শামস আল মমীন: কবিতার সান্তিয়াগো

সাবেরা তাবাসসুম

১.
কোনো এক শনিবার বিকালে সাংসারিক কাজকে একপাশে সরিয়ে চায়ে চুমুক বসাতে বসাতে ভাবছিলাম সামান্য মনুষ্য জীবনে কবিতা কী আশ্চর্য শক্তি ধারন করে! কবিতা মাথায় নিয়ে সারারাত পথ হাঁটে চন্দ্রগ্রস্ত মন। দুনিয়াদারী উজাড় হয়ে যায়। প্রেম আচমকা পাশে বসে ঘন শ্বাস ফেলে কাঁধে। ভীরু মনন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে টগবগ করে ফোটে। কখনও ব্যথাবিদীর্ণ গোধূলি নিশ্চেতন হৃদয়ের সমব্যথী হয়। কখনওবা তীব্র টকটকে লাল ঠিকরে বেরোয় সংহতি। যখন ভাবছি এসব, তখন আমার হাতে সদ্য আসা ‘সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা‘ বইটি। শীত আসি আসি করছে। এর সাথে গরম গরম পাঠ চলছে বিষয় বৈচিত্র্যে ঠাসা নানা মেজাজের বর্ণের স্বাদের কবিতাগুলো। অনুবাদক কবি শামস আল মমীন। কিছুদিন হল তাঁর সাথে আলাপ হয়েছে লেখকবন্ধু আখতার ফারুকের সূত্রে তা-ও ফোনে। বলছি প্রায় এক যুগ আগের কথা। ‘সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা’ বইটির দু তিন কপি তখনও পাওয়া যাচ্ছিল বাজারে। সংগ্রহ করে পড়া শুরু করেছিলাম সেই সময়। তাঁর ঝরঝরে গতিশীল অনবদ্য অনুবাদে পরিচিত হতে থাকি এথরিজ নাইট, শ্যারন ওল্ডস, টয় ডেরিকোট, লেনার্দ নেইথান, ম্যাগি এনডারসন, চার্লস বুকোস্কি, টেড কুজার, লোরনা দে সেরভান্তেস, লুইজ গ্লিক প্রমুখের কবিতার সাথে। অনুবাদের যে খটমট বিমূর্ত একঘেয়েমি চরিত্রের বদনাম আছে বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রে সেটা একেবারে ঘুচিয়ে দিয়েছেন তিনি। শামস আল মমীন। তখনও তিনি আমার কাছে অনুবাদক। তাঁর কবিতার সাথে তখনও আমার সাক্ষাৎ ঘটে নি।

‘লি শেন’ দিয়ে তাঁর কবিতার সাথে আলাপ। তাঁর সাথে প্রথম দেখাও সেবার। শামস আল মমীনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মনোলগ উপহার পেলাম। মনে আছে, লি শেন কবিতাটি চাবুকের মত আঘাত হেনেছিল আমার মন ও মননে। যখন পাঠ করলাম, পাখির ছানার মত যার আধফোটা চোখ / ঝড়ের তাণ্ডবে নুয়ে থাকা তবু খাড়া শিরদাঁড়া, প্রতিবাদী– তখন ধ্বংসস্তুপের মাঝে টিকে থাকা হতবাক সজীব চারাগাছটিকে চোখের সামনে দেখতে পাই যেন। যখন কবিতার চক্রকে পূর্ণ করে আনেন এই বলে—

“আমি পাহাড়ের মত তার সামনে দাঁড়াই, বলি,
পড়ায় তোমার মন নেই। আজ তোমার আব্বাকে
কল করা হবে। ওয়ান্টন
স্যুপের মতই তাকে বিষণ্ণ দেখায়।
আমি বলি তিনি কি অফিসে?
তিনি নেই।
তবে তোমার মা?
সে আমার রক্তচোখে চোখ রেখে নরম শিশুর মত বলে,
ভিয়েতনামে।”

