মোস্তফা সোহেলের উপন্যাস: ময়ূখ হাওয়া

দুই

সন্ধ্যার আলোয় একা একা বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল মরিয়ম বেগম। আলোময় দিনটাকে যেনো অস্পস্ট এক অন্ধকার গ্রাস করছে ক্রমশ । পাখিগুলো দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছিলো তখন। চারদিকে খুব ধীরে ধীরে বিষণ্ণতা এসে ভর করছিলো মেঘেদের মতো। এরকম খুব ধীর, শান্ত সময়ে একটা খবর তাকে ভেতরে ভেতরে আনমনা করে তোলে !

কিছুক্ষণ আগেই মেয়ে রুক্মিণী ইউনিভার্সিটি হল থেকে ফোন করে জানিয়েছে, ওর বাবা সাবু আজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে জনসভার ভেতরেই। খুবই সিরিয়াস অবস্থা। তাকে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছে গুলশানের সপ্তর্ষি হাসপাতালে!’ সে এখনই মরিয়ম বেগমের মুগদার বাসায় আসছে। হাসপাতালে যাবে।’ খবরটা শুনে কিরকম নস্টালজিক হয়ে যায় মরিয়ম বেগম। পাশাপাশি নিজের স্বামীর উপর একটা তীব্র ঘৃণাও ফুঁসে উঠতে থাকে সাঁপের লকলকে জিহ্বার মতো।

সেই কবেকার কথা। সাবুর সাথে যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়স কতোই বা ছিলো? বাইশ? তেইশ? সবেমাত্র ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়েছে সে। সাবু তখন ছাত্র রাজনীতি করা টগবগে যুবক ! সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়েছে। ছোটোখাটো ব্যবসা শুরু করেছে গাড়ির পার্টসের। যা উপার্জন হতো ওর, তাতে ভালোই চলে যেতো দুজনের। এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাইতোও না মরিয়ম বেগম। ছিমছাম সাজানো-গোছানো সংসার। আস্তে আস্তে ব্যবসাটাও বাড়তে থাকে সাবুর! একজন মন্ত্রীর সহায়তা নিয়ে জাপান থেকে কিছু গাড়ি ইমপোর্ট করে সে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সাবুর! মতিঝিলে একটা ছোট্ট গাড়ির শো রুম করে জাকিয়ে ব্যবসা শুরু করে সে। এভাবেই পাঁচ বছরের মাথায় দুটো শোরুম হয়ে গেলো। ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে গুলশানে করে ফেললো একটা বড় রেস্টুরেন্ট। নিজের রাজনৈতিক দলের সেন্ট্রাল কমিটির মেম্বার হয়ে গেলো সাবু । তারপর রুক্মিণী এলো। মরিয়ম বেগমের জগৎ তখন মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু রাজনীতি আর ব্যবসা সাবুকে যেনো দিনের পর দিন অন্য মানুষে পরিণত করে তুললো। সাবু তখন রীতিমতো নিজের পার্টিকে চাঁদা দেয়। ব্যবসার কাজকর্ম সেরে বাড়ি না ফিরে রাতভর পার্টি অফিসে থাকে। কোনোদিন বাড়ি ফেরে। কোনোদিন ফেরে না। এদিকে একরকম বাবার অযত্নে, অনাদরে বেড়ে উঠতে থাকে রুক্মিণী।

অথচ মেয়েকে কি ভীষণ ভালোবাসতো সাবু। রুক্মিণী নামটা অবশ্য সাবুর দেয়া। জন্মের প্রথম দিনই মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে সাবু বলেছিলো, আজ থেকে ওর নাম হলো রুক্মিণী! তারপর মরিয়ম বেগমের দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিলো, রুক্মিণী কে জানো? প্রশ্নটা করে নিজেই উত্তর দেয় সে।

রুক্মিণী ছিলো শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী। ইনি বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের কন্যা। রুক্মিণী শ্রীকৃষ্ণের প্রেমে পড়েন নিজেই এবং তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছেও প্রকাশ করেন। কিন্তু শিশুপালের সঙ্গে রুক্মিনীর বিয়ে ঠিক হয়। শ্রীকৃষ্ণ এটা জানতে পেরে বিয়ের ঠিক পূর্ব লগ্নে রুক্মিনীকে হরণ করে বিয়ে করেন । পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিনীর ঘরে দশটি তেজস্বী পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছিলো !

