বাবলী হকের ছোটগল্প: ইতিময় নেতিকথা   

বৃষ্টি থেমে গেছে। অনেকক্ষণ। গাড়ি থেকে নেমে মাধবীলতার ঘন ঝাড় পেরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকতেই কেমন গা ছমছম করে উঠল। মাধবীলতার ঘ্রাণ ছাড়িয়ে, মাটির সোঁদা গন্ধ টপকে ঘাসের ওপর স্নিকার্স পরা পা ঘষি। ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুক্ষণ পরপর মাটিতে যেমন এক পা ঘষে।

মার্চের শেষ সপ্তাহ তবু শীত-শীত ভাবটা যাচ্ছে না। বৃষ্টি হচ্ছে কখনো থেমে-থেমে। কখনো লাগাতার। প্লেনে ওঠার আগে ফোনে এমনটাই বলছিল ভাই। আশঙ্কায় ছিলাম, বৃষ্টির জন্য ফ্লাইট ক্যানসেল না হয়ে যায়!

টরেন্টো থেকে  অ্যামিরাতসের এটাই ছিল লাস্ট ফ্লাইট। দুবাই-এ পাঁচ ঘণ্টার স্টপ ওভাৱ। টরেন্টো থেকে দুবাই পর্যন্ত গুটিকয়েক প্যাসেঞ্জার। কিন্তু দুবাই থেকে ঢাকার পথে একটা সিটও খালি নাই৷  গিজগিজ করছে মানুষ। দেশে ফিরছে। আমিও ফিরলাম। চৌদ্দদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এয়ারপোর্টে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিল, এটা সরকারি নির্দেশ। টেম্পারেচার দেখল, নাম-ঠিকানা, ফোন নাম্বার টুকে রাখল৷ ভেবেছিলাম এয়ারপোর্টের মহাযজ্ঞের কলকব্জা থেকে বের হতে মধ্যরাত হবে। তেমন কিছুই ঘটল না। ল্যান্ড করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বের হতে পারলাম।

মেইন রোডের দোকানপাট সব বন্ধ। গলির ভিতর চায়ের দোকানটায় দম আটকানো সাটার টানা। আশপাশে আলো পর্যন্ত নেই। বাড়ির সদর দরজা খোলা। দারোয়ান রমিজকাকাকেও দেখা যাচ্ছে না।  সন্ধ্যার আলো- আঁধারিতে বাড়ির ভিতর ঢোকার পথে  মনে হল যেন কালো একটা অজগর  শুয়ে আছে–আমি তার উপর দিয়ে হেঁটে গৃহপ্রবেশ করলাম! ভয় পাওয়া মানুষের মতো সঙ্কোচে, দ্বিধায় আমার পঁচিশ বছরের পরিচিত বাড়ির দরজা একটা সুড়ঙ্গপথ হয়ে গেল। অথচ সারাটা পথ আনন্দে আচ্ছন্ন ছিলাম – দেশে ফিরছি।

ভাইয়ের বউ সারাফ একটু অপ্রস্তুত হেসে ঘরের দরজা খুলে দিয়েই দ্রুত সরে গেল। ভাইয়ের কপালে উদ্বেগের উল্কি!  দরজার কাছ থেকে সরে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে বলল,

–এয়ারপোর্টে আমার যাওয়া হল না রে। ঠিক আছিস তো? একেবারে নিজের ঘরেই চলে যা। সারাফ সব গুছিয়ে রেখেছে।

আমার ঘরে টিমটিম আলো জ্বলছে।  ঘরের দরজায় আঙুল ছোঁয়াতেই  দুই ডানা মেলে একঝাঁক সাদা প্রজাপতি ঝাঁপিয়ে পড়ল শরীরে জুড়ে। জানালার পর্দা সদ্য ধোয়া পাটভাঙা।  বিছানায় চেনা চাদর। শরীর টেনে নিয়ে গেল শয্যায়। ভাই দরজার বাইরে থেকে বলে গেল,

–আগে ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নে। মার সঙ্গে কাল দেখা করিস। তোর লাগেজ দিয়ে যাচ্ছি।