তখন আমার প্রশ্নের উত্তর মিলে যায় একটা শব্দ উচ্চারণে—ভিয়েতনাম। টের পাই পাঠকের মননে চাবুক হাতে জেগে থাকে—ভিয়েতনাম ও লি শেন। পুঁজি ও ক্ষমতার ছাতার নিচে যুদ্ধ ও নিপীড়নের শেলের ক্রমাগত আঘাত ও বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে লি শেন এক মিতবাক প্রতিবাদ। উচ্চকিত না হয়ে কবিতা কী করে মানবিক হয়ে উঠতে পারে তার চমৎকার উদাহরণ লি শেন। এরপর একে একে আরও কবিতা পাঠ চলেছে, কবিতা নিয়ে তাঁর সাথে হয়েছে প্রচুর আলাপ। বিস্মিত হয়েছি তাঁর কবিতায়, ভাবনায় বিষয় বৈচিত্র্য দেখে। আবার চিরাচরিত কোনো বিষয়ের ভিন্ন ও মনোজ্ঞ উপস্থাপনও চুম্বক টান টেনেছে। এ প্রসঙ্গে গোলাপ ১ কবিতাটিকে দুর্দান্ত বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না—

“গোলাপের রঙ ও সুবাস চিরকাল
রহস্যময়
তাকে দেখে মানুষ যা ভাবে
আসলে তা নয়…

সে খুব ভীরু ও উদাসীন,
তার ছোট ছোট পাতা
সরু সরু কাণ্ড-শাখা
আর
সুঁইয়ের মতো কাঁটা
দূরে রাখে
গন্ধলোভী
যতো
হাত…”

গোলাপ নিয়ে সাধারণত যে সকল কবিতা লেখা হয়, তার সুগন্ধ, আকার ও সৌন্দর্য্যকে প্রতীক, উপমা, চিত্রকল্প বা ভাবালুতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, এটি সেগুলো থেকে স্পষ্টতই আলাদা। মূলত দেখবার ভঙ্গিটা তাঁর ভিন্ন এবং সে কারণে এটি স্বতন্ত্র সংহত গভীর একটি কবিতা। অহেতুক উপমা চিত্রকল্পের মেদ কবিতাটিকে ভারাক্রান্ত করে নি। তাঁর কবিতা পড়লে বোঝা যায় তিনি এসেছেন প্রস্তুত হয়ে। বেশ আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছেন কবিতার সৃজনখেলায়।

২.
শামস আল মমীনের প্রথম কবিতার বই চিতায় ঝুলন্ত জোৎস্না (১৯৯৫) প্রকাশের পর থেকে ২০২২ সালের আজকের দিন পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নয় (মনোলগ দ্বিতীয়বার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে)। সবগুলোই কবিতার। একটি অনুবাদগ্রন্থ ছাড়া বাকিগুলো মৌলিক কবিতার বই। মানে তিনি আসলে পুরোপুরি কবিতার মানুষ। বই আকারে পাই নি, কিন্তু পাঠের সুযোগ হয়েছে তাঁর নেয়া কিছু সাক্ষাৎকারও। বলা বাহুল্য সেই অর্থপূর্ণ বিশদ সাক্ষাৎকারগুলোয় তিনি ব্যক্তির কাজ ও তার দর্শনকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা আমার আছে। কেবল পাঠ না বলে নিবিড় পাঠ বলা যায় তাকে। যে কারণে শামস আল মমীনের কবিতা ও কবিতার জার্নি নিয়ে দু চারটে কথা বলার ভরসা পাচ্ছি।