নামের ব্যাপারে সাবুর কাছ থেকে এরকম ব্যাখ্যা শুনে মনে মনে হাসে মরিয়ম বেগম। এই গল্পটার সঙ্গে কোনোভাবেই নিজের মেয়ের নাম রাখার বিষয়টা মাথায় ঢুকলো না মরিয়মের। আসলে নামটা পছন্দ ছিলো না তার। মরিয়ম আবারও মুখ টিপে হাসলেন। সেকেন্ডখানিক চুপ থেকে বললেন, ঠিক আছে। তাহলে ভালো নামটা আমি রাখি?

রাখো

ওর নাম হলো কুসুম সোবহান। পছন্দ হয়েছে ?

সোবহান সর্দার ওরফে সাবু, নিজের নাম মেয়ের নামের সাথে শুনে খুশি মনে মাথা নাড়লো! তারপর থেকে ওকে বাবা ডাকতো রুক্সি নামে আর মরিয়ম বেগম ডাকতো কুসুম নামে। তখনও সংসার ঘিরে ছিলো ভালোবাসা আর শান্তির ছায়া। কিন্তু রাজনীতিতে ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে ওঠা এই মানুষটাকে নিয়ে পত্র-পত্রিকায় উঠলো ঝড়। নিজের দল ক্ষমতায় এসেছে সবেমাত্র । তাই প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন সোবহান সর্দার। এরকম খবর ভেসে বেড়াতে থাকলো চারদিকে। অবশেষে .সব জল্পনা-কল্পনা মিটিয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হলো সাবু । তারপর ভীষণ এক ব্যস্ত সময় গেছে তাঁর। সংসার, স্ত্রী , মেয়ে কারো দিকেই একটু তাকাবার সময় ছিলো না সাবুর । কিন্তু এতো কিছুর পরও মরিয়ম বেগমের কোনো অভিযোগ ছিলো না। শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সব দুঃখ -কষ্টগুলো একরকম মুখ বুজেই সহ্য করে গিয়েছিলন মরিয়ম বেগম।

কিন্তু হুট্ করেই তাঁর কাছে আশ্রয় নেয়া দরিদ্র ও স্বামী পরিত্যক্তা কাজলি তার এতোদিনের সব হিসেব-নিকেশ বদলে দিলো। যেদিন গভীর রাত করে বাড়ি ফিরতো সাবু, সেদিন কাজলি তাকে ধরে বিছানায় শুয়ে দিতো! মশারি টানিয়ে দিতো! খাবার লাগলে রাতেই টেবিল সাজিয়ে দিতো। কখনো একটু মাতলামিটা বাড়লে তার পাশে বসে মাথায় চুলে বিলি কেটে দিতো ! মরিয়ম বেগম অভিমান করেই ঘর থেকে বেরুতেন না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতেন তার স্বামীর মুখে নিজের নামটি শোনার জন্য। কিন্তু সাবু কখনই এসে মরিয়ম বেগমকে ডাকতেন না। অথচ সকাল হলেই অন্য এক সাবুকে দেখতে পেতো মরিয়ম! নাস্তার টেবিলে চা খেতে খেতে পত্রিকা নিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকতো সাবু। মরিয়মকে দেখলে লজ্জিত হাসি হেসে বলতো, একটু দেরি হয়ে গেছে রাতে! সরি। আমার মেয়ে কই ?

