে কবিতাকে বেঁধেছেন এই কবি প্রাচ্যের সুরে। চোখে দেখা বাস্তবের সাথে মনে দেখা বাস্তবের করমিলন ঘটিয়েছেন তিনি। লোরকার পরাবাস্তব অনুভূতি ও দেশপ্রেম ফেরদৌসের কবিতায় কোথায় যেন সুর তুলে যায়। পাশাপাশি তিনি অন্তর্গত বিস্ময়ের দিকে ধাবিত করেন তাঁর ভাবনাকে। বিস্ময় ও বেদনার সুন্দর তাঁকে নৈমিত্তিক যাপনের অনুষঙ্গের দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দেয়। জীবনের সরল দর্শন লেখেন কবিতায়— স্পর্শের ভেতর-বাহির। কবি ফেরেন অন্য কোনো নেশার ঘোরে। একাকীত্বের সাধনা হয়তো তাঁকে দেখিয়ে দেয় আধ্যাত্মিক পথের দিশা। পুঁজির দুনিয়া গ্রাস করে নিচ্ছে একে একে বিজন গুহা ও নির্জনতা। এ বিপন্ন সময়ে ফেরদৌস তাঁর হাতটি বাড়িয়ে দেন হাজার বছরের হাতটির উদ্দেশ্যে।
রৌদ্রসবুজ নীল অপেরা
কবি তার সময়কে ধারণ করেন। ইতিহাসের গলি রাজপথে চড়াইয়ে উৎরাইয়ে যেমন হেঁটে বেড়ান, তেমনি তার সময়ের দর্শন, সমাজনীতি, রাজনীতি অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতির উঠান চত্বর দাপিয়েও বেড়ান। ফেরদৌস নাহার তেমনই এক কবি যার কবিতায় সভ্যতা, পুরাণ এবং রাজনীতি বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অতীত ও বর্তমান দুইই সমান জরুরি তাঁর কবিতার কাছে। অথচ সেগুলো আমাদের কাছে লাউড লাগে না। ঠিক যতটা আঘাত করলে কবিতার চরিত্র ঠিক থাকে, ঠিক ততোটাই বাজিয়ে নেন তিনি। অভিবাসন তাঁর কবিতাকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। অভিবাসী জীবনের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া মধ্যরাত কথা বলে ওঠে কবিতায়। এ এক রূপান্তরিত হওয়ার গল্প। কোনো একটি নয়, অজস্র গল্প। এতকালের ভালোবাসার শহর আর মানুষগুলোর উষ্ণতা ছেড়ে প্রবল শৈত্যে ও একাকিত্বে সুর মেলাতে পারছে কি কবি? ঝোলেভাতে মেখে খাওয়া এক অপূর্ণ বাঙালির স্থানান্তর, তার গৃহহীন মাতালের পদক্ষেপ হয়ে ফেরার ইতিহাস চিরকালের। এই বেদনা কি সত্যিই প্রাচ্যকে গুডবাই জানাতে পারে কখনো? অন্তহীন বসে থাকে কবি এক আলোর পাখির দেখবে বলে। বাঁক বদলের মুহূর্তে পাখিদের উড়বার যে কৌশল, তা রপ্ত করেছেন ফেরদৌসও। হালকা হাড় আর শক্তিশালী পেশির যৌথ নিয়ন্ত্রণে নিজেকে ভাসিয়ে নিতে পেরেছেন ঠিক পাখির মতন। তাই কবিতায় তিনি ঘোষণা দিতে পারেন— তিনি সেই কলমবাজ! যার আছে কবিতা, আছে গদ্য, আছে অনন্ত দূরবাস। প্রিয় কবি লোরকাকে গ্রহণ করেছেন তিনি অস্থি মজ্জায়। কোথাও না কোথাও তাই লোরকার চিত্রকল্প, লোরকার সাহস— রূপান্তরিত আত্মা হয়ে প্রতিফলিত হয় কবি ফেরদৌসের ক্যানভাসে, রেখাচিত্রে।
