মাহবুব আলীর গল্পঃ র‍্যাঁদা

মকসেদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। মেজাজ সপ্তমে। অনেকক্ষণ ধরে দোকানের বারান্দায় বসে আছে। একটি বিড়ি ধরিয়েছে কখন, সেটিও অর্ধেক হয়ে গেল। অম্বরিশ স্টোর থেকে বেরোয় না। ভেতরে ছুঁড়িও আছে। কী করছে কে জানে! ঘরের মধ্যে শুধু খসমশ শব্দ। ব্যাটার এতক্ষণ লাগে? শেষে হারামি ঘুমিয়ে পড়ল না কি? যা ঘুম-কাতর মানুষ! সুযোগ পেলেই ঘুমোয়। মকসেদ আর একবার হাঁক দেয়, –
‘কি বে তোর হল?’
চুপচাপ। কোনো সাড়া নেই। স্টোরের ভেতর একেবারে নিঃসাড়-নিঃশব্দ। পেছনে প্রাচীর আর তিন পাশে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী টিনশেডের ঘর। ইটের দেয়ালে নোনা ধরে গেছে। এখানে-ওখানে পাঁশুটে সবুজ শ্যাওলা। অকাজ কাঠ-তক্তার দেয়াল। কোথাও আড়াআড়ি ফাঁকফোকর। শুকিয়ে এই অবস্থা। তার মধ্য দিয়ে দিনান্তের শেষ সূর্য তির্যক ঘরের মেঝেয় নেমে গেছে। সেই আলোয় বাইরে থেকে ভেতরের কিছু আন্দাজ করা সহজ নয়। দৃষ্টিতে যা ধরা পড়ে সব ঝাপসা। দু-জন মানুষের ছায়া। অম্বরিশ আর সখিনা। কয়েক সপ্তাহ হয় এই ছুঁড়ি হাতে-পায়ে ধরে বসল। মায়াময় বিষাদ চেহারা। কি যে হল! মকসেদ ‘না’ বলতে পারল না। কাউকে পারতপক্ষে কোনো পাত্তা দেয় না সে। কখন কি হতে কী হয়! বিপজ্জনক বয়স। সখিনা এমনভাবে কাঁদল, পাথরের মন গলে যায়; আর সে তো আটত্রিশের বুড়ো। মোমের মতো গলে গলে নরম। তখন আকস্মিক সুফিয়ার কথা মনে পড়ে যায়। সবসময় তো মনে পড়ে। কিন্তু সে-সময় কেমন ব্যাকুল-উন্মন। বুকের মধ্যে খাঁ-খাঁ তেপান্তর জেগে ওঠে।

কত দিন হয়ে গেল সুফিয়া চলে গেছে। দুটি বাচ্চা রেখে পরপুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যায়, এমন কারও কথা মনে আনতে ইচ্ছে করে না, উচিত নয়; মন সেই কথা শোনে কোথায়? মন কিছু বোঝে না। অজান্তে টুপ করে কখন যে ভাবতে বসে খেই পাওয়া মুশকিল। তখন অনেক প্রেম অনেক স্মৃতি ভুশ করে দাঁড়িয়ে যায়। তার জন্য কত কি না করেছে! দিনরাত পরিশ্রম। টাকা রোজগার। কোনো সাধ-আহ্লাদ-শখ অপূর্ণ রাখেনি। দামি দামি ক্রিম-স্নো-পাউডার…শাড়ি-গহনা কত কি! পকেটে টাকা না থাকলে ধার-কর্জ করে ভালো ভালো বাজার। সব মিথ্যে। সুফিয়াকে পাগলের মতো ভালবেসে ছিল। এমন কোনো রাত ছিল না, বুকের মধ্যে আগলে রেখে ঘুমোয়নি। সামান্য মাথাব্যথায় দোকান ফেলে মাথা টিপে দিয়েছে। দারুচিনি বেটে কপালের দু-পাশে ঘন প্রলেপ। ঘর-সংসারের এটা-ওটা নানান কাজে হাত লাগিয়ে সহায়তা। কত কি! অবশেষে সবকিছুর মূল্য পেয়েছে, দাগা; প্রচণ্ড দাগা। বোকা মানুষ দাগা খেয়ে একে-ওকে বলে বেড়ায়, চালাকেরা বনজঙ্গলে গিয়ে কাঁদে। সে চালাক নয়…বোকা মানুষ। তারপরও বোঝে কাউকে বুকের গোপন দুঃখ বলা যায় না। উচিত নয়। মেয়েদের তাই খুব ভয় লাগে। প্রচণ্ড অবিশ্বাস। অনেক শিক্ষা শেষে বুঝে গেছে, এভাবেই বাকি জীবন চলে যাবে। কোনো স্বপ্ন…কোনো ভুল আর করবে না। অথচ সখিনাকে দেখে মন লাগামছাড়া উন্মন হয়ে যায়। বুক জুড়ে শূন্যতা লাফ দিয়ে ওঠে। আহা কত মায়াময় চেহারা!

সেদিন থেকে কাজে লেগে গেল সখিনা। হাতের কাজে সহায়তা করে। করাতে ফাইল ঘষে। বাটাল আর র্যাঁদার ব্লেডে ধার দেয়। কাঠ চেপে ধরে রাখে। নৈচাকুন্দানুর দড়িতে টান মারে। পরিশ্রমী। কোনো কাজে ক্লান্তি নেই। এখন কাজ শিখতে চায়। মকসেদ কাজ শেখাবে বলে দিয়েছে। সে নিজের কাজ করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্বেদবিন্দু মসৃণ মুখছবির দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়। দৃষ্টিতে ভেসে বেড়ায় মুগ্ধ-তন্ময় ঢেউ। স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে। কিন্ত…সে কি আর সম্ভব? মনের কথা মনেই থাকে। চোখে তো ধরা দেয় না। দেয়া উচিত নয়। অথচ অম্বরিশ কুড়ি-পঁচিশ দিনের মাথায় আচমকা সেই কথা বলে বসে। নিশ্চয়ই লুকিয়ে-চুরিয়ে লক্ষ্য রাখে সে। মকসেদ উদাস দৃষ্টিতে গোধূলির আকাশ দেখছিল। আজকাল আকস্মিক মন আনমনা হয়। সে আকাশ না কি সখিনা মনে নেই। অম্বরিশের কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠে। তারপর সারারাত একলা শয্যায় মাথার মধ্যে সেই কথা গুনগুন বাজতে থাকে। মনের দেয়ালে অচেনা কোনো কালো ভ্রমর রংধনু সুরের প্রতিধ্বনি তুলে যায়।
‘ওস্তাদ সখিনাকে ঘরে তুলে নাও। তোমাদের দু-জনকে বেশ লাগে।’
‘কি যা-তা বলিস বে? আমার বয়সের অর্ধেক বয়স। রূপার থেকে সাত-আট বছরের বড় হবে। তাকে বিয়ে করব? তোর মাথা খারাপ? লোকে কী বলবে?’
‘পুরুষ মানুষের আবার বয়স কি ওস্তাদ? আর লোকের কথায় কি যায় আসে? সে-সময় কত কথাই তো হল। তারপর সব চুপ। কেউ তো তাকে ভালো বলল না। একজন খারাপ মেয়েমানুষের জন্য জীবনটা নষ্ট করে দেবে?’
‘এই খারাপ মেয়েমানুষ বলিস না, তোর বউদি ছিল; সম্মান করে কথা কইবি।’
অম্বরিশ একপলক তাকিয়ে কথা বাড়ায় না। অনেকবার পুরোনো গল্প শুনেছে। সে দৃষ্টি সরিয়ে কাজে মন দেয়। বাটালির উপর হাতুড়ির ঘায়ে কাঠের বুকে ছিদ্র তোলে। মকসেদের অচেনা শিহরন। তার বুকের কোনো কোনায় গর্ত-ক্ষত তৈরি হয়। সে কিছুক্ষণ অম্বরিশের দিকে অপলক দৃষ্টি ফেলে রাখে। সুফিয়া আসলে খারাপ মেয়েছেলে। নষ্ট মানুষ ভ্রষ্ট চরিত্র। না না সুফিয়ার কোনো দোষ নেই। সব তার নিজের অবহেলা। সকল দোষ একার। তার বুক থেকে হালকা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। অস্থির ভাবনায় চলে যায় অনেক দূর। দৃষ্টি সজল হতে হতে আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে যায়।