রুক্সির বয়স তখন সতেরো/আঠারো। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে এডমিশনের জন্য অপেক্ষা করছিলো সে। কিন্তু ওই বয়সেও বাবাকে দেখে শিশুর মতো দৌড়ে এসে সাবুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তো সে। তারপর বাবা আর মেয়ের দুজন-দুজনকে ধরে কি আদর! এই দৃশ্য দেখে সারাদিন কিরকম একটা ঘোরের ভেতরে ডুবে থাকতো মরিয়ম বেগম। প্রতিদিনের মতো সেও ভুলে যেতো সাবুর এইসব অবহেলার চিত্রপট । কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন সকালে কাজলি মরিয়ম বেগমের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। মরিয়ম বেগম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করলো কাজলি! মরিয়ম বেগম খানিকটা বিস্মিত।

ক্ষীণ কণ্ঠে বললো, কি হয়েছে রে কাজলি ?

খালাম্মা স্যার আমারে গত রাইতে…

কি পরিষ্কার করে বল

আমি আর কিছু বলতে পারবো না খালাম্মা।

বুঝতে পেরেছি। তুই শুধু বল, এই কাজে তোর কি সম্মতি ছিলো ?

প্রশ্নটা শুনে চুপ হয়ে যায় কাজলি! মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

মরিয়ম বেগম তাড়া দেয়, কি হলো বল, সত্যিটাই বল। কোনো সমস্যা নাই।

কাজলি কোনো উত্তর দিতে পারে না। লজ্জায় তার মাথা ক্রমশঃ নুয়ে আসছে।

মরিয়ম বেগম আর কথা বাড়ান না। ঠান্ডা মাথায় দরজা বন্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর ছোট্ট ব্যাগে দুচারটা মাত্র কাপড় নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসেন তিনি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় এসে রুক্সি অবাক! মা এভাবে চলে যাবে ভাবতেও পারেনি সে। তাই নিজের গাড়ি নিয়ে মায়ের মুগদার বাসায় হাজির হয়ে যায় রুক্সি। কিন্তু মরিয়ম বেগম খুব শান্ত।

রুক্সি বললো, মা তুমি ছাড়া আমরা থাকবো কীভাবে ?

মা হেসে বললো, তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও কুসুম। ধরো তুমি যদি কখনো শোনো তোমার বাবা তোমার মা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের সাথে রাত কাটায়। তোমার বাবার প্রতি ঘৃণা হবে না ?

রুক্সি যেনো মায়ের এরকম একটা গভীর ইমোশনের জায়গা ছুঁতেই পারলো না। একটু অন্যমনস্ক হয়ে সে বললো, আসলে কি জানো মা, প্রতিটি পুরুষই মনে হয় জন্ম নেয় পলিগেমাস চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এটা তার সৃষ্টিগত মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অংশ। অন্য দিকে নারী জন্ম নেয় মনোগেমাস বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এই কম্বিনেশনের ভিতর নিশ্চয়ই কোনো গভীর তাৎপর্য আছে। একজন পুরুষ যতোই ভান করুক না কেন, যতোই অস্বীকার করুক না কেন, যতোই লজ্জা পাক না কেন, মূলত সে মনের গভীরে অবশ্যই বহুগামী স্বভাবই লালন করে। সুতরাং এইসব বিষয়ে বাবাকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। মূল কথা হচ্ছে, এতোসব জঞ্জালের মধ্যেও তোমাদের দুজনকেই খুব বেশি ভালোবাসি। কাউকেই হারাতে চাই না। আবার বাবার এইসব দোষ ত্রূটি নিয়েও সোচ্চার হতে চাই না।

মরিয়ম বেগম শুধু চোখের জল ফেলেন। তিনি বছরখানেক ধরেই ফেরত যান নি আর নিজের সংসারে! কতোদিন রাত-বিরেতে সাবু ফোন করেছে। পাগলের মতো ছুটে এসেছে। ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু মরিয়ম বেগমের আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করেনি ওই বাড়িতে।