ফেরদৌস নাহার সাহস ও গতির কবি। আশাবাদ তাঁর কবিতায় আসন গেড়ে আছে। সমস্ত উপেক্ষা প্রত্যাখ্যান বৈষম্য সত্ত্বেও কবিতায় আশার কথা, সম্ভাবনার কথা রাখেন তিনি। স্বরটা অভিমানের তবে সেখানে স্থবিরতার কোনো স্থান নেই। আছে বিশ্বযাত্রার কথা। ভ্রমণপথের কথা। একটা জার্নি। কোথাও চলে যাওয়া। ফেরার আভাস থাকে না, আবার থাকে। অভিমানী অপেক্ষারা স্মৃতি লাবণ্যে ডুবে যায়। কেউ আসবে না জেনেও। এক নিরন্তর নির্মম খেলায় নিয়ত দোসর কবি। তাই কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে— স্টেশন, প্ল্যাটফরম, চেনা-অচেনা মুখ, আগন্তুক, মুখোশ, রক্ত আগুন, ঝোড়ো বাতাস, অবিচল সমুদ্র, বৃষ্টিআকাশ, অপেরা, মুক্ত বিহঙ্গ, স্যানাটোরিয়াম, প্রতীক্ষা, সমাধিস্থল আর ঈশ্বরের সাথে বোঝাপড়া। সাথে আছে ভ্রমণের অনুষঙ্গ। বিচিত্র পরিবেশে কোন দূরের পথিককে যেন কাছে ডেকে নেন ফেরদৌস নাহার। পাঠককে এক নতুন আবহের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। কখনও পাঠক পান ভ্রমণের ভেতর দিয়ে পেইন্টিং উপভোগের বর্ণিল আনন্দ। যেমন স্টেশন— একটি অপরিহার্য শব্দ ফেরদৌসের কবিতার। একটা সংযোগ স্থল। আবার বিদায়ের প্রতীক। কখনো ভীড়ের ছবি। কখনো অপেক্ষা, নৈঃসঙ্গ্যের আরেক রূপ। পৃথিবীর ইতিহাস মাথায় করে হেঁটে যেতে যেতে ফেরদৌস দেখা পান তার জীবনের, তার কবিতার আগন্তুকের। একাকী সাঁকো বা বেড়িবাঁধের রাস্তায় কোনো কোনো মুখ চেনা হয়ে আসে। আবার অচেনা হয়ে যায়। স্মৃতির নির্যাস নিয়ে প্রেম হারানোর দিনে ঈশ্বরের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার কথা বলেন। এখানে কেবল চলা, কেবল গতি। আগেই বলেছি থেমে থাকার গল্প ফেরদৌসের কবিতায় নেই। ভ্রমণের ঐশ্বর্যে পূর্ণ কবির জীবনপাত্র। এই ভ্রমণ যেন-বা ধ্যান। এই ধ্যান যেন-বা মোক্ষ লাভের সূত্র। এই সূত্র যেন-বা দেখা দেয় একমাত্র আরাধ্য কবিতারূপে।
ক্রান্তিকালের ইস্কুলে বইখাতা জমা রেখে হারিয়ে যায় কবি বার বার
বলা হয় জগতে প্রকৃতির দুটি দিক আছে যা মানুষের সীমাবদ্ধতার ও স্বাধীন আদর্শবাদী ক্রিয়ার যোগফল। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রত্যেকটি বস্তুই সীমাবদ্ধ, বিকৃত এবং সংকুচিত। যে কারণে এর মূলে প্রাধান্য পায় বিকৃতি। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে ধরা পড়ে অন্তর্নিহিত সমগ্রতা, সজীবতা। এর কারণে মানুষের পক্ষে সৌন্দর্য দর্শন সম্ভব হয়। দার্শনিকদের মতে, সৌন্দর্যের অস্তিত্ব প্রকৃতিতে নয়, মানুষের সুন্দর আত্মার মধ্যে। এই সুন্দর আত্মার অভিব্যক্তিই শিল্পকর্ম। কবি ফেরদৌস নাহার তাঁর কবিতায়, শিল্পকর্মে সুন্দরকে বেঁধেছেন অন্তর্নিহিত সমগ্রতা, সজীবতা দিয়ে। নাগরিক জীবনের জটিলতা ক্লান্তি ও ক্লেদ সেখানে আসে তবে মুখ্য ভূমিকা নিতে পারে না।