সখিনা উত্তরের এককোনায় আপনমনে র‍্যাঁদার ব্লেডে শান দেয়। অগোছালো চুল। শত ভাঁজে প্রায় ভঙ্গুর অপরিষ্কার ফ্যাকাশে নীল কামিজ। বুকের উপর দড়ির মতো রক্তলাল ওড়না। সেটির বাঁ-পাশ উপরে উঠে গেছে। মকসেদের দু-চোখ ধাক্কা খেয়ে বিহ্বল। নিশ্চুপ সরে আসে। আঙুলের ফাঁকে আটকানো পেনসিল টুপ করে ঝুলে যায়। মেঝেতে ছড়ানো আর্টপেপারে আঁকা ডিজাইন। সরল আর বক্র রেখায় আঁকা বনেদি আমলের পালঙ্ক ঝাপসা হতে শুরু করে। সুফিয়ার কথা আবার মনে পড়ে যায়। স্বগতোক্তির মতো মনের মধ্যে পুরোনো ধ্বনি বাজে।

‘সুফিয়ার দোষ নাই রে…সব আমার। আমার কোনো অজানা ভুলে চলে গেল। তবে মুখ ফুটে বললে ভালো হতো। নিজেকে শোধরাতে পারতাম।’
মকসেদের দু-চোখ স্থবির ভাবলেশহীন। আজ দেড়-দুই বছর হয়ে গেল সেই মানুষকে দেখে না। কেমন আছে সে? অস্পষ্ট কোনো মুখছবি ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অনেক কথা অনেক দৃশ্য ঘুরপাক খেতে শুরু করে। মন-উন্মন অস্থির। তারপর বাতাসে বোবা দৃষ্টি তুলে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুফিয়াকে খুব ভালবাসত। কেন এমন হল? তার কথা একটুও ভাবল না? সেও তাকে ভাববে না। ভাবতে চায় না।

সেদিন আর আজ। মকসেদের কাছে যন্ত্রণার দিনগুলো সবসময় একইরকম। ধূসর অন্ধকার নীল আকাশ। প্রতিটি মুহূর্ত বিষাক্ত পোকা কামড়ের কিটকিট জ্বালা-যন্ত্রণা ছড়িয়ে অস্থির করে দেয়। দিতে থাকে। সে কী করবে? এ থেকে কোনো মুক্তি নেই। এভাবেই বুকের মধ্যে বিষকাঁটা নিয়ে বাকি জীবন বেঁচে থাকতে হবে। নরকের স্বাদ নিতে নিতে পেরিয়ে যাবে দিনকাল। তার বুক ঠেলে অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

অবশেষে সে বারান্দা থেকে উঠে দাঁড়ায়। স্টোরের কাছে গিয়ে আবার হাঁক ছাড়ে। কিছুক্ষণ নাকি অনেকক্ষণ…বেশ অস্থির জবাব ভেসে আসে। হাঁসফাঁস গোঙানি। মুখচাপা কণ্ঠ। জোর নিশ্বাস ছেড়ে দেয়ার শব্দঢেউ।

‘আর একটু ওস্তাদ…অনেকদিনের জমাট জিনিস। এই সখিনা, একটু উঁচু করে ধর তো, হ্যাঁ-হ্যাঁ ঠিক আছে, একটু বাঁয়ে; দাঁড়া…দাঁড়া।’

সখিনা কঁকিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। মকসেদের কানে স্পষ্ট বাজে তার রেশ। নিশ্চয় কিছু ওলট-পালট হয়েছে। কোনো অঘটন ঘটন। ছুঁড়ি লোড সামলাতে পারেনি। মকসেদ এসব ভাবনায় আরও অস্থির হয়। ধৈর্যের বাঁধ উধাও হয়েছে আগেই, এবার প্রপাতের মতো আছড়ে পড়ে। অনেক কাজ হাতে জমে গেলে মাথা ঠিক থাকে না। সে বাঁ-দিকে সর্বদা হেলে পড়া দরজায় এক লাথি মেরে বসে। পাল্লাটির বড় দোষ…খোলা রাখলেও একসময় আস্তে করে আবার ভেজিয়ে যায়। সে ডানহাতে সেটি চেপে ধরে প্রায় লাফ মেরে ঘরের মধ্যখানে গিয়ে দাঁড়ায়। একেবারে হতভম্ব।

‘শালা এতক্ষণ লাগে? একটা  র‍্যাক নামাতে এত সময় লাগে বে? হারামির পুত! আর ওই শালি, সকালে কিছু খাসনি? শক্তি নেই?’
‘কী করব ওস্তাদ? পুরানা রদ্দি মাল। তার উপর নানান জিনিস ভেতরে ঢুকে আছে। জাম মেরে গেছে।’

দশ ইঞ্চি চওড়া। তিন বাই সাড়ে চার ফুট র‍্যাক। সেটির দু-পাশে দু-জন ধরে আছে। একদিকে অম্বরিশ অন্যপাশে সখিনা। অম্বরিশ দুপুরে বাড়ি গিয়ে সেজেগুজে এসেছে। শেভ করে একেবারে ছায়াছবির নায়ক। রাজ্জাক-শাবানার ভক্ত। একটি ছবি যদি বাদ দেয়! কোনো কোনোটি তো হাফ-ডজন এক-ডজন দেখে ছাড়ে। কি যে মজা! মকসেদ কিছু বোঝে না। তবে কৈশোর পেরিয়ে আসা মানুষটি ভালো। দেখতে দেখতে তিন সাড়ে তিন বছর হয়ে গেল। তার সঙ্গে কাজ করছে। মির্জাপুরে থাকে। বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে। একটু আমুদে। প্রায় সময় মুখে গান, ‘গীতিময় সেইদিন চিরদিন বুঝি আর রলো না। আজ চৌরঙ্গিতে নতুন ছবি লেগেছে। নিশ্চয় ফার্স্ট-শো দেখবে। ছুটি না দিয়ে উপায় নেই। মায়া পড়ে গেছে। মকসেদ মনের দিক দিয়ে দুর্বল মানুষ। সিনেমা হলে ছায়াছবির কাহিনিতে সহজে মিশে যায়। বিষাদ-দৃশ্যে চোখ ছলছল ভিজে উঠে। হায় কত দিন সিনেমা দেখে না সে! তার দৃষ্টি সখিনার দিকে ছুটে যায়। রাতে বাঁধা চুলের ফিতে ঠিকমতো খোলেনি। ছাগলের লেজের মতো কাঁধের উপর ঝুলে আছে। চোখে-মুখে ক্লান্তি। ভারী কাজে হাঁপিয়ে একশেষ। হালকা ফরসা মুখছবি গোলাপি-লাল। অম্বরিশের চেহারায় কুঁচকে পড়া ভাঁজ। অসহায় দৃষ্টি। তবে শেষমেষ নামিয়ে এনেছে।