কিন্তু আজ সাবুর অসুস্থতার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভেঙে পড়লো যেনো মরিয়ম । হঠাৎ করেই সে উঠে দাঁড়ায়। মনে মনে ভাবে, কুসুম এলেই ওর সাথে হাসপাতালে যাবে সে সাবুকে দেখতে।

 

তিন

সাবু ভাইয়ের ঘুম ভেঙে গেলো রাতে। তিনি আশেপাশে অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন। দুই পাশে দু’জন নার্স গম্ভীর ভাবে বসে আছে। তাদের দুজনের চেহারাই অবিকল কাজলির মতো লাগছে তার কাছে। সাবু ভাই নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন স্যালাইন চলছে। কিরকম একটা বিভ্রমের মধ্যে পড়েছেন তিনি। ডান দিকে বসা কাজলি এসে তার মাথায় হাত রাখে।
বলে, এখন কেমন লাগছে বাবা ?

ভালো। তুমি কখন আসছো? কে তোমারে ফোন দিছে? আউয়াল?

নার্স মোটেও অবাক হলো না। সাবলীলভাবে বললো, হ্যা আউয়াল ভাই খবর দিছে !

সাবু ভাই মিষ্টি করে হাসে। বলে, ও কাজলি তোমার বাম পাশে কেডা ? হুবহু তোমার চেহারা। তোমার বোন ? এ কোথায় থাকে ?

স্যার ঠিক ধরছেন। আমার বোন। গ্রামে থাকে।

বাসায় নিয়া আইসো ! তোমরা দুই বোন মিলা-মিশা থাকবা ! রাত্রে আমার সেবা করবা! পারবা না ?

সাবু ভাই ফোকলা দাঁতে হাসেন আবার।

নার্স বললো, স্যার একটা ইনজেকশন দিতে হবে। সাবু ভাই চিন্তিত মুখে বললেন, কি কও কাজলি তুমি কেমনে ইনজেকশন দিবা? নার্সরে ডাকো !

আমরা দুই বোন মিলে দিয়ে দেই?

ও তোমরা দুইজন মিলা দিবা ?

নার্স গম্ভীর হয়ে ইনজেকশন রেডি করতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

ইনজেকশন দেবার পর সাবু ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তার ঘুম পাচ্ছে। আশ্চর্য, মেয়ে দুটিকে এখন আর কাজলির মতো মনে হচ্ছে না। এয়ার কন্ডিশন এর টেম্পারেচার কমিয়ে দেয়াতে শীত লাগছে তার। তিনি নিজেই কম্বলটা পায়ের কাছ থেকে টেনে এনে গায়ে দেন। নিজের মেয়ে রুক্সির মুখটা ভেসে ওঠে হঠাৎ করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। এরই মধ্যে আউয়াল এসে সামনে দাঁড়ায়।

সাবু ভাই বলে, আউয়াল আমার আসলে কি হইছে ? কিরকম ঘুম ঘুম লাগতেছে!

বস , তেমন কোনো সমস্যা না। ইলেক্ট্রলাইট ইমব্যালেন্স হয়েছে।

কি কস? এইটার মানে কি?

আউয়াল একটু অসহায় ভঙ্গিতে তাকায়। রক্ত পরীক্ষার পর রিপোর্ট দেখে ইলেক্ট্রলাইট ইমব্যালেন্স বা দেহের খনিজ অসমতা সম্পর্কে ডাক্তার শুধু বলেছিলো, নো প্রবলেম, সমস্যা নেই। ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এইভাবে খুব ক্যাজুয়ালি বললে নেতা বিশ্বাস করবে না। আউয়াল সেটা জানে।

আউয়াল বললো, বস এইতো পাশেই ডক্টরস স্টেশন। একজনরে ডাকি ? তার কাছ থেকে শোনেন।

ডাক! তার আগে শোন। কারে কারে খবর দিছো?

রুক্সীরে। আপনার মেয়ে।

মরিয়মরে খবর দেও নাই?