কবিতা ও কবি পঠিত হন পাঠকেরই চোখে। ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গীতে এমন সব দিক উন্মোচিত হয় যা হয়তো খোদ কবিও ভাবেন না। শৈল্পিক সৃজনশীলতা নিজের ইচ্ছার সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য পূরণ করে থাকে। এবং তার উদ্দেশ্য হলো স্বাধীন হওয়া। খারিজ হওয়ার ভয় ও একই সঙ্গে গতানুগতিকতাকে পরিত্যাগ করার বিপুল আনন্দ নিয়ে ফেরদৌস নিরীক্ষা করে গেছেন তাঁর কবিতায়। কখনো আঙ্গিকে, কখনও বিষয়ের নতুনত্বে, কখনওবা কবিতার নির্মাণশৈলীতে। ফেরদৌস নাহারের গীতিকার সত্তা, চিত্রশিল্পী সত্তা এবং তাঁর প্রবাসজীবন তাঁকে রসদ যোগায় কবিতায় নিরীক্ষাধর্মী হওয়ার। তাঁর দীর্ঘ কবিতাযাত্রায় নানা বাঁকের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলো পাঠকের মনে মননে গেঁথে আছে। আজ জন্মদিনে তাঁর প্রতিটি কবিতাগ্রন্থ থেকে আমার পছন্দের একটি করে কবিতা তুলে দিলাম পাঠকের হাতে। ফেরদৌস নাহার আক্ষরিক অর্থেই কবিতার শ্রমণে নেমেছেন। কবির এই ধ্যানমগ্ন উড়ালযাত্রা নির্বিঘ্ন হোক।
পুনর্বার
কেমন অচেনা বালক দোল খাও বাতাসে।
তুমি ভালো আছো তো শহরে নগরে,
আমি তো পুরোপুরি চিনি না তোমাকে।
গৃহস্থের পয়মন্ত হাতে ফলেছে সংসার
আমার অভিশপ্ত হাত কেবল সে সব
ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যায়।
অস্পষ্ট গভীর ক্রন্দন নিয়ে
আমার হাত কে পারে ফেরাতে?
উঠোনের অক্ষয় মাটিতে বালক বয়স
তুমি কি পারো সে হাত ফেরাতে?
ভয় নেই, আমি ঠিক ফিরে যাবো
যদি তুমি পারো খুব ফেরাতে।
সেখানে এখন বিদায়ের উৎসব
সারারাত ধরে সাজিয়েছি গৃহদোর
একটু পরেই আমি সবকিছু ভেঙ্গে দেবো
হে অচেনা বালক
পারবে কি আমায় ঠেকাতে?
(ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন, ১৯৮৬)
মানুষের পাঁচটি মুখ
আমার জানা মতে
মানুষের পাঁচটি মুখ
একটি খাদ্য গ্রহণের জন্যে
একটি মিথ্যে বলবার জন্যে
একটি চুম্বনের জন্যে
একটি হাসবার জন্যে
আর একটি মুখ সত্যের জন্যে
আমি খুব সহজেই পাঁচটি মুখের
চারটি-কে পেয়ে গেলাম।
প্রথমে কিছু খাবার এনে রাখতেই
খাদ্য গ্রহণের মুখটি আপনাতেই খুলে গেলো।
আমি মানুষের ভাগ্য নিয়ে বিশ্ব পরিক্রমা করলাম
আর অমনি মিথ্যে মুখটি মানুষের দুর্ভাগ্য,
পরিণাম, আশা-হতাশা, বর্ণবাদ
ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অবিরাম মিথ্যে বলে গেলো
রাজনীতিবিদেরা যেভাবে বলে থাকেন।
আমি একটি শিশু এবং
একজন নারীকে উপস্থাপন করলাম
একটি মুখ পরম আহ্লাদে মুখ চুম্বন করলো
শিশুকে প্রকাশ্যে এবং নারীকে— অবশ্যই লুকিয়ে।
আমি জগৎবিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা
চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে এলাম আর কী আশ্চর্য
ওকে দেখামাত্রই একটি মুখ
প্রচন্ড হাসতে শুরু করলো।
যেন মহাহাসির কিছু ঘটে গেছে
এত কিছু করবার পরও
আমি সত্যের মুখটি পেলাম না।
অবশেষে ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই
কে যেন পেছন থেকে কাঁধে হাত রাখলো
এবং ফিস ফিস স্বরে বলে উঠলো,
গণিকালয়টি কোন্ দিকে একটু দেখিয়ে দেবেন কি?