মকসেদ এবার নিজে এগিয়ে র‍্যাকের একপাশে হাত রাখে। তারপর তিনজন সেটিকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরোয়। স্টোর একেবারে জঞ্জাল হয়ে শেষ। একদিকে কয়েকটি ভাঙা আলনা। রংচটা বিবর্ণ আধখান খাট। একটি পাল্লাভাঙা মিটসেফ। একধারে কুন্দাই কাঠের ফরমা আর লোহার চাকা। কয়েক ডজন টুকরো কাঠের সতূপ সাজানো তক্তার উপর জড়ো করে রাখা। এ কি করেছে ফাঁকিবাজেরা! তার রাগ অন্যদিকে সরে গেছে। সখিনাকে বড় ক্লান্ত আর দুঃখী দেখায়। খারাপ লাগে। তখন সহসা দু-চোখে ধীরে ধীরে আবেগ জড়ো হয়। সেই ফাঁকে গুনগুন সুরে বেজে ওঠে সেদিনের কথা। আপনমনে বাজতে থাকে। মন্দ লাগে না। বুকের গহিনে শিহরন জাগায়। একবার কি ভেবে দেখবে? কি জানি! তারপর আবার ভালবাসা। বিশ্বাস। প্রতারণা। তার চলে যাওয়া। সে বুড়ো হতে চলা মানুষ। রোমান্টিক ভাবনা কেন? এখনো কি সিনেমার দিনে পড়ে আছে? সে আলগোছে নিজেকে সখিনার দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে নেয়।

সামনে র‍্যাক। সবটুকু জুড়ে ধুলো ময়লার আস্তরণ। নতুন কাঠের জিনিস। মূল্যবান। লালচে ঘি-রং। কাঠের পরতে পরতে তীব্র মাদক গন্ধ। মন উন্মন তেপান্তর-দোলা। র‍্যাঁদা দিলে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতর পোড়াতে থাকে। সে পোড়াক। যে পোড়ার, পুড়তে থাকুক; তাতে কারও কিছু এসে যায় না। এই নিয়ে দুনিয়া চলছে। দুনিয়ায় শত কাজ। কে কার খোঁজ রাখে?

অনেক কাজ করতে হবে। র‍্যাকের চারপাশে তক্তা…পেছনে প্লাইউড। ডানদিকে উপরে একটি ড্রয়ার। ফ্রন্টে বাতার কাজ। গ্লাস হোল্ডার। তবেই তৈরি হবে শো’কেস। শেষে র‍্যাঁদা শিরিশ মেরে মসৃণ ফিনিশিং। চার্ট-স্পিরিট-মোম-চক-খড়িমাটি-রুইমস্তক-কার্ফা-রঞ্জন মিলিয়ে কালচে-লাল-চকোলেট রঙের চমৎকার কাচ-বার্নিশ। তখন মড়া গাঙে নামবে জলঢেউ। বসন্ত যৌবনের জোয়ার। শুকনো-মরা গাছে ফুল। বাহারি সেই জেল্লায় পুরোনো কাঠের জিনিস খুঁজে পাবে প্রাণ। জীবন হবে নতুন। সামনে উৎসবের বাজার। মোটামুটি ভালো দাম পাওয়া যাবে। তার জীবন শুধু দাগা খাওয়া অচল-নিষ্প্রাণ-শক্ত কাঠ। বাতিল। সেটি দিয়ে কিছু হবে না। হয় না। এই বয়সে চুলে পাক ধরে গেল। মুখের উপর খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। সেগুলো আরও সাদাকালো। ওখানে শেভ দিয়ে র‍্যাঁদা মেরে উজ্জ্বলতা আনার কোনো সাধ জাগে না। জীবনের কোনো সাধ-আহ্লাদ বাকি নেই। তারপরও অম্বরিশের কথাগুলো বারবার মনে এসে ফাগুনের উদাসী বাতাস হয়। ঝড়ের নীরব ঢেউ তোলে। শজনের ডালে ডালে ঘি-রং ফুল মনকে দোলায়।

মকসেদ কী-সব ভাবতে ভাবতে র‍্যাক পর্যবেক্ষণে লেগে যায়। কয়েক মাস ধরে স্টোরে পড়ে ছিল। আজকাল করে কাজ ধরা হয়নি। কোনো কাজ নিয়মের মতো এগোয় না। এভাবে অবহেলা অনাদরে জীবন চলে? সে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। যে করে হোক সপ্তাহখানেকের মধ্যে ফিনিশিং মেরে দোকানের সামনে সাজিয়ে দিতে হবে। তারপর সহসা দৃষ্টি তুলে দেখে অম্বরিশ নেই। একেবারে হাওয়া। সে চোখের ইশারায় সখিনার দিকে জিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয়।
‘ডিটল আনতে গেইছে দাদা, আঙুল কাটিছে।’
‘কার?’
‘আমারে দাদা…যা ভারী!’
মকসেদ একটুও আশ্চর্য হয় না। চোখ সরু করে কৌতূহলী দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়। সখিনার ডানহাতের তালুতে রক্ত। অদ্ভুত বিষণ্ণ চেহারা মায়াময় লাগে। চেতনায় বড় কোনো পাপের অদ্ভুত শিহরন। ঢেউ খেলে খেলে দোলাতে থাকে। অবিমিশ্র উপলব্ধি। সখিনা…দেখতে মন্দ নয়। একটু সাবান তেল পড়লে চকচকে হয়ে উঠবে। ভালো কাপড়ে ফিল্মস্টার। অম্বরিশ কী ভেবে যে কথাগুলো বলে, তখন তার খেই খুঁজে পেতে ইচ্ছে হয়। মনের কোনায় বায়বীয় দৃশ্য-কল্পনা পাখনা মেলে আকাশে উড়াল দিতে চায়। সুফিয়ার কথা মনে আসে না। মকসেদ অন্য একজন মানুষ সেই সুখস্বপ্নে উজানের মতো জেগে ওঠে। দোকানঘরের চার-দেয়াল আকাশে ভেসে বেড়ায় অনেকক্ষণ।

আজ অনেক সহজ ভঙ্গিতে কাজ করতে পারছে মকসেদ। প্রাণ খুলে বকবক। নানান কথা বলে। অম্বরিশও কম সরস নয়। মাঝে মধ্যেই চটুল গানের দু-একটি কলি গুনগুনিয়ে ওঠে। মকসেদ স্কেল-পেনসিল নিয়ে টুকরো কাঠের মাপজোক করে। র‍্যাকে যে কাঠ, পাওয়া যাবে না; নিম বা আম কাঠ দিয়ে কাজ সারতে হবে। একবার বার্নিশ হয়ে গেলে ভেতরে কী আছে, কোন্ কাঠ কে জানতে পারে; কে বোঝে? যেভাবে মানুষ বুকের মধ্যে কী বয়ে বেড়ায় সব ছবি চেহারায় আসে না। কারও ঠোঁটের কোনায় হাসি লেগে থাকে। তার বুকে দগদগে ক্ষত। ক্ষণে ক্ষণে পোড়ায়। রক্তাক্ত করে হাজার স্মৃতি। কে বলে তার চেহারায় হাসির আড়ালে কত বেদনা লুকিয়ে আছে?

সখিনাকে দোকান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। মকসেদ এতদিন একসঙ্গে কাজ করল, কোনোদিন মনে হয়নি, মেয়ে মানুষ; এসব কাজ তার নয়। কিন্তু সেদিন বিকেলে সখিনার আঙুল থেকে রক্তপাত হতে দেখে প্রচণ্ড খারাপ লাগে। আহা সখিনার খুব কষ্ট! মকসেদের কারণেই এমন দশা হল! সে নিজে স্টোররুমে গিয়ে র‍্যাক বের করে আনতে পারত। কেন যে বারবার ভুল হয়ে যায়। অম্বরিশ দ্রুত ছুটে একদলা তুলোর মাথায় ডেটল ভিজিয়ে ফিরে আসে। সখিনার আঙুলে যত্ন করে জড়িয়ে দেয়। এমন দৃশ্য দেখে মন পোড়ে মকসেদের। নিজেকে গালাগাল দেয়। তার উচিত ছিল এসব কাজে নিজে এগিয়ে যাওয়া। দোকানে আলমারির কোনো কোনায় ডেটল-আয়োডিন যা হোক রাখা দরকার। এই ভাবনার মধ্যে বাতাসে ডেটলের ঝাঁজ ছড়িয়ে যায়। নাকে এসে লাগে। কিছুক্ষণ নাকি অনেকক্ষণ? একসময় আকস্মিক অনেককিছু ভাবতে বসে। সেই ভাবনা একদিন দু-দিন ছড়িয়ে যায়। অবশেষে সেদিন বলে উঠে, –
‘হ্যাঁ রে তুই মেয়েমানুষ। কাঠমিস্ত্রির এসব ভেজাল কাজ তোর দ্বারা হবে না।’
‘তা হলে কী করব দাদা? খেদায়া দিবেন?’
‘তো কী করা যায়? তুই বরং কোথাও বাসাবাড়ির কাজ কর।’
‘না দাদা!’