লাগেজ শব্দটা শোনামাত্রই হোটেল মনে হল। মা জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলায়নি, ভাইয়ের হাতে চকলেটের প্যাকেট তুলে দেইনি। সারাফের সঙ্গে গিফট নিয়ে খুনসুটি হয়নি! মনেই হচ্ছে না বাড়ি ফিরেছি!  দরজা আটকে  বিছানায় বসে বালিশ বুকে চেপে আদর করতে থাকি। ঘরে সেই পুরানো গন্ধ। শরীর গেঁথে যাচ্ছে বিছানায়। সময় থমকে গেল। মাথার ভিতরটা পুরোপুরি শূন্যতার দখলে। কোনো কথা, কোনো মুখ মনে পড়ছে না আর এখন।

ওয়াশরুমে যাবার আগে পর্দা সরিয়ে বন্ধ জানালা খুলে দিতেই পাশের বাড়ি থেকে ঘিয়ের গন্ধ ভেসে এল। সুজির হালুয়া রান্না হচ্ছে। কাল সারাফকে বলব ঘি দিয়ে সুজির হালুয়া করতে।

গভীর রাতে ঘরের ভিতর মৃদু পায়ের শব্দে চোখ খুলে গেল। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অবসন্ন শরীর।  খিদেও ছিল না। কখন যেন দরজার কাছে ট্রলিতে খাবার রেখে গিয়েছে, টেরও পাইনি।  ঘুম চোখে দেখতে পেলাম মায়ের শাড়ির আঁচল দরজার কাছ থেকে সরে গেল। মাঝরাতে ঘুমের আড়ালে চুপিসারে মা আমাকে দেখতে এসেছিলেন! দেখার জন্য বেডসাইড সুইচ মাথার কাছে খুঁজতে থাকি। হাত খুঁজে পায় বালিশের নীচে চারকোনা ছোটো একটা শীতল ধাতু।  কী হতে পারে! আলো ছাড়া চেনা যাবে না। হাতের মুঠোয় চেপে চোখ বুজে শুয়ে থাকলাম। এত ক্লান্ত যে উঠে দেখার শক্তি পাচ্ছি না। তলপেট টনটন করছে। ওয়াশরুমে যাব।

মুঠোয় লোহার টুকরোটা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়ির লোকেরা ঘুমিয়ে গেলে মা এসে আমার বালিশের নীচে এক টুকরো বিপদ তাড়ানো লোহা রেখে গেছেন। আহা আমার  মমতাময়ী মা! ভয়-ভীতি আছড়ে পড়ে মমতার আঁচলে। মায়ের বিশ্বাসের মধুর চাক থেকে বিন্দু বিন্দু মধু নিংড়ে গায়ে মাখতে থাকি। এখন আর ঘুম আসছে না৷ জেট ল্যাগ! মাত্র একুশ দিনেই আমার ঘুমের ঘড়ি নড়েচড়ে বসেছে! কোনো কিছুই ঠিক নেই। ভাবতে চাইলাম ভোর হলেই কেটে যাবে ধোঁয়াটে গুমোট বিষণ্নতা আর সব আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।

খোলা জানালায় রোদ উঁকি দিচ্ছে। চোখে  রোদ পড়তেই জেগে গেলাম। তেষ্টায় জিভ তালু শুকিয়ে গলার ভিতর খড়খড় করছিল। গলার নীচে কী যেন একটা আটকে আছে। টেবিলে জগে জল রাখা আছে। গ্লাস নেই।  দু-হাতে জগটাকে গলার কাছে ধরতেই বেশ খানিকটা জল গড়িয়ে আমার কুর্তি ভিজিয়ে দিল। এতক্ষণে খেয়াল হল ফিরে জামাকাপড় না বদলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখনো সবাই ঘুমাচ্ছে।  আমি নিজে  ঘরের বাইরে যেতে পারব না। ভাই বারবার বলছিল,

–তোর কষ্ট হলেও চৌদ্দদিন একটু নিয়ম মেনে আইসোলেশনে থাকতে হবে। সারাফ প্রেগন্যান্ট আর মারও তো অনেক বয়স হয়েছে। বয়স্কদের নিয়েই বেশি ভাবনা!

মা-র কত বয়স হয়েছে, সত্তর বা বাহাত্তর! এটা কি অনেক বয়স? কই মাকে দেখে তো মনে  হয় না বয়সের ভারে ন্যুব্জ!