আগেই বলেছি তিনি বেশ প্রস্তুত হয়ে এসেছেন কবিতার জগতে। কেবল ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন বলে নয়, কবিতা লিখতে চেয়েছেন বলেই পাঠ ও অনুবাদের ভেতর দিয়ে তাঁর প্রস্তুতি এগিয়েছে। পূর্ব থেকে পশ্চিম— জীবন যাপনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে। তাঁর কবিতার গড়ন, বিষয় নির্বাচন ও
সৃজনশৈলী দেখে মনে হয় নানা মতবাদের চেয়ে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন পাশ্চাত্যের নানা কবিতা ও সাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে। বলা যায় হার্লেম রেনেসাঁ বা নিও নিগ্রো ম্যুভমেন্ট (১৯২০-১৯৩০) এর কথা। শুরু হয়েছিল কালোদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। বলা হয়ে থাকে সেটি এখনও জারি আছে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পমাধ্যমে। এই আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে মুক্তিকামী সকল মানুষের উপর। কবি শামস আল মমীনের কবিতা ভাবনায় তা দোলা না দিয়ে যায় না। দৌড় কবিতাটি আমার ভীষণ এ্যাপ্রোপ্রিয়েট লাগে এ প্রসঙ্গে। একজন বঞ্চিত কিশোরের গোটা জীবনচক্র, তার নির্মিত আকাঙ্ক্ষার কথা জেনে যাই। হতে পারে সে কালো, বাদামী বা হলুদ। হতে পারে যমুনা পারের কোনো ছেলে। বঞ্চিত কৈশোরে সে হয়ে উঠতে চায় ‘এ্যাডিডাস ম্যান’-এর দেখাদেখি ‘র‌্যালফ লরেন’। যাকে ঘৃণা করে সুবিধাপ্রাপ্ত মেয়েগুলো। আর যার ইচ্ছে করে ওই মেয়েদের দেয়ালে ঠুকিয়ে রক্তাক্ত করে দেখায় ওদের রক্ত তার মতই লাল। এই বাস্তবতার সাথে ঘোঁট পাকায় ড্রাগের আসক্তি। মেরুকরণ ও শোষণের রাজনীতিতে প্রান্তজন হয়ে বেড়ে ওঠার গল্প রয়েছে কবিতাটিতে। বৈষম্যের বঞ্চিতের মুখ চেনাতে এক অবশ্যপাঠ্য কবিতা দৌড়।

“…আমি আজ স্কুলে যাই নি। কালও যাব না। আমি দৌড়াচ্ছি,
দৌড়াতে দৌড়াতে আমার আকাশ দেখতে ভাল লাগে।
আমার কাপড়চোপড় ঝকঝকে, নতুন। আমি দৌড়াচ্ছি উড়ন্ত
বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র, আমার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ছে।
কে যেন আমার নাম ধরে ডাকে,
বড়শীতে গাঁথা মাছের মতো আমি ছটফট করি
আমার গলায় যেন চাঁদ আটকে আছে… আমি কিছুতেই তার নাম
বলতে পারছি না… কিন্তু আমি তাকে চিনি…” 

অভিবাসী জীবনে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে রূপান্তরিত হওয়ার ভয় তাড়িয়ে নেয় তাঁর কবিতার চরিত্রদের। সেই ভয় সেই টেনশন আছে পরবর্তী প্রজন্মের বেড়ে ওঠা নিয়ে। সাদা চামড়ার নীলচে সবুজ চোখের সরু হুঁশিয়ারির গল্প আছে। আর এরই মাঝে বড় হচ্ছে তাদের সন্তান। ‘ইমিগ্র্যান্ট’ কবিতার প্রসঙ্গ এখানে টানা যায়—

“সংসারে নৃত্য করে নিত্য
নরোম চাঁদের আলো। তুমি
শুনবে না ফেরিঅলার মচমচা ডাক, পাখিদের
কিচিরমিচির কিংবা বলের পিছনে ধাবমান বালকের
একরোখা দৌড়।
ফ্রেমে বাঁধা নীরব ছবির মতো বড়
হবে ছেলেমেয়ে। প্রতিবেশীর অসুস্থ প্রীতি

ওদের কোমল মুখে ছায়া হয়ে থাকে।

এদেশ সোনার, অফুরন্ত ফসলের এবং সম্ভাবনার;
কিন্তু এর কতটা তোমার!”