না বস।

খবর দাও। বৌটা আমার রাগ কইরা আছে। অনেক স্মৃতিরে আউয়াল। তিরিশ বছরের সংসার।

বুঝছি। খবর দিতেছি বস !

জামান কই?

পার্টি অফিস থেকে ওকে ডেকেছে বস। পত্র-পত্রিকায় আর ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় আপনার অসুস্থতার ব্যাপারে বিশেষ ব্রিফিং করা হয়েছে। আবির ভাইয়ের সাথে এইসব এরেঞ্জমেন্টে আছে সে।

এইটা অবশ্য খুব ভালো কাজ হইছে! বাংলার জনগণ জানুক! কি বলিস? আরো ভালো হইতো যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানতো! যদিও আমি বিরোধী দলেরই নেতা বলা চলে।

জি বস।

পয়সারে খবর দিছো ?

পয়সা নেতার চাচাত ভাই। ব্যবসায়ী। গুলশান এক নম্বর মার্কেটে শাড়ির দোকান আছে তার । শ্যামলি স্কয়ারেও একটা দোকান আছে শাড়ির । সাভারে প্যাকেজিং ইন্ডাসট্রি আছে । আসল নাম মোকাব্বর সর্দার। বনানীতে থাকে। ওনার নামেই নেতার গাড়ি , বনানীর ফ্লাট, এইসব ব্যবসা এবং ব্যংক ব্যালেন্স। ধরা খাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই। নিজের সুবিধার জন্য সাবু নিজেই এইরকম সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে। শুধুমাত্র তিনজন বোঝে এই নামের মাজেজা। প্রথমজন নেতা নিজে, দ্বিতীয়জন মোকাব্বর এবং তৃতীয়জন আউয়াল।

আউয়াল হাসি হাসি মুখ করে বলে, বস উনিতো সিঙ্গাপুরে। ব্যংকের কাজে গেছেন। ওখানে আপনার একাউন্টে কিছু ইয়ে জমা দেবেন। ভুলে গেলেন নাকি বস ?

নেতা সন্ধিগ্ন চোখে এদিক-ওদিক তাকায়। ফিসফিস করে বলে, আস্তে কথা বল। ডলার’রে খবর দে।

এই নামটাও সাংকেতিক। ডলার তার ছোট বেলার বন্ধু। নেতার গাড়ির ব্যবসা দেখে। ডলারের আসল নাম হলো মনসুর আলি। বরিশাল বাড়ি। নেতার গ্রামের পাশের গ্রাম। স্কুল জীবনের বন্ধু। কিন্তু এসব কাহিনী ইচ্ছে করেই গহীন অরণ্যে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সে ব্যবসায়ী। ঢাকা শহরে অন্তত পঁচিশটা চেইন রেস্টুরেন্টের মালিক। সেটাও আবার অন্যরা চালায়। সে প্রায় একটা কম দামি খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে গাড়ির শো রুমে বসে থাকে। ক্লায়েন্টদের সাথে কথাবার্তা বলে। গাড়ি বিক্রি করার তেমন কোনো আগ্রহ নেই তার। কিন্তু রাত বাড়লে শো রুম বন্ধ করে নিজেই রেস্টুরেন্টের হিসাব-নিকাশ দেখভাল করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। সপ্তাহে একদিন সাবুর সাথে বসে সব রেস্টুরেন্টের বেচা-বিক্রির হিসাব দেয় সে। সাবুর একটাই কথা, জীবনে উন্নতি করতে হলে অভিনয়টা খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। তা না হলে জীবনে বড় সাফল্য আসবে না। যে যত বড় অভিনেতা সে ততো সফল।