ভাই বলল, টেলিভিশনটা তোর ঘরে দিয়ে যাই। সময় কাটবে। না করলাম। আমার টিভি দেখার অভ্যাস নেই। বললাম, বই পড়েই সময় কেটে যাবে।

মা আমার ঘরের দরজা বরাবর দূরে একটা চেয়ার নিয়ে বসে গল্প করে।

–ঘুম হল? খেয়েছিস? কেমন হল  তোর সেমিনার?

–ভালোই ছিল।  কিন্ত কয়েকটা ভিজিট ক্যানসেল হয়ে গেল। লকডাউনের কারণে। পাঁচদিন হোটেলের রুমেই বসে কাটালাম। টিকিট অ্যারেঞ্জ করতে পারিনি বলে চলে আসতেও পারছিলাম না। একই অবস্থা সব জায়গায়!

অনেক ঘুমালাম। সকাল দুপুর বিকেলসহ রাত। কেবলই ঘুম। মাঝে জেগে উঠে খেয়েছি। খিদে ছিল না তবু খাবার দেখে মনে হয়েছে খাওয়া দরকার। খাবারের ভিতর যেন ঘুম লুকিয়ে ছিল। খাওয়ার পর আবার ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম আর আধো ঘুমের মধ্যে কেটে যায় দু-তিনদিন। ঘুমে স্বপ্ন ঢুকে পড়ে। দেখছিলাম ধবধবে  বরফের উপর একটার পর একটা কফিন রেখে যাচ্ছে। কফিন বহনকারীরা  চলে গেলেই মানুষগুলো হরিণের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসছে। আনন্দে ছুটছে সাদা স্বচ্ছ বরফের উপর। আরও…কী সব দেখি! জেগে উঠে মনেও থাকে না।  এসব দেখার কোনো রাতদিন ছিল না। কখনো স্বপ্ন আর ঘুম দুটোই ভেঙে যায় সিলিং ফ্যানের ঘরঘর শব্দে। শুয়ে থাকি। ঘুমের ভাঁজে-ভাঁজে নিজেকে গুটিয়ে রাখি। এতটাই গুটাই যে শুকনো পাতার শব্দেও চমকে যাই। মনে হয় ঘুমাতে ঘুমাতে এই পৃথিবীর আয়ু একদিন শেষ হয়ে যাবে।

ইউনিভার্সিটির ক্লাস হচ্ছে না। বলছে সাধারণ ছুটি পর্ব শেষ হলে আগামী মাস থেকে অনলাইন ক্লাস নিতে হবে। বন্ধু, কলিগ মাঝে-সাঝে ফোন করে! আমি কাজ ছাড়া পারতপক্ষে কাউকে ফোন করি না। অভ্যাস নেই। আমার কাছে খুচরো আড্ডার ফোনও খুব একটা আসে না। ফেইসবুকে দিনে বেশ কয়েকবার ঢুকে পড়ি। নতুন অভ্যাস। আগে  হয়তো একবার দুবার চোখ বুলাতাম। এখন ফেইসবুক খুব সরব। অনেকটা সময় কাটে। কিন্ত কয়েকদিনেই বিরক্তি ধরে গেল। সেই একঘেয়ে লাইভ প্রোগ্রাম। সবাই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে আরও কত প্রকটভাবে নিজেকে জাহির করা যায় জনসমক্ষে! রাত কেটে যায় এই ভেবে যে রাতের খোলস থেকে বেরিয়ে মোড়ের দোকানে  চায়ের সঙ্গে সিঙাড়া পিঁয়াজু ভাজা হবে। দিন আসে। দিনগুলি কেমন মিথ্যে হয়ে যায়! কিছুতেই প্রমাণ করতে পারি না, শুক্র-শনি-রবি-সোম…ছিল।  অসাড় হয়ে পড়ছি। ভালো থাকার অজুহাতগুলি আর খুঁজে পাচ্ছি না। কার ওপর বিরক্ত হব, কার সঙ্গে রাগ করব? অদৃশ্য শত্রু মহা পরাক্রমশালী! অস্ত্রের দৃশ্যত কোনো রূপ নেই। ঝনঝনানি নেই। কান ফাটানো শব্দও নেই। কিন্ত তার অস্তিত্বের অবস্থান বড়ো শক্ত। আমার করণীয় একমাত্র নিজেকে আটকে রাখা।