সখিনা আঁতকে সজোরে জবাব দেয়। মকসেদ চমকে ওঠে। পার হয়ে যায় নিশ্চুপ সময়। বড় অস্বস্তির অসহনীয় বিকেল সন্ধের কোলে নেমে পড়ে। কেউ কারও দিকে তাকায় না। তারপর ধীরে ধীরে ভেবে নেয় অনেককিছু। জীবনে কম অভিজ্ঞতা হয়নি। সব তার গল্প অথবা গল্প নয়। গল্পে জীবনকাহিনী থাকে। এই মেয়েটি অল্প বয়সেই খারাপ অনেককিছুর মুখোমুখি হয়েছে। এসব মানুষ হয় একদম খারাপ হয়ে যায় অথবা নিজের মধ্যে কুঁকড়ে থাকে। সখিনার বসবাস নিশ্চয় ভয় বা আতঙ্কের জগতে। মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত রহস্যময়। মেয়েদের অনেক কষ্ট থাকে। বিচিত্র অভিজ্ঞতা গল্প-কাহিনি। অসুন্দর কুৎসিত ঘটনা। সখিনাকে কী বলবে ভেবে পায় না সে। তখন অম্বরিশ এসে পড়ে। মকসেদ অবশেষে ভাবলেশহীন।
‘অম্বরিশ একে দিয়ে দোকানের কোনো কাজ করানো যাবে না।’
‘না দাদা আমি কাজ করতে পারব। এতদিন করছি, কোনো ভুল হইছে?’
‘সে কথা নয়। তুই এক কাজ কর…যেমন বাসায় থাকিস তেমন কাজ তোর উপযুক্ত। দোকানের কাজ তোর নয়।’
‘ওস্তাদ তো ঠিকই বলছে সখিনা। তুই ওস্তাদের বাসায় কাজ করবি। আর বস্তির নানি না কে কোন্ বুড়ির কাছে থাকিস, সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আয়। ওস্তাদের ছেলেমেয়ে একলা থাকে।’
‘তুই আবার মাঝখান থেকে ফ্যাচ ফ্যাচ করছিস কেন? ও আমার বাসায় কী করবে?’
‘সব কাজ করব দাদা। ভাত রান্না-কাপড় ধোয়া-ঘর ঝাড়ু দেয়া-মোছামুছি সব কাজ পারি।’
‘আর থাকবি কোথায়? তোর নানি বাড়ি?’
‘সে তো বস্তি ছেড়ে চলে আসবে ওস্তাদ। তোমার বাসায় থাকবে। রূপা আছে হাসিব আছে। ওদের সাথে থাকবে।’
‘তুই বলিস কি? না না লোকে খারাপ কথা বলবে। ঢিঢি পড়ে যাবে।’
‘তুমি মানুষকে বড় ডরাও ওস্তাদ।’
‘কোন্ শালারে ডরাই!’
‘যা সখিনা তোর কাজ হয়ে গেল। আজকেই জিনিসপত্তর সব গুছিয়ে ওস্তাদের বাড়ি চলে আয়।’
সখিনা বিস্মিত উন্মুখ দৃষ্টি মেলে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছিল। কিছু বুঝতেও পারে। তার মুখের স্মিত হাসি শেষ-বিকেলের আলোয় ঠিকরে ঝরে যায়। মকসেদ ছোট এক শ্বাস ছেড়ে অচেনা কণ্ঠে বলে উঠে, –
‘তুই কী বলছিস অম্বরিশ?’
‘আমাকে কাজ করতে দাও ওস্তাদ। সখিনা কাল দুপুরে ইলিশ মাছ রান্না করবি। ভাত খাব।’
‘তুই তো ম্যালা ঝামেলা করিস অম্বরিশ। ইলিশের দাম কত জানিস?’
‘অনেকদিন খাই না ওস্তাদ।’

মকসেদ কী বলে? তার হতচকিত দৃষ্টির সম্মুখে অম্বরিশ এখন অভিভাবক। সে দৃষ্টি সরিয়ে বিহ্বল কী দেখে যায় বুঝতে পারে না। সখিনা কাজ করে। দুপুরে খেতে যায়। বিকেলে সেজেগুজে ফিরে আসে। কলাপাতা-সবুজ প্রিন্টের কামিজ। উজ্জ্বল সাদা পাজামা। মাথায় একমুঠো চুল, বেশিরভাগ লালচে-কালো, তেল চপচপে চকচক; হেয়ার-ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা ছোট্ট খোঁপা। মুখে স্নোর প্রলেপ। চোখের উপরে চিকন কালো ভুরু, যেনবা প্লাক করে সাজানো; পাতায় হালকা আফশাঁন-চুমকি ছায়া। রোদের আলোয় নীল-সবুজ-সোনালি ঝিলমিল। মকসেদের এতদিন লাগে ভালো করে তাকাবার। সখিনার হাতে একটি টিনের বাক্স। অনেক যত্নে রাখা বোঝা যায়। লতা-ফুল-পাখি ছবির নিচে নীল-সাদা নকশি লেখা: ‘সুখের সংসার’। সখিনা প্রস’ত। মকসেদ কী বলে? সে নিশ্চুপ, কত সুন্দর কল্পছবি ভেসে যায়; কোনো শব্দ-ভাষা মুখে নেই। অজানা শিহরন-পুলক বুকের মধ্যে মৃদু বাতাস ছড়িয়ে দেয়। সখিনার আনন্দ মুখছবিতে ভেসে ওঠে অন্য কারও মুখ। সুফিয়া এমন করে চুল বাঁধত। তার ছিল মাথা-ভরতি ঝাঁকড়া চুল। অন্ধকার রাতের মতো। সে এক-একটি রাত বটে! রাতের মতো অতলান্ত গভীর-রহস্যময় কিছু হয় না। সখিনার চোখে-মুখে অদ্ভুত নিষ্পাপ বোকা বোকা মায়া। মকসেদের বুকে কেন জানি বারবার অজানা কোনো আবেগের ঢেউ জেগে ওঠে। অকারণ আনন্দ-বিষাদে ভাসাতে থাকে। ওদিকে সখিনা সব গল্প শেষ হলে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। তার চেহারায় অদেখা খুশির ঝিলিক।