৩.
শামস আল মমীনের কবিতার সাথে পরিচয়ের এই এক যুগ সময়ে একে একে পাঠ করেছি তার বেশ কিছু কবিতা। মনোলগের পর তাঁর কবিতা বিষয়ে, আকারে আরো বিস্তার লাভ করেছে। এর মাঝে গরিবের ইশ্কুল, গরিবের ঘরবাড়ি আর গরিবের সংগ্রাম কবিতাগুলো আমার কাছে বিশেষভাবে উল্লেখ করবার মত। শার্ল বোদলেয়ারের ন্যাকড়াকুড়োনির মদ (দ্য র‌্যাগপিকার’স ওয়াইন) কবিতায় যেমন সুর পাই, এই কবিতাগুলোয় সেই আবহ আছে। বোদলেয়ার বলছেন—

“দরিদ্র লোকগুলোকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে অনুতপ্ত ঈশ্বর তৈরি করলেন নিদ্রা
মানুষ তৈরি করেছে পবিত্র সূর্যসন্তান মদ”

সমাজের ক্ষমতা কাঠামোয় প্রান্তিক মানুষের ছক কাটা জীবনের গল্প শামস আল মমীন বলেছেন তাঁর কবিতায়।গরিবের ঘরবাড়ি কবিতায় আমরা দেখি

” গরিবের ঘরবাড়ি গরিবের মতো
বৃষ্টি এলে ভিজে যায়
ঝড় এলে উড়ে যায়

ঘুমহীন মহলে ধনীদের কী ভীষণ মাথা ব্যথা, কিন্তু
চোখ বুঁজলেই গরিবের ঘুম আসে আর যখন ঘুমায়
মাথার উপরে
দোয়েল কোকিল সারাক্ষণ সুমধুর গান গায়…”

গরিবের সংগ্রাম আমার পছন্দের কবিতাগুলোর একটি। এখানে বলছেন—

“…আমি যে ইস্কুলে যাই তার মাঠে আম-কাঁঠালের
গাছ ছিল। কিন্তু ওইসব কাঁঠাল ও আম কোনদিন
সুবাস ছড়াতে পারেনি, কারণ

অসংখ্য ক্ষুধার চোখে ওরা
অসহায় ছিল।
অবশেষে ইস্কুলের পাঠ শেষ…
ওরা বলে শেষ
মাথায় গরিব চিন্তা
একদিন দলবেঁধে রাস্তায় মিছিল করি
গরিবের গান গাই
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি
পরনে জেব্রার মতো ডোরাকাটা জামা।
ওরা হেসে বলে, বসো…
হাঁটুমুড়ে সেই যে বসলাম
আর কোনদিন উঠে দাঁড়াতে পারিনি।”

শ্রেণিভেদের সমাজে বৈষম্যের চিরকালীন গল্প বললেন কবিতায়, অনুচ্চ স্বরে। সামাজিক ইস্যু, রাজনৈতিক ইস্যু, যুদ্ধ বা বৈষম্য নিয়ে কবিতা লেখাকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয় আমার। কারণ বেশিরভাগ কবিতারই স্টেটমেন্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এ সকল বিষয়কে কেন্দ্র করে যে সকল প্রচলিত ও জনপ্রিয় কবিতা আছে, তার মাঝে মুষ্টিমেয় কবিতা ছাড়া বাকিগুলোকে বিশেষ ঘোষণাপত্রের কাতারে ফেলা যায়। এই জায়গাতে শামস আল মমীনের কবিতার একটা বিশেষ মাত্রা আমরা পাই। তাঁর কবিতাগুলো আগে কবিতা হয়ে কাছে আসে। কী পর্বে সেগুলোকে বিভাজন করা হবে সেটা পরের ব্যাপার।