মনসুর আলি খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে শোনে নেতার কথা। উৎসুক দৃষ্টিতে নেতার দিকে তাকিয়ে বলে, বন্ধু তুমিতো দারুণ একটা উপদেশ দিয়েছো। সাবু হাসে, বলে, কথা আরো আছে। জীবনে সফল হবার জন্য শিক্ষা আর সাধনা যেমন দরকার। তেমন দরকার ভাগ্য। আর ভাগ্য হাতের মুঠোয় আনতে হয় মানুষের কল্যাণ সাধনের মধ্য দিয়ে। নিঃস্বার্থভাবে যে যত মানুষের কল্যাণে কাজ করবে ততোই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকবে। ভীষণ পরীক্ষিত।

মনসুর আলি কি যেনো ভাবে। সাবুর জীবনের হিসাব মেলাতে কিরকম ভাবনায় পড়ে যায়। সে বলে, তোমারতো অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা সবই আছে– এগুলো পাবার জন্য কি তোমাকে এতোটা সাধনা করতে হয়েছে ?

সাবু হো হো করে হাসে। বলে, বন্ধু কোনো সাফল্যই আগ বাড়িয়ে ধরা দেয়না, তাকে অর্জন করতে হয়। যাকগে এগুলো আর একদিন বলবো।

মনসুর আলি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাবুর দিকে! আউয়ালের কথায় যেনো মুহূর্তে ফিরে আসে নেতা। বললো, কি বলছিস !

নেতা এই অল্প-স্বল্প বিষয়ে মনসুর আলিকে খবর দেবার কি দরকার?

আরে গাধা, হাসপাতালের বিল দেবে কে? .

আউয়াল হেসে বললো, বিল দেবো আমি বস। আপনার ‘এস’ ব্যংকের মহাখালি শাখা থেকে। আপনার নামে একাউন্ট। কিন্তু ছবি, আইডি কার্ড, সিগনেচার সব আমার। নেতা হেসে বললেন, আইডি কার্ড কই পাইছিলি ?

আউয়াল কথা শুনে হা হা করে হাসে। তারপর নেতার কানের কাছে মুখ এনে বলে , নীলক্ষেত থেকে করেছিলাম।

এরই মধ্যে ডক্টরস স্টেশন থেকে একজন সুন্দরী তরুনী ডাক্তার কাছে এলো। সাবু ভাই মোহিত হয়ে তাকিয়ে আছেন। ডাক্তার তার কাছে এসে বিগলিত কণ্ঠে বললো, স্যার আমার নাম রেহনুমা। আপনি আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন।

আচ্ছা। আসো আমার পাশে এসে বসো একটু।

রেহনুমা হেসে বললো, স্যার আমি একটা চেয়ার টেনে বসছি। বলেন আপনি।

তোমার কি বিয়ে-শাদি হয়েছে ?

কথাটা শুনেই রেহনুমার চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে। এরকম প্রশ্নে খানিকটা বিব্রত রেহনুমা। কিন্তু মুখে সেই বিরক্তি প্রকাশ করে না সে। শুধু মিনমিন করে বললো, আসলে স্যার একবছর হলো একা আছি। ডিভোর্সড বলতে পারেন।

ওহ সরি সরি।

না না ঠিক আছে। আপনি বলেন ,

কি জানতে চাইছেন?

আমি জানতে চাচ্ছি -ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স জিনিসটা কি ?

ডাক্তার রেহনুমা মিষ্টি করে হাসলেন, বললেন, আসলে স্যার, শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে স্নায়ু, হরমোন এবং তরল পদার্থের স্বাভাবিক কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটে। ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হলে সোডিয়াম, ক্লোরিন , ম্যাগ্নেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এর মতো খনিজের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি অথবা ঘাটতি বোঝায়। ভয় নেই, আপনার রিপোর্ট অনুযায়ি মেডিসিন দেয়া হয়েছে। আশা করি পরশুর মধ্যেই রিলিজ পেয়ে যাবেন। বাসায় কয়েকদিন বিশ্রামে থাকতে হবে, এই যা !