মকসেদ সন্ধের কথা ভাবতে ভাবতে বুকে শিহরন তোলে। গতকাল অনেক রাতে ফিরেছে। কারও দেখা পায়নি। যেভাবে ডেকচি থেকে ভাত-তরকারি তুলে খাওয়ার দিনকাল, দেখে ঘরের টেবিলে সবকিছু কি সুন্দর পরিপাটি সাজানো। সখিনার কথা মনে পড়ে যায়। পরিবারে একজন মায়াবতী না হলে চলে না, কথা সত্য কথা ঠিক; কিন’…। আনমনে কী-সব ভাবনা-ছবি আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে পড়ে। সারারাত সুখ সুখ স্বপ্নদোলা। আজ অনেক ভোর-সকালে জেগে যায়। মন চঞ্চল-অস্থির। এলোমেলো কত ভাবনা। সে ঘর ছেড়ে বারান্দায় চৌকিতে বসে। সূর্য উঁকি দেয়। মন-উন্মন হালকা বাতাস। নয়ন সম্মুখে ঝকঝকে পরিষ্কার আঙিনা। শজনের কতগুলো পাতা ছড়িয়ে আলপনা ছবি। কয়েকটি চড়-ই কিচিরমিচির ব্যস্ত ওড়ে। হায় কতকাল পাখিদের দেখা নেই! আকস্মিক সুফিয়ার কথা, কত স্মৃতি কত ঘটনা; আঙিনায় ছিটকে নেমে আসে। সে যখন বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসত, সেই প্রত্যাবর্তনের মধ্যে বেজে ওঠে রহস্য উন্মাদনা; বিরহ-প্রতীক্ষা অবসানের গুনগুন সুর। সখিনা বুঝি সেই অদ্ভুত দোলা বুকে ছড়িয়ে দেয়। আনন্দ-বিহ্বল। মকসেদের ভালো লাগে। তখন সখিনা পশ্চিমের ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। অচেনা সুবাসে বাতাস উন্মাতাল। চোখের পলক এক-দুই-তিন। অবশেষে দৃষ্টির যোগাযোগ। একটি হাসির রেখা উজ্জ্বল সকাল এনে দেয়। মকসেদের মনছবি অ্পলক মুগ্ধ-বিস্ময় ধরে রাখে। আসলে ছুঁড়ি, ছুঁড়ি নয়; সখিনা দেখতে অনেক সুন্দর। আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো অপ্সরা সামনে হেঁটে যায়। তারপর মকসেদ কোনো ভাবনা নাকি দুর্ভাবনায় কেমন মিইয়ে পড়ে। মানুষজন খারাপ কিছু ভাববে না তো? মন্দ কথা যদি ওঠে? উঠবেই। সমাজে তির্যক দৃষ্টির মানুষজন বেশি, সকলেই পরের দিকে তাকায়; নিজের দোষ দেখে না। তখন কী হবে? কী জবাব আছে তার? এসব ইত্যাদি প্রশ্ন মাথায় কিছুক্ষণ গুনগুন সুরে ঘুরপাক খেলে পরে একঝটকায় নামিয়ে ফেলে। মানুষের খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই, কার ঘরে কে আছে, কে কার কী হয়, কে দেখে বেড়ায়? আসলে মন্দ মানুষের চিন্তা সবসময় খারাপ। সে মন্দ মানুষ…খারাপ মানুষ। তাই কি? সত্যি বলতে একটু লজ্জা-ভয় লাগে।

সুফিয়া চলে গেছে কত বছর…কতকাল পার হল। এই ঘরদোর মেয়েমানুষের স্পর্শ পায়নি। মকসেদের খটখটে শরীরের মতো চারিদিক রুক্ষ শুষ্ক। গ্রীষ্ম খরার দিনশেষে যখন আকস্মিক একপশলা বৃষ্টি এসে সবকিছু ধাঁধিয়ে দেয়, ভিজিয়ে দেয়, প্রত্যেক মুহূর্ত অলৌকিক মনে হতে থাকে, আজকাল যেন কোমল কোনো রূপছায়া স্নিগ্ধতার স্পর্শ ছড়িয়ে দেয়; তার বুক থেকে অপার্থিব তেমন নিশ্বাস বের হয়ে আসে। এসব আশ্বস্তকর ভাবনার মধ্যে চোখে পড়ে, সখিনা কত সহজে রূপা আর হাসিবের সঙ্গে মিশে গেছে। মকসেদের মন ভরে যায়। তখন সে নিজে থেকে রান্নাঘরে গিয়ে বাজারের থলে বের করে নেয়। বাজারে যেতে হবে। সে এখন বেশ স্বাভাবিক। সখিনা তার অনেকদিনের চেনা মানুষ, আপনজন; এমন গভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে বসে, –
‘হ্যাঁ রে তুই মাছ রাধতে পারিস তো!’
‘বাবা যে কি বলে…আণ্টি এর আগে এসে রেধে দেয়নি?’
‘তাই তো!’
মকসেদ হতচকিত নিশ্চুপ। বোকার মতো সলজ্জ হেসে ওঠে। রূপার দিকে তাকাতে ভরসা পায় না। অচেনা লজ্জা এসে ভিড় করে। কেন কে জানে। নিজের মধ্যে যে অকারণ উত্তেজনা, অসি’র ভাবিয়ে তোলে; আনমনে শাসনও করে যায়। আজ ইলিশ কিনতে হবে। অম্বরিশ খেতে চেয়েছে। সেও অনেকদিন খায় না। রূপা-হাসিবও খুব পছন্দ করে। সন্তানের তৃপ্তি স্বর্গের সুখ এনে দেয় বাবার।

কয়েক সপ্তাহ দেখতে দেখতে চলে গেল। মকসেদ এখন সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। তার কাঁচাপাকা চুলে পড়েছে কলপ। গোঁফের শক্ত আভরণে রং উজ্জ্বল কুচকুচে কালো। তার বয়স একলাফে নেমে এসেছে সাত-আট বছর। এখন সখিনার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে ছোটকাকুর মতো মনে হয় না। অম্বরিশের প্রতি প্রচ্ছন্ন কৃতজ্ঞতায় মন ভরে ওঠে। সেদিন তার কথামতো সখিনাকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে অনেক ভালো হয়েছে। অসহায় মেয়েটির মনে এখন ফুর্তির রংধনু। নিরাপদ-নিশ্চয়তার ছবি দু-চোখে তার। রূপা-হাসিব এখন কত সহজ প্রাণবন্ত! তাদের খাওয়া-দাওয়া, স্কুল যাওয়া-আসা; কোনোকিছুতে কোনো সমস্যা নেই। সকালে নাস্তা খেয়ে নিতে পারে। অথচ এতগুলো দিন কত কষ্ট হল! মকসেদেরও কষ্ট কম কিসে? সকালে উঠে মোড়ের দোকানে যেতে হয়। সেখানে লাইন ধরে পরোটা-ভাজি নিয়ে ঘরে ফেরা। ছেলেমেয়েকে স্কুলের জন্য রেডি করা। এসব ইত্যাকার কাজ করতে করতে বিবিধ উপলব্ধি। মেয়েদের অনেক কাজ। সে-সব কাজ সকলের দ্বারা হয় না।

কখনো কখনো উদাস বিষণ্ণতায়…স্বার্থপর ভাবনায় দু-চোখ ভিজে উঠেনি তাও নয়। সুফিয়া কী করে গর্ভের দুটি সন্তানকে ফেলে চলে যেতে পারল? তার কোনো ক্ষমা নেই। মকসেদ আর তাকে ভাববে না। কোনোদিনও না। এখন সখিনার দিকে তাকিয়ে পুরোনো সবকিছু ভুলে যাবে। যেভাবে গাছের শুকনো শাখায় নতুন করে সবুজ আসে, বৃন্তে বৃন্তে জেগে ওঠে বাতাস মৌতাত রঙিন ফুল; তার জীবনে ফিরে এসেছে অলীক বসন্ত। স্বস্তি আর বেঁচে থাকার নতুন অর্থ। সে এখন সকালের মোহময় সময়ে নিজেকে বিছানায় গড়িয়ে নিতে পারে। নিশ্চুপ শুয়ে শুয়ে কত কথা ভাবে। কত স্বপ্নের অর্থ বুঝতে পারে। সখিনা বারান্দার উনুনে কোনোকিছু রান্না করে। কোনোদিন পরোটা ভাজার চনমনে শব্দ-সংগীত। কোনো সকালের বাতাসে খিচুড়ির উন্মনা সুবাস। তেমন করে বুকে কোনো আগামীর অলীক দৃশ্যছবি শিহরন তুলে যায়। ঢেউ দোলাতে থাকে। ভালো লাগে।