কবি শামস আল মমীনের কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পাঠককে তাঁর কবিতা এক ধরনের এথনোগ্রাফিক ভিউ দেয় । কখনও বিশদ, কখনও নয়। অথচ চরিত্রের জীবনের মূল বাঁকগুলো যেন বলা হয়ে গেছে কবির ভাষ্যে। কোনো রকম বাহুল্য ছাড়া। তাঁর কবিতা কেবল কবিতা নয়, সংবাদও। একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বিশেষ অবিশেষ চলমান ঘটনাগুলো— ব্যক্তির হেরে যাওয়া, বিচ্যুতি বা ক্লান্তি বা লড়াইয়ের কোনো না কোনো গল্পের বিস্তার থাকে। কথা সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে ডিটেইলিং, পাঠক পেয়ে যায় তাঁর কবিতায়। প্রেক্ষাপট অবশ্যই ঘোর বাস্তবের। কখনও উপসংহারের। কখনও অনাগত কালের। মনে হয় জীবনের নানা
লড়াই ও বাঁক পেরিয়ে এসেছেন যেন অভিজ্ঞ সান্তিয়াগো। অনন্ত লড়াইয়ের কথা ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসছে অসম্ভব দীপ্তিময় দুটো চোখে।

বিয়ন্ড রিয়্যালিটি বলে কিছু নেই তার কবিতায়। এই বস্তুবাদী পৃথিবীতে যা কিছু অনুচিত ঘটে চলেছে তার কাব্যিক উপস্থাপন হাজির করেন তিনি পাঠকের সামনে। বলা যায় মাইক্রো স্টোরি বেছে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। তার সাথে কদাচিৎ ফ্ল্যাশ ফিকশন। আর এগুলোর ভেতর দিয়ে বলে চলেন সামান্য-অসামান্য কথা। তারাপদ রায়ের কাব্যচিন্তাপথের তিনিও পথিক। তারাপদ রায় বলেছেন, “নিজের সম্বন্ধে আমার সবচেয়ে বড় কথা আমি কখনো এমন কিছু লিখি না যা স্পষ্ট নয়, যা বুদ্ধিগ্রাহ্য নয়, যা আমি নিজে জানি না বা বুঝি না। ধোঁয়াটে বা অপরিচ্ছন্ন উক্তিতে আমি বিশ্বাস করি না এবং স্বীকার করতে দ্বিধা নেই আজ পর্যন্ত এমন
কোনো পাঠক বা পাঠিকার আমি সন্ধান পাই নি যিনি বলেছেন, আমার কবিতা তিনি বুঝতে পারেন নি। যা সহজে বোধগম্য নয় তা যেমন আমি লিখি নি, তেমনি আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি মুখের ভাষায়। যে ভাষায় আমরা প্রতিনিয়ত কথা বলি, আমাদের সেই মৌখিক ভাষাকে আমি কবিতায় নিয়ে যেতে চেয়েছি।”

শামস আল মমীনের স্বাতন্ত্র্য হল এই মৌখিক ভাষায় পষ্ট কথার সাথে দেশান্তর ও প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার মিশেল দিয়ে উমদা সব কবিতা রচনা করে চলেছেন। যে কারণে তাঁর কবিতা পাঠকের সঙ্গে সফল যোগাযোগ তৈরি করে নেয়। ফলে তাঁকে জনবিচ্ছিন্ন কবি বলা চলে না একেবারেই।