ঝোড়ো হাওয়ায়  জানালার  কাচ ভাঙল। পর্দার পাশ কাটিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ে। কদিনের নিস্তব্ধতাকে নাড়া দিয়ে গেল কিছুক্ষণের ঝোড়ো বাতাস! বারান্দার দরজাটা খুলে দেই। ঝড় দেখি। আশেপাশের গাছগুলো যেন ভেঙেচুরে ছুটে পালাবে।  নির্জন রাস্তায় উড়ে আসা শুকনো পাতা, খড়কুটো, টুকরো কাগজ, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের খালি বোতল,  কোকের খালি ক্যান গড়াগড়ি করে। এসব দেখে দেখেও ভালো লাগা জাগাতে চাই!

পাশের বাড়ির বাচ্চাটা সকাল থেকে  বারান্দায় দাঁড়িয়ে বন্ধুদের নাম ধরে ডাকে। কী কী সব অদ্ভুত নাম বলে! আঞ্ছু পাঞ্চু কাঞ্জু…পাতুতি…!  সকালে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আদরের বয়স পাঁচ কি ছয় হবে। টোপা টোপা গাল। লাল টি শার্টটা পেটের ওপর উঠানো।  বারান্দার প্রান্তে এসে আদরকে জিজ্ঞেস করলাম,

– কাকে ডাকছ?

আমাকে বারান্দায় দেখেই দৌড়ে ভিতরে পালিয়ে গেল।  এরপর থেকে কি ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মধ্যেই বেঁচে থাকতে হবে! আমরা কি গুহাবাসী হয়ে যাচ্ছি? মানুষের সাড়া পেয়ে মানুষ পালিয়ে যায়।

বারান্দার টবের মাটি শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে। গাছের পাতা ঝরছে। টবগুলিতে পানি দিতে কেউ আসে না। গাছগুলো ভিজিয়ে দিতে গিয়ে  মনে হল আশপাশ থেকে কেউ হয়তো এখনি  বলে উঠবে ‘আপনি বাইরে এসেছেন কেন? ঘরে ঢুকে পড়ুন তাড়াতাড়ি!’   মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমার এখন গৃহবন্ধিত্বকাল চলছে। ঘর থেকে বেরিয়ে আবারও উলটো পায়ে ঘরের ভিতর ঢুকে যাই।

এই শহরের বাড়িগুলি বড়ো গায়ে-গায়ে জড়ানো। ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। বাড়ি বানানোর সময় বাড়িওয়ালারা এক ইঞ্চি জমিও ছাড় দেবার কথা ভাবেনি। উলটো দিকের বাড়িটা দক্ষিণমুখো। রোদ ঝলমল করে। কাল দেখলাম ও বাড়ির  কাজের মেয়েটা তার পাশের বাড়ির মেয়েটার সাথে কনটেইনার বিনিময় করছে।  ঘরের জানালা খুললে আজকাল এসবই দেখি।  চৌদ্দদিন এত এত দীর্ঘ হয়!

টেবিলের উপর এক কাপ রং-চা।  এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা, গোলমরিচ দেয়া মসলা চা। আর দুই পিস চকলেট কেক। রং-চা আর খেতে ইচ্ছে করে না। গলার ভিতরটা জ্বালা করে। ইচ্ছে করছে কড়কড়ে ফিশ ফ্রাইয়ের সঙ্গে ক্যাপুচিনো কফি খেতে!  যেদিন বের হব, কফিশপে বসে এককাপ কফি তো খেতেই পারি!