আমি সত্যের মুখটি পেয়ে গেলাম
পুঁতি গন্ধ মাখা সত্যের মুখটি এখন
গণিকালয়ের দিকে ফেরানো।
(উলঙ্গ সেনাপতি অক্টোপাস প্রেম, ১৯৮৮)
কসাইখানার অন্ধকারে
কসাইখানার তক্তপোশে চারটি যুবক গল্পে বসে
শিকে গাঁথা মাংস-চাকা চনমনিয়ে নাচছে পাশে
চারটি যুবক গল্প করে বাজায় তালি
খুবসে হাসে ।
কসাইখানার তক্তপোশে ঝলসে ওঠে
ধারাল এক চাপাতি আর
মাংস কাটার ছন্দ নাচে
ঘচাং ঘচাং ঘচ ঘচ আর ঘুচুর ঘুচুর নাভিশ্বাসে
শব্দ আসে গন্ধ ভাসে
চারটি যুবক খুব জাঁকিয়ে হাসির তুফান দেয় মাতিয়ে
রক্ত ঝরা মাংস কেমন তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে
কসাইখানার অন্ধকারে এই পৃথিবী হচ্ছে লোপাট
টুকরো টুকরো মাংস হয়ে সাত বাজারে দেয় ঝুলিয়ে
কসাইখানার অন্তরালে,
হাড় মাংসের বেচাকেনায় চারটি যুবক
খুব চুটিয়ে আড্ডা মারে খিস্তি করে
শক্ত মঠোর গর্ভে শীতল নকশা রুমাল রক্তে ভাসে
যুবকগুলোর গল্প জুড়ে রঙচটা ঘোর বৃষ্টি নামে।
(দেহঘর রক্তপাখি, ১৯৯৩)
জাদুকর জীবনের মোড়ে
যদি জানতে পাও সব মিথ্যে ছিল, মিথ্যে ছিল
চরাচর উপত্যকা, বেনামি প্রেমের জন্মকথা
আর সব যা যা ভালোবাসা-বাসি।
যদি জানতে পাও আমার যে নাম ধরে
এতকাল ডেকেছ
সে-নাম মিথ্যে নাম, অন্য কারো
অলস চোখের পাতায় ঘুম না নামা হুতাশ
অন্ধকার হাতড়ে ফেরা সব ভুল
শুধু এক চমৎকার মিথ্যেবেলা সত্যের রূপ ধরে
এতকাল নদী নদী খেলা খেলে গেল।
যদি জানতে পাও এইসব বাতাস অজানা দিন
রক্তের ছোবলে নীল বিষ ঢেলে ঢেলে
ধোঁকা দিয়ে গেছে, দিয়ে গেছে সম্মোহন
আমি সেই জাদুকর জীবনের মোড়ে মোড়ে
সাজিয়েছি ইন্দ্রজাল, করেছি একাগ্র সাধন
হরেক দেশের মানুষ, হরেক রকম বেশে ঘাই মেরে
ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে মিথ্যে বলে গেছি
ফুল ফোটার সময় হলো হে মিথ্যে দিন
আমাকে আরক্ত করো, আমার প্লাবন ফেল খুলে
জেনে যাও আমিও ছিলাম ভুলে
ভুল জন্মের ইত্যবসরে।
(সমুদ্রে যাবো অবিচল এলোমেলো, ১৯৯৬)
রেখা
হাতের তালুর রেখা অনেকেই পাঠ করে
বুঝতেও পারে কেউ কেউ
আমি অবশ্য তাদের দলে নই
হাতমুঠি ভাঁজ করাই আমার রেখার কাজ
তবু কেউ বলে ওঠে আশ্চর্য হৃদয়রেখা তো!