অম্বরিশ নিত্যদিনের রুটিন-মতো দোকানে আসে। তার ঠোঁটের কোনে কখনো চিলতে মুচকি হাসি। মকসেদ বোঝে। এখন কোনো অস্বস্তি হয় না। তার চেয়ে অনেক বুড়ো কত অল্পবয়সি ছুঁড়ি বিয়ে করছে। সেও একদিন সখিনাকে ঘরে তুলে নেবে। কত দিন সেই কোমল স্পর্শ পায় না! এবার অবশ্যই ঘুরে আসবে সুদিন। মধুময় হারানো দিনকাল। এমন ভাবনায় দিন যেতে যেতে মন রঙিন। কোনোদিন অসম্ভব উদার। অম্বরিশের চোখ-ধাঁধানো দৃষ্টি সহজে উপেক্ষা করে। বাজারের থলে এগিয়ে দেয়।

‘শোন্ টাটকা দেখে সবজি নিবি। মৃগেল বা মৌরলা মাছ হাফ কিলো। পচা-শড়া নিবি না। ভালো মাছ না থাকলে খাসির মাংস আড়াইশ। তোর জন্য তো শালা গরু খাওয়া যায় না।’
‘আমার জন্য তুমি উপোষ থাকবে নাকি ওস্তাদ? হা হা হা…আমি বাড়িতে খেয়ে নেব!’
‘আ বে রাখ, বুড়ো মাকে আজ আর জ্বালাস না। বিধবা মানুষ তোর জন্য হাবিজাবি রাধতে হয়।…হ্যাঁ রে কাকি কেমন আছে? একদিন যাব ক্ষণ।’
‘ওস্তাদ তোমার কথা বলে মা। যখন একা এদিক-ওদিক ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তুমি ঠাঁই না দিলে কোথায় চলে যেতাম। ডাইল হেরোইন বেচতে গিয়ে হয়তো কাঠিখানায় থাকতে হতো।’
‘এখনো খাস নাকি? মেরে তক্তা করে দেব।’
‘কি যে বলো ওস্তাদ, অনেক বাঁচা বেঁচেছি! তুমি মানুষটা বড় দয়ার সাগর দাদা।’
‘ওই শুরু হল তোর রাজ্জাকি অভিনয়। যা বাজার চলে যা। থলেটা সখিনাকে দিয়ে চলে আসবি। রূপা-হাসিব স্কুল থেকে ফিরেছে কি না খবর নিস।’
এভাবে মকসেদ কোনো কোনোদিন অম্বরিশকে কাজের ফাঁকে দুপুরের বাজারে পাঠিয়ে দেয়। সেদিন দোকানের সকল কাজ অনেক সহজ হয়ে পড়ে। সখিনা বাড়িতে আসার পর থেকে সেখানের জীবনেও স্বাচ্ছন্দ্য। ছেলেমেয়ে দু-জন কথা বলার মানুষ পেয়ে খুশি। পাড়ায় পরিচিতি তুলে ধরে, ‘খালা বা আন্টি’। মকসেদের এখন আগের মতো তেমন তাড়া নেই। ভোরে ঘুম থেকে জেগে চোখ ডলতে ডলতে কালুর রেস্তোরাঁয় যেতে হয় না। নিজের কাপড় নিয়ে টিউবওয়েল পাড়ে কুস্তি নেই। প্রাণভরে গায়ে-মাথায় সাবান ঘষে ঘষে গোসল করতে পারে। এখন পুরোনো কাপড়গুলো ঝকঝক হাসে। নিজের জন্যও পেয়েছে কিছু সময়। স্বস্তি আর প্রশান্তি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া চেহারা-ছবি দুয়ারে এসে দাঁড়ায়। সে এখন খুশি। সুফিয়া আগের মতো স্বপ্ন-জাগরণে হানা দেয় না। আজকাল মনের মধ্যে নতুন স্বপ্নদোলা। সেখানে অসম্ভব কোনো সুপ্ত বাসনা থেকে থেকে জেগে ওঠে। অস্থির বাতাসে আনন্দ ঢেউ। অম্বরিশ যে কথা শোনাত, আঙিনার উত্তর কোনায় ছোট্ট আতাগাছ; তার পাতার ফাঁকে ফাঁকে হাজার চড়-ই সেই গান গায়। সখিনাকে একদিন কাছে পাবে। ফিরে আসবে সেই জীবন। এসব ভাবতে ভাবতে, স্বপ্নছবি দেখতে দেখতে তার নতুন চেহারা কাছে টানতে শুরু দেয়।

মকসেদ র্যাঁদা হাতে নিয়ে কাজ ভুলে যায়। দিগ্বিদিক ভাবনায় শরীর শিহরনে কাঁপে। পায়ের নিচে আমকাঠের তক্তা। র্যাঁদা মেরে পালিশ করে শো’কেস সাজিয়ে নেবে। তারপর কাচ-বার্নিশে চনমনে করে দেবে কাঠামো। দোকানের সামনে রেখে দিলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে বিক্রি হতে অসুবিধা নেই। এই তো জীবন! পুরোনোকে ধরে রেখে কি লাভ? তার মন ভাবনার প্রাচীন থেকে বের হয়ে আসে। যে দিন চলে গেছে, তাকে ধরে রাখা কেন? এখন পুরোনো মন র‍্যাঁদা মেরে নতুন রূপে সাজিয়ে নেয়ার সময়। নতুন মন নতুন মানুষ। কল্পনার কত ছবি ভেসে ওঠে। সে-সব দেখতে দেখতে বুকে এসে ঢেউ তোলে বসন্তের ঝিরঝির পাগল হাওয়া। একবার ইচ্ছে হয় কোনো প্রেমের গান কলি দু-ঠোঁটের শিসে ফুরফুর বাতাসে ছেড়ে দেয়। সাধ জাগে, কাজ ফেলে ছুটে যায় নিজের আঙিনায়। সখিনা এখন কী করে? মন খুলে কি বলে দেবে সেই পুরোনো কথা? নতুন করে?

মকসেদ শেষমেষ পারে না। কয়েকটি দিন চলে গেল অস্থিরতায়। চোখের দৃষ্টি সংযোগ করেও মনের কথা বুকের মধ্যে থেকে যায়। সকল কথা যে সময়ে বলা যায় না, পরিবেশ দরকার; সেই সত্য। সে সবকিছু হাতের নাগালে পেয়েও স্থির-স্থবির-নিশ্চুপ। অনুকূল বাতাসেও মন জ্বলে জ্বলে শুধু গুমট হয়। আজ দোকানে বসে বসে নিজেকে দোষে। সাহস না থাকলে কোনোকিছু অর্জন করা যায় না…সম্ভব নয়। তার বুকের মধ্যে বসে থাকা বুড়ো এক মন র‍্যাঁদা মেরে তরুণ হতে পারে না। কেন? সে যতদিন ভেবে নেয়, যে করে হোক বলে ফেলবে; কোত্থেকে বিমূঢ়-জড় সময় এসে সব গুলিয়ে দেয়। চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় সুফিয়ার ভর্ৎসনা দৃষ্টি। সেই চোখের জলছায়ায় নাচানাচি করে কৌতুক-শ্লেষ। তার ঝাঁকড়া চুলে ছেয়ে যাওয়া চেহারা আর মুখের ভাষা অসহ্য মনে হয়। বিছুটি দংশন জ্বালা। ‘তুমি কেমন পুরুষ? মেয়ে দেখলে কুকুরের মতো ছোঁক ছোঁক করো।’ মকসেদ অবশেষে নিজের মধ্যে অসম্ভব গুটিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্যকোনো পথ পায় না। কখনো কখনো স্থবির জড়জঙ্গম নিষ্প্রাণ। সত্যিই তো সে স্বার্থপর কামার্ত পুরুষ বই আর কী?