প্রতিদিনের একঘেয়ে ঘুম, ঘুম থেকে উঠে কিছুই না করার শূন্যতা জড়বৎ করে দিচ্ছে। পড়তে পর্যন্ত পারছি না।  ভেবেছিলাম অখণ্ড অবসরে বই নিয়ে নির্বিঘ্নে সময় কাটবে। এরকম উপদ্রবহীন ছুটি তো সহজে পাওয়া যায় না৷ বইমেলায় অনেকগুলি বই কেনা হয়েছিল। পড়া হয়নি। কিন্তু কিছুতেই মন দিতে পারছি না পড়ায়। এক-দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর অন্য বইতে চলে যাচ্ছি। সেখানেও বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছে না। বই থাকে বুকে উপুড় হয়ে আর নয়তো আশেপাশে ভিড় করে। ভোর হতেই পাখিদের কিচিরমিচির শুনি। অনেকগুলো পাখি৷ কিছুক্ষণ পর পাখিগুলো উড়ে যায়। দুয়েকটা থাকে। ছোটো ছোটো করে ডাকে। ধীরে ধীরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ একটা শালিকের হাঁটাহাঁটি দেখি। আগে একটা শালিক দেখে অভ্যাসবসত আরেকটা শালিক খুঁজতাম। এখন একটার দিকেই তাকিয়ে থাকি। ফাঁকা রাস্তায় টুকটুক করে এপাশ-ওপাশ হেঁটে বেড়াচ্ছে। খাবার খুঁজছে। মাঝে মাঝে পথ থেকে পোকামাকড় খুঁটে খাচ্ছে। পাখিরা কি জানে পৃথিবী জুড়ে ভয়ানক এক  অসুখ নেমে এসেছে ! ভীষণ ছোঁয়াচে রোগে সময় আটকে গেছে!

হোম কোয়ারেন্টাইনের আজ শেষদিন। দু-একদিন পরপর মা জিজ্ঞেস করে, –তোর জ্বর-টর আসেনি তো?

রেগে যাই। বলি,

–জ্বর কেন হবে মা?

পরদিন জিজ্ঞেস করে,

–তোর কি ঠান্ডা লেগেছে?

হেসে ফেলি,

–ঠান্ডা লাগবে কেন? আমি তো ঘর থেকেই বের হই না।

মা শুকনো মুখে বলে,

–তোর গলাটা কেমন যেন ভাঙা শোনায়।

–সারাদিন ঘুমালে গলার স্বর এমনই শোনাবে। তুমি ভেব না, আমি একদম ঠিক আছি।

–আজ কয়দিন যেন হল বিদেশ থেকে আসার?

–চৌদ্দদিন প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে!

সকালে সারাফের কাছে খবরের কাগজ চাইলাম। বলল, কাগজ আসা সেই কবে থেকে বন্ধ!

বললাম, কাল ইউনিভার্সিটি যেতে হবে।  অফিসে  কিছু কাজ আছে।

বেরুলাম। পথঘাট ফাঁকা। সাইকেলের টুংটাং শব্দ দূর থেকে শুনছি। সরু সরু ইটের  ফাঁকে হারানো সবুজ। গাছপালা সতেজ। স্নিগ্ধ বাতাস। কিছু লোকজন হাঁটাহাঁটি করছে গলি পথে। সব কিছুই কেমন যেন শান্ত, নিস্তরঙ্গ! এ আমার সেই চেনা শহর নয়। ছাব্বিশে মার্চ থেকে সারা দেশে লক ডাউন। লক ডাউন কিন্তু বলছে না, বলছে, দশ দিনের সাধারণ ছুটি। ধারণা করা হচ্ছে এই ছুটি আরও বাড়বে। অনেকেই ছুটি কাটাতে শহর ছেড়ে  চলে গিয়েছে গ্রামে। গলির মোড়ে ভ্যানগাড়ির সেই ফলওয়ালাও নেই। রিক্সাগুলো জটলা করে যেখানে ভিড় করে থাকত তার পাশেই স্তূপ করা টসটসে পেয়ারা নিয়ে মাথায় গামছা বেঁধে, গালের ভিতর পানের টোপলা পুরে লোকটা দাঁড়িয়ে থাকত। ঠোঁটের দু-পাশ থেকে গড়িয়ে পড়ত পানের রস। এই কারণে আমি কোনোদিন ওর কাছ থেকে পেয়ারা কিনতাম না। আজ তাকে না দেখে মন উদাস হল।