হাতের রেখার গল্প দেখেশুনে জেনে গেছি
আমাদের যুগে এসব গালগপ্প যত
তবুও কারও কারও কেরামতি, অভূত উত্থান
আমাকে বিস্ময়ে ফেলে, অবাক আমি
অজান্তেই বলে উঠি, আশ্চর্য ভাগ্যরেখা তো!
অথচ জন্মটানে টান টান পড়ে আছি বেহদ্দ
অগোছালো চারদিক বৈষয়িক ঘরে
যত না বসবাস তারচে’ হাঁসফাঁস বেশি
ক্রোধ আর ঘূর্ণির সমূহ বিস্তারে
নির্লিপ্ত বলে উঠি, আশ্চর্য আয়ুরেখা তো!
(বর্ষার দুয়েন্দে, ২০০১)
গৌতমের সাথে কথোপকথন
ক্রমশ গৃহবাসী থেকে গুহাবাসী হয়ে উঠছি,
বাজারে কত কিছু, তবু কিছুই লাগে না আমার কাজে
উদাস দিনের পায়ে চুমু খেয়ে ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়ি দিনে,
আর রাত জেগে ঘুরে বেড়াই বিজন বসে থাকার দেশে।
গৌতম বুদ্ধ প্রায়ই আসেন, তাঁরও কিছু লাগে না ভালো,
বোধিবৃক্ষের নিচে আজকাল নিয়মিত জুয়ার আসর বসে,
ধ্যানের জায়গা নাই, ওরা বলে লুম্বিনিতে ফিরে যেতে
যেখানে গোপা ছেলে কোলে চেয়ে আছে পথের দিকে।
গৌতম তো যাবে না, আনমনা বলে, কী করি বলো তো…?
আমি আর কী বলবো, এত বড় মানুষ! বল্লাম,
আসুন, বসে থাকুন আমার এই গুহাময় গৃহে,
বসে বসে ধ্যান করুন, অথবা গান… সবই তো সাধন!
আমরা দু’জন কিছুই বলি না, কিছুই করি না,
চুপচুপ চেয়ে থাকি চাপ চাপ আঁধারের দিকে
গুহা দুলে ওঠে, তবু গৃহ থেকে বের হবো না পথে
হাজার বছরের পুরানো একটি হাত আমাকে ধরে বসে থাকে।
(বৃষ্টির কোনো বিদেশ নেই, ২০০৯)
প্রাচ্য তোমাকে গুডবাই
ঘনিষ্ঠ আঁধারে আজ কেঁদে যাবে আলোর পাখি
ঘরে ফেরা হবে না ব’লে দিগন্তের পাগল বাতাস
খোঁচা দেবে সারারাত্রি।
তুমি কেমন আছো শব্দভূক প্রাচ্য নাগরিক?
চোখের কোণে জল-বিন্দু, তুমি কেমন আছো হে
ঝোলে ভাতে মেখে খাওয়া অপূর্ণ বাঙালি?