সাবু হাসলো, বললো, যাক আমাকে চিন্তা মুক্ত করলে।

ডাক্তার রেহনুমা হেসে বললেন, জি স্যার, আপনার মতো এতো বড় একজন নেতার সেবা করতে পেরে আমরাও কৃতার্থ।

সাবু হাসলো। বললো, রেহনুমা, কালকে থেকে ভাত খাই নাই। একটু ব্যবস্থা করা যায় !

ডাক্তার বিনীত হেসে বললেন, অবশ্যই স্যার। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনি এবং এটেনডেন্ট দুজনের জন্যই রাতের খাবার আসবে।

সাবু ভাই বিগলিত হয়ে মধুর করে হাসার চেষ্টা করলো। আড়চোখে রেহনুমার দিকে তাকালো একবার। কি অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি! চুলগুলো সবুজ রঙের ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। শাড়িও পরেছে সবুজ। ফর্সা গালে কিরকম লাল আভা। যেনো ময়ূখ হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট। কপাল। চুল। সেই একথোকা রশ্মির মতো হাওয়া যেনো দিকশূন্য করে ফেলে তাকে ।
রেহনুমা বললো, স্যার কি কিছু বলবেন?

সাবু ভাই হুট্ করে বললো, আপনি একটু আমার পালসটা দেখে দেবেন রেহনুমা?

রেহনুমা আরো কাছে এলো তার। পারফিউমের একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগে সাবু ভাইয়ের। রেহনুমা নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে সেকেন্ডখানিক পার্লস দেখলো সাবু ভাইয়ের। সিরিয়াস কণ্ঠে বললো, ঠিক আছে স্যার। নরমাল আছে।

সাবু ভাই হেসে বললেন, খুব ভালো লাগছে খবরটা শুনে। ইউ উইল রিসিভ অ্যাওয়ার্ড ফর ইওর হোলি সার্ভিস!

কি যে বলেন স্যার। এতো আমাদের কর্তব্য।

সাবু ভাই মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন। ডাক্তার রেহনুমা হাত তুলে বিদায় নেয়।

সাবু ভাই আউয়ালকে কাছে ডেকে বললেন, আউয়াল এই মেয়ে আমার মনে ধরছে। কোনো ব্যবস্থা করতে পারবি ?

আউয়াল অসহায়ের মতো তাকায়। কিন্তু হাসিটা ঠোঁটে লেগে থাকে ঠিকই ! নিজের মুখটা নেতার কানের কাছে এনে বলে, দেখি স্যার আগে সুস্থ হয়ে ওঠেন। দেখা যাক।

 

মোস্তফা সোহেল

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৭০। যশোর শহরে। মা এবং মেঝো ভাই মোশতাক শাকিলের অনুপ্রেরণাতেই নিজেকে লেখালেখির ভুবনে প্রোথিত করেন নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় উন্নয়নবিদ। ঔপন্যাসিক, গল্পকার। মাঝে মাঝে কবিতাও লেখেন তিনি। এ পর্যন্ত মোস্তফা সোহেলের ১৫ টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত উপন্যাস: তুমি আমায় প্রথম ছুঁয়েছিলে, রূপালি রাত (২০১১, পলল ), আনন্দবাড়ী, (২০১২, জনান্তিক), বুনো জোৎস্নায় (জনান্তিক), মুখোশ (২০১৩, বিজয় প্রকাশ), নেতা (২০১৪), ভালবাসা ও একটি জলফড়িং (বিজয় প্রকাশ,২০১৫), বধূ কোন আলো (বিজয় প্রকাশ, ২০১৭), আমি কান পেতে রই, একদিন ঝুম বৃষ্টিতে (বাংলানামা ), মনপাহাড় ২০১৮, চোখের আলোয় দেখেছিলাম এবং সুন্দর তুমি এসেছিলে। ২০১২-২০১৩ সালে উপন্যাস নেতার জন্য তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পুরস্কার লাভ করেন।

কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নিঃসঙ্গ টারমিনাল, সাদা মেঘে ওড়াই মৌনতা এবং শহরে রটে গেছে আমাদের প্রেমের কথা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।