শামস আল মমীন আরো বিশেষ হয়ে উঠেছেন মানবতাবাদী কবিতায়। এই বিশেষত্ব এসেছে বিষয় নির্বাচনের পর সেটাকে নিয়ে গবেষণা করার জায়গাতে। আকারে খানিকটা দীর্ঘ এসব কবিতা। লেখার পর সম্পাদনার টেবিলে যে খাটুনিটা তিনি দেন সেটা নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই বোঝে। আমরা নমুনা টানতে পারি কয়েকটি কবিতার। রেহানে জাবারিকে নিয়ে লেখা মা কবিতা কিংবা জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে লেখা আমেরিকা কবিতার কথা বলা যায়। সাভার ট্রাজেডি, লজ্জা অথবা একটা মাঠের গল্প, শাহবাগ, ষোলো একর পোড়া জমি, আয়মান কুর্দি এদের নিয়ে লেখা
কবিতাগুলোও উল্লেখযোগ্য। এরা ইতিহাসের দলিল। এসকল কবিতায় নথিবদ্ধ হয়ে আছে চলমান রাজনীতির কাঁটাতার, যুদ্ধবাজ মুখগুলোর শান্তির মুখোশ আর আপাত দৃষ্টিতে পরাজিত মানুষের অপরিমেয় প্রচেষ্টা। বলা যায় তাঁর কবিতা সমাজের অসংগতি, দুর্বলতা এবং অপূর্ণতার বিশেষ তথ্যচিত্র।

৪.
কবিতায় কথা বলে যেতে চান তিনি। একটা আলাপের পরিসর খুঁজে বেড়ান। কবিতা কোনো না কোনো উপায়ে কবির পুঞ্জীভূত আবেগের প্রকাশ। তিনি কখনও কখনও যেটা করেন, সেটা মূলত কথা বলা। উন্মুক্ত প্রান্তরে খোলা আলাপ। জরুরি আলাপ। সাধারণ আলাপ। কখনও কথা বলেন একা একা। মনোলগ। কখনও পাঠক তাঁর সাথে কথা বলে ওঠে। একটা জারি থাকা আলাপের চিত্র আমরা পাই তাঁর কবিতায়। এই বলার আকুতি কথা বলা দরকার কবিতাটিতে ফুটিয়েছেন তিনি—

“আমাদের কথা বলা দরকার
জাক লাকাঁ নয় কার্ল মার্কস নয়
সক্রেটিস নয় প্লেটো নয় তবে
আমাদের কথা বলা দরকার

বড় কোন কথা নয়
বড় কোন লোকও নয়
ছোট ছোট কথা
আমাদের কথা খুব সাধারণ কথা তবু
বলা দরকার বার বার বলা দরকার
……………………………………..
জীবনের জন্য এগুলো এমন জরুরিও নয়
তবু বলা দরকার বার বার
বলা দরকার। এইসব ছোট ছোট কথা

কাছে এসে বসা
গাঢ় করে প্রেম, আর
দূরে ঠেলে দেয় বিচ্ছেদের আকাঙ্ক্ষা…”

দীর্ঘ প্রবাসজীবন বলেই বোধহয় জন্মভূমিতে ফেরার আকুতি তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে আছে। স্মৃতিনিষ্ঠ জলজ কবিতা। পুরনো ভিটার লেনদেন, ফেলে আসা জন্মশহরে বন্ধুর মৃত্যু, নদীর কাছে ফিরতে না পারার বেদনা আরও নানান অনুষঙ্গ। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রেমের কবিতা তিনি বুঝেশুনে এড়িয়েছেন। তবে বাঙালি কবি
প্রেমের কবিতা লিখবেন না তা তো হবার নয়। সেটা অনিবার্য ব্যাপার। শামস আল মমীনের প্রেমের কবিতা নির্মোহ। কোনো গদ গদ ব্যাপার নেই। আর্ল গ্রে চায়ের স্বাদ ও সুবাস রেখে যাওয়ার মত মৃদু। স্বাস্থ্যকর। একটা সম্মানজনক দূরত্ব থেকে সম্পর্ককে দেখার ব্যাপার আছে। বোঝা যায় ঘোরগ্রস্ত কবিতার রাস্তায় তিনি হাঁটেন না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় আমরা দু’জনে নিঃসঙ্গ ছিলাম কবিতাটি। ভিন্ন স্বাদের প্রেমের কবিতা এটি। প্রতারণা ও প্রতিহিংসার গল্পে কখন যেন প্রেম দানা বেঁধে ওঠে। সঙ্গম সেখানে হয়ে ওঠে পরস্পরকে জানার এক চমৎকার কৌশল।
অমরত্বের বাসনা কোনো সৃজনশীল মানুষের মনে রেখাপাত করে নি, সেটা অসম্ভব ব্যাপার। শামস আল মমীনের কোনো কোনো কবিতা তাঁর সে আকাঙ্ক্ষার আভাস রাখে। তবে মৃত্যু ভাবনায় পৌঁছনোর আগে পরিণত বয়সের ভেতর লুকানো হাহাকার ও সৌন্দর্য্য দুইই তুলে আনেন কবিতায়। দীর্ঘ দাম্পত্যে আগামীর পূর্বাভাস জেনে যেতে থাকেন। স্বীকারোক্তি দেন—