একদিন রাতের খাবার শেষে রূপা-হাসিব ঘরে গেছে। সখিনা তাদের সঙ্গে থেকে সারারাত আগলে রাখে। মকসেদ বসে আছে বারান্দার চৌকিতে। পকেট থেকে বিড়ি হাতে নিয়েছে। দু-আঙুলের ডগায় ডলে ডলে নরম করে। জ্বালানোর অপেক্ষা। সুযোগ এল কি? সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী ভেবে নিথর নিশ্চুপ। বুকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। আঙিনার পুব-উত্তর দেয়াল, শজনে আর আতাগাছ; পাশের বাড়িতে গন্ধরাজের ঝাড় পাঁপড়ি মেলে দেয়। বাতাস ফুরফুরে ঢেউ, সুগন্ধি রাত স্বপ্ন-মায়াময়, এই তো সুযোগ, সেই কথা বলা যায়; কিন’…। সখিনা এঁটো থালাবাসন তুলে নিতে নিতে চকিতে সলজ্জ দৃষ্টি ছড়িয়ে মুখ নিচে নামিয়ে ফেলে। অস্ফুটে বলে উঠে, –
‘দাদা কিছু কইবেন নাকি?’
‘উঁ!’
‘কয়দিন ধরে মনে হয়, আপনি কিছু কইবেন।’
মকসেদের কি হল! স্থবির হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। চোখের সামনে বসে থাকা সখিনাকে অচেনা মনে হয়। কি অপরূপ মায়াবতী! মকসেদ নিশ্চুপ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। হৃৎস্পন্দনের ছন্দে ছন্দে বিমূর্ত উপলব্ধি। এবার…হ্যাঁ এবার বলা যায়। কিন্তু সে পারে না। পারল না সে। সখিনা জবাব না পেয়ে নাকি অপেক্ষা না করে ধীরপায়ে টিউবওয়েলের দিকে চলে যায়। সেই রাতে বারান্দায় টিমটিম জ্বলতে থাকা পাঁচ-ওয়াটের বাল্ব একলা জেগে জেগে উপহাস করে। মকসেদ ঘুমোতে পারে না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে ঘুমহীন রাত তন্দ্রা মায়াঘোর নিজেকে খুঁজে পায় না। তারপর কখন কেন জানি মনে হয়, কোনো অপরূপা নারী খোলা দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্ত রহস্য ছায়া। সখিনা না কি সুফিয়া? সে চিনতে পারে না। অনেক উজ্জ্বল দৃষ্টির দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিবশ মন প্রাণ। সকালে ঘুম থেকে জাগতে দেরি হয়ে যায় তার। রূপা এসে ডেকে ডেকে বলে, –
‘বাবা তুমি এখনো শুয়ে আছো? জ্বর-টর হয়নি তো?’
‘না মা তেমনকিছু নয়।…নাস্তা হয়ে গেছে?’
‘হচ্ছে। আজ আন্টিও দেরি করে উঠেছে। তুমি উঠে পড় বাবা।’
‘উঠি মা।’

মকসেদ অবসাদ কণ্ঠে জবাব দিয়ে উঠে পড়ে। আঙিনায় দাঁড়ায়। শজনের ডালে কয়েকটি চড়ুই কিচিরমিচির করে। দুটো শালিক গহিন চোখে তাকায়। সখিনা উনুনের পাশে বসে আছে। তার দৃষ্টি দূর-দিগন্তে কোথাও। বিষাদ মায়াময় মুখছবি। মকসেদ চমকে ওঠে। তার দৃষ্টি কোনোদিন এমনভাবে ঘুরে আসেনি। কিশোরী মেয়েটি আকস্মিক দমকা বাতাসে সত্যি সত্যি আজ পূর্ণ নারী। রাতে কখন কেউ একজন জড়িয়ে ধরে, কোন্ স্বপ্নদোলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সে কি সুফিয়া, নাকি সখিনা, অথবা অলীক কোনো কল্পনা বা ভুল স্বপ্ন; মকসেদ কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারে না। সবকিছু উর্বর চিন্তার কোনো মায়াবী রাত অকারণ শিহরন তোলে। মন-উন্মন-বিবশ। সখিনা একবার তাকায়। দু-চোখে গভীর মায়া।
‘দাদা আপনের শরীর ভালো তো? এত বেলা করে তো কোনোদিন ওঠেন না?’

মকসেদ কোনো উত্তর দিতে পারে না। তখনো রাতের স্বপ্নঘোরে ডুবে থাকে। কী হল তার? সে গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। সেখানে ঘুরপাক খেতে থাকে। সুফিয়া কত দিন হয় চলে গেছে। নিন্দুকের কানাঘুষো-উপহাস-শ্লেষ-গল্প-কাহিনি। অনেক কষ্ট। কাউকে বুকের কষ্ট দেখাতে নেই। কোনোদিন দেখায়নি। সহ্য করে যায়। বেদনায় ঝুলে ঝুলে অস্বস্তিময় জীবন আবার স্বাভাবিক। তাই কী? কে জানে। এরমধ্যে কোনোদিন কোমল একটু স্পর্শ, আদর সোহাগ প্রেমময় সময় কোনোকিছু ভাবায়নি। যেভাবে নিজেকে অসহায় হতভাগা মনে হয়, কপালে সুখ নেই; সব মেনে নিয়েছে। কোনোদিন অসহ্য কোনো আকাঙ্ক্ষা জাগেনি। কিন্তু আজ এ অবস্থা কেন তার? হৃদয়ের পরতে পরতে কোন্ শূন্য হাহাকার বিষাদ তোলে? নিজেকে নিঃসঙ্গ একলা মনে হয়?

উৎসবের দিন এসে গেছে প্রায়। বড়মাঠে বৈশাখি মেলার আয়োজন চলে। মকসেদের কত ভাবনা-পরিকল্পনা। নতুন বছরে নতুন করে সাজিয়ে নেবে ঘরদোর-সংসার-জীবন। পরশুদিন সেই র‍্যাক দিয়ে তৈরী শো’কেস ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। কে বলবে পুরোনো কাঠের কাঠামো, তার হাতের স্পর্শে, র‍্যাঁদার ঘষায় হয়ে গেছে মূল্যবান শৌখিন জিনিস। এ জীবন-সংসার বস্তুতে তুষ্ট। সেও কম কিসে? নগদ টাকায় স্বস্তি তার। মনে দোলা দেয় কোনো স্বপ্নের দিন। নিজেকে তেমন ঘষেমেজে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার অবসর। সে সন্ধেয় মালদহপট্টির দোকান ঘুরে ঘুরে বৈশাখি শাড়ি কেনে। সখিনাকে কোন্ শাড়ি মানায়? রূপা-হাসিবের জন্য বর্ণমালা নকশি রংছাপ পোশাক। নিজের জন্য পাঞ্জাবি কিনতে গিয়ে থমকে ওঠে। সে তো এমন পোশাক পরে না, কোনোদিন পরেছে মনে নেই; একবার বিয়ের সময়। আহা কি সুখ-উন্মাদনা ছিল সুফিয়াকে কাছে পেয়ে! কাজকর্ম দোকান আর বাড়ি ইত্যাদি কোনোকিছু দামি নয়। সারাদিন-রাত বসে থাকে তার কাছে। তার উজ্জ্বল মুখছবি-কথাভঙ্গি-দৃষ্টির সামনে নতুন করে খুঁজে নিতে কত সাধ! সেই সুফিয়া বড় দাগা দিয়ে চলে গেল। কেন? সে জানে না। তার কথা কত আর ভাবে সে? সুফিয়া কি ভাবে? মকসেদের দিন কীভাবে চলে যায়? কেমন বেঁচে আছে? দু-জনের ভালবাসার দুটি ফুল, রূপা আর হাসিব; কেমন আছে তারা? সুফিয়া কি কোনোদিন ভেবেছে? না…কোনোদিন ভাবে না। যে নারী সকল বন্ধন ছেড়ে চলে যেতে পারে, অতীতদিনের কোনোকিছু সঙ্গে নেয় না; মকসেদও পেছনের সকল জঙ্গল ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বাঁচবে। অম্বরিশ যেভাবে স্বপ্নের দুনিয়া চিনিয়ে দেয়, সেখানে নিজেকে নিয়ে যাবে। সখিনাকে নিয়ে গড়ে তুলবে ভালবাসার নতুন ভুবন।