এই সপ্তক বারান্দায় আজ থেমে আছে নক্ষত্র রাত
দূর ওই নিয়নের জ্বলজ্বলে জ্বলে থাকা নিঃসঙ্গতা
সাক্ষী করে অন্ধ আকাশ,
শব্দ তুলে ছুটে চলে ব্লু নাইট বাস
ঝিমাতে ঝিমাতে রোজ বাড়ি ফেরে— কলের পুতুল।
মধ্যরাত, টলমলে পায়ে হাঁটে ডাউন টাউন— গৃহহীন মাতাল,
শহর ঘুমাতে গেলে নগরকে জাগিয়ে রাখে যারা
তারা টেনে কোরাস গায়— প্রা চ্য তো মা কে গু ড বা ই…
(উদ্ধত আয়ু, ২০০৯)
ফেরারি প্রেমী
বিপন্ন চিকিৎসা আমার আজই সমাপ্ত হলো।
আমাকে দিয়েছে ওরা একাকাশ পথ্য, এক সাগর বিপর্যয় সিরাপ।
একা একা খেতে ভালো লাগে না তাই ডাক দেই পান্থজনে ।
বলি, এসো হে এসো পান করো জগৎ তরল,
গিলে নাও গুটি কয়েক ট্যাবলেট
এসো ভাগাভাগি করে ভুলে থাকি যাবতীয় যাবজ্জীবন…
মরিচা পড়েছে দূর স্বপ্নের লৌহ ফটকে
ধ্বনিরআগে এখন প্রতিধ্বনি এগিয়ে আসে
নবতারা আকাশে না উঠলে স্বস্তি পায় পুরানো আঁধার
আমার চিকিৎসক একজন নামজাদা ফেরারি প্রেমী
তার পায়ে আঁকা ছিল এককোটি বছরের আত্মঘাত উল্কি
বাড়ি তার জিউসের পাশের বাড়ি।
জিউস তার প্রেমিকাকে ভোগ করেছিল
যদিও এই কথা লেখা নাই পুরাণে, কিন্তু জানত সকলে
সেই থেকে চিকিৎসক আমার লিখে যাচ্ছেন শুকনো নদী…
আমি তার একাগ্র রোগী, খুব রাগী জানেন বলে
প্রতিদিন লিখে দেন একরাশ উজান ভাটি।
(পান করি জগৎ তরল, ২০১০)
ডাকঘরে সংসার
ডাকঘরে আমার খুব সংসার পাতার ইচ্ছে ছিল
ডাকটিকিট কপালে এঁটে ভেসে যেতে চেয়েছিলাম নগরে নগরে
হয়নি বলে ঠাণ্ডা ডকইয়ার্ডে বসে থাকি শীত উপেক্ষা করে
মরাতের জোৎস্নায় ভিজে এক একটি অপার্থিব মাঠ
পাড়ি দিয়েছিলাম পার্থিব মহরে। নিজ চোখে দেখেচিলাম
প্রকাণ্ড চাঁদ তার পোশাক বদল করছে খোলা মাঠপ্রান্তরে
সেকথা লিখেছিলাম সর্বোচ্চ ডামাশুল দিয়ে…
পাখি এবং টেলিগ্রাম একত্রে এনভেলাপে ঘুমিয়ে পড়ে
তখন বরিশালের জলঘাট টলমল দুলতে দুলতে বলে,
তোর কিছু হবে না!
যদি কিছু না-ও হয় তা-ও তো কিছু হওয়া…
(চারুঘাটের নৌকোগুলো, ২০১৩)
মদস্বাদ নিতে চাই জন্মের ভেতর
সাকিরা ঘুমিয়ে গেছে কে দেবে মদ?
মদের বোতল বলে ছুঁয়ো না আমাকে!
উজাড় বর্ষা এল, এল অচেনা জীবন
কষ্টের আধভেজা জলে ভিজতে ভিজতে
দুয়ারে দাঁড়াল যে তার কথা মনে কি পড়ে?
দাবায় উঠেছে ঘোর চাল চাল ঝড়
ঘোড়ারা লাফিয়ে চলে পিঠে তার অদেখা চালক।
মদপাত্র শূন্যে গড়ায়, লেগে আছে ক’ফোঁটা রোদ
সাকিদের ঘুমন্ত চোখ মদিরা মাদল
আমি যদি সব জানি তবে কেন কষ্টঘাই বুকে
সত্য স্বভাব গিলে কাছে ডাকে শ্মশানের ডোম
অনেক পুড়েছে দেহ মহাশূন্য খেলা শেষ জ্বর
অনেক ছাইয়ের পাশে শুয়েছি জ্বলন্তরাত
শবদেহ দুমড়ানো ভোর
বোতলের জিভ চাটে দূরাগত কণ্ঠের তাপ
আকণ্ঠ নেশাপান, আজন্ম ক্ষুধাভোগ
গড়াতে গড়াতে চলে ঘর থেকে পথঘোর পথে
আজ ডাকি—
ও সাকি কিছু মদ দেবে কি আমাকে?