পাঠশালার গলি পার হয়ে বড়ো রাস্তায় এলাম। একবারও মনে হচ্ছে না এটাই জনবহুল ধানমন্ডি! অল্প কয়েকটা প্রাইভেট গাড়ি চলছে। গণপরিবহন এখনো বন্ধ। রিক্সা চলছে মেইন রাস্তায় রাজকীয় ভঙ্গিতে। শহরের বেশ কয়েকটি মোড়ে পুলিশের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটা দুটা আর্মির জিপ অকারণ দ্রুতগতিতে  চলে গেল। রাস্তাগুলিকে দীর্ঘ, প্রশস্ত মনে হচ্ছে।   নোংরা কাগজ, ফেলে যাওয়া খাবারের টুকরো কিছুই নেই। এই কয়দিনেই লোকজন নাগরিক সভ্যতা শিখে ফেলেছে নাকি! ভালোই তো! আসলে ব্যাপারটা বোধহয় অন্য রকম। মানুষ তো বেরই হচ্ছে না খুব একটা। পথের ভিড়ে অভ্যস্ত ছিলাম। এই নির্জনতায় মাথার ভিতরে আবার সেই শূন্যতা  ছুঁয়ে গেল। ভুলে গেলাম কোথায় যাচ্ছি। হাঁটতে থাকি। বেশ কড়া রোদ। আকাশ ঝকঝকে। কতদিন এমন আকাশ দেখিনি। ছাতা আনা দরকার ছিল। পরমুহূর্তেই ভাবলাম, গায়ে একটু রোদ লাগুক। ইমিউন পাওয়ার বাড়বে।  কী অদ্ভুত না?  আমাদের ইমিউন সিস্টেম নিয়ে কত ভাবনা। কিন্তু এই পৃথিবীরও যে একটা ইমিউন সিস্টেম আছে, তা নিয়ে ভাবছে ক’জন?  একা হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, আর কি কোনোদিন মানুষ মানুষের পাশে হাঁটবে না?  উষ্ণ হাতের মুঠোয় হাত গুঁজে একজন আরেকজনের সঙ্গে চলবে না! সবার  মুখেই মাস্ক। দু-একজন ছাড়া। তাদের মধ্যে আমি একজন! ঘরে টেবিলের উপর মাস্ক ফেলে এসেছি। কেমন এক অপরাধ বোধ হতে থাকে। মাস্ক পরিনি মনে হতেই  হঠাৎ গলা শুকিয়ে কাশি উঠল। কেন যে ভুলে গেলাম মাস্ক আনতে! ঘর থেকে বের হবার আগেই  পরা উচিত ছিল।  ফুটপাত জনশূন্য। ফেরিওয়ালা পসরা সাজিয়ে বসেনি। ফুটপাতের দেয়াল  ঘেঁষে নার্সারির গাছগুলি বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে। আজ নয়, এরপর যেদিন বের হব কয়েকটা গাছ কিনব। যা কিছু দেখছি তার বাইরেও কী যেন চোখ খুঁজছে! যেন এই প্রথম দু-চোখ ভরে ঘরের বাইরেটা দেখছি। এই কয়দিন দেখা আর শোনা সীমিত ছিল জানালা আর বারান্দার ফ্রেমে। এর আগে বাড়ি থেকে কাজের জায়গায় সপ্তাহে পাঁচদিন যাওয়া আসার পথে একবারও তো মনে হয়নি এমন চোখ ভরে চারপাশটা দেখি! জানি না কেন এই শহরের ফাঁকা পথে নিজেকে একজন আগন্তুকের মতো মনে হচ্ছে।

টিচার্স রুমে উঁকি দিয়ে দেখলাম কেউ নেই। টেবিলের চারপাশে চেয়ারগুলি পরিপাটি করে সাজানো।  অফিসরুমের সামনে পিয়ন সালেহ দাঁড়িয়ে আছে হাতে-মুখে বর্ম সেঁটে। দূর থেকে চেনা যায় না। সে আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মাস্ক গলায় টাঙিয়ে আকর্ণবিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল, আসসালামু আলাইকুম ম্যাম।

–কেমন আছেন সালেহ? আর কেউ আসেনি?

–না। এখন তো ছুটি চলতাছে। ম্যাম আপনার কি মাস্ক লাগত?