মকসেদ দোকানে বসে বসে স্বপ্নঘোরে ভেসে যায়। একসময় আলমারির পাল্লা খুলে প্যাকেটগুলো স্পর্শ করে। এককোনায় সবকিছু গুছিয়ে রাখে। নিজের জন্য অবশেষে সেই পোশাকও কিনে ফেলেছে। একটু বাহুল্য খরচ। সে হোক…কোনো কোনো শখ বা সুখের জন্য একটু বেহিসাবি খরচ করতে হয়। আজ শেষ-দুপুরে কিনে নেবে সিনেমার টিকিট। সকলে মিলে সন্ধের শো’তে দেখবে কোনো কল্প-কাহিনি। নিজের জীবনে খুঁজে নিয়ে আসবে আনন্দধারা। সে ভুল করছে না তো? একবার রূপা আর হাসিবের মতামত নিলে ভালো হয়। কোনো বাধা হয়তো আসবে না। তারপরও জেনে নেবে। সন্ধ্যের য়ালোছায়ায় নিজেকে সযত্নে লুকিয়ে খুঁজে নেবে আলোময় জীবনের সকল প্রস্তুতি। এসব ভাবনার মধ্যে অদ্ভুত চঞ্চল-অস্থির স্বস্তি বুক জুড়ে নেমে আসে। সময় গতিময় থাকে না। একসময় অম্বরিশ এসে হেসেখেলে কাজ করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। বড় অস্থির।
‘ওস্তাদ আজ বিকালে আসতে পারব না।…ফিল্ম দেখতে যাব।’
‘কোথায় কোন্ ছবি চলছে রে? অনেক বছর দেখা হয় না। একদিন আমাকেও দেখতে হবে।’
‘আর বলো না ওস্তাদ…আজকেই শেষ শো। তুমি সিনেমা দেখবে নাকি? আগে তো ছবি দেখতে। রোমান্টিক এক ফিল্ম চলছে।’
‘দেখি কী করা যায়?’
‘ওই দেখতে থাকো। ভাবতে থাকো। বউদি চলে যাবার পর তুমি তো আর, সে যাক…আমি আজ আর আসছি না।’

মকসেদ বোকার মতো নিঃশব্দে হেসে ওঠে। আজ তারও ইচ্ছে সিনেমা হলের আলোছায়া নির্জনে কোথাও দু-দণ্ড বসে। সখিনার কানে কানে অকপটে বলে ফেলে মনের সকল কথা। এত সময় গেল, কত সুযোগ এল; বলতে পারল না। সে কি নিস্পৃহ অলস? সংকোচ কাবু? সাহস নেই? হবেও বা। কেন যে ইদানীং এমন হয়। সত্যি বলতে বাইরে যা দেখা যায়, সবটুকু সত্য নয়; কার বুকে কী হয় কে জানে? কোন্ ঝড় বয়ে চলে সেই জানে। কারও খোঁজ রাখার কথা নয়। সেই ভাবনা সেই কথা তার একার থাক, কাউকে জানানোর প্রয়োজন কি? কিছু কথা কিছু স্মৃতি আর পরিকল্পনা নিজের মধ্যে রেখে দিতে হয়। আজ সেও যাবে সিনেমা দেখতে। রূপা আর হাসিব যাবে। সঙ্গে থাকবে সখিনা। পাশে বসিয়ে আলগোছে বলে ফেলবে ভালোলাগা-ভালবাসার স্বপ্নকথা। নতুন পরিকল্পনা। অতীতের ধুলো-ময়লা আস্তরণ র্যাঁদা মেরে খসিয়ে চকচকে ঝকঝকে করে নেবে জীবন। ঘরদোর-সংসার-বেঁচে থাকা জীবন। কারও জন্যে বুকে দুঃখ-হতাশা রেখে মেঘলা-বিষাদ করবে না নতুনের আকাশ। একটি জীবন…একবারই আসে…আর ফিরে পাবে না।

মকসেদ সন্ধের আগে আগে যখন ঘরে ফিরে আসে, চঞ্চল-ব্যস্ত; হাতে বৈশাখি কাপড়ের প্যাকেট। পকেটে চারটি টিকিট। মনে উন্মাতাল প্রত্যাশা। রূপা সামনে এসে দাঁড়ায়। তার দু-চোখে আনন্দ উপচে পড়ে। নতুন কিছু পেলে খুশি হয় সকলে। আজ মকসেদের মনেও আবেগ-উচ্ছ্বাস। বাঁধভাঙা জোয়ার। জীবন নতুন রূপে সাজতে চায়। কোনো প্রশ্ন কোনো যুক্তি নেই। এই তো জীবন। মন আবেগের ঘুড়িতে আকাশে মেঘের মতো ভেসে যায়। সে তাই তেমন আগুপিছু না ভেবে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে সখিনাকে খোঁজে।
‘হ্যাঁ মা তোর আণ্টি কোথায়? আজ সকলে একসাথে সিনেমা দেখতে যাব। এই দেখ খুব ভালো সিটের টিকিট এনেছি।’
‘আণ্টি তো কিছুক্ষণ আগে অম্বরিশ কাকুর সাথে সিনেমা দেখতে চলে গেল।’

মকসেদ হতবিহ্বল নিশ্চুপ-স্থির। কিছু বুঝে উঠতে পারে না। অথবা অনেককিছু বুঝে নেয়। পুরোনো কাঠ র্যাঁদা মেরে নতুন করে তুললেও একসময় নির্জন অন্ধকারে ঘুণপোকার অসি’রতায় জেগে ওঠে। মানুষ তার ভেঙে পড়া ক্ষয়ে যাওয়া মন ক্ষণিকের মুগ্ধতা-লোভে সেজে উঠলেও সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এমনই হয়। তখন বুকের নির্জনে একাকী কাঁদতে বসে কেউ। নিজের সঙ্গে তো মিথ্যে চলে না। সে এখন কী করে? আলগোছে পকেটে হাত দিয়ে টিকিটের স্পর্শ নিতে নিতে কোনো দিশার সন্ধান করে মাত্র।

তখন দমকা বাতাসে দেয়ালের ওপাশ থেকে গন্ধরাজের সুবাস বারান্দা ভাসিয়ে দেয়।

 

মাহবুব আলী

প্রভাষক-ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট
প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক-দৈনিক উত্তরা, সহযোগী সমন্বয়কারী-সিডিএ, সমন্বয়কারী-এসপিপি, পরামর্শক-সিটিএস, দিনাজপুর।
গণেশতলা, সদর, দিনাজপুর; বাংলাদেশ।

প্রকাশিত বই: ছোটগল্পের নির্মাণশৈলী (সাহিত্য ও সাংবাদিকতা),অস্তিত্বের পলায়ন (গল্প), ভয় (গল্প), অযোগ্যতার সংজ্ঞা (গল্প), পিঙ্গল বিকেলের আয়নায় (গল্প), রাত পাহারা চোখ (গল্প), গোপনীয়তার অলিগলি (গল্প),
প্রকাশক: জয়তী বুকস, ঢাকা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।