আজ যে কণ্ঠ কাঠ!
চৌচির বুক ফাটে আবারও হাসে
এ-বর্ষায় জল নেই আছে শুধু মেঘর ধমক
যেখানেই যাই না কেন,
কিছুটা মদস্বাদ নিতে চাই জন্মের ভেতর।
(নেশার ঘোরে কবিতা ওড়ে, ২০১৩)
চলে যাওয়াই মৌলিক
যারা দূরে ছিল, তারা এখন কাছে এসেছে, আর যারা কাছে ছিল, তারা কি
এখন দূরে চলে গেছে! হয়তো সমুদ্র সংকেতে বাতিঘরের আলো খুঁজতে
বার বার এই চলে যাওয়া
যেতেই পারে, কারণ, থেকে যাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই মূলত মৌলিক
কত দিন ও রাত ঘেঁটে হেঁটে জেনেছি, অবলীলায় যদিও বা কাছে যাওয়া
যায়, চলে যাওয়ায় লেগে থাকে কঠিন যুদ্ধ এবং অধিকৃত বিতৃষ্ণা
মৌলিক মানে এখন, চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু বুঝি না
(নাভি ও নন্দন, ২০১৫)
পাখিদের ধর্মগ্রন্থ
পাখিদের ধর্মগ্রন্থে আমার নাম লেখা আছে
তুমি বলেছ, উড়ে যাবার হয়েছে সময়
পাখিরা দাঁড়িয়ে আছে, ওঠো
প্যাঁটরা তুলে নাও কাঁধে
আমাদের যেতে হবে পাখিদের সাথে
পাহাড় ডিঙিয়ে উঁচু উঁচু ব্লাফার্সের ধার ঘেঁষে
কতদিন ও রাত্রির অভিযান শেষে
আমরা থেমেছি মেহিকান প্রাচীন আকাশে
আমার যে মাটিতেই ভালো লাগে, কেন যে
পাখিদের ধর্মগ্রন্থে নাম লেখা থাকে
(পাখিদের ধর্মগ্রন্থ, ২০১৫)
রূপান্তরের ঘোড়া
আমিও গেয়েছি তার গান
মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের মতো এক একটি যতিচিহ্ন
দাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
আমিও চিনেছি সেই স্তব্ধতার মানে
শব্দাবেগে ঝড় ওঠা বিমূর্ত আবেগ
যাবার আগেই যারা হাত টেনে বিদায় জানাবে
তাদের ভরা চোখে জলকারবারঝুঁকে বৃষ্টি নামাবে
অনেক কিছুই তো ফুরায়ে না
রূপান্তরের ঘোড়া চলে যায় কত না দ্বারে
কত না কিছু যেতে যেতে কত মুখ ছুঁয়ে
শপথের কথা বলে
আমাকে ক্ষমা কর
আমিও কি গেয়েছি সেই গান
জটিল ধাঁধার উত্তরে মৃদু হেসে চুপ করে গেছি
চাইনি নতুন করে চক্রপাক ঘূর্ণি তুলুক
নেমে আসুক দুরারোগ্য গোধূলি আলো
নিঃসন্দেহে এ-কথায় নেই সন্দেহ
(রূপান্তরের ঘোড়া, ২০১৬)
যাবতীয় স্যাক্সোফোন
আনন্দ নেমে আসছে আজ অনেকদিন পর
বড় বিস্ময়, বড় বটশাখা আন্দোলন অলিন্দে অকারণ
তোমার চরমপত্র নিভে যাওয়া আলোর পাশে
পানিভাঙা পথ ভেঙে এইমাত্র দাাঁড়ালো এসে, বড় ভালোবেসে
স্যাক্সোফোন উঠল বেজে। হলুদ আগুনে যারা শুয়ে থাকে রাতভর
তাদের বুকের ঘরে ধরফর খবর পুড়তে থাকে