“রক্তচাপ আর কলেস্টরেল আতঙ্কই বলে দেয়
যৌবন আমাকে ছেড়ে গেছে। দিনগুলো
এখন আগের চেয়ে ক্লান্ত
রাতগুলো খুব একঘেয়ে।
………………………………..
এক কাপ চা আর বাটার ফ্রি টোস্ট বলে দেয়
যৌবন আমাকে ছেড়ে গেছে।

আজকাল জেনেশুনেই তোমাকে ছুঁই,
এও বুঝি, আমরা চিরযৌবনা নই।
এবং কোনও না কোনভাবে
একে অপরকে বাঁচতে সাহায্য করি;
আর এও জানি কোনও না
কোনভাবে সাহায্য করবো… মরতেও।”

তবু এ জীবনে রিউইন্ড বাটন চেপে এত হল্লা ভীড়ের মাঝেও পুনর্বার নিজেকে চিনে নেয়ার সবুজ আশ্বাস দিচ্ছেন নিজেকেই। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার পর কিছু রয়ে যায় কি —

“আমি কাউকে বলি না কিছু
যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামের মত চুপ করে থাকি
সকলের কাছে প্রশ্ন হয়ে থাকি ।
যে পথে হেঁটেছি এতকাল
আহা! যদি আর একবার দেখে যেতে পারি,
আমার পায়ের চিহ্ন কি মুছে গেছে সব?”

৫.
ছোট্ট করে বলি, কবিতাযাত্রায় একজন কবি লম্বা পথ হেঁটে এলে তার পথ পরিক্রমার পুরোটা ধরতে পারা পাঠক হিসেবে একটু অসম্ভব ব্যাপারই বটে। শামস আল মমীনের কবিতা তাঁর পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে প্রকাশিত হবে, সমাদৃত হবে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়। আমার দৃষ্টিতে যে জায়গাগুলোয় তিনি বিশেষ, সেগুলোর
ওপরেই সামান্য আলোকপাত করেছি। এই স্বল্প পরিসরে প্রিয় অনেক কবিতা-ই অনুল্লেখিত রয়ে গেল। তিনি হাত কবিতাটি যেমন লিখেছেন তেমনি আত্মহত্যার আগে, ঘুমের পরেও কিছু ঘুম থেকে যায় কিংবা ছোঁয়া’র মত কবিতাও লিখেছেন। একই সাথে লিখছেন স্মৃতি, চিকলী, আ-মরি বাংলা ভাষা, প্রেম বা এক অদ্ভুত দিন ছিল আজ। আমার কাছে যথার্থই তিনি অভিজ্ঞ সান্তিয়াগো। মোট কথায় বিষয় এবং পরিবেশনের বৈচিত্র্যে ভরিয়ে রেখেছেন দুই বাংলার পাঠককে। বাংলা কবিতার জন্যে এ এক সুসংবাদ। তাঁর বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ কবিতা প্রকৃত পাঠকের জন্যে হোক সুষম আহার।

 

সাবেরা তাবাসসুম


কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top