সালেহ বরাবরই বুদ্ধিমান ছেলে! আমার জন্য একটা সার্জিক্যাল মাস্ক জোগাড় করে নিয়ে এল। একটা অস্বস্তি থেকে বেঁচে গেলাম। কাজ শেষ করে ডিপার্টমেন্টাল শপ থেকে কিছু খাবারদাবার কিনলাম। সারাফের জন্য একটা আমের আচার নিলাম। রাতে খিচুড়ি করতে বলব। আজ আমিও সারাফকে সাহায্য করতে পারব। কাজের মেয়েটা আসছে না কত দিন। মা আর সারাফ দুজনেরই খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাইকেও দেখছি টুকটাক ঘরের কাজ করছে।

প্যাকেটগুলি হাতে নিয়ে হাঁটা যাচ্ছে না। রিক্সার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম। দু-তিনটা রিক্সা চলে গেল যাত্রীসহ। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একটা খালি রিক্সা এসে সামনে দাঁড়াল। প্যাকেটগুলো রিক্সার একপাশে রেখে উঠে বসলাম। বসেই রিক্সার হুড তুলে দিতে বললাম রিক্সাওয়ালাকে। আজ বড়ো রোদেলা দিন। খুব ক্লান্ত লাগছে।

ঠিক তখনই। সেই সময়টায় প্রচণ্ড একটা শব্দ। কিছু বুঝে ওঠবার আগেই আছড়ে পড়লাম মুখ থুবড়ে কাঁকড় ছড়ানো পথে। মনে হল বাতাসের একটা চাবুক দ্রুত ছুঁয়ে গেল আমাকে। দেখতে পাচ্ছি প্যাকেটগুলো সহ রিক্সাচালক ছিটকে পড়েছে। একটা মাইক্রোবাস দ্রুত আমার পায়ের পাশ ঘেঁষে ছুটে গেল। আমার পায়ে, হাতে কিছু একটা পিচ্ছিল পদার্থ লেপটে আছে। ব্লাইন্ড স্পটে ঢুকে পড়ার আগে আমি চিত্রার্পিত চেয়ে থাকলাম আকাশের দিকে। আকাশ খণ্ডিত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একটু একটু অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। দেহটা ক্রমশ লঘু হচ্ছে।

জেগে উঠলাম আকাশের শেষ সীমানায়। ইথার ভরা মেঘের ভিতর।

আমি আচ্ছন্নতায় শুনতে পাচ্ছি …কেউ একজন বিড়বিড় করছে.. গোড়ালি ফ্র্যাকচার…ইমার্জেন্সি… ব্লাড টেস্ট… বেঁচে গেছেন…।

শুয়ে থাকতে হবে আকাশ বিহীন শয্যায়! রাত শেষে দিন কাটে। ভাই আসে প্রতিদিন। মাকে, সারাফকে বড়ো দেখতে ইচ্ছে হয়। পাঁচদিন হতে যাচ্ছে ডান পা প্লাস্টার অবস্থায় শুয়ে আছি। ফুসফুসে বাতাস কমে আসছে। খাবারে স্বাদ নেই, গন্ধ নেই। বাধ্যতামূলক কোভিড টেস্টের রিপোর্ট এসে গিয়েছে। পজিটিভ। এখানে রাখা যাবে না। গন্তব্য কুর্মিটোলা করোনা হাসপাতাল।

ভাই ডাকছে? নাকি আকাশ…

 

 বাবলী হক

বাবলী হকের জন্ম  পঞ্চাশের দশকে ঢাকা শহরে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরোনো  ঢাকায়। কৈশোর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন। ছোটোদের পাতায় ছড়া ও কবিতা দিয়ে শুরু। সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালী সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বের হয় প্রথম উপন্যাস। তারপর চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে।  দীর্ঘ তিরিশ বছর পর ২০১৫ তে স্মৃতির পটভূমিতে লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আম্বিয়াদাদি ও তার বিড়ালেরা’। আবার ফিরে এলেন লেখালেখির জগতে। ‘অষ্টপ্রহর আনাগোনা’ তাঁর তৃতীয় উপন্যাস। শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও  তিনি মূলত গদ্য লেখেন কিন্তু কবিতা পড়তে ভালোবাসেন। প্রিয় কবির তালিকাও দীর্ঘ।  প্রিয় লেখক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা চৌধুরী ও কবিতা সিংহ। বৃষ রাশির জাতিকা এই লেখকের শখ—ভ্রমণ ও বাগান করা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।