কিন্তু তারা পুড়ছে না নিজে
অপূর্ব তোমার দেশে মাঝিহীন নাও ভাসে শ্বাসে নিঃশ্বাসে
অকেদিন পর তার নামের অক্ষরে একদল পিঁপড়ে হাঁটে
আমি জানতাম না এত মিষ্টি সেই নামে শুয়ে আছে
(প্রেম-অপ্রেম যাবতীয় স্যাক্সোফোন, ২০১৭)
আমার দেশে হ্যালোইন নাই
অতঃপর আমার অসুখ হলো, দিনরাত হ্যালোইনের চরিত্র
দেখতে দেখতে কখনও ঘুমাই, কখনও জাগি
অবশেষে আমার রাত দিন পালটে গিয়ে সে এক অদ্ভুত
টাইম টেবিলে এসে দাঁড়াল। নিদ্রা ব্যাঘাত-জনিত
ঘটনাসমূহ ক্রমান্বয়ে ঘুরতে থাকে। অপেক্ষা করি—
কবে বাড়ি যাব, কবে সময় মিলিয়ে ঘুমাব জাগব
তারপর কত বছর উড়ে উড়ে ক্লান্ত ডানায় আঁকিবুকি
কাটতে কাটতে তোমাকে পাঠালাম একটা সাধারণ চিঠি
ভেবেছিলাম পৌঁছবে না। কিন্তু ঠিক ঠিকিই পৌঁছে গেল
হ্যালোইনের চরিত্রগুলো সারারাত জেগে পেছন পেছন
দৌড়ায়। জানি, বাড়ি গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে
আমার দেশে হ্যালোইন নাই
(বাজে অন্তহীন দ্রিমি, ২০২২)
ঝুঁকি নিয়ে ঝড় তোলে
ফিরে যাচ্ছি
যেতে যেতে একটি পিয়ানো ঝুঁকি নিয়ে ঝড় তোলে
আঙুলগুলো দেখি না, শুধু একত্রে অজস্র আঙুলের ঢেউ
ওঠা নামা করে
মাংসের বাজারে গমগম ঘোলাটে শব্দ উড়ে উড়ে ঘোরে
ঘুরে ঘুরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তার খুনেরা-গন্ধ
বিকিকিনির এমনই মন্ত্র, উচ্চারণের সাথে সাথে
কড়কড়ে কড়ি ও তেলের মিলিত নাচ ঝড় তোলে। অথচ
অঙ্কের হিসাব কষা এইসব ফন্দি-ফিকির খুব দরিদ্রভাবে
পড়ে আছে ভিখিরির অ্যালুমিনিয়ামের থালায়
ভীষণ নিরবচ্ছিন্ন দরদামের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি
হআরিয়ে ফেলা পথ হাঁক দেয়— কে যায়, ওকে ধরো।
কেউই ধরতে পারে না, কাছাকাছি এসে থমকে যায়
ফিরে যাচ্ছি। যেতে যেতে একটি পিয়ানো ঝুঁকি নিয়ে
খুব দ্রুত ঝড় তুলছে। দূরের ছায়াপথে সকরুণ কবিতা
হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে বিষন্ন গদ্যের সাথে
(হ্যাংওভার সন্ধ্যার ডানা, ২০২৩)
সাবেরা তাবাসসুম

পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার হাত ধরেই কবিতার সাথে আজন্ম সখ্য। কবিতা, অনুবাদ,
প্রবন্ধ/নিবন্ধ, সংগীত, সিনেমা ও চিত্রকলা নিয়েই তার সৃষ্টিশীল জগৎ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের
সংখ্যা সতের। চৌদ্দটি মৌলিক কবিতাগ্রন্থ এবং তিনটি অনুবাদগ্রন্